Profile Photo

সালমান সাদিকOffline

  • SalmanSadique
  • Profile picture of সালমান সাদিক

    সালমান সাদিক

    3 years, 10 months ago

    গল্পঃ মরেছে, মেরেছে, বেঁচেছে!
    লেখকঃ সালমান সাদিক

    সাত সকাল। বাতাস বইছে। এখনও গরমটা সেভাবে পড়েনি। শুনশান মৃত্যুপুরী।
    -মারছে, মারছে…
    আঘাতের পর আঘাত আসছেই। কোনো থামাথামি নেই। শূন্য রাস্তায় মারামারি চলছে। কে কাকে মারছে, কে মরছে, কে আঘাত পাচ্ছে দেখার সময় নেই।
    -শালা তোরে আইজকা শেষই কইরালবাম!
    -শুয়ারের বাচ্চা তোর মুখের মইদ্দে সান্দায়া দিমু।
    ভোঁতা আওয়াজ। কেউ কাউকে মারলো। হাড্ডিতে লেগেছে। ভেঙেছে কি না বলা যায় না। ব্যথা! ব্যথার কথা বলছেন? ব্যথা কাকে বলে জানা নেই।
    -দেখেন ভাই, আপনে কাজডা না করলে আগামীকাল আপনেরে মাইরা ফালামু।
    -ভাই, মারামারিরে ডরাই না। আইসেন, দেহা যাইবো, কে কারে কী করে।
    দুইটা গুলি বা বুক বরাবর তিন-চারবার ছুরির পোঁচ। কুপিয়ে হত্যা করা যায়। চাইনিজ কুড়াল দিয়ে মাথার উপরে একটা আঘাত করতে পারলে খুলি দুই টুকরা হয়ে যাবে।
    -দেখ শুয়ারের বাচ্চা, তুই তোর সীমা অতিক্রম করছোস। অহন আল্লারে ডাক।
    গুলির আওয়াজ। পাশের কাঁঠাল গাছ থেকে দুইটা পাখি উড়ে গেলো। কাঁঠাল গাছটার গোড়ায় রক্তের ছিটা ছিটকে গেলো। আঘাত করেছে কেউ। কেউ কুকুর মারছে, কেউ মারছে শুয়োরের বাচ্চা।
    *
    আঘাতের পর আঘাতে শরীরের বোধশক্তি লোপ পেয়েছে। বুঝতে পারছি, কেউ মারছে। পাঁজরের হাড়গুলো ভেঙেছে। নাকটা ভেঙেছে। কখন যে ভাঙলো! হাত দিয়ে নাকটা ছোঁয়ার চেষ্টা করলাম। আহ! হাতটাও শালার ভাঙছে। একটু আগে মুখের মধ্যে রক্তের স্বাদ পাচ্ছিলাম। নোনামতন। এখন আর পাচ্ছি না কেন? রক্ত কি তবে আর নাই শরীরে! আচ্ছা, তাহলে তো আমার মরে যাওয়ার কথা!
    -আমি কি মরেছি?
    -মনে হয় না। মরলে তো কিছু একটা ঘটতো। এখনও পৃথিবীর স্পর্শ-ছোঁয়া পাচ্ছি।
    -আমার মনে হয় না। ছোঁয়া যদি পাবোই তাহলে ব্যথা অনুভব করছি না কেন?
    -আসলে ব্যথা হয়ত ভয়েই পালিয়েছে। ব্যথারও তো অনুভূতি কিছু আছে না কি! হয়তো বা শরমে।
    -হতে পারে।
    -এ সময়ে আর কথা বাড়ানো উচিত হবে না।
    -কেন?
    -কারণ, এখনও মার খাচ্ছি। মার খাওয়ার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। বেচারা এতো কষ্ট করে মারছে!
    -ওই শালাও কারো হাতে ভালো ধোলাই খেয়েছে।
    -ওর ধোলাই খেতে হবে কেন!
    -হ্যাঁ, নাহয় এতো সময় মারে কীভাবে! জিদের চোটেই শালা ক্লান্তি ভুলে গেছে।
