Profile Photo

সানাউল্লাহ নূরOffline

  • sanaullahnoor
  • Profile picture

    #যুদ্ধের_গল্প
    উল্কাবৃষ্টি
    “””””””””””””

    তেহরানের উত্তর-পূর্বে আলবোর্জ পর্বতমালা যেন আকাশের নীল চাদরটাকে পরম মমতায় আগলে রেখেছে। সেই পাহাড়ের ঢালে শান্ত, ছিমছাম এক মফস্বল শহর— দামভান্দ। আরভিনের শৈশবের একটা অংশ এখানে কেটেছে।
    তার বয়স তখন মাত্র ছয় মাস। এক পড়ন্ত বিকেলে মা লেইলা সোরুশি তাকে কোলে নিয়ে ঘরের কাছের ছোট টিলাটায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেদিন এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। কচি আরভিন মায়ের কোলে শুয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল দিগন্তের দিকে। মা আদর করে গাল টিপে দিলেন, খেলনা দেখালেন, কিন্তু আরভিনের চোখের মণি যেন আসমানে আঠা দিয়ে লাগানো। রাতে কামরান সোরুশি বাড়ি ফিরলে লেইলা রহস্যময় হাসিতে ভেঙে পড়লেন।
    জানো, তোমার ছেলে তো আজরের বেটা আব্রামের (আ.) মতো আকাশে নিজের খোদারে খোঁজে। আকাশের দিক থেকে পলক ফেলে না সে! বিকেলের ঘটনা খুলে বললেন তাকে।
    কামরান ছেলের কপালে চুমু খেয়ে হেসে উঠলেন, বল কী! আমাদের ঘরে বুঝি এক খুদে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এল।

    দামভান্দে আরভিনের দিনগুলো কাটত মেঘেদের সাথে কথা বলে। বিশেষ করে গোধূলি বেলায় যখন আকাশটা রক্তিম বর্ণ ধারণ করত, আরভিনকে তখন আর ঘরে রাখা যেত না। মাদ্রাসার শিক্ষক বাবা কামরান মাঝে মাঝে ধমক দিতেন, আরভিন, কোরআনের আয়াতগুলো ঠিকমতো মশকো করো, আসমানে কী দেখ সারাক্ষণ? আর ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট মা লেইলা মিটিমিটি হাসতেন। বিজ্ঞানের মানুষ হয়ে তিনি বুঝতেন, ওই ছোট্ট চোখ দুটো আসলে অজানাকে গিলছে।
    আরভিনের সাত বছর বয়সে আবিষ্কৃত হলো তার আসল নেশা। সে শুধু আকাশ দেখে না, সে দেখে উল্কাবৃষ্টি। আগুনের ফুলকিগুলো যখন আকাশের বুক চিরে পড়ে, আরভিনের মনে হয় মহাকাশ বুঝি তাকে সংকেত পাঠাচ্ছে। ছয় বছর বয়সে যখন বোন আনাদিল এল, আরভিনের পৃথিবী আরও রঙিন হয়ে উঠল। ভাই বোন মিলে আকাশ দেখা শুরু করল। তবে আনাদিল ছিল বাবার ছায়া। কামরান অফিস থেকে ফিরলেই তার পিছু পিছু লেপ্টে থাকত সে।
    আরভিনের বয়স যখন আট কামরানের বদলি হলো ঐতিহাসিক শহর ইসফাহানে। ছয় মাস পর লেইলাও সেখানে ট্রান্সফার নিলেন। ইসফাহানের আকাশ যেন আরভিনের নেশাকে আসক্তিতে বদলে দিল। বিশেষ করে ফায়ারবল বা উজ্জ্বল অগ্নিপিণ্ড যখন আকাশকে চিরে দিত, আরভিন আনন্দে বাকরুদ্ধ হয়ে যেত।
    ইসফাহানের সেই সুখি নীড়ে তাদের রাতগুলো কাটত মিষ্টি খুনসুটিতে। কামরান বলতেন, আমার আরভিন হবে কোয়ান্টাম ফিজিসিস্ট। পরমানু বিজ্ঞানে ইরানের গর্ব হবে সে।
    লেইলা বাধা দিয়ে বলতেন, উঁহু, ও পড়বে সাহিত্য। আমাদের দেশে নতুন এক রুমী বা সাদীর দরকার। ওর চোখে আমি আধ্যাত্মিক কবিদের আত্মা দেখি।
    আনাদিল তখন বাবার কাঁধে চড়ে বসে জিজ্ঞেস করত, তাহলে আমি কী হব মা?
    তুই শিখবি জীবন বাঁচানোর বিদ্যা, হবি দেশ সেরা ডাক্তার, লেইলা তাকে বুকে টেনে নিতেন। এভাবে হাশি-খুশিতে ভরে থাকত পরিবারটি।

