Profile Photo

রাহেনা বেগমOffline

  • Rahena-Begum
  • Profile picture of রাহেনা বেগম

    রাহেনা বেগম

    1 year, 2 months ago

    আমার আব্বা একজন সরকারি চাকুরীজীবি ছিলেন।
    আব্বা তাঁর মাসিক বেতন এনে আম্মার হাতে তুলে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতেন।এই স্বল্প বেতনে আম্মা তাঁর সংসার চলাতে হিমশিম খেতেন।
    তাই আম্মা বাসায় গরু, ছাগল , মুরগী পালতেন।যাতে করে সন্তানদের প্রাণীজ প্রোটিন এর অভাব দূর করতে পারেন। গৃহপালিত পশু এবং রেশন দিয়েই তিনি কোন রকমে সংসার চালাতেন।
    আমার বড় ভাই রাজশাহী মেডিকেল এ , মেজভাই এবং বোন রাজশাহী ববিশ্ববিদ্যালয়ে , ছোট ভাই রাজশাহী কলেজে পড়াশোনা করতেন।
    বড়ভাই এর মেডিকেল এর খরচ চালানো (বড়ভাই স্কলারশিপ নিয়েই পড়াশোনা করতেন) , মেডিকেল এর বই সহ আরও আনুসঙ্গিক খরচ চালানো খুব কষ্টকর ছিলো।
    বলা চলে ডাক্তারি পড়ানো আর হাতি পোষা একই কথা।

    সেই সময় আমার বড় বাবা(আব্বার বড় ভাই) এসেছিলেন বড় ভাই এর জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। আম্মা -আব্বাকে বড় ভাই এর পড়াশোনার খরচ দিতে হবে না, মেয়ের বাবা-মা ই লেখা পড়া করাবেন। মেয়েদের বাড়ির ছাদে সুইমিংপুল আছে( সেটা কি, আমরা তখন জানতাম না।বড় বাবা বলেছিলেন – আরে ছাদের উপর পুকুর আছে)।
    আসলে সেই সময়ে এমনই হতো- মেয়েপক্ষরা ছেলের লেখা পড়ার দায়িত্ব নিতো, বিয়ের বিনিময়ে।
    আমার আম্মা ,বড় বাবাকে নিজ পিতার মতই দেখতেন। আমার এখনো মনে পড়ে একবার বড়বাবা ভীষণ অসুস্থ হয়ে এসেছিলেন। আম্মা তাঁকে নিজ পিতার মতই সেবা করে সুস্থ করেছিলেন।
    যাক , আসি বিয়ের বিষয়ে। আম্মা খুব ভদ্র ভাবে বড় বাবাকে বলেছিলেন – আমার ছেলেকে ওই বাড়িতে বিয়ে দিলে আমরা কখনো মাথা উঁচু করে সেখানে যেতে পারবো না।ছেলেকে এক কথায় বিক্রি করে দেওয়া হবে, আমি সেটা কখনো হতে দিবো না।
    আমি একজন সরকারি কর্মচারীর সন্তান।

    আমার আব্বা এমনি কোন এক গ্রীষ্ম কালে তাঁর ব্যবহারের বাইসাইকেল বিক্রি করে সন্তানদের জন্য আম কিনে এনেছিলেন। আম্মা , আব্বার সাথে অনেক রাগারাগি করেছিলেন। কারণ সাইকেল ছাড়া আব্বা কিভাবে মফস্বলে যাবেন?
    আব্বা নাকি বলেছিলেন – “আমি সাইকেল ছাড়া যাবো, কিন্তু ছেলে মেয়েদেরকে বছরের ফল খাওয়াতে পারবো না এটা কি হয়?”

