Profile Photo

শ.ম.ওয়াহিদুজ্জামানOffline

  • sharifmuhammadwahiduzzaman
  • আত্নত‌্যাগ
    শরীফ মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান

    সুমি রাগারাগি করে তার ছেলেকে সাথে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে এলো।তার স্বামীকে সে খুব ভালোবাসে কিন্তু তার স্বামী বদরাগী আর তার কোনো কথা সে শোনে না।সুমি কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। লোকটাকে এই পাচ বছর ধরে সে বুঝিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কিছুতেই তাকে সুপথে ফিরিয়ে আনতে পারছে না ।
    তাদের ছেলে রায়হানের বয়েস দুই বছর হয়েছে। আর এই ছেলের ভালোবাসায় আটকে গেছে তার মা সুমি।ছেলে যখন খুব সুন্দর করে তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে তখন তার মা সুমি পৃথিবীর সব কষ্ট এক নিমিষে ই ভুলে যায়। আর এত সুন্দর ছেলের কথা ভেবেও তার বাবা ঠিক হচ্ছে না। কি করবে সুমি তা সে ভাবনায়ও আনতে পারছে না।
    এক সপ্তাহ পার হয়ে গেল। সুমি তার স্বামী ইকবালকে বহুবার মোবাইল ফোনে শুধরে যাওয়ার জন‌্য তাগাদা দিয়েছে।কিন্তু তার কথা ইকবাল কানেই তোলে না।তার কথায় ইকবাল আরো হাসাহাসি করে বলে তুমি বোকা হয়েছ আমার এত টাকা পয়সা এত টাকা পয়সা দিয়ে কি করবো তাই একটু আমোদ ফূর্তি করে কাটাই তাও তোমার সয় না। আমি তো কারো কোনো ক্ষতি করি না।বাবার বাড়ি গেছ আর কিছুদিন থেকে চলে এসো।
    সুমি আর কিছু বলেনি।সে এবার সোজা তার বাবা মাকে বিষয়টা জানিয়ে দিল।এত বছর সে কাউকে কিছু বলেনি যে তার স্বামী মদখোর, জুয়া খেলে আরো তার হাজার রকমের বদ স্বভাব রয়েছে। ধনীর একমাত্র সন্তান হওয়ার কারণে ইকবাল বাবার অফুরন্ত সম্পদের অধিকারি হয়েছে আর তার সেই সম্পদের অপব‌্যবহার করছে এখন সে ।সুমি এতদিন ধরে তাকে শুধরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু সে ততটা সফল হতে পারেনি যতটা সে চায়। তাই সুমি রাগ করে চলে এসেছে তার বাবার বাড়ি।আর বাবা মাকে তার কষ্টের কথা খুলে বলেছে।
    সুমিকে নিয়ে তার বাবা মা চিন্তিত হয়ে পড়ল।তারা তাদের আদরের মেয়ের কোনো কষ্ট সহ‌্য করতে পারে না।তারা এ বিষয়ে আলোচনা করার জন‌্য সুমির রুমে এসে হাজির হলো। রায়হান কে নিয়ে সুমি বিছানায় শুয়ে ছিল।বাবা মাকে দেখে সে উঠে বসল।
    তার মা তাকে বলল, সুমি মা আমরা তোকে কিছু বলতে চাই।
    আচ্ছা বল। সুমি বলল।
    আমরা তোর কোনো ধরণের কষ্ট সহ‌্য করতে পারবো না।তুই এখন কি করতে চাস।তার বাবা তাকে বলল।
    বাবা আমি বুঝতে পারছি না। আমাকে কিছুদিন ভাবার সময় দাও।তাছাড়া আমাদেরকে রায়হান এর কথা সবার আগে ভাবতে হবে।সুমি তার বাবা মাকে বলল।
    তার কথা শুনে তার মা বলল, এত ভাবাভাবির কি আছে তুই কি কোনো দিক থেকে ছোট হয়ে গেছিস।আমরা তোকে আবার বিয়ে দেব।তুই শুধু একবার রাজি হয়ে যা আমরা ঐ ইকবালকে দেখিয়ে দেব।
    মায়ের কথা শুনে সে বলল, না মা এত তাড়াতাড়ি আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না, তোমরা তাড়াহুড়া করো না।আমি রায়হানের কথা ভাবছি।