    -ভাই, এমনে ভাবো কেন। হয়তো বা যারা মারে তারা ক্লান্ত হয় না। তারা মেরেই যায়। হয়তো মারার মধ্যে আলাদা একটা আনন্দ আছে। এ জন্যই হয়তো ওরা ক্লান্ত হয় না
    -দেখ ভাই অতশত বুঝি না। মার তো তুমিই খাচ্ছো!
    -হ্যাঁ, আমি তুমি, আমরাই তো মার খাচ্ছি।
    -তোমার কি মনে হয় না, আমরা যথেষ্ঠ মার খেয়েছি?
    -কি জানি। ঠিক বুঝতে পারছি না।
    -আমার মনে হয়, আমাদের এবার একশানে যাওয়ার সময় এসেছে। কী কও!
    -দাঁড়াও আরেকটু খেয়ে নেই। মার খেতেও তো সুখ!
    *
    শুয়োরের বাচ্চাটাকে দেখেছে সে। শালা, দেখলেই মন চায়, গায়ের আশ মিটিয়ে একটা ধোলাই দেই। চিন্তাটা মাথায় আসতেই ঠোঁটের কিনারা বিদ্রুপের হাসিতে খানিকটা বিকৃত হলো।
    -দেখ শালা এবার, মজা কারে কয়।
    -হাতটা গুটিয়ে নে। সুবিধা হবে।
    -আচ্ছা কতক্ষণ মারলে মনের আশ মিটবে বলে মনে হয়?
    -জানা নাই। আগে তো মারতে দিবি না কি!
    -আমার মনে হয় টাইম সেট করে নিলে ভালো হয়। মনে আছে তো, ওই পাড়ার জামশেদরে দিতে হবে।
    -হুম!
    -এখন কিচিরমিচির থামা।
    -শালার গরের শালা!
    সে মারলো, সুখ পেলো। অবশ করা সুখ, যা ছড়িয়ে পড়ে। অবশ করা সুখে বিবশ হয়ে সে মেরে গেলো একটা শুয়োরের বাচ্চাকে।
    *
    -তুমি বাপু মার খাচ্ছিলে?
    -হ্যাঁ, চাচা। খাচ্ছিলাম।
    -তো কতক্ষণ মার খেলে?
    -বলতে পারবো না।
    -তারপর কী হলো?
    -কিছুই হলো না। একসময় মার থেমে গেলো। একলা ফুটপাতে পড়ে রইলাম। এক টোকাই এসে পকেট হাতড়াচ্ছিলো। আরেক শালা প্যান্ট ধরে টানছিলো। জুতো জোড়া কে কখন খুলে নিয়েছিলো, জানা নাই।
    -তুমি তো তখন কিছুই করতে পারো নাই! ইশ, আমি যদি থাকতাম! শুয়ারগুলার মুখ থেঁতো করে দিতাম একেবারে।
    -চাচা, কাহিনি তো সেখানেই। যে শালা প্যান্ট ধরে টানছিলো, ওই শালারে দিলাম কষে এক লাথি। কয়দিন খায় না কে জানে! আর ওরা, শালারা সারাদিন তো জুতার গাম খায়া বেড়ায়। খাচ্ছোর আর কারে কয়! তো ওই শালা ছিটকে গিয়ে পাশের ম্যানহোলের ঢাকনার সাথে বেধে রাখা রডে গিয়ে বাড়ি খেলো। তা রডের মাথাটা ছিলো আবার ছুঁচলো। একেবারে ফুটা করে দিলো ওই শালারে। যা একখান সিন ছিলো না কাক্কু!
    -কিন্তু… কিন্তু তুমি না বলছিলা, তোমার পা ভেঙে গিয়েছিলো?
    -হ্যাঁ, গিয়েছিলো তো!
    -তাহলে তুমি লাথি মারলা কেমনে!
    -আপনাকে বলেছি কি না, যে শালা আমারে মারছিলো ওই শালারও পা ভাঙা ছিলো।
    -সেটা কীভাবে সম্ভব!
    -চাচা, আপনার পাও তো ভাঙা। আপনে তো কোনোকিছু ছাড়াই দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আপনার মুখে এ কথা মানায় না।
    -বাছা, আমার কথা আলাদা।
    -আমার কথা আলাদা হতে দোষ কি?
    -কি জানি, বাপু!