    আমি একজন সরকারি কর্মচারীর সন্তান , যে সরকারি কর্মচারীকে সন্তানদেরকে আম খাওতে সাইকেল বিক্রি করতে হয়।

    যে সরকারি কর্মচারী তাঁর বড় ছেলেকেই গৃহ শিক্ষক দিতে পেরেছিলেন এবং বড় ছেলেকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন বাকী সন্তানদের লেখা পড়া করানোর। আমার বড় ভাই সেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছিলেন। আর সে জন্য WHO এর স্কলারশিপ পেয়েও ভাইবোনদের জন্য , পড়াশোনা করতে আমেরিকায় যাননি।
    আমার বড় ভাই এর জামা, জুতো পরে মেজভাই বড় হয়েছেন।
    আমি একজন সরকারি ডাক্তারের বোন(বিসিএস ক্যাডার )।
    যে ডাক্তার জীবনে কখনো প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন নাই,কোর্টে মিথ্যা সাক্ষী দিতে বাধ্য করবে জন্য।

    আমি একজন সরকারি কর্মচারীর বোন, যার গৃহশিক্ষক ছিলো বড় ভাই। আমি মনে করি আমাকে যেভাবে বড়ভাই পড়িয়েছেন ,তেমন করে কোন শিক্ষক ই পড়াতে পারবেননা।
    আমি একজন সরকারি কর্মচারীর সন্তান, বোন যাদের জীবনে অর্থনৈতিক কষ্ট থাকলেও কখনো আদর , যত্ন ভালোবাসার অভাব ছিলো না।
    আমরা বিলাসী জীবন যাপন করি নাই।আমরা জামা কাপড় এর জন্য বায়না ধরলে আম্মা আমাদের বলেছিলেন শেখ সাদির গল্প।
    আম্মা বলেছিলেন পোশাক মানুষের পরিচয় না, তার পরিচয় তার আচার ব্যবহার।

    আম্মার পালিত ছাগল দিয়ে আমাদের কুরবানী হতো।
    আজকের মতো তখন যদি মোবাইল থাকতো তাহলে আমার ছোট ভাই সেই ছাগলের সাথে সেল্ফি তুলে বলতো- এই হলো আমার উচ্চ বংশীয় ছাগল, যা টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। আমার আব্বার সৎ পথে উপার্জনের টাকায় কেনা, আমার আম্মার আদর যত্নে পালিত এবং আমার কেটে আনা ঘাস খেয়ে বড় হওয়া।

    ইচ্ছা করলেই আম্মা পুলিশদেরকে দিয়ে গরু ,ছাগলের ঘাস কাটাতে পারতেন অথবা আমার আব্বা কাউকে আমের কথা বললে যে কেউ আমের বাগান তুলে এনে দিতেন।
    কিন্তু নাহ্ , আমরা আমার আব্বার বেতনের বাহিরে কখনো কারো উপহার ও আমার আব্বা আম্মা গ্রহন করেন নি।
    আমার আব্বা আম্মা চলে গেছেন , ওপারে তাঁদের হিসেব সহজ , কারণ তাঁদের সম্পদ নেই।

    আমি গর্বিত এই জন্য যে আমি একজন সরকারি কর্মচারীর সন্তান এবং বোন।
    মজার বিষয় হলো আমার সরকারি কর্মচারী আব্বা আমাদের সব ভাই বোনের মধ্যে একটি জিনিস খুব ভালো ভাবে দিয়ে গেছেন, সেটা হলো – সততা।
    যার ফলে আমাদের সব ভাই বোনের ভোগান্তির অন্ত নেই।
    তারপরেও আমরা গর্বিত , আনন্দিত।
    কিছু “নাই ” এর ও একটা কিছু আছে, যা দূর্লভ।

    বিঃদ্রঃ লেখাটি ব্যক্তিগত স্মৃতি চরণ।
    ইহার সাথে কারো বর্তমান ,চলমান, অতীত ,ভবিষ্যৎ এর সাদৃশ্য করতে যাবেন না।

    5
    2 Comments
    • একজন সরকারি কর্মকর্তার বেতনে সংসার চালানো যে কত কঠিন, তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাই। তিনিও বেতনের টাকা আমার হাতে তুলে দিয়ে মনের আনন্দে ঘুরেন।

Friends

Profile Photo
naznin shamim
@nazninshamim
Profile Photo
Md Mofiz
@mdmofiz
Profile Photo
MAHMUD HAYAT
@mahmudhayat
Profile Photo
wajibad
@wajibad
Profile Photo
MAHAJABIN AFROZE
@mahajabinafroze
Profile Photo
Intisar Jabed
@intisarjabed
Profile Photo
মেঘ
@megh
Skip to toolbar