    ঠিক আছে তুই যা বলবি তাই হবে।এত তাড়াহুড়া করার কিছু নাই।চলো আমরা এখন আমাদের রুমে যাই।সুমির বাবা তার মাকে নিয়ে তাদের রুমে চলে গেল।
    সুমি ভাবনায় পড়ে গেল।সে কি তার বাবা মাকে ইকবালের বিষয়টা জানিয়ে ভুল করেছে,নাকি ঠিকই করেছে।তার কারণে তার বাবা মা এখন সবসময় চিন্তার মাঝে থাকবে। না নিজের কাছেই তার এ বিষয়টা এখন ভালো লাগছে না। সে এখন কি করবে তা নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না।ভাবনায় ডুবে রইল সুমি, তার চিন্তা শুধু রায়হানকে নিয়ে। সে যদি কিছু করতে যায় তবে রায়হানের জীবনটা এলোমেলো হয়ে যাবে।সে যে রায়হানের মা।তার কোনো কষ্টও যে সে সইতে পারবে না। তার ছেলের জীবনের কথা তাকে সবার আগে ভাবতে হবে যে।তাই ইকবালে সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা বা না রাখার সিধান্তটা তাকে অনেক ভেবে চিন্তে নিতে হবে।চিন্তা ভাবনার অন্তরালে সুমি ঘুমিয়ে পরল।
    সকালে ঘুম থেকে জেগে সুমি দেখল তার মামা তাদের বাসায় এসে হাজির হয়েছে।সে এসেছে মানে কোনো একটা মিশন নিয়েই সে এসেছে। আর এখন তাদের বাড়িতে তার বিষয়টাই যে গুরুত্বপূর্ণ সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।তাদের এই বড় মামা যখন তাদের বাড়িতে আসে তখন কোনো মিশন নিয়ে ই আসে আর সেটাকে সে যেভাবেই হোক সফল করে ছাড়ে।তাই মামাকে দেখে সুমি ভাবনায় পড়ে গেল সে আবার তার বিষয়টার একটা হেস্তনেস্ত করার জন‌্য আসেনি তো।
    সুমিকে দেখে তার মামা বলল, সুমি মামনি কেমন আছো, তোমার ছেলে রায়হান কেমন আছে?
    আমরা ভালো আছি, মামা আপনি কেমন আছেন।সুমি বলল।
    আছিরে মা একটু ব‌্যস্ত আছি, মানুষের সমস‌্যার সমাধান করতে করতেই আমার দিন কেটে যাচ্ছে।সুমির মামা কাবুল বলল।
    তা কাবুল মামা তুমি এত ব‌্যস্ততা নিয়ে আমাদের এখানে এলে কিভাবে।সুমি তার মামার কাছে জানতে চাইল।
    জবাবে কাবুল মামা বলল, আরে মা এখানে তো মিশন নিয়ে এসেছি।যা আমার জন‌্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিশন।তোর আম্মা আমাকে খবর দিয়েছে তুই নাকি মুসকিলে রয়েছিস তার সমাধান করার জন‌্যই তো আমি এসেছি।
    সুমি যা ভেবেছিল তাই হয়েছে।কাবুল মামা তার সমস‌্যার সমাধান করার জন‌্যই এসেছে।সুমি আবার নতুন করে বেশি করে চিন্তিত হয়ে পরল।কেননা যে বিষয়টা সে গোপন করে রেখেছিল তা যেন আজ প্রকাশ হয়ে যেতে চলেছে।
    সুমি এবার বিষয়টা হালকা করে দেয়ার জন‌্য বলল, না মামা আমি তো তেমন কোনো মুসকিলে নাই মা মনে হয় তোমাকে ঠিকভাবে বুঝিয়ে বলতে পারে নি।
    সুমির কথা শুনে তার মামা কাবুল বলল, না রে মা সুমি এভাবে লুকিয়ে রেখে কষ্ট পেলে তো হবে না।তোর মা আমাকে ঠিকই বলেছে আর আমি ঠিকই বুঝেছি। তোকে আর কষ্ট পেতে দেব না আমরা এবার এর একটা সমাধান করবই আমরা।
    না মামা আমার কথা ছাড়া তোমরা কাউকে কিছু বলতে যেও না। এতটুকু বলে সুমি তার রুমে চলে গেল।
