Profile Photo

রাহেনা বেগমOffline

  • Rahena-Begum
  • Profile picture of রাহেনা বেগম

    রাহেনা বেগম

    1 year, 1 month ago

    ঘটনা -১
    রিদওয়ান (২ বছর ৫ মাস)।
    রিদওয়ান তার দাদীকে মাস্ক ও নিজের জুতা এনে দেয় এবং পড়িয়ে দিতে বলে। দাদী তার কথা মতই কাজ করেন। এরপর রিদওয়ান বলে – চলো বাহিরে বেড়াতে যাই।
    দাদীর উত্তর – নাহ্ ভাইয়া বাহিরে যাওয়া যাবে না!
    এরপর রিদওয়ান তার দাদীকে ব্যাগ দিয়ে বলে – যাও তুমি চলে যাও (দাদী তাদের কাছে মাঝে, মাঝে থাকে, রিদওয়ান তার দাদীকে খুব ভালোবাসে। দাদী চলে যেতে চাইলে সে কান্নাকাটি করে)।
    এরপর সে প্রচন্ড কান্নাকাটি করে, দাদীকে মারে।
    রিদওয়ান এর আব্বু, আম্মু দু’জনই জব করে। সে “ডে কেয়ার” সেন্টারে থাকতো। দাদী যখন তাদের সাথে থাকে তখন, বিকাল বেলায় যেয়ে রিদওয়ানকে ডে কেয়ার সেন্টার থেকে নিয়ে আসতো।
    সূত্রঃ রিদওয়ানের দাদী (আমার বড় বোন)।

    ঘটনা – ২
    রাওনাফ (১ বৎসর ৭ মাস)
    সে তার প্রতি বেলার খাওয়ার মার সাথে তাদের Apartment এর নীচে পার্কে যেয়ে খেতো। এখন করোনার কারণে বাড়ির বাহিরে যেতে পারে না। খাওয়ার সময় হলেই সে তার আম্মুকে দরজা খুলে দিতে বলে। প্রথম কিছু দিন তাকে ভুলিয়ে রাখা গেলেও বর্তমানে সে দরজাতে গিয়ে ধাক্কা দেয়, খুলে না দিলে দরজাতে মাথায় আঘাত করে।
    সূত্রঃ রাওনাফের নানা এবং আম্মু (আমার ভাই এবং ভাস্তি)।

    ঘটনা – ৩
    সময়ঃ রাত্রি ১.৩০
    স্থানঃ রাজিয়াসুলতানা রোড
    এক কিশোর (১৩/১৪ বৎসর), ব্যালকনিতে এসে প্রচন্ড চিৎকার করছে- আমাকে ছেড়ে দেও, আমি এভাবে থাকতে পারবোনা, আমি মরে যাবো, আমাকে ছেড়ে দেও। ছেলেটার বাবা- মা তাকে জোর করে চেপে ধরে রেখেছে এবং ঘরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
    মোহাম্মদপুর এর বেশ কয়েকটি এলাকা লকডাউন করা হয়েছে। নিজ নিজ বাড়ি মালিকগণ মেইন গেট তালা দিয়ে রেখেছেন সবার নিরাপত্তার জন্য।
    সূত্রঃ মাহিন, শিহাব, (আমার ভাই এবং বোনের ছেলে) যারা ওই এলাকায় আছে, ওদেরই সামনের ফ্ল্যাটের ঘটনা।

    ঘটনা – ৪
    রেহান, রোহান (বয়স যথাক্রমে ১৩ এবং ১১)
    আমাদের বাড়িতে দুটো দরজা, তারা প্রতিদিন একবার খুব গোপনে (আমি যখন রান্না করি) অন্য দরজা দিয়ে গিয়ে মেইন দরজায় কলিং বেল বাজাচ্ছে। কারণ তারা অনেক দিন থেকে কলিং বেলের আওয়াজ পায় না। কলিং বেল দিয়ে তাদের প্রিয় মানুষরা (ভাইয়ারা) আসতো। এখন তাদের আসার শব্দটাই তারা শুনতে চায়, বিকল্প হিসেবে নিজেরা বাজিয়ে অনুভূতিটা পেতে চাচ্ছে।
    সূত্রঃ রেহান, রোহানের আম্মু।

