-
গল্পঃ স্বার্থ
“তো যা বলছিলাম, খালি ফুটপাত দেখলেই কেন জানি নিজেকে রেসের ঘোড়া মনে হয়”, হাসতে হাসতে বললো রানা, ” আমি রেসের ঘোড়া, আর ফুটপাতগুলা হচ্ছে দৌড়ের ময়দান। আর ফুটপাতে হাটতে থাকা মানুষগুলোকে টক্কর দিয়ে রাস্তার শেষ মাথায় যাওয়াই আমার মেইন গোল,” কথা শেষ করেই চায়ের কাপে ডুব মারলো সে।
রিফাত কোনো জবাব দিলো না, নিজের ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে রইলো শুধু। গাঢ় বাদামী রঙের চায়ের উপর ভেঙে যাওয়া লাল সর এখনো ভাসছে। চা-টা কেমন যেন তিতকুটে-তিতকুটে লাগছে তার কাছে। বেশি লিকার পড়ে গেছে নাকি?
“ভাই টেনশন করস ক্যান, প্যারা নাই, চি……” কথাটা বলতে গিয়েও থেমে গেলো রানা। কথাটা খুব মিথ্যা শোনাচ্ছে।
তাছাড়া, কাউকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে কোনো লাভ আছে কী?
অবশ্য রিফাতের দুশ্চিন্তার কারণটা সে জানে না। খুব সম্ভবত গত পরশুতে দেওয়া ফিজিক্স খাতা। তিন সেকশনের মানুষ এই পরীক্ষাইয় গণহারে ফেল করেছে।
এর চেয়ে সে নাহয় নিজের মতন বকবক করতে থাকুক, সবকিছু নাহয় এভাবেই যাক। পাশের ব্যস্ত রাস্তাঘাটে চলতে থাকা বলাকা বাস, রিকশায় বসে গামছা দিয়ে ঘাম মুছতে থাকা রিকশাওয়ালা- সব।
কিছু সময় পর রিফাত নিজেই ভুলে যাবে তার দুশ্চিন্তার কথা।
” একটা মজার জিনিস শুনবি?”, রানা নতুন করে কথা শুরু করার চেষ্টা লাগালো।
“আগে ছোটো থাকতে কে জানি আমাকে বলেছিল, কাক মরলে তা নাকি জীনে খায় ! কথাটা সত্যি নাকি জানার জন্য তারপর এমন কাজ করেছিলাম, ভাই রে ভাই, এখনো ভাবলে নিজেরে বলদ বলদ লাগে”
রানা ভেবেছিলো, রিফাত হয়তো জিজ্ঞাসা করবে, “কি করলি তারপর?” কিন্তু রিফাত অন্যমনস্কভাবে “হু” এর মতো একটা শব্দ করলো শুধু।
রানা গলা নামিয়ে ষড়যন্ত্রকারীর মতো বললো,
” তারপর কী করেছিলাম জানিস?”
“কী?”
” বিদ্যুতের খাম্বার নিচ থেকে একটা মরা কাক এনে বাসার স্টোর রুমে এনে রেখে দেখলাম কী হয়। পাক্কা একসপ্তাহ রাখলাম” শেষকথাটা ফিসফিস করে বললো রানা।
” একসপ্তাহ রাখতে পারলি?” রিফাত এই প্রথম কথায় একটু আগ্রহ দেখালো।
” হ্যা, পারবো না কেন?” রানা বাহাদুরি করার মতন করে জবাব দিলো।
” এসব ছ্যাঁচড়ামি আংকেল-আন্টি একবারও দেখে নাই?”, রিফাত অবাক হয়ে প্রশ্ন করে।
রানা রিফাতের প্রশ্নের দিকে কোন পাত্তা দিলো মনে হলো না। সে নিজের মতন করে বলতে থাকলো, ” প্রথমদিন তেমন কিছু হয় নাই”,
“তারপর আস্তে আস্তে, প্রথম কয়েকদিনে কাকটার মাংস পচা শুরু করলো। আস্তে আস্তে, কিন্তু সে কী গন্ধ, গন্ধের চোটে মরে যাইতে ইচ্ছা করবে!”
” তারপর? ”
“তারপর আর কিছুই না, বাসার সবাই তো টের পাইলো, সেই সাথে আম্মুর ঝাড়ুর বাড়ি খেয়ে এসব উল্টাপাল্টা কাজ করার যত তেল ছিল, সব ওইদিনই বের হয়ে গেলো। দি এন্ড”, রানা কথা শেষ করে ফিক করে হেসে দিলো, “মোরাল অব দ্য স্টোরি , একজন সাইকোর কান্ডকারখানা থামানোর জন্য একটা শক্ত ঝাড়ুর বাড়িই যথেষ্ট”,
রিফাতকে একটু আশাহত মনে হলো। এরকম তড়িঘড়িভাবে শেষ করাটা তার ঠিক পছন্দ হয় নি।
“আচ্ছা, তুই যে একটা মরা কাক এনে স্টোররুমে এনে রাখলি, কেউ দেখে পর্যন্ত নাই?”, রিফাত প্রশ্ন করার চেষ্টা করে।
“নাহ, আম্মু-বাবা বাইরে গেছিলো তখন, এই সুযোগে……বুঝছিস তো, হোম অ্যালোনে মানুষ যেসব করে….”
রিফাত ঘড়ির দিকে তাকালো। দেড়টা বাজছে। কোচিং আছে দুটায়। ইশ, বাসাটা কাছে হলে ভালো হতো, একটু বাসায় গিয়ে রেস্ট নেওয়া যেতো, এইসব আজগুবি সব গল্প শোনা লাগতো না।
রানা ছেলেটাকে রিফাতের চেনা আছে। কোনো প্রয়োজন ছাড়া যেচে কথা বলার মতো মানুষ এ না। হয়তো বায়োলজি প্র্যাকটিকালের ইনডেক্সটা লাগবে দেখে এরকম খাতির পাতাতে আসছে।
একমাত্র এটাই হয়তো রানার এরকম বাড়তি খাতিরের কারণ। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক।
মানুষ যথেষ্ট স্বার্থপর প্রাণী। স্বার্থ ছাড়া কেন খালি খালি কিছু করতে যাবে?
রিফাতের মেজাজ আজকে এমনিতেই খারাপ।
মাঝে মাঝে তার কাছে সবকিছু কেন জানি ভয়াবহ অসহ্য লাগে। আজ যেমন লাগছে। অসহ্য, ভয়াবহ অসহ্য।
কাল সারারাত ঘুম হয় নি। ইদানিং প্রায়ই হয় না। ইনসোমনিয়া কী না আল্লাহ মালুম।
এর জন্যেই কী এরকম বিরক্ত লাগছে? কে জানে?
রিফাত আবার ঘড়ির দিকে তাকালো, পৌনে দুটা বাজছে। আক্কাস স্যারের কোচিংয়ের সময় হয়ে আসলো। অবশ্য স্যারের বাসাটা বেশি দূরে না। এই তো দুই গলি পাশেই, লাল বিল্ডিংটা ।
ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বেঞ্চ ছেড়ে উঠতেই রানা গলার গদগদে ভাবটা ঝেড়ে পরিষ্কার করে বললো,
” আচ্ছা একটা কথা ছিল”
“কী?”
“তোর বায়োলজি প্র্যাক্টিকালের ইনডেক্সটা-…”
রিফাত মনে মনে হাসলো। যা ভেবেছিলো ঠিক তা-ই।
এই একটা কথা, এতো ভণিতা করে না বললে কী হতো না? প্রথমে রাস্তায় হাঁটার গল্প, তারপর মরা কাকের কাহিনী……… এতো অজুহাতের কী আদৌ দরকার ছিল?
কিন্তু বাইরে দিয়ে রিফাত শুধু জবাব দেয়, হুম
” তাইলে আজ রাতে কী আসতে পারবি আমাদের বাসায়। ইনডেক্সটা নিয়ে?”
রিফাত আবার একই জবাব দিলো, হুম
উত্তরটা শুনেই কীনা কে জানে, রানার খুশিতে গদগদ ভাবটা আবার ফিরে আসলো। সে গদগদ স্বরে অনেকটা নিজের মতো করেই বললো,
“যাক,এমনিতেই আজকে আমি হোম অ্যালোন ……… ইচ্ছামতন মজা করা যাবে”
রিফাত কিছু বললো না, কী মজা করা যাবে সেটা নিয়ে তার মাঝে তেমন আগ্রহ নেই। শুধু মনের মাঝে একটুকরো দুশ্চিন্তার অবসান।
যাক, আজগুবি কথার ফায়দা আছে বলতে হবে। শুধু ফায়দা না, ভালোই ফায়দা। গত রাত এই চিন্তায় ঘুম হয় নি তার।
রিফাত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে রানার দিকে তাকালো।
লাশটা রাখবার অবশেষে একটা ভালো জায়গা পাওয়া গেছে। স্টোররুমটা একবার ভালো করে দেখে আসাই শুধু বাকি।
তাছাড়া যে বাসায় একা থেকে এমন কাজ করে অভ্যস্ত, তার উপর সন্দেহের তীরটা ঘুরানো তেমন কঠিন হবে না।
সবকিছুর পেছনেই স্বার্থ থাকে, কোচিংয়ের দরজা খুলতে খুলতে রিফাতের মাথায় কথাটা বেজে উঠলো।
মানুষ যথেষ্ট স্বার্থপর প্রাণী। স্বার্থ ছাড়া কেন সে খালি খালি কিছু করতে যাবে?1 Comment
Friends
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
অভিমানী মন
@ovimanimon
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor
তুলট ডেস্ক
@toulot
D K MAHANTA
@dkmahanta01718942602
Fahim Hasan
@fahim-hasan



অসাধারণ