    সুমির মামা কাবুল সুমির কথায় কিছুটা বিস্মিত হয়ে গেল।সে বুঝতে পারছে না সুমি মেয়েটা আসলে কি চায়। তার মা তো বলেছে তার বদরাগী জামাই ইকবালের সাথে তার আর সম্পর্ক রাখবে না তারা।আর সুমির মাঝে তেমন কোনো অনুভূতির দেখা তো পেল না এখন সে।না বিষয়টা কাবুলকে সঠিক ভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।সে তার ভাগ্নির ভালো করতে এসেছে, তাই বিষয়টা তাকে জানতেই হবে যে আসলে কি হয়েছে আর কি করতে হবে।
    কাবুল তার বোন দুলাভাইয়ের কাছে গেল।
    কাবুলকে দেখে তার দুলাভাই বলল, আসো শালাবাবু আসো তা সুমির বিষয়ে কিছু করতে পারলে। জানতে পারলে কিছু ও কি করতে চায়।
    না দুলাভাই আপনাকে নিয়ে আর পারি না।আমাকে রেসপেক্ট করে একটু কথা বলুন, শালাবাবু কোনো কথা হলো।আমাকে আপনি বলতে পারেন গোয়েন্দা কাবুল।কাবুল তার দুলাভাইর কথার জবাবে বলল।
    কাবুলের কথা শুনে তার বোন বলল, হয়েছে হয়েছে। কি যে গোয়েন্দাগিরি করিস তাতো আমরা জানি। এখন বল সুমির সাথে কথা বলে কি বুঝতে পেরেছিস ওকি ইকবালের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায় নাকি সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায়।
    বোনের কথা শুনে কাবুল বলল, আমার তো মনে হয় সুমি এখনও ঐ দুষ্ট ছেলেটাকে ভালোবাসে।আর ওকে ত‌্যাগ করতে চায় না।ওর সাথে কথা বলে আমার তেমনই মনে হয়েছে।
    তোকে দিয়ে কোনো কাজ হবে বলে আমার মনে হয় না। তোর ওপরে কোনো দায়িত্ব দিয়ে আমি শান্তি পাই না।কাবুলকে তার বোন তিরস্কার করে বলল।
    বোনের কথার জবাবে কাবুল বলল, তুমি যে কি বলোনা আপা দেখ আমি সব ধরণের সমস‌্যার সমাধান করে বেড়াই আর তুমি কিনা আমার কাজ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছ।
    হয়েছে হয়েছে আমরা তোমার কাজ নিয়ে কোনো সংশয় করছি না। তুমি কেবল এসেছ, কয়েকদিন থাকো আর বিষয়টা নিয়ে কাজ করো।কাবুলকে উদ্দেশ‌্য করে এবার তার দুলাভাই বলল।
    ওকে দুলাভাই তুমি এবার সমঝদার এর মতো কথা বলেছ । আমি এবার একটু রেস্ট করে নেই।তার পরে দেখা যাবে কিভাবে আমি এই সমস‌্যার সমাধান করি। এতটুকু বলে কাবুল চলে এল।
    এদিকে সুমি খুব চিন্তিত হয়ে পরল।তার খুব ভাবনা হতে লাগল কেন যে সে ইকবালের বিষয়টা তার বাবা মাকে বলতে গেল।রাগের মাথায় সে আসলে ভুলই করে ফেলেছে হয়ত, কেননা এখন বিষয়টা সবাই জেনে যাবে।কি করা যায় সে ভাবতে লাগল।সে বাবা মাকে জানিয়েছে মাত্র কিন্তু কি করবে তাতো এখনও ভাবেনি সে অথচ তার মা কাবুল মামাকে এর মাঝে ডেকে এনেছে।
    সুমি ভাবতে লাগল, ইকবালকে সে কতোবার বুঝিয়েছে কিন্তু সে তো বুঝতে চায় না।কি করবে সে।চরম সিদ্ধান্তও তো সে নিতে পারছে না।কারণ সে তো একজন মা।আর তার ছেলের কথা ভাবাই তার প্রথম এবং প্রধান কাজ।সে যদি ইকবালের কাছ থেকে দূরে সরে আসে তবে রায়হানের জীবনটা এলোমেলো হয়ে যাবে।একজন মা হিসেবে সেটা তার কিছুতেই কাম‌্য নয়।সুতরাং সীধান্তহীনতায় ডুবে রইল সুমির মন।
    সে মায়ের কাছে গেল।মা আসলে এই সময়ে তাকে সঠিক পথ দেখাতে পারছে না। সে তার মামাকে খবর দিয়ে এনেছে, সুমির কাছে এটাও আবার ভালো লাগেনি।কিন্তু বাবা মা আর তার এক ভাই ছাড়া তার তো আর কোনো আপনজন নেই যারা তাকে সাহায‌্য করতে পারে।
    সুমি তার মার কাছে জানতে চাইল, মা তুমি মামাকে আবার খবর দিতে গেলে কেন?
