-
কবি, কবিতা ও কবিত্ব
মনির হোসেন সোহাগবাংলা ছন্দের রূপরেখা গ্রন্থে মাহবুবুল আলম লিখেছেন, ‘প্রকৃতি ও জীবনের সান্নিধ্যে কবিমনে সৃষ্ট বিচিত্র ভাব যখন ছবির মত প্রত্যক্ষ এবং গানের মতো মধুর করে ছন্দোবদ্ধ বাক্যে প্রকাশ করা হয় তখন তাকে কবিতা বলা হয়’। যথোপযুক্ত শব্দ চয়ন, ছন্দময়তা, ভাষাচিত্র এবং ভাব কল্পনা প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে বলা হয়, মানবমনের ভাবকল্পনা যখন অনুভূতিরঞ্জিত যথাবিহিত শব্দসম্ভারে বাস্তব সুষমামন্ডিত চিত্রাত্মক ও ছন্দোময় রূপ লাভ করে তখনই তার নাম কবিতা। বিশ্বায়নের এ যুগে রাজনৈতিক বলয়ে যেমন এসেছে মতাদর্শনের ভিন্নতা তেমন-ই কবিতাকে সংগায়িত করতেও রয়েছে ভিন্ন মত। প্রবীনদের মতে, কবিতা হলো গীতপ্রবনতা, মিল, অন্তমিল, অক্ষর কিংবা অনুপ্রাসের প্রবাহমানতায় ব্যক্তি কিংবা সামাজিক জীবনের নানামুখী দর্শন, দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যক্তি কথামালার সমষ্টি। আবার তরুণ প্রজন্মের মতে, একজন সাধারণ ব্যক্তির হৃদয়স্পন্দনের অসাধারণ বহিঃপ্রকাশই কবিতা। কবিতাকে যেভাবেই সংগায়িত করা হোক না কেন কবিতা সাধারণ মানুষের মনের না বলা কথাগুলোর-ই বহিঃপ্রকাশ। সে কবিতা হোক ছন্দময় কিংবা গদ্যময়। কেননা কেবল ব্যক্তি কেন্দ্রিক আনন্দ-বিষাদ নয়, সমাজ বাস্তবতার মর্মমূলে নিহিত যে রাজনৈতিক বাস্তবতা, তার বিস্তারও অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে কবির কবিতায়। কবি স্পষ্টভাবে বা রূপকের অন্তরালে সমাজকে চিত্রিত করেন একান্ত আপনমনে। কবিতায় সাম্যের বাণী ধ্বণিত হয়, নিঃসৃত হয় ভালবাসার অনুরাগ। আবার কখনো বা কবিতা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা। যেমনটি চায় সমাজের শ্রমিক-যুবার, চাষা-কুলি আর পেশাজীবী সাধারণ মানুষ।
প্রতিটি দশকের কিংবা প্রতিটি শতকের কবিরা সবসময় তাদের নিজেদের এবং তাদের চারপাশের কথা বলেছেন। প্রকাশ করেছেন হৃদয় স্পন্দন, আকুতি কিংবা স্বপ্নাতুর প্রত্যাশা। এঁকেছেন আগত কিংবা অনাগত দিনের ভাষাচিত্র। ব্যক্তিগত আনন্দ বেদনা, ভাষাময়তা পেয়ে অত্যন্ত সত্য, সুন্দর ও স্বার্থক হয়ে ফুটে ওঠেছে কলমের নিপুন আছড়ে। আর এসব কথা, আর্তি, স্বপ্ন কিংবা চেতনা ভাষাহীনতায় অবরুদ্ধ ছিল গণমানুষের মনে। এজন্যেই একজন কবির লেখার সাথে সাধারণ মানুষ আত্মীয়তা বোধ করে।
যিনি কবিতা লিখেন তিনিই কবি। আরো বিশদভাবে বলতে গেলে, যিনি সমাজ জীবনের প্রাত্যহিক সকল ঘটনা, চাওয়া-পাওয়া, কিংবা স্বপ্ন শব্দ বনুনে ফুটিয়ে তোলেন, সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে, মেধা-মননে, চলনে-বলনে কিংবা সামাজিকতায় আরেকজন সাধারণ মানুষ কবি হয়ে ওঠে। আরো সহজভাবে বলা যায়, সমাজের প্রতিটি মানুষই কোন না কোনভাবে কবি। কেউ কবি হয়ে ওঠে, প্রকাশিত হয় আবার কেউ বা নিভৃতচারী থেকে যায় অন্তরালে। কেউবা তাঁর কবিত্বের বিকাশ ঘটায় কেউ অবরুদ্ধ রাখে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়। প্রত্যেক দেশের, প্রত্যেক জাতির, প্রতিটি কবিই তাঁর কবিতার মাধ্যমে একটি দেশের, একটি জাতির, একটি সময়ের ইতিহাসকে জীবন্ত করে করে রাখে কলমের আছড়ে কিংবা বইয়ের পাতায়। সমৃদ্ধ করে ঐ দেশ জাতি কিংবা বিশ্বসাহিত্য সম্ভারকে। এজন্যেই কবিকে বলা হয় একটি জাতির স্বপ্ন দ্রষ্টা। কবির কবিতা হাজার বছর পরও প্রামান্য দলিল হয়ে রয়, তৎকালীন রীতি-নীতি, আচার-অনাচার, চিন্তা-চেতনা, জীবন-বোধ, ভাষা-সংস্কৃতি তথা সমগ্র সমাজ ব্যবস্থায়। কেননা সাধারণ মানুষের হৃদয় স্পর্শি কবিতা মানুষের অন্তরে গেঁথে থাকে, গেঁথে রয়।
3 Comments
Friends
মোঃ আমজাদ হোসাইন
@amzadhossian34041gmail-com
Badhon Roy Dipto
@badhon-roy-dipto
তাহমিদ হাসান লাতাব
@tahmid
Mohammad Shiown
@mohammad-shiown
RUHIN HASAN
@ruhin
Bikash Biswas Joy
@bikashbiswasjoy1010
Sushmita Biswas
@sushmitashruti
বিলকিস খানম কাজল
@bilkiskhanam-kazal
Raju Biswas
@raju-biswas


ভালো আলোচনা