    জানেন, এরা যখন দোষ খুঁজছিলো তখন চাচার মধ্যে, বাছার মধ্যে আশ্চর্য কৌতুক পাচ্ছিলাম। আসলে এসব বাতাসে ছড়ায়। এটাই তো বেঁচে থাকার উপায়।
    -এই উপায় তুই কই পাইলি শালা!
    -কেনে, আর কী উপায় তোর জানা আছে ক দেহি।
    -মানুষ খায় বলেই বেঁচে থাকে।
    -তাই নাকি! হাহ হা। তুই শালা হাসালি রে।
    -কেন, খারাপ কিছু কি বললাম?
    -শালা তোর মাত্র জন্ম হইছে তো। তাই তুই জানোস না। আমরা হইলাম মানুষের উপরের ধাপ। আমগো খাবার বাতাসে ঘুইরা বেড়ায়। হেহ হে।
    -কী কস শালা! তোর মাথাত আগে থেইকাই সমস্যা আছিলো।
    – হাহ হা। সমস্যা ছিলো বইলাই বাইচা আছিলাম। অহনও আছে বইলাই আছি।
    -তুই শালা একটা উন্মাদ।
    -হ্যাঁ, আমি উন্মাদ। আগে মানুষ ছিলাম। এখন বাইচা থাকতে হইলে মানুষকে উপরের লেভেলে উঠতে হয়।
    – তাইলে আমি কী, আমি কি তাইলে মানুষ না না কি!
    -তুই, মনে আছে, ওই যে, রাস্তায় হঠাৎ একদিন মারামারি হচ্ছিলো।
    -হ্যাঁ, বেশিদিন হয়নি তো।
    -আসলে ওই সময়ে তুই শুয়োর থেইকা মানুষ হইতে গেছিলি। পরে রডে বাড়ি খায়া আমগো লেভেলে উইঠা আইছোস।
    -দেখ শয়তানি ছাড়। আমার মনে হয় তোর মাথায় বান্দরের মগজ ফিট করা।
    -সেটা ভালো এক হিসেবে। আমি শুয়ার ছিলাম না।
    -তাই না কি! হাহ হা। ভালো করে তাকা ওই যে বেডে শুয়ে থাকা বাছাটার দিকে। কী, কিছু মনে পড়ে?
    -হুম, কেমন পরিচিত মনে হচ্ছে।
    -হাহ হা। আয়নায় নিজের চেহারাটা দেখে নে।
    -জানিস তো, আমাদের কোনো প্রতিবিম্ব হয় না।
    -আসলে তুই আছোস বইলাই তোর কোনো প্রতিবিম্ব নাই। আমরা আছি বইলাই আমাদের আর কোনো দ্বিতীয় সত্তা নাই।
    -আচ্ছা, তোর কণ্ঠটা কেমন পরিচিত মনে হচ্ছে।
    -তা তো হবেই। মনে পড়ে সেদিনের সেই টোকাইটার কথা?
    -হুহ, ওইটা মরছিলো।
    -হ্যাঁ, তুইও মরছিলি।
    -তাহলে এরা কারা?
    -আমরাই। সবসময় যেমন ছিলাম।
    -যাহ শালা, মাথাডা ঘুরায়া দিলি।
    -শালার মাথা তো ঘুরবোই। দুনিয়াডা সারাক্ষণ যে ঘুরছে এইডা জানোস?
    *
    -দেখ বাছা, এখানে দুঃখ বা সুখ বলে কিছু নাই।
    -আসলে আমি এখনও তেমন করে কিছু অনুভব করতে পারছি না।
    -এক সময় পারবা। তখন এই অনুভূতিহীন অনুভূতি নিয়েই এগুতে হবে। তোমাকে বেঁচে থাকতে হলে এভাবেই যেতে হবে।
    -চাচা, আপনারও কি এরকম পরিস্থিতি কখনও এসেছিলো?
    -দেখ বাছা, সবাই একটা নির্দিষ্ট প্রতিফলনের অনুসরণ করে এগুতে থাকে।
    -আমি তো জানতাম, এই জগতে কোনো প্রতিবিম্ব নাই।
    -আসলে আমরা কিছুই জানি না। আমরা এখন পর্যন্ত কোনোকিছু অনুভবই করতে পারি না। বুঝতে পারা বা জানতে পারা তো আরও দূরের ব্যাপার। আসলে আমরা অনুভূতিহীন একটা কিছু, যার কোনো ব্যাখ্যা নাই।

    10
    5 Comments
Skip to toolbar