    এমনিতেই। কেন? পাল্টা তার মা তার কাছে জানতে চাইল।
    না বলছি মামাতো এখন ইকবালের এমন স্বভাবের কথা সবার কাছে বলে দেবে।আর তাহলে আমার ইজ্জত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বলতে পারো। সুমি বলল।
    আরে না মা তুই এতো চিন্তা করিস না আমি কাবুলকে সবকিছু বুঝিয়েই এনেছি ও কারো কাছে কিছু বলবে না।আর এটা আমাদের পারিবারিক সন্মানের বিষয় সুতরাং তুই চিন্তা করিস না।সুমির মা তাকে নিশ্চিন্ত করে বলল।
    আচ্ছা মা যেহেতু আমাদের সন্মান এখানে জড়িত তাই তুমি আমাকে বলো এ বিষয়ে আর কোনো কথা কারো কাছে বলবে না যা করার আমিই করবো।সুমি তার মাকে অনুরোধের সুরে বলল।
    ঠিক আছে আমরা তোর সিদ্ধান্তের দিকেই চেয়ে থাকবো তুই আর চিন্তা করিস না।সুমির কথার জবাবে তার মা তাকে নিশ্চিন্ত করে বলল।
    ওকে আমি এবার চিন্তা মুক্ত হলাম। এতটুকু বলে সুমি মার কাছ থেকে চলে এল।
    এক মাস পার হয়ে গেল।সুমি আর ইকবালের কাছে ফিরে যায়নি। সে তার বাবার বাড়িতে বসেই অপেক্ষা করতে লাগল যে তার স্বামী নিজের চরিত্র ঠিক করে তাকে ফিরিয়ে নিতে আসবে।কিন্তু তার ভাবনা সঠিক ছিল না।কেননা ইকবাল সে রকম মানুষ নয়।সেও অপেক্ষা করতে থাকল যে তার স্ত্রী আপনা থেকেই তার কাছে ফিরে আসবে।দুজন দুজনের ভাবনার জায়গায় স্থীর রইল,কিন্তু কেউ কাকে ফিরে আসার জন‌্য তাগাদা দিল না। এদিকে কাবুল মামা এ ইসু‌্য নিয়ে সুমিদের বাড়িতেই অবস্থান করতে লাগল।সেও বারবার চেষ্টা করতে লাগল দুজনের মাঝে একটা সমাধান এনে দিতে,কিন্ত সে দুজনের সাথে কথা বলে কারো মনের সঠিক চাওয়াটা বুঝতে পারছে না।তাই কিছুটা নিরব থেকে সে তার কি করণীয় সে বিষয়ে ভাবতে লাগল।
    সুমি প্রায়ই ইকবালকে মোবাইল ফোনে নানা রকমের উপদেশ দিয়ে থাকে আর বলে এ কথা সে না শুনলে সুমি আর ফিরে যাবে না। কিন্তু ইকবাল হেসেই সব কথা উড়িয়ে দেয়। সে বলে ঝামেলা না করে তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।
    সুমি আজ আবার ইকবা‌লকে কল করে বলল, কি আমার কথায় রাজি হয়েছ তাহলে আমাকে নিতে এসো, এক মাস তো হয়ে গেল।আর কতোদিন এখানে থাকব।
    সুমির কথা শুনে ইকবাল রাগ দেখিয়ে বলল, আমি কি তোমাকে ওখানে থাকতে বলেছি নাকি।তোমার ইচ্ছেমতো গেছ, আবার তোমার ইচ্ছে হলে চলে এসো। আমি ব‌্যস্ত আছি তোমাকে নিতে আসতে পারবো না।
    ইকবালের কথা শুনে সুমির ও রাগ হলো। সে বলল, আচ্ছা আমার ইচ্ছেমতোই ফিরে আসবো কিন্তু তোমার যে বাজে কাজগুলো আছে তার কি করবে, সেগুলো তো আমি ছেড়ে দিতে বলেছি তার কি করলে?
    একদিনে এতোদিনের করা কাজ ছেড়ে দিতে পারবো না আর তাছাড়া তোমার তো কোনো ক্ষতি আমি করছি না, তোমার কোনো অভাব আমি রাখিনি তাহলে আমার পিছনে উঠে পড়ে এতো লেগেছ কেন শুনি। আমি বলি কি ঝামেলা না করে তুমি ফিরে এসো।
    এবার সুমি বলল, তুমি কি রায়হানের কথা একটুও ভাববে না।ছেলেটা দিন দিন বড় হচ্ছে।ও যদি তোমার এই জুয়াবাজি দেখতে পায় তাহলে ওর ওপরে কি বিরুপ প্রতিক্রিয়া পরবে তুমি বুঝতে পারছ।
    বেশি বকবক করোনা।সুমির কথায় রাগ করে ইকবাল এতটুকু বলে লাইন কেটে দিল।
    সুমির দুচোখ দিয়ে নীরবে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরল।সে তার কান্নাকে থামাতে পারল না।ছেলেটার কথাও ভাবল না তার বাবা।কিন্তু সে তো রায়হানের জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে না।এখন যদি সে ইকবালকে ত‌্যাগ করে তবে ইকবাল তো রায়হানের জীবনটা ধ্বংস করে দেবে।তাহলে কি করণীয় এখন সুমির, সে যে একজন মা। সবার আগে এটাই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। সুতরাং আবেগের বশে সে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।
    সুমি আর কালক্ষেপণ করতে চাইল না।সে তার বাবা মা ভাই আর মামার সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করলো। তার মামা তাকে বলল, আমার মনে হয় না তুমি কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এ বিষয়ে। কারণ আমি ইকবালের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝেছি তা হলো সে কিছুতেই তার পথ থেকে ফিরে আসবে না। তাতে তুমি যাই করো। ওর সাথে থাকো বা না থাকো ও ওর পথ থেকে ফিরে আসতে পারবে না।তাই তুমি একা কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে চলতে পারবে না।তোমাকে সবার আগে রায়হানের কথা ভাবতে হবে।
    মামা ঠিকই বলেছে আপু, তোমাকে রায়হায়নের কথা তো মাথায় রাখতে হবে।সুমির ভাই মামার কথায় সায় দিয়ে বলে উঠল।
    না আমি তোদের কথায় একমত না, মেয়েরা আজকাল এত অসহায় নয় ও ইকবালকে ছেড়ে দিলে আমরা আবার ওকে বিয়ে দিতে পারি। যদি সুমি রাজি থাকে তাহলে আমরা এমন সিদ্ধান্তই নেব।সুমির মা কিছুটা শক্ত ভাষায় কথা বলে ফেলল।
    সুমি নিশ্চুপে সবার কথা শুনে যাচ্ছে কারো কথার কোনো জবাব দিচ্ছে না আর ভাবছে নানা মতের মাঝে সে হয়তো হারিয়ে যাবে কিন্তু রায়হান যে তার সন্তান তার যাতে ভালো হয় সে কাজই সে করবে।তাতে যদি ইকবালের কাছে তাকে ফিরে যেতে হয় তবে সে ফিরেই যাবে।কেননা সন্তান মায়ের কাছে সবচেয়ে আদরের জিনিস।