    এরকম হাজারটা, রেদওয়ান, রাওনাফ, রেহান, রোহানদের ঘটনা ঘটছে প্রতিটি বাড়িতে, প্রতিদিন। কোয়ারেন্টিনে থেকে তারা মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে।
    যেটার প্রভাব তাদের শারীরিক সুস্থ্যতাকেও ব্যহত করছে।
    আসলে আমরা কেউই এই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। এই অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে সম্পূর্ণ নতুন। তাই আমরা বড়রাই নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে পারছিনা, এটাই স্বাভাবিক। এ সময় আমরা Anxiety-তে ভূগছি। ভালোভাবে নিজের যত্ন নিতে পারছিনা, পাশাপাশি বাড়িতে থাকা শিশু কিশোরদেরকেও সাহায্য করতে পারছিনা।
    নিজেদের (বাবা- মার) Anxiety ছড়িয়ে পড়ছে সন্তানের উপর। আসুন নিজের যত্ন নেই, নিজে ভালো থাকি এবং শিশু, কিশোরদের ও ভালো রাখি।

    কি করতে পারি??

    # শিশুদেরকে প্রচুর সময় দেইঃ
    তাদের নিয়ে পুরনো এলবাম দেখি। তাদের ছোট বেলায় তারা কি করতো? তাদের জন্মটা আমাদের কাছে কত গুরুত্ব বহন করে, তা তাদের জানাই। আমাদের ছোট বেলা কেমন কেটেছে? কিভাবে সময় কাটাতাম। ছবি দেখিয়ে পরিবারের সবার সাথে আমার সম্পর্ক, কাটানো সময়, আনন্দের স্মৃতি গুলো বলি। (আমার ছেলেরা ছবি দেখতে দেখতে একটা খেলা বের করেছে- সেটা হলো – আমি আমার বাবা, দাদা… এভাবে কয় প্রজন্মের নাম জানি)।

    # পরিস্থিতিকে মেনে নেওয়াঃ আমরা একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। সবাই ভয় পাচ্ছি, আতঙ্কিত হচ্ছি। এটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা বেশ কিছু জিনিস ইতিমধ্যে জানতেও পেরেছি, যেগুলো পালন করলে আমরা নিরাপদ থাকতে পারি। আর সেগুলো আমরা মেনেও চলছি। (আমি রেহান, রোহানকে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস আসার আগেই কিছু মুভি দেখিয়েছি,যেমন- Parasite, Contagion, The Flu etc).
    Parasite – দেখিয়ে বলেছিলাম কি বুঝলে? উত্তর – “টয়লেট এর উপরে উঠলে WiFi পাওয়া যায়।”
    আর কিছু? হ্যাঁ – ছেলেটা খুব চালাক, তাদের পরিবারের সবাইকে চাকরিতে ঢুকিয়েছে!
    আর?
    নাহ্ তুমিই বলো।
    আমি- একজন যে দীর্ঘদিন ব্যজমেন্টে ছিলো, সে তার অল্প খাবার, নিয়ে একটা ঘরে কাটিয়ে দিয়েছিল। সে সেখানে শুধু তার জীবন কাটায়নি অনেক কিছু তৈরিও করেছে। তার মালিককে খুশী করার জন্য লাইট অন করতো, মালিক বাড়িতে আসলে, কোড ওয়াডে ম্যাসেজ ও দিত।
    সে ওখানে ছিল বাঁচার জন্য, কিন্তু সে তার সেই জীবনকে মেনে নিয়েছিল বলেই বেঁচে থাকতে পেরেছিলো
    Contagion, The Flu, Pandemic-এ আমরা কি দেখলাম?
    ভ্যাকসিন খুব সহজে বানানো যায় না। অনেক টেস্ট করানোর প্রয়োজন হয়। Antibody তৈরি করতেও একই ব্যাপার। তাই আমাদেরকে জানতে হবে এবং মানতে হবে এই ভাইরাসকে কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়। আমাদের সৌভাগ্য আমরা তা জানি, এখন আমাদের দ্বায়িত্ব হলো এগুলো মেনে চলা।

