Profile Photo

সঞ্জিত তির্কী কাব‍্যিকOffline

  • SonjitTirkyPronob
  • ৬ষ্ঠ পর্ব ( আমরা আদিবাসী )
    আদিবাসীদের বিবাহ
    সঞ্জিত তির্কী প্রণব
    বিবাহ হলো ওরাঁও জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান।বিবাহ অনুষ্ঠানের মাধ‍্যমে তারা রীতি রেওয়াজ পালন করে।পরিবার হলো ওরাঁও জাতির হইলোক ও পরলোকের যৌথ বন্ধন।গোত্র প্রর্থা হচ্ছে তাদের পরজীবনের অধিকার।বিবাহের মাধ‍্যমে মেয়েরা ছেলেদের গোত্রে প্রবেশ করে।বর্তমান জীবনে কেবল সন্তান জন্ম কর্ম,ধর্মপালন,ধনসম্পদ এবং নাতা গোতা জোড়াটা কেবল দেখা যায়।কিন্তু মূলে আপন কূল আর ভাবি সন্তানদের ঐক‍্য প্রকাশ করে।এজন‍্য তারা পূর্ব পুরুষের জন‍্য কিছু ভাত ও জল থালার বাইরে মাটিতে রাখে।পিতা-মাতা আপন ছেলে-মেয়ের বিবাহ বন্ধনে বেঁধে দিয়ে ভগবানের নিকট তাদের দায়িত্ব সমাপ্ত বুঝে।তারা সবসময় সর্তক থাকে যে তারা জীবিত থাকা অবস্থা যেন ধার্মেস এর নিকট তাদের ছেলে মেয়েকে নিