Profile Photo

Shofia SheuleOffline

  • Shofia-B-Sheule
  • Profile picture of Shofia Sheule

    Shofia Sheule

    4 years, 8 months ago

    বাহির ডাকে আয়………//সুফিয়া শিউলি

    শ্রেণীকক্ষের দরোজার পাশে শিউলি কান ধরে হাটুমুড়ে বসে আছে , সে খুব খুশী, অংক ক্লাসে থাকতে হচ্ছে না! তারথেকে বরং বাইরে কত কি দেখা যাচ্ছে…
    মালীমামা বাগান পরিষ্কার করতে গিয়ে কিছু কিছু ফুল কেটে ফেলে দিচ্ছেন, সাথে কিছু অতিরিক্ত চারাগাছও ফেলে দিচ্ছেন। কখন সেগুলো নেয়া যাবে, শুধু সেই চিন্তাটাই মাথায় ঘুড়ছে।
    ওদিকে আবার বকুল তলায় শালিকগুলো বকুলফল খাওয়ার নাম করে ঝরেপড়া ফুলগুলো নষ্ট করছে, সেজন্য খুব রাগ লাগছে।
    তাছাড়া পিছনের চাঁপাফুল গাছটার নিচে কোন ফুল পড়ে আছে কিনা, সেটাও তো দেখতে হবে! ঘন্টা বেজে উঠলেই টিফিন সময় … আহা কখন যে ঘন্টাটা বেজে উঠবে?
    শিউলির আর একটা বিষয় খুব ভালো লাগে এই স্কুলের, তা হল প্রধান শিক্ষিকার গলার জোর! ওড়ে বাব্বা… সেই স্কুলগেটের কাছে ডানদিকের বারান্দার শুরুর মাথায় বড় আপার বসার ঘর, আপা সেখান থেকে এক চিৎকার, এই মেয়েরা !…… আর ঐ এক চিৎকারেই গোটাস্কুলের মৌমাছির গুঞ্জন একদম নিঃশব্দ হয়ে যায়।
    শিউলি কাউকেই বলেনি, সে মনে মনে ভেবে রেখেছে বড় হলে সে এমন গলার জোরওয়ালা প্রধান শিক্ষিকা হবে। এই কথাটা সে একবার শুধু তার ছোটভাইয়াকে বলায়, তার ভাইয়া ব্যঙ্গো করে হেসে বলেছিল, অংকে তো উলটে পরিস; আর শিক্ষক হতে চাস?
    সেজন্য সে আর কাউকে মনের কথাটি বলার রিক্স নেয়নি।
    শিউলি শেষব্রেঞ্চের ছাত্রী, প্রায়দিনেই তাকে কান ধরে হাইব্রেঞ্চের ওপরে নতুবা দরোজার বাইরে থাকতে হয়। তাই এ বিষয়টা নিয়ে তারমধ্যে কোন ভাবান্তর বা দুঃশ্চিন্তা কাজ করে না। যেন এটা হবে, এটাই স্বাভাবিক।
    ও হা, তাই বলে সে আবার গাড্ডুমেরে কিন্তু পড়েও থাকে না…… কিভাবে যেন প্রতিবছর ঠিক ফেলের দরোজা পেরিয়ে পাসের লাইনে বসার সিট পেয়ে যায়!
    তার মা প্রায় তাকে বলে, ‘তুই একটু পড়ায় মনোযোগী হলে অনেক ভালো করতে পারতি, কেন যে এমন করিস?’ মা কিন্তু আবার বলেই ক্ষান্ত থাকে না, মাঝে মাঝে রেগে গেলে ধুম-ধারাক্কা লাগিয়েও দায়।
    শিউলির তাতেও কোন ভাবান্তর হয় না। চোখের পানি মুছে আবার যে আর সে…!
    তার এমন ভাবলেশহীন ভাবধারায় চলাফেরা দেখে তার যে অল্প কজন স্কুলবন্ধু আছে, তারা প্রায় তাকে বলে, ‘তুই না খুব ঢংগী!’ বলে হাসাহাসি করে তাকে নিয়ে……শিউলির তাতেও কোন ভাবান্তর হয় না, সে চুপ থাকে আর তার মতোই চলে।
    তার মনে হয় তখন, না বললাম তোদের সাথে কথা, তাতে কি? কথা বলার জন্য গাছ আছে, সূর্য আছে, চাঁদ আছে, কত পাখি আছে……!
    শিউলি পথে চলতে চলতে রাস্তার পাশের ড্রেনে কোন ব্যাঙ লাফাতে দেখলে, তার সাথেই সে কথা জুড়ে দেয়…।
    আর সে তো জানেই শুধু শুধু অধিক সময় পড়াশোনায় বায় করে কিচ্ছু হয় না। ঐ পাশ করার জন্য পরীক্ষার আগে আগে ঠিক করে পড়লেই হয়। তার চেয়ে বরং নিজের আশে পাশে কত কি দেখার আছে। সেগুলো প্রত্যেকদিন একবার করে না দেখলে কি আর চলে?
    হাটুমুড়ে বসে থাকতে থাকতেই হটাৎ তার মনে পড়লো, বাসার জাম গাছটার মাঝের মোটা ডালটার মাথায় বাদামী রঙের একটা পাখি বসে থাকতে দেখে সে প্রায়। পাখিটা কি সেখানে বাসা বেঁধেছে? দেখাই হলো না এখনো; একবার যদিও চেষ্টা করেছিল গতকাল, কিন্তু মা যে জোরে ধমক লাগালো; ভয়ে আর গাছে ওঠা হয়নি।
    মা বলেছে, তার নাকি আর গাছে ওঠা হবে না। সে নাকি বড় হয়ে গেছে এখন। কিন্তু শিউলি কিছুতেই বুঝতে পারছে না, সে কেমন করে বড় হয়ে গেল! অষ্টম শ্রেণীতে উঠলেই বুঝি সবাই বড় হয়ে যায়? মাকে জিগ্যেস করতে হবে বিষয়টা।
    আচ্ছা, ছোট ভাইয়াও তো অষ্টম শ্রেণীতেই পড়ে। আমরা দুভাইবোন তো একই ক্লাসে পড়ছি। বরং ভাইয়াই তো আমার চেয়ে বয়েসে বড়, তাহলে? মা তো ছোট ভাইয়াকে বলে না, সে বড় হয়ে গেছে, সে যেন আর গাছে-টাছে না ওঠে! তবে শুধু শুধু আমাকে বলা কেন?
    শিউলির আরও মনে হলো, মা যেন আজকাল কেমন পর পর আচরণ করে তার সাথে। আজকাল আর সাইকেলটা নিয়েও রাস্তায় বের হতে দিতে চায় না। বীথির মা নাকি মার কাছে অভিযোগ করেছেন, ‘আপনি এমন পরহেজগার মানুষ আর আপনার মেয়ে সাইকেল নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়! এটা কি ভালো দেখায়?’
    শিউলি কিছুতেই বুঝতে পারছে না, তার মা পরহেজগার মানুষ হওয়ার সাথে তার সাইকেল চালানোর কি সম্পর্ক? এটাও মায়ের কাছে জানতে হবে।
    এমন সময় টং টং ঘটাং করে ঘন্টাটা বেজে উঠলো। তার এক বন্ধু ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে হাসতে হাসতে বলল, কি রে এখনো হাটুগেরে বসে আছিস? স্যার তো চলে গেছে, ওঠ… এখন।
    শিউলি একপাটি দাঁত বের করে ফিক করে হেসে বকুলতলা বরাবর দিলো দৌড়।
    বন্ধুটি চিৎকার করে উঠলো, তুই যাচ্ছিস কেন? টিফিন খাবি না?
    তুই খা, পারলে আমারটাও খা।
    আর এভাবেই সে বছরগুলো পেরিয়ে মানবিক বিভাগে সবকটা বিষয়ে, এমন কি যে অংক ভয় পেতো, সেটাতেও অনেক ভালো নম্বর পেয়ে স্কুলপাস দিয়ে বেরিয়ে আসে…। আর তার মা তখনো বলে, ‘ ঈস… মেয়েটা আর একটু ভালো করে পড়লে আরও ভালো করতে পারতো! পড়ায় এত কম মনঃ থাকলে কি আর তাকে দিয়ে কিছু হয়!’

    10
    6 Comments
Skip to toolbar