-
বৈবাহিক ধর্ষণ ও ইসলাম; প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে যতগুলো নিকৃষ্ট কাজ আছে তার মধ্যে ধর্ষণ নিকৃষ্টতম যা মানব নামক সৃষ্টির অন্যতম অংশ নারী সমাজের পবিত্রতা, স্বাধীনতা, স্বকীয়তা ও ইচ্ছা কে নিষ্ঠুর ভাবে নষ্ট করে দেয়। এটি মানবিকতার চরম বিপর্যয় ছাড়া কিছুই নয় যেখানে শালিনতা, নৈতিকতা ও সুস্থ চিন্তাধারা’র লেশ মাত্র খুঁজে পাওয়া যায়না। এটি আরো চিন্তার বিষয় হয় যখন দেখা যায় যে একটি নারী তাঁর সর্বস্ব ছেড়ে এক অপরিচিতি বা পরিচিত পুরুষকে নিরাপদ মনে করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং সেখানেই সেই নারী ঐ পুরুষ দ্বারা এমন আচরণ বা ব্যাবহারের স্বীকার হন যা ধর্ষণের পর্যায়ে পরে। যাকে বিশ্ব সভ্যতা বৈবাহিক ধর্ষণ হিসাবে আক্ষা দেয়।
কোনো নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে জোর পূর্বক যেকোন অবস্থায় তাঁর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করাকে ধর্ষণ বলা হয়। মানবাধিকার কর্মিদের মত অনুসারে বৈবাহিক ধর্ষণের ব্যপার টি একটু ভিন্ন যেখানে ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় আইনে স্বামী স্ত্রী একে অপরের জন্য বৈধ। তবে যখন কোন স্বামী তাঁর স্ত্রী’র ইচ্ছা ও সহমতকে উপেক্ষা করে সে (স্ত্রী) শারীরিক ও মানুষিক ভাবে অপ্রস্তুত থাকার পরেও তাঁর চাহিদা পূরণ করতে উদ্ভুদ্দ হয় এবং তাঁর ইচ্ছা চরিতারথ করে তখন তা বৈবাহিক ধর্ষণ হিসাবে গণ্য হবে।
উনিশ শতকেও এই মতবাদের কোন স্পষ্ট ধারনা ছিল না। তবে বিশ শতকের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে এটি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয় যা প্রথম অবস্থায় প্রতাক্ষাত ছিল খোদ তথাকথিত সভ্যতার ধারক ও বাহক হিসাবে পরিচিত পশ্চিমা দেশগুলোতে। বলতে দিধা নেই যে এখনো অনেক অইসব সভ্য দেশ এ এর পুরোপুরি স্বীকৃতি হয়নি। যা ৭০ এর দশকে এসে প্রথম আমেরিকা এটিকে ধর্ষণের মত অপরাধ বলে শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়ন করে। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত এর জন্য পরিস্কার কোন আইন প্রণয়ন বা কোন পদক্ষেপ গ্রহন করেনি।
এখোনি উপযুক্ত সময় এটি নিয়ে কথা বলার, এটিকে সবার সামনে উপস্থাপন করার। কেননা বাংলাদেশের সিংহ ভাগ মহিলা জানেন না যে তারা যে ঘরোয়া সহিংসতার স্বীকার হন তাঁর সুন্দর শাস্তিমুলক আইন হতে পারে। বিষয়টি আরো বেশি প্রয়জনিয় ও গুরত্তপূর্ণ হয়ে পরেছে এই কভিট-১৯ এর সময়। অনেক পরিসংখ্যানই এর সত্যতা প্রমান করে। “মানুষের জন্য ফাওন্ডেসন” বলছে এই লক-ডাউন এর সময় বাংলাদেশের ২৭ টি জেলায় কমের পক্ষে ৪২৪৯ জন মহিলা বৈবাহিক ধর্ষণ সহ অন্যান্য সহিংসতার স্বীকার। এবং ১১০০০ নারী তাঁর স্বামী দ্বারা সহিংসতার স্বীকার। এই পরিসংখ্যানটি অন্য যেকোন সময়ের থেকে অনেক বেশি নাড়া দেয় যেখানে নির্যাতিতের সংখ্যা অনেক বেশি। বাংলাদেশি নারী এটা বুঝতে পারেন না যে তাঁর স্বামী একজন ধর্ষক এর ভুমিকায় আবির্ভূত হতে পারে।এবং যার কারনে মূলত অসচেতন ভাবেই সে প্রতিনিয়তই একজন ধর্ষকের সাথে থাকছে। যেখানে একটি মেয়ে এক সম্পূর্ণ অপরিচিত পুরুষের হাতে হাত রাখে এক আজানা বিশ্বাস এর উপর ভিত্তি করে, যার কাছে সে সভাবতই নিজেকে নিরাপদ মনে করে। কিন্তু সেই পুরুষটি নাপারে তাঁর পবিত্রতা রক্ষা করতে , নাপারে তাঁর বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে। যার কারণে ঐ পুরুষটি কখোনই তাঁর আপনজন কে খুঁজে পায়না যার দরুণ সংসারে অসান্তি লেগেই থাকে। যেমন টি রুদ্র মুহাম্মাদ শহিদুল্লাহ বলছেন,
