-
প্রিয় তুহিন ,
তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই , বিয়ের অনেক বছর পরে আমার হটাৎ খুব শখ হলো যে আমি নাক ফুঁটো করবো?
সাথে করে দুই ছেলে এবং তোমাকে নিয়ে পার্লারে গিয়ে নাক ফুঁটো করলাম, পার্লার থেকে নাক ফুল পরিয়ে দিলো।এবং বলে দিলো কিছু দিন পরে এই নাকফুল খুলে সোনার নাকফুল পরতে পারবো। তুমি খুব সুন্দর ছোট্ট একটি নাকফুল বানিয়ে দিলে।কিন্তু আমি সেই নাকফুল পরলেই নাক একদম টুক টুকে লাল হয়ে যায়।এরপর একে একে অনেকগুলো নাকফুল বানিয়ে , কিনে দিলে তুমি।যেটাই পরি না কেন, একই অবস্থা। শেষে তুমি বললে বাদ দেও পরতে হবে না। কিন্তু আমার মন সেটা মানতে চায় না, আমি শুনেছি যে নাক ফুঁটো করার পরে নাক ফুল না পরলে স্বামীর অমঙ্গল হয়।এই আশংকায় আমি নাক ফুল পড়ে থাকি, এদিকে নাক টুকটুকে লাল হয়ে থাকতো। তুমি খুলে দিলে, আমি তখন বাধ্য হয়ে আমার আশংকার কথা তোমাকে বললাম।শুনে তুমি হেসে বলেছিলে এগুলো কুসংস্কার। কোন গহনা কারো জীবন বাঁচাতে বা রক্ষা করতে পারে না।
তোমার মধ্যে কোন কুসংস্কার আমি কখনও দেখি নাই, বিয়ের পরেও সবাই বলতো বিবাহিত মেয়েদের সব সময়ে হাত, কান খালি রাখতে হয় না, এতে স্বামীর অমঙ্গল হয়।
আমার অভ্যাস ছিলো না হাতে কানে সব সময়ে পড়ে থাকার , তাই অস্বস্তি বোধ করতাম।তুমি তখনও বলেছিলে পড়তে হবে না এগুলো কুসংস্কার।
কুসংস্কার মুক্ত তোমাকে আমার ভালো লাগতো, সেটা তোমাকে কখনো বলা হয়নি।
তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে তুহিন যে আমি বিয়েতে কবুল বলতে অনেক বেশী সময় নিয়েছিলাম? আমি ব্যাকুল হয়ে কাঁদছিলাম, আমার আব্বা, ডাক্তারদের বেঁধে দেওয়া তাঁর জীবনের শেষ সময় গুনছিলেন বাসায়। আব্বাকে ছেড়ে আম্মাও কমিউনিটি সেন্টারে আসতে পারেন নি।আমার মেজভাই, ভাবি, আমার আদরের দুই ভাস্তি, আমার বিয়েতে আসতে পারেনি সুদূর আমেরিকা থেকে।
যেদিন আমার গায়ে হলুদ হচ্ছে ,মেজভাই ফোন করে অঝোরে কাঁদছে। ফোনের দুই প্রান্তে আমরা দুই ভাই বোন অঝোরে কাঁদছি।পাশের রুমে অসুস্থ আব্বা আমার কান্না শুনে অস্থির হয়ে বড় ভাবির কাছে জানতে চাচ্ছেন, কি হয়েছে আমার মা মনির? আমার মা মনি কাঁদছে কেন?
এমন এক পরিস্থিতিতে কবুল শব্দটা বলা কি অনেক সহজ ছিলো তুহিন?
আমার শুধু আম্মাকে তখন দেখতে ইচ্ছে করছিলো। আমি আম্মা আম্মা করে নাকি কেঁদেছিলাম। লুতফর ভাই আমার সেই কান্নার অডিও করে রেখেছিলেন এবং বিয়ে পরে অডিও বাজিয়ে সবাইকে শোনাতেন।
হ্যাঁ ,তুমি বিষয় টা বুঝতে পেরেছিলে এবং সবাইকে বলেছিলে আমার কবুল বলতে দেরী হওয়ার কারণ। যদিও তোমার পক্ষের অনেকেই অনেক কথা বলেছিলো তোমাকে, যেমন- মেয়ে মনে হয় বিয়েতে রাজি ছিলো না ,ইত্যাদি ইত্যাদি।
তুহিন আমাদের বিবাহিত জীবন ছিলো ১৯ বছর ১২ দিন।
এরমধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সময় আমরা কাটিয়েছি ২০২০ এর এপ্রিল ৮ থেকে ২২শেমে’২০২০ এর সময়টাই।এতটা সময় আমরা আর কখনও একসাথে কাটানোর সুযোগ পাই নি।
আমি ব্যস্ত ছিলাম আমার লেখা পড়া নিয়ে, তুমি তোমার চাকরি নিয়ে।
এই করোনাকালীন সময়ে যখন লকডাউনে সব বন্ধ, সেই সময়ে আমরা পেয়েছিলাম একান্ত ভাবে দুজনকে।
কত কথা, কত গল্প, কত রান্না! এতটুকু সময় তুমি আমাকে একা ছাড়তে না, সারাক্ষণ শুধু আমাকে ডাকতে।আমরা চারজন যেন এই কয়েকটি দিন একসঙ্গে লেপ্টে থাকতাম।
প্রতিদিন নতুন নতুন আইটেম বানিয়ে প্রতিবেশীদেরকে ইফতার পাঠাতে , আমার নিষেধ করা স্বত্বেও বাজারে যেতে।
এরপর কোথা থেকে কি হয়ে গেলো তুহিন?
