-
একটি তিব্বত ৫৭০ সাবান
ওরা যখন আমাকে হেলিকপ্টারে করে টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে এলো,
সকাল পেরিয়ে তখন ভাদ্র মাসের দুপুরের প্রায় শুরু…
হয়ত দিনটি অন্যান্য স্বাভাবিক দিনের মতোই শুরু হতে পারতো,
নিস্তব্ধ, ঘুঘু ডাকা, শান্ত, হলদেটে দুপুর,
আকাশে পেঁজা তুলোর মতো শরতের নরম মেঘ,
অনবহিত কৃষকেরা বোরোর আবাদ নিয়ে সকালেও হয়তো ব্যস্ত ছিল,
আর কিছু বয়স্ক জেলে, ভাষান জাল ফেলে,
রোজকার মতো চুপটি করে ঠাঁই বসে ছিল,
মরা নদীর ঠিক ঘোলা বাঁকটিতে…কিন্তু আসলেই কি দিনটি অন্যান্য দিনের মতো সাধারণ ছিলো ??
তোমরা যখন জানতে পারলে গতরাতে ঘাতক-বর্বরদের অবিরাম গুলিতে
আমার ও আমাদের নির্মম মৃত্যুর কথা,
ভেতরে ভেতরে কি একটুও উতলা হওনি তোমরা,
বিচলিত হওনি কেউ !!
অন্যরকম এক অনুভূতির বোধ হয়নি কি সেদিন তোমাদের মনে,
অথবা দিনটিকে কি সত্যি একটুও ব্যতিক্রমি মনে হচ্ছিলো না
তোমাদের অবচেতন মনে কারো ??যদিও তাদের ভয়ে তোমরা তাৎক্ষণিক ভাবে
জানাতে পারোনি তোমাদের সহজাত অভিব্যক্তি গুলো,
হয়ত সেগুলো ভালো অথবা মন্দে মেশানো ছিল,
খুশির অথবা কষ্টের ছিল, যার কাছে যেমন…
আমিও তো মানুষ ছিলাম, নাকি !!!একটা সাধারণ মোটরগাড়ীর শব্দে তখনকার দিনে
গ্রামের ছেলে, বুড়ো দামড়ারা সবাই হইহই করে বের হয়ে পড়তো,
পেছনে পেছনে ছুটতো,
অথচ সেখানে সেদিন সেই হেলিকপ্টারের বিকট আওয়াজেও
কেউ বাইরে বের হয়নি, বের হবার সাহস পাইনি
তীব্র ভয়ে আর আতংকে, তাই নয় কী !!…আমাকে আমার গ্রামেই নিয়ে আসা হলো,
আমার সেই বাড়িতেই, টুঙ্গিপাড়ায়…
ওরা আমার কফিন নামালো,
আমি কফিনের ভেতর নিঃসার হয়ে শুয়ে ছিলাম,
চা-পাতা আর বরফ দিয়ে ঢাকা,
পরনে ছিল রক্ত মাখা পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি…
জানো, কাফনের কাপড় গায়ে দিয়ে নয়,
কি যেন একটা সাধারণ আটপৌড়ে সাদা কাপড়
বা চাদর দিয়ে মোড়া ছিলাম আমি…
বুকের বামপাশে তিনটি গুলির ছিদ্র ছিলো,
যেখানে সযত্নে আগলে রেখেছিলাম
আমার বাংলাদেশকে, “ভালোবেসে”…ডান হাতের একটি আঙ্গুল গুলিতে ফেঁটে, উল্টে গেছে,
আমার দেহ থেকে তখনও নাকি রক্ত ঝরছিলো, ওহ কি নির্মম !!
একদিন এই আঙ্গুল উচিঁয়েই তো বজ্রকন্ঠে দিয়েছিলাম
সেই ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ, ভুলে গেছো তোমরা !!
“এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম,
এই দেশকে স্বাধীন করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্”…কবর খোঁড়ার কাজতো আগেই করে রেখেছিলো ওরা,
আমাকে দ্রুত অন্তরাল করতে
তারা কবর খুঁড়তে বেশী দেরী করেনি,
অথচ আমার দাফন, কাফনের বেলায়
তাদের যতো ওজর, আপত্তি, অনীহা…
আমাকে নাকি গোছল ছাড়াই, জানাজা ছাড়াই,
দাফন-কাফন ছাড়াই কবরে নামিয়ে দেবে তারা,
অথচ আমি নাকি একদিন তোমাদের,
এই দেশের স্বাধীনতার নায়ক ছিলাম,
তোমাদের অভাগা রাষ্ট্রপতি ছিলাম, হা হা হা…!!!তারপরও তোমরা আমাকে ভালোবেসেছো,
ওদের প্রবল অনিচ্ছা ও বিধি নিষেধ সত্ত্বেও
তোমরা আমাকে দাফন, কাফন দিয়েছো অনেক কাকুতি, মিনতি করে,
অথবা এক প্রকার জোর করেই…
কে যেন একটা তিব্বত ৫৭০ কাপড় কাঁচার সাবান নিয়ে আসলো
আমাকে গোছল দেবে বলে, আর সিলভারের বদনা,
আরেকজন কাফনের কাপড় কিনে আনলো
স্থানীয় বাজার থেকে তড়িঘড়ি করে,
ওটাও রিলিফের মার্কিন থান কাপড়…
ছেলেগুলোকে আমি চিনি না, ওদের কাউকেই আমি চিনি না,
চিনতাম না, চেনার কথাও না,ওরা হয়তো সিরাজুল, মোকলেছুর’রা ছিলো…
এদেশে ওরাই হয়তো আমাকে প্রকৃতভাবে ভালোবেসেছিলো
দূর থেকে, নীরবে, আর অন্তর দিয়ে…
আমাকে শেষ বেইজ্জতির হাত থেকে বাঁচাবে বলে,
শরীয়াহ মোতাবেক দাফন-কাফন দেবে বলে,
সর্বোচ্চ চেষ্টা, তদবির করে করে যাচ্ছিলো প্রতিনিয়ত,
মেজর সাহেবের শত গড়রাজি, রাগ আর কঠিন ধমক সত্ত্বেও…
— তোমার কিসের এতো ব্যস্ততা, ভয় আর রাগ মেজর সাহেব ??