তোমাকে পারিনি ছুঁতে, তোমার তোমাকে
উষ্ণ দেহ ছেনে ছেনে কুড়িয়েছি সুখ,
পরস্পর খুড়ে খুড়ে নিভ্রিতি খুঁজেছি।
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারিনাই।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার কতটা সোচ্চার বা তারা কতটা নাগরিককে সচেতন করার ক্ষেত্রে কাজ করছে। বাংলাদেশি আইনে এই বৈবাহিক ধর্ষণের কিছুটা উল্লেখ পাওয়া গেলেও তা কোন কাজে আসার মত নয়। এ ব্যাপারটি আলোচনার আগে আমার কাছে আর একটি বিষয় আলোচিত হওয়ার দাবি রাখে তা হল ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলাদেশের এক বৃহৎ জনগুষ্টি ইসলাম ধর্ম মতে বিশ্বাস করে। অনেক সময় এমনো দেখা যায় যে অনেকেই তাঁর বাঙ্গালী পরিচয়ের আগে ধর্মীয় পরিচয়ে পরিচিত হতে ভালবাসে। তাই এটি নয়ে কথা বলাটাই বেশি প্রয়োজন বোধ করছি।
ইসলাম সরাসরি বৈবাহিক ধর্ষণ কে স্বীকৃতি দেয়না বরং অনেকাংসেই অস্বীকার করে। কেননা ইসলাম বলে, বিবাহের পরে স্ত্রী তাঁর স্বামীর ক্ষেত স্বরূপ যেখানে স্বামী তাঁর ইচ্ছে মত বিচরণ করতে পারে তবে নির্দিষ্ট কিছু দিন ছাড়া যে দিনগুলোতে স্ত্রীর শরীর থেকে অপবিত্র রক্ত নির্গত হয় কেননা এটি স্ত্রীর প্রতি নির্যাতন ও উভয়ের ক্ষতির কারণ (সুরা-২/২২২,২২৩)। এই কথাতে এটা প্রমানিত হয় যে ঈসলামি আইন এ বৈবাহিক ধর্ষণের কোন স্থান নেই বরং ইসলামী বোদ্দারাও এটি মেনে নেন না। কিন্তু বৈবাহিক সম্পর্ক বৈবাহিক ধর্ষণে পরিনত হওয়ার যে কারণ গুলো আছে তা পরক্ষ ভাবে ইসলামে উল্লেখ করা আছে। প্রথমত, ধর্ষণ হচ্ছে নির্যাতনের অপর নাম। আর ইসলামে নির্যাতন করতে শুধু নিষেধই করা হয় নি বরং বলা হয়েছে, যে জুলুম করবে তাঁর উপর আল্লাহ’র লা’নত তাকে আল্লাহ ভালবাসেন না (সুরা- ৩/৫৭)। দ্বিতীয়ত, শারীরিক বা মানুষিক অপ্রুস্তুতির কারণে স্ত্রীর অনিচ্ছা সত্তেও দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করা। শারীরিক্ অক্ষমতার কথা সরাসরি উল্লেখ আছে এবং ইসলাম কোন বিষয়ে জোর জবরদস্তি করতে নিষেধ করেছে সুতরাং মানুষিক অক্ষমতার কারণে অনিচ্ছা প্রকাশ করা এর মধ্যে গণ্য হয় এবং ইসলাম অন্যের ইচ্ছা ও মতামত কে সন্মান দিতে বলে যদি ইসলামের কোন আইন এর লঙ্ঘন না হয়। ইসলাম আরো বলে যে যখন কোন ব্যাক্তি তাঁর স্ত্রির সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চায় সে যেন তাঁর স্ত্রীকে প্রথমে তা ইঙ্গিতের মাধ্যমে বুঝায়। তৃতীয়ত, একজনের কথা ও কাজে অপর জন যেন কষ্ট না পায় সে বিষয়ে ইসলাম অনেক গুরুত্ব দেয়। আর এই সহিংসতাতে কষ্ট পাওয়ার বিষয়টি সু প্রতিষ্ঠিত। উপর্যুক্ত কারণগুলো বিবেচনা করে এটা আমরা বলতে পারি যে ইসলামে এ ধরনের ঘরোয়া সহিংসতার স্থান নেই।
ঠিক একই ভাবে বাংলাদেশি আইনে বৈবাহিক ধর্ষণের কারণকে ভিত্তি করে কিছু পরক্ষ পরিভাষা আমরা উল্লেখ করতে পারি। যেমন, বাংলাদেশ সংবিধানের ৩২ নং ধারায় বলা আছে যে, ব্যাক্তি স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবেনা। এবং ৩৯ নং ধারায় বাক স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। অথচ বৈবাহিক ধর্ষণ বা ঘরোয়া সহিংসতায় এই দুই ধারার কোনটারই বহাল থাকেনা। স্ত্রী তাঁর সকল ধরনের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত তো হয়ই উপরুন্তু কোন কিছু বলার অধিকার বেমালুম হারিয়ে ফেলে। বাংলাদেশ পিনাল কোড ১৮৬০ এর ৩৭৫ নং ধারার অতিরিক্ত ধারায় এব্যাপারে বলা হয়েছে যে যদি স্ত্রীর বয়স ১৩ বছরের কম হয় তাহলে তা বৈবাহিক ধরষনের পর্যায়ে