    # পছন্দের কাজ খুঁজে বের করাঃ
    আমরা এখন আমাদের পছন্দগুলো পূরণ করার সময় পেয়েছি। দিনের সময়কে ভাগ করে নিয়ে পছন্দের কাজগুলো করবো। হতে পারে সেটা – ছবি আঁকা, গল্প লিখা, গল্পের বই পড়া, গান শোনা, দাবা খেলা, লুডু খেলা, ঘর গোছানো ইত্যাদি ইত্যাদি। পছন্দেরতো শেষ নেই!
    রিদওয়ান এবং রাওনাফ এর আম্মুও কিন্তু এই সময় অনেক মজার মজার কাজ করতে পারে ওদের নিয়ে। ঘর গোছানো, ঘর ঝাড়ু দেওয়া, মাকে আলু, পটল, পিয়াজ এগিয়ে দেওয়া, চশমা এনে দেওয়া। প্লেটে ভাত দিয়ে এক সাথে বসে খেতে পারে, খাওয়ার পরে বেসিনে সেগুলো রেখে আসা। এগুলো করতে শিশুরা পছন্দ করে।
    মাঝে মাঝে মা, বাবারা শিশুদের সাথে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে, বিভিন্ন মজার খেলায়।

    # দূরত্ব সেটা শুধু ই শরীরেরঃ
    সন্তানদের বোঝাতে হবে এ দূরত্ব শুধুই শরীরের, মানে একজনের কাছে যাওয়া যাবে না, তার মানে কিন্তু আমাদের মনের দূরত্বের উপর কোনই বাঁধা নেই।
    আমরা আমাদের সব প্রিয়জনের সাথে ভিডিও কলে, অডিও কলে এখন আগের থেকে অনেক বেশী কাছে আছি, কারণ আমাদের হাতে এখন আগের চেয়ে অনেক সময়।

    # পড়াশোনার জন্য চাপ দেওয়া যাবে নাঃ
    এই অস্বাভাবিক সময় যেনো শিশুদের জন্য আরো বিভিষিকাময় না হয়। আগে সময় পাইনি, “এখন পাইছি তোদের” এমন ভাবা যাবে না। মনে রাখতে হবে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সব সময়ই আগে, পরে তাদের গ্রেড।

    # পুষ্টিকর খাদ্যঃ করোনা মোকাবেলায় আমাদের পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল, ভিটামিন সি যুক্ত খাবার খেতে হবে।
    যেহেতু, বাড়িতেই আছি আমরা তাই নিয়ম করে ভিটামিন ডি এর জন্য রোদে বসতে পারি।

    # শরীরচর্চাঃ ভাইরাস মোকাবেলায় আমরা পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি নিয়মিত শরীর চর্চাও করবো। ছাদে সন্তানদের নিয়ে গিয়ে প্রতিদিন হাঁটাহাঁটি করবো। ব্রিদিং এক্সারসাইজ, মাইন্ডফুলনেস এক্সারসাইজ করবো এবং সন্তানদেরও করাবো।
    যার যার ধর্ম পালন করবো।
    রেহান, রোহান এবং তার বাবা তিন জনে জামাত করে নামাজ পড়ে। আলহামদুলিল্লাহ্।

    আসুন আমরা আমাদের প্রিয়জনদের নিয়ে খুব সুন্দরভাবে নিয়ম মেনে,আতঙ্কে নয়, ভয়ে নয়, আনন্দে সময় কাঁটাই। যেনো এই মহামারী থেকে যখন আমরা আল্লাহ্ তালার রহমতে মুক্তি পাবো তখন যেনো বলতে পারি – আল্লাহ্ আমাদের একসাথে থাকার সুযোগ দিয়েছিলেন এবং আলহামদুলিল্লাহ্ আমরা তার স্বদব্যবহার করেছি।
    রেহান, রোহান এখন গান শুনছে, কি গান শুনছে জানেন? –

    “আমরা করবো জয়”
    সবাই বাড়িতে থাকবেন, নিরাপদে থাকবেন।
    ১৩/০৪/২০২০

    2
    3 Comments
Skip to toolbar