-
যেদিন ভিজেছিল চোখজোড়া
.
” ছি-ছি ! কী নির্লজ্জ। তুমি যা-ই বল আপু, আমি আর বসে থাকতে পারছি না এভাবে , ” বলে উঠে দাঁড়াল মৌমিতা।
মনিরা দ্রুত তাকে টান দিয়ে বসিয়ে দিল ফের। কিন্তু মৌমিতা নাছোড়, সে আবারও দাঁড়িয়ে পড়ল। মনিরা মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করল, ” আরে, কই যাস তুই ! বস এখানে ! ”
” না আপু ; এমন কোরো না-তো ! যেতে দাও আমাকে ! ”
” মৌমি, কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলা ইসলামে নিষিদ্ধ কিন্তু – ”
কিন্তু সে বাক্যটি শেষ করার আগেই মৌমিতা চলে গেছে ততক্ষণে। মনিরা হতাশ হয়ে মাথা নাড়ল বার কয়েক। উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটা দিল মৌমিতার গমনপথে।
গিয়ে দেখতে পেল মৌমিতা তখন তার “উপদেশ”বাণী বর্ষণ করা শুরু করেছে তার শ্রোতাকে উদ্দেশ্য করে , “…. হ্যাঁ-হ্যাঁ, বোরকা নিয়েই তো আপনাদের যত সমস্যা। নিজে কী পরেছেন, চেয়ে দেখেন আগে ! ছেঁড়া ন্যাকড়া, ফুটপাথ থেকে কিনেছেন ; বুঝি না নাকি আমরা ? তার ওপর এক মাস ধরে হয়তো গায়ে পানিই লাগান নাই। গায়ে পারফিউম দিয়েছেন সে গন্ধ ঢাকার জন্য। কিন্তু গায়ে এত গন্ধ যে, পারফিউমের গন্ধ মিলিয়ে গোবরের চেয়েও নিকৃষ্ট দুর্গন্ধ আসছে ; ছি ! ”
শ্রোতা ভদ্রমহিলাও অবশ্য কম যান না ; এত কথার পরও তিনি খুব বেশি দমে যাননি। বললেন, ” আপনি কী ? হ্যাঁ- আপনি কী ? আমি তো তা-ও পারফিউম মেখেছি, আপনি সেটাও মাখেননি ! আপনার গায়ের ঘামের গন্ধেতো টেকাই যাচ্ছে না ! কয় মাস ধরে বোরকা পরিষ্কার করেননি, কে জানে ! ”
” এই মহিলা, এই ! আমি বোরকা প্রতিদিন ধুই, জানেন। আর ঘামের গ– ”
তাকে মাঝপথে থামিয়ে টান দিয়ে সরিয়ে নিয়ে এল মনিরা। মৌমিতা তখন রাগে ফোঁস-ফোঁস করছে। মনিরা নরম কণ্ঠে বলল, ” খামোখা কতগুলো কথা শুনলি, বল তো ? ”
” তুমি জান, কী খারাপ এই মহিলা ? আমাকে নিয়ে এলে কেন ? ”
” সে কি আগ বাড়িয়ে তোকে কিছু বলেছে ? ”
” আমাকে বলে নাই কিন্তু, আমাদের ইসলামকে নিয়ে কতগুলো কথা বলল ! ”
মনিরা আপ্লুত হল বোনের কথায়। অথচ একটা সময় মৌমিতা এমন ছিল না। না, পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে সে সবসময়ই সচেতন ছিল। বরং তার এ কাটা কাটা কথা বলার স্বভাব দিয়ে সে মানুষকে এর আগেও বিব্রত করেছে, বিশেষত পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে। তার পছন্দের সাথে না মিললেই মানুষকে কথার বাণে কুপোকাত করা তার অন্যতম একটা কাজ।
আর সে স্বভাব কাজে লাগিয়ে দ্বীন মেনে চলা মানুষজনকে সে কষ্ট দিয়েছে সবচেয়ে বেশি। এমনকি নানু-দাদুকেও সে ছাড় দেয়নি। সবশেষ, মনিরা যখন এ পথে হাঁটতে শুরু করল, তখন তাকে কষ্ট দিয়ে কথা বলাটা হয়ে উঠেছিল তার নিত্যদিনই পছন্দের কাজ।
কিন্তু গত বছর হঠাৎ করেই পরিস্থিতি পালটে যেতে শুরু করল, যখন সে নিরীহ এক ১৪ বছর বয়সী মাদরাসার ছাত্রকে জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে পুলিশ বাহিনীকে ক্রসফায়ারে হত্যা করার কথা জানতে পারল।
