-
রাতের ব্ল্যাকরিজ কোনো বিশ্রামের জায়গা নয়, বরং এটি একটি নিভৃত ল্যাবরেটরি। যখন রাস্তার শেষ ল্যাম্পপোস্টটি টিমটিম করে জ্বলে ওঠে, তখন শুরু হয় মানুষের ভেতরের ‘অন্ধকার সংস্করণ’-এর পদচারণা। এখানকার ড্রেন দিয়ে শুধু বৃষ্টির জল নয়, বয়ে চলে হাজারো মানুষের বিসর্জিত স্বপ্ন। শহরের প্রতিটি জানালা এক একটি নিস্তব্ধ চোখের মতো তাকিয়ে থাকে; কেউ জানে না সেই চোখের পেছনে কোনো অপরাধী লুকিয়ে আছে নাকি কোনো আর্তনাদ। এই শহরে ঘুম মানে কেবল চোখ বন্ধ করা নয়, বরং নিজের অস্তিত্বকে কিছুক্ষণের জন্য এই যান্ত্রিক দানবের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা।
শহরের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ আর মেট্রো রেলের লাইনগুলো যেন ব্ল্যাকরিজের স্নায়ুতন্ত্র। দিনের আলোয় যারা টাই-কোট পরে সুশৃঙ্খল অভিনয় করে, রাতের অন্ধকারে তারাই এই সুড়ঙ্গের অন্ধকারে কোনো এক নিষিদ্ধ লেনদেনে লিপ্ত হয়। এখানে দেয়ালগুলো কথা বলে না ঠিকই, কিন্তু তারা সব মনে রাখে। কোনো এক পুরনো দালানের গায়ে লেগে থাকা নোনা ধরা দাগগুলো আসলে গত দশকের কোনো এক রাজনৈতিক চক্রান্তের মানচিত্র। আপনি যদি খুব মন দিয়ে শোনেন, তবে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের মাঝে শুনতে পাবেন সেই সব মানুষের ফিসফাস, যারা এই শহরের ভিড়ে হারিয়ে গিয়েও আজও নিজেদের ঠিকানা খুঁজে বেড়াচ্ছে।
ব্ল্যাকরিজে নিঃশ্বাস নেওয়া মানে ধুলো আর ধোঁয়ার সংমিশ্রণে এক বিষাক্ত অক্সিজেন গ্রহণ করা। এখানকার কারখানাগুলোর চিমনি থেকে বের হওয়া কালো ধোঁয়া আকাশের নীল রঙকে চিরতরে মুছে দিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষ এখন আর নীল আকাশ খোঁজে না; তারা অভ্যস্ত হয়ে গেছে ধূসর মেঘের চাদরে। শহরের ঘড়িগুলো এখানে সময়ের হিসেব রাখে না, বরং হিসেব রাখে কত দ্রুত একজন মানুষ তার মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে একটি পুতুলে পরিণত হচ্ছে। এখানে যন্ত্র আর মানুষের পার্থক্য কমে এসেছে—মানুষের হৃদয়ে এখন চাকা ঘোরে, আর যন্ত্রের গায়ে লেপ্টে থাকে মানুষের ঘাম।
ব্ল্যাকরিজের সস্তা হোটেলগুলোর ঝাপসা আয়নায় যখন কেউ নিজের মুখ দেখে, সে চমকে ওঠে। আয়নার মানুষটি কি সে নিজে, নাকি এই শহরটি তার ভেতরে অন্য কাউকে ঢুকিয়ে দিয়েছে? এখানে সম্পর্কের কোনো নাম নেই, আছে কেবল ‘প্রয়োজন’। রাজপথের মোড়ে যে ট্রাফিক সিগন্যালটি লাল হয়ে জ্বলে থাকে, সেটি আসলে থামার সংকেত নয়, বরং একটি সতর্কবাণী—যে আগে বাড়বে, সে হয়তো ফিরবে না। ভালোবাসা এখানে একটি বিলাসিতা, আর বিশ্বাস হলো একটি মরণফাঁদ। প্রতিটি করমর্দনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক একটি অদৃশ্য ছুরি, যা শরীরের রক্ত নয়, বরং আত্মার বিশ্বাসকে ক্ষতবিক্ষত করে।
অবশেষে শহরটি যখন পূর্ণরূপে গ্রাস করে নেয়, তখন বোঝা যায়—ব্ল্যাকরিজ কোনো ভৌগোলিক অবস্থান নয়, এটি একটি মানসিক অবস্থা। আমরা যারা এই গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছি, আমরা আসলে কেউ মুক্ত নই। আমরা প্রত্যেকেই এই বিশাল শহরের একেকটি স্ক্রু বা নাট-বোল্ট। প্রতিদিন ভোরে যখন সাইরেন বেজে ওঠে, তখন মনে হয় এটি নতুন দিনের সূচনা নয়, বরং আমাদের সত্তার আরেকটি স্তরের ব্যবচ্ছেদ। এই শহর কাউকে মুক্তি দেয় না; এটি কেবল আমাদের একেকজন থেকে অন্যজনে রূপান্তরিত করে। শেষ পর্যন্ত ব্ল্যাকরিজ টিকে থাকে, আর আমরা তার ইতিহাসের পাতায় একেকটি তুচ্ছ ফুটনোট হয়ে হারিয়ে যাই।
2 Comments
হ্যাঁ বা না শব্দ দুটি সবচেয়ে পুরনো এবং ছোট। কিন্তু এ কথা দুটো বলতেই সবচেয়ে বেশি ভাবতে হয়।
পীথাগোরাস
Friends
Joy Iqbal
@joyiqbal
Subani News
@subaninews
ম পানা উল্যাহ্
@panaullah63gmail-com
Najir Hossain
@najirhossain
khokon du
@khokondu
মোহাম্মদ মিজানুর রহমান (কবি মিজান পঞ্চায়েত/ কবি মিজান বিএসসি)
@mohammedmizanurrahman
sordar alom
@sordaralom
মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক
@nazmul26
Burhan Ferdoushi
@burhanferdoushi

শহরটি এমন এক গোলকধাঁধা, যেখানে মুক্তি মানেই রূপান্তর, আর টিকে থাকা মানেই মনুষ্যত্ব বিসর্জন।