    নভেম্বর মাস। উল্কাপাতের মৌসুম। আরভিন ততদিনে জেনে গেছে উল্কার বৈজ্ঞানিক রহস্য, আবার কোরআনের সুরায় বর্ণিত ‘শিহাবুন সাক্বিব’ বা উজ্জ্বল অগ্নিশিখার কথাও তার মুখস্থ। সে জানে, এই আগুনের গোলাগুলো শয়তানকে তাড়াতে নিক্ষিপ্ত হয়। মহাজাগতিক সেই আধ্যাত্মিক রহস্যের মোহে সে তখন আচ্ছন্ন।
    সেদিন ছিল এক মেঘলা সন্ধ্যা। ইসফাহানের আকাশটা ছেঁড়া তুলোর মতো মেঘে ঢাকা, কিন্তু মাঝেমধ্যে স্বচ্ছ নীল উঁকি দিচ্ছিল। আরভিন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছিল। লেইলা, কামরান আর আনাদিল লিভিং রুমে বসে সান্ধ্য জলখাবার খাচ্ছিল। জাফরান চা আর পার্সিয়ান রুটির সুবাসে মৌ মৌ করছিল ঘরটা।
    আরভিন, আয় বাবা! চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, মা ডাকলেন।
    তোমরা খাও মা, আমি একটা ফায়ারবল দেখেই আসছি, আরভিনের উত্তর।
    ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশ চিরে যেন দানবীয় উল্কাবৃষ্টি নেমে এল। আরভিন দেখল ঝাঁকে ঝাঁকে আলোকপিন্ড তাদের বাসার দিকে তেড়ে আসছে। তার পরিচিত সেই উল্কাবৃষ্টির চেয়েও এগুলো অনেক বেশি তীব্র, অনেক বেশি ক্রুর। আরভিন ভাবল, আজ বুঝি আকাশের সব নক্ষত্র তার বাড়ির ওপর ভেঙে পড়বে। সে অবাক বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। মা-বাবাকে ডাক দেওয়ার মতো কোনো শক্তি তার গলায় ছিল না।
    কিন্তু ওগুলো উল্কা ছিল না। ওগুলো ছিল মানুষের তৈরি অগ্নিপিন্ড— ইসরায়েলি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।
    পর মুহূর্তেই এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। চারদিকের দেয়ালগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। আগুনের লেলিহান শিখা আর ধুলোর ঝড়ে আরভিনের চেতনা লুপ্ত হয়ে গেল।
    পরদিন সকালে যখন তার জ্ঞান ফিরল, দেখল সে সাদা এক ধবধবে হাসপাতালের বিছানায়। পাশে দাঁড়িয়ে চাচা ফরহাদ সোরুশি। চাচার চোখে জল। আরভিন অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, মা, বাবা, আনাদিল ওরা কোথায়?
    চাচা কোনো কথা বললেন না, শুধু তাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। আরভিন বুঝল, তার ব্যক্তিগত আকাশটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। তার বাবা-মা আর আদরের বোনটি এখন আকাশের সেই নক্ষত্রদের দলেই মিশে গেছে, যাদের সে ছোটবেলা থেকে খুঁজত।

    যুদ্ধ থেমে গেছে। আরভিন ফিরে এসেছে তার পুরনো শহর দামভান্দে। চাচা ফরহাদ আর চাচি তাকে চোখের মণি করে আগলে রেখেছেন। কিন্তু আরভিন আর আগের মতো নেই। সেই চঞ্চল কিশোরটি এখন এক জীবন্ত মূর্তিতে পরিণত হয়েছে। সে আর আসমানের দিকে তাকায় না।
    একদিন রাতে চাচা ফরহাদ দেখলেন, আরভিন ব্যালকনিতে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশে তখন দুর্দান্ত উল্কাপাত হচ্ছে।
    আরভিন, দেখ বাবা, আজ কত উল্কা পড়ছে, চাচা আরভিনকে জাগিয়ে তুলতে চাইলেন।
    আরভিন মন্থর গতিতে মাথা তুলল। তার চোখে কোনো উজ্জ্বলতা নেই। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল, একটি অগ্নিপিণ্ড খসে পড়ছে পাহাড়ের আড়ালে। আরভিনের মনে হলো, ওটা উল্কা নয়— ওটা তার মা। অন্য একটি ছোট শিখা— ওটা নির্ঘাত আনাদিল। আর বড় একটি জ্যোতিষ্ক—ওটা নিশ্চয়ই তার বাবা।
    সেই থেকে আরভিন আর উল্কা দেখে না।

Skip to toolbar