মৌমিতার প্রকৃতিই এমন যে, সে যা বিশ্বাস করবে, মন-প্রাণ দিয়ে করবে। এ ঘটনার পর থেকে ধীরে ধীরে তার মধ্যে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। জিন্স প্যান্ট, ফতুয়া বাদ দিয়ে সে প্রথমে ঢিলেঢালা থ্রিপিসে এল। হাতার ঝুল থ্রি কোয়ার্টার থেকে লং হল, সাথে যুক্ত হল হিজাব। তারপর বোরকা। এখন চলছে কিছুটা স্টাইলিশ নিকাব। মনিরা আশা করছে শীঘ্রই সে পূর্ণ পর্দায় আসবে, ইন শাআল্লাহ। কিন্তু এত এত কিছুর পরও সে মুখের ওপর কথা বলে দেয়াটা ছাড়তে পারেনি পুরোপুরি।মনিরা অনেক বুঝিয়েছে তাকে ; সে নিজেও বুঝেছে কিছুটা, অহেতুক মানুষকে কষ্ট দিয়ে কথা বলা অনেকটা কমিয়েছেও। কিন্তু এখন আবার ইসলাম সম্পর্কে কিছু বললে সে চুপ থাকতে পারে না, সেটা কেউ অজ্ঞতাবশত করলেও।মনিরা তাকে বলল এবার, ” ইসলামকে নিয়ে বলেছে যখন, তখন তুই সে বিষয়েই বলতি তাকে বুঝিয়ে ? ”
” বুঝিয়ে বলতাম ! সে কী কী বলেছে জান, সেগুলো কি সহ্য করার মতো ? ”
” না, তা না। কিন্তু তবুও তাকে ব্যাক্তিগতভাবে এভাবে বলতে পারিস না তুই। ”
” সে এভাবেই শোনার যোগ্য। ”
” একদমই না। মৌমিতা, তুই না কাউকে কষ্ট দিয়ে কথা বলবি না, বলেছিস –”
” কিন্তু সে তো ইসলামের শত্রু, আপু ! ”
” যা-ই হোক সে, তবুও তুই বলতে পারিস না। সে যদি হাশরের দিনে তোর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয় ? ”মৌমিতা চোখে-মুখে সহসা ভয়ের ছাপ দেখা গেল। মুখে কিছু বলল না সে। মনিরা এ সুযোগে তাকে আরও নরম ভাষায় খানিকক্ষণ বোঝাল।
আর মিনিট দশেক পর তাকে খুশি করে দিয়ে মৌমিতা রাজি হয়ে গেল সে নারীর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে।__________________
জেরিনের বিস্ময়ের রেশ এখনও কাটেনি। সে ভাবতে পারেনি যে, তার মুখে এতগুলো কথা শুনেও একটি মেয়ে উল্টো এসে ক্ষমা চাইবে। হ্যাঁ, মেয়েটিই এসে যেচে পড়ে তার সাথে তর্ক করেছে অবশ্যই, কিন্তু তার কথাগুলোর বিপরীতে সে-ও শুরু থেকে অপমানজনক অনেক কিছু শুনিয়ে দিয়েছে তাকে। এমন তর্ক অনেকের সাথেই তার হয়েছে ; সাধারণ পোশাক পরা মানুষ থেকে শুরু করে দুয়েকজন বোরকা পরা মানুষের সাথেও। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ এসে ক্ষমা চায়নি তার কাছে। সেসব মানুষের কারও কারও সাথে জেরিন নিজেও আগ বাড়িয়ে তর্কে জড়িয়েছিল। কিন্তু না কেউ তার কাছে ক্ষমা চেয়েছে এ পর্যন্ত, না চেয়েছে সে কারও কাছে।
তাই আজকের এ ঘটনায় সে ভীষণ রকম অবাক যে হবে, এতে বিস্ময়ের কিছু ছিল না।
কতই বা হবে মেয়েটির বয়স ? তার মৃত বোনটা বেঁচে থাকলে হয়তো এই মেয়েটির মতোই হতো। অরিন, তার মিষ্টি বোনটা !
মাম্মা-বাবাইয়ের শেষ বারের মতো হওয়া ঝগড়ার মাঝে থামাতে গিয়ে ওর পড়ে যাওয়া, মাম্মার ওকে খেয়াল না করেই বাবাইয়ের উদ্দেশ্যে ছুরি ছুড়ে মারা, সেটা গিয়ে ওর গলায় বিঁধে যাওয়া আর তারপর ওর করুণতম মৃত্যু….
বাবাই আর মাম্মার জেল… ,তার ভেঙে পড়া পরিবারের এক সদস্য বনে যাওয়া, আত্মীয়স্বজনের তীব্র অবজ্ঞা, সবশেষে তার মাদকাসক্ত হয়ে যাওয়া — সব একে একে মনে পড়তে লাগল জেরিনের। তার জীবনে শেষ ক’টা বছর যে একজন সহমর্মির বড়ো অভাব ছিল… , ভীষণ অভাব….
বহুদিন বাদে তাই একজনের নম্র কণ্ঠের ক্ষমাপ্রার্থনা চোখ ভিজিয়ে দিল তার।5 Comments
Friends
Md Shakhawat Hossen
@mdshakhawathossen
FAM Farhad
@fmfarhad71gmail-com
মোবারক হোসেন
@mobarakhossain
area info
@areainfo
উত্তম কুমার
@uttamkumarpaul75
গোলাম ফারুক অভি
@enterprisesikder45gmail-com
02101988
@sahedahmed
মো: আমিরবিন আনোয়ার
@writeramir
শেখ মিজানুর রহমান
@sheikhmizanurrahman66gmail-com


সংলাপগুলো এত স্বাভাবিক আর জীবন্ত লেগেছে, মনে হচ্ছিল সত্যিকারের একটা ঘটনা দেখছি। চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্ব খুব যত্ন নিয়ে আঁকা হয়েছে। খুব ভালো লাগলো!