আমাদের বিয়ের ২১ দিনের দিন আব্বা চলে গেলেন।আমি আমার জীবনের প্রথম মৃত্যু দেখলাম, তাও আবার সেটা আমার প্রিয় আব্বা। আমি ব্যাকুল হয়ে কান্নাকাটি করছিলাম।আম্মা এসে আমার মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন -লায়লা, কাঁদিস না মা, আব্বার জন্য দোয়া কর!”
আমি নির্ভরতায়, আম্মার কাঁধে মাথা রেখে আব্বার চলে যাওয়ার শোক ভুলার চেষ্টা করেছিলাম।
আবার যেদিন আম্মা চলে গেলেন সেদিন তুমি নওগাঁ থেকে পৌঁছানোর আগেই আম্মা চলে গেলেন। আমি ফোন করে তোমাকে জানালাম, তুমি বললে- তুমি চলে এসেছো প্রায়। ছেলেদেরকে বললে আম্মুকে দেখে রাখো।
তুমি এসে আমার হাত ধরলে আমি পরম ভরসায় তোমার কাঁধে মাথা রেখে আম্মার চলে যাওয়ার শোক ভুলার চেষ্টা করলাম।
কিন্তু তুহিন তুমি যখন চলে গেলে একদম অপ্রত্যাশিতভাবে তখন কিন্তু আমি কোন ভরসার হাত, স্বন্তনা দেওয়া , কান্না করার জন্য একটা কাঁধ পাইনি তুহিন।
এমন সময় যখন কেউ কারো কাছে ইচ্ছে করলেই আসতে পারে নাই। আমিও পারিনি আমার বাচ্চাদের জড়িয়ে ধরতে।
তুমি আমি আমরা সবাই নির্দিষ্ট হায়াত নিয়ে/ রিজিক নিয়ে এই পৃথিবীতে এসেছি , এর বাহিরে যাওয়ার সাধ্য আমাদের নেই।
তবু্ও কতজনের কত কথা আমাকে শুনতে হয়েছে।
আমি জানি তুমি থাকলে এর উত্তর তুমি দিতে।
আজ ২৯শে রমজান। ২০২০ সালের ২৯শে রমজান ভোরে তুমি আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছো তোমার নির্দিষ্ট গন্তব্যে।
আমরা তোমার সাথে কাটানো প্রতিটি মূহুর্তের স্মৃতি বুকে নিয়ে একে একে চার বছর পার করলাম।
মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে এই দোয়া করি যেন তিনি তোমাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান করে নেন।আমিন।
তোমার হেনা।
০৯/০৪/২০২৪6 Comments-
-
কি ভীষণ আবেগ মিশে আছে এই খোলা চিঠিখানিতে না পড়লে জানতেই পারতাম না! পড়তে পড়তে কি নিদারুণ শূন্যতা অনুভব করছি বুকের বা পাশটায়, বলে বোঝাতে পারবো না! প্রিয় মানুষগুলো যেখানেই থাকুক ভালো থাকুক এই পার্থনা করি!
-
Friends
Hasina Sultana Rima Rima
@hasinasultanarimarima
আনিকা মারজান ইরা
@anikamarjanera
Marketing Online
@marketingonline
Munmun Chakraborty
@munmunchakraborty
Md Babul Hossain
@mdbabulhossain
আনিকা ইসলাম হৃদিতা
@hridita
আয়মন সিদ্দিকা উর্মি
@asurmi85
Song For Peace
@songforpeace
Sahriar Rubaiat
@sahriarrubaiat


স্রষ্টা আপনাকে একজন উত্তম সংগী দিয়েছিলেন। আপনাদের দোয়ার উত্তম প্রতিদান নিশ্চয়ই তিনি দিবেন।