আমাকে তো তোমরা মেরেই ফেলেছো গতরাতে…জানো, জীবনের শেষ গোছলটাও করতে হলো আমাকে
একটা কাপড় খাঁচার সাবান দিয়ে,
হা হা হা, তিব্বত ৫৭০ কাপড় খাঁচার সাবান…
অথচ আমি নাকি কোনো একদিন
এই দেশের রাষ্ট্রনায়ক ছিলাম,
একটি ভালো গায়ের মাখার সাবানও কি
আমার প্রাপ্য ছিলো না শেষ যাত্রায়,
অন্তত তোমাদের দেশ স্বাধীন করার পেনশন হিসেবে ??সেই ৫৭০ সাবানটিই যেন
আমার সারা জীবনের কর্মসমূহের
মূর্ত রূপক প্রতিদান ছিলো,
আমাকে অপমানের শেষ ভাষা ছিলো,
আমার নিরব প্রতিবাদের শেষ চিৎকার ছিলো,
আর তোমাদের ভালোবাসারও
শেষ অর্ঘ্যটা ছিলো যে সেটা…কারা যেনো খুব কাঁদছিল, কয়েকজন মহিলারা,
তারা নাকি অনেক দূরের কোনো গ্রাম থেকে এসেছে,
কোটালিপাড়া…
আমাকে শেষ দেখা দেখবে বলে,
আর অফিসারটিকে খুব কাকুতি, মিনতি করছিল
কবর দেয়ার আগে আমার মুখটা
শেষবারের মতো দেখানোর জন্যে…
আচ্ছা, ওরা কি আমাকে শেষ বারের মতো দেখতে পেয়েছিলো,
মেজর সাহেব কি শেষ দেখার অনুমতি দিয়েছিলো ওদের,
নাকি কুকুর, বিড়ালের মতো তাড়িয়ে দিয়েছিলেন আমার প্রতি ওদের
ভালোবাসার বহিঃ প্রকাশ সহ্য করতে না পেরে ??জানো, কাফন দেয়ার সময়ও আমার নিথর দেহ থেকে
রক্ত বের হচ্ছিল,
কে যেনো ভালোবেসে, আলতোভাবে
বারবার মুছে দিচ্ছিলো…অবশেষে আমার জানাজা হলো…
গোটা বিশ বা পঁচিশেক লোক মাত্র,
বেশিরভাগই স্থানীয় থানার অসহায় পুলিশ সদস্য,
বা হাসপাতালের সদস্যরা…
অথচ তোমরা মারা গেলেও তো
কয়েকশো লোক হয় কমপক্ষে,
আর গন্যমান্য হলেতো কথাই নাই,
কয়েক হাজার চোখ বুঁজে…অথচ সেদিন আমার পাশে কেউ দাঁড়াতে পারেনি,
দাঁড়ানোর সাহস পায়নি,
সাধারণ জনগণকে জানাজায় অংশ নিতে দেয়া হয়নি,
১৪৪ ধারা জারি ছিলো সেদিন,
ফোর্স দিয়ে টুঙ্গিপাড়া ঘেরাও করে রেখেছিলো সেদিন ওরা,
আমি যে শেখ মুজিব,
আমি যে বঙ্গবন্ধু, তাই…!!!লেখকঃ সাঈদ আজিজ / 01622660840.
3 Comments
Friends
Drako Shajib
@drako
Mobasheratun Nayma
@nknk468
Azijul Hakim Asif
@azijulhakimasif
Mushfiquzzaman Mushfiq
@mushfiq
Jannatun-Ferdaus
@jannatun-ferdaus
Asma Akter
@asmaakter
আব্দুল্লাহ সাজিদ
@abdullah-sajid
KhalidHasan
@khalidhasan
Tanzila kham
@tanzilakhan



শিরোনাম দেখে বুঝতে পারিনি এমন কলজে ছেড়া কবিতা হবে। সত্যি! ভেতরটা কেপে উঠল। শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন কবিপ্রিয়!