    সুমির মায়ের কথা শুনে তার বাবা বলল, না না তুমি কিছু না ভেবে এভাবে বললে হবে না, আমাদের ভেবে চিন্তে ওকে ভালো বুদ্ধি দিতে হবে। না হলে ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। আমার মনে হয় ওর কাছে যা ভালো মনে হয় ও যেন সেটাই করে।
    এবার সুমির মামা বলে উঠল, আমার মনে হয় এতো রাগারাগি না করে সুমির ইকবালের কাছে ফিরে যাওয়া উচিত।কারণ ছেলে আস্তে আস্তে বড় হলে লজ্জায় পরেও তার বাবা সংশোধন হয়ে যাবে।আর সুমি তো সবসময় সে চেষ্টা করেই যাবে। সুতরাং সুমি মা তুমি আমার কথা শোনো তুমি ইকবালের কাছে ফিরে যাও।তোমাদের সকলের মঙ্গল হবে।
    ভাইয়ের কথা শুনে রেগে গেল তার বোন। বলল, কাবুল তোকে দিয়ে কোনো দিন কোনো কাজ হয়নি আজও হবে না।তুই সুমিকে ফিরে যাবার বুদ্ধি কেন দিলি, আমরা কেনো ইকবালের সাথে আপোস করতে যাবো।ওকে ভালো মানুষ হয়ে উঠতে হবে তাহলেই আমরা সুমিকে ওর সাথে যেতে দেব।
    মায়ের কথা শুনে সুমি বলল, না মা তোমরা এতো রাগারাগি করো না বাবা যা বলেছে তাই করবো আমি ভেবে নিজেই সিদ্ধান্ত নেব আমি কি করবো।আর তোমরা আমাকে নিয়ে এতো চিন্তা করো না।
    সুমির কথা শুনে সবাই নিশ্চুপ রইল।
    কিছুক্ষণ পরে নীরবতা ভেঙ্গে সুমির বাবা বলল, ঠিক আছে মা তোর কথাই রইল। আমরা তোর ওপরে সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিলাম।তুই যেটা বলবি সেটাই আমরা করবো।
    ঠিক আছে বাবা এখন যে যার রুমে যাও আমি আমার রুমে গেলাম।আমি ভেবেই সিধান্ত জানাব আমি কি করবো।
    সারারাত একটু ও ঘুমাতে পারলো না সুমি।সে চেয়েছিল কিছুদিন ইকবালের কাছ থেকে দূরে থাকলেই সে ঠিক হয়ে যাবে।কিন্তু সুমির ভাবনা ঠিক ছিল না। ইকবাল তার মনের মতো হতে চায় না। কারণ তার রয়েছে অগাধ অর্থ সম্পদ যার কারণে সে বিপদগামী হয়েছে।এখন সুমি কি করবে তার ইকবালের কাছে যাওয়া দরকার আবার তাকে সংশোধন করাও দরকার।আর এর ব‌্যতিক্রম অন‌্য কিছু ভাবলে যে তার রায়হানের ক্ষতি হবে।সুমি ভাবতে লাগল, তার মাঝে মাতৃত্ববোধ প্রখর হয়ে উঠল।
    সুমি বিছানা ছেড়ে উঠে পায়চারি করতে লাগল আর রায়হানের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল হায়রে আমার বাবা তোমার জন‌্য আমি সবকিছু ত‌্যাগ করতে পারি।তবে কেন আমি তোমার সুন্দর জীবন গড়ে তোলার জন‌্য এ জীবনটা ত‌্যাগ করতে চাচ্ছি না।আমি যে তোমার মা আমি তোমার জন‌্য সবকিছু ত‌্যাগ করবো।
    সুমি আপনমনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল।এবার তার দুচোখে ঘুম এসে হানা দিল।সে নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পরলো।
    ভোরবেলা ব‌্যাগ হাতে নিয়ে সুমি তার ভাই রাকিবকে ডাক দিল।রাকিব তার কাছে চলে এলো সাথে সাথে।সে এসে বলল, কি আপু কি হয়েছে?