পরবে এবং স্বামী কে শাস্তি দেওয়া যাবে। কিন্তু এই আইন এখন বাংলাদেশে বর্ণনাতীত ভাবে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পরেছে যেখানে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েকে বিয়ে করাটাই একটি শাস্তিযুগ্য অপরাধ। যদিও পিনাল কোডের ৩ টি ধারার সাথে বৈবাহিক ধর্ষণের কারণ গুলো হুবহু মিলে যায় ১। মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়া, ২। তাঁর সম্মতি ছাড়া সম্পর্ক স্থাপন করা, ৩। মৃত্যু ভয় বা মারার ভয় দেখিয়ে সম্মতি নেওয়া, এটা ১৩ বছরের নিচে তো বটেই ১৮ বছরের উপরেও হরহামেসা ঘটছে। এই যখন অবস্থা তখন “দ্যা কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর- ১৮৯১” এর ৫৬১ নং ধারায় দায় সারানোর মতো বলা আছে বৈবাহিক ধর্ষণ কিনা তা ক্ষতিয়ে দেখতে। এটি কিছুটা আশার আলো জাগালেও কোন নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান নেই।
অনেকেই বলবে যে কোন মুসলিম দেশে তো এরকম শাস্তির বিধান নেই তবে বাংলাদেশে কেন? তাদের জ্ঞাতার্থে বলি, আমাদের দেশে এই সহিংসতার হার দিন দিন বেশি হচ্চে যার এক নুমুনা উপড়ে আমি দিয়েছি। তবে আরো বলি যে অনেক দেশই বৈবাহিক ধর্ষণ কে শাস্তিযুগ্য অপরাধ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে, এমনকি কিছু মসলিম দেশ যেমন কাতার, তুরুস্ক এটিকে অপরাধ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং আলাদা আইন প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশের এখন উপযুক্ত সময় বৈবাহিক ধর্ষণ কে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার। সংবিধান ও ধর্মীয় অনুশাসন লঙ্ঘিত হচ্ছে। খুব সম্প্রতি ধর্ষণের যে জয়জয়কার শুরু হয়েছিল তা যে এখন মিটে গেছে এমনটি ভাবা নেহায়েত নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেওয়া হবে। তাই বলি, কোন কিছু চরম পর্যায়ে পৌছানোর আগেই সেটা নিয়ে সোচ্চার হতে পারলে তা প্রতিরোধ বা প্রতিহত করাটা অনেকাংশেই সহজ। এটি ঠিক জন্মের পর পরই আগাছা তুলে ফেলার মতো অবস্থা হবে যাতে করে গাছের ক্ষতি করতে না পারে। সে জন্যই আমাদের বড় দায়িত্ব হলো মানুষকে এই বৈবাহিক ধর্ষণ সম্পর্কে পরিস্কার তথ্য দেওয়ার মাধ্যমে সচেতন করানো। আমরা আমাদের দেশকে অনেক উন্নত করার লক্ষে কাজ করছি এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য কাজ করছি সেখানে জাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে অন্ধকারে রেখে এবং অবহেলা করে তা কি আদৌ সম্ভব? যেখানে আমরা এক সুস্থ মানুসিকতা সম্পূর্ণ জাতি গঠনে বদ্ধ পরিকর সেখানে আমাদের নৈতিকতা ঠিক রাখা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা সব বুঝেও অনিষ্ঠের মুল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এই অনিষ্ঠ থেকে জাতিকে রক্ষা করতে আইন প্রণয়ন ও যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা একান্ত জরুরী। এই দৃষ্টি ভঙ্গি থেকেই বৈবাহিক ধর্ষণ কে অপরাধ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। এখনই সময় এটি নিয়ে চিন্তা করার। এখনই সময় এটি কে সবার সামনে তুলে ধরার। এখনই সময় বৈবাহিক ধর্ষণ কে অপরাধ হিসেবে দেখার।6 Comments
Friends
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
অভিমানী মন
@ovimanimon
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor
তুলট ডেস্ক
@toulot
Dhali Moin
@dhali-moin
Mohammad Hasan
@mohammad-hasan


আমরা আরো মানবিক হয়ে উঠবো। অভিনন্দন তোমাকে।