    সুমি বলল, রাকিব চল আমাকে তোর দুলাভাইয়ের কাছে দিয়ে আয়।
    আচ্ছা ঠিক আছে চল আপু। রাকিব এক কথায় রাজি হয়ে বলে উঠল।
    সুমি কথা শুনে সবাই ড্রইং রুমে চলে এলো।তার মামা বলল, ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিস মা।যা স্বামীর কাছে ফিরে যা ছেলেকে মানুষ কর আর তোর বখে যাওয়া স্বামীকেও মানুষ করে তোল।
    ঠিক আছে মামা দোয়া করবা।সুমি তার বাবা মাকে ও দোয়া করার জন‌্য বলে রাকিবকে সাথে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে পরলো।
    সুমিকে দেখে ইকবাল হাসি মুখে বলল, ও অবশেষে ফিরে আসলে তাহলে।যাক বাবা বাঁচা গেল।আমি খুব চিন্তার মধ‌্যে ছিলাম এতোদিন।
    ইকবালে কথা শুনে সুমি বলল, দেখ আমি তোমার জন‌্য ফিরে আসিনি।আমি যে মা তাই আমাকে ফিরে আসতে হয়েছে এই ছেলের কথা ভেবে ।আমি ফিরে এসেছি রায়হানের মা হিসেবে, তোমার স্ত্রী হিসেবে আমাকে আর খুঁজে পাবে না।তবে সেটাও সম্ভব যদি কোনো দিন তুমি ভালো মানুষ হয়ে আমার কাছে ফিরে আসো।
    সুমির কথা শুনে ইকবাল হেসে বলল, ফিরে যে এসেছ সেটাই বড় কথা।কি হিসেবে এসেছ সেটা পরে দেখা যাবে।
    সুমি আর কথা বাড়াল না।রাকিবকে বিদায় দিয়ে রায়হানকে কোলে নিয়ে সে বাসার ভিতরে চলে গেল।একজন মা হিসেবে সে আত্নত‌্যাগ করে নিজের জীবনকে একজন জুয়াড়ীর সাথে মিশিয়ে নিল।

    3
    2 Comments

শরীফ মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান

বহুমাত্রিক লেখক

শরীফ মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান। শ.ম.ওয়াহিদুজ্জামান নামেই পরিচিত। জন্ম ১৩ এপ্রিল, বরিশাল জেলার বাবুগন্জ থানার দক্ষিন রাকুদিয়া গ্রামে। পিতা-মো.আবু হোসেন শরীফ, মাতা-মিসেস দেলোয়ারা হোসেন। তিন ভাই এক বোন। তিনি গণিতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন সরকারী বি.এম কলেজ,বরিশাল থেকে। স্কুল জীবনেই লেখালেখির সঙ্গে জড়িয়ে পরেন। দৈনিক আজকের কাগজ পত্রিকায় প্রথম কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, শিশুতোষ গল্প, গোয়েন্দা গল্প এবং ভ্রমণ কাহিনী প্রকাশিত হয়েছে। সৃজনশীল ভাবনার সৃষ্টিশীল রুপদানে পাঠকের হৃদয়ে তৃপ্তি প্রদানের নিমিত্তে প্রতিনিয়ত লেখক নিজেকে উজাড় করে দিয়ে অনিন্দ‌্য সুন্দর সাহিত্য সৃষ্টিতে নিয়োজিত রয়েছেন। একটি সুখি সমৃদ্ধ সুন্দর মায়া মমতায় পরিপূর্ণ বিভেদহীন বাংলাদেশ রয়েছে লেখকের কল্পনায়।প্রকাশিত বই ১৯টি,কাব্যগ্রন্থ- অপরিচিতা নামে,আবু সাঈদ,সাদা মনের মানুষের দলে,লাল সবুজ পতাকা,আমরাও খুনি হব,জয়নালের কিছু স্বপ্ন ছিলো,উপন্যাস-কাশফিয়া, প্রবন্ধ গ্রন্থ-সফলতার উপকরণ,গোয়েন্দা গল্প-সুমন্তর গোয়েন্দা অভিযান,ছায়াপাখি,ভূতের কান্না,লাল মলাট রহস্য, ছোটো গল্প-ধূসর রঙের জীবন,রক্তিম মানচিত্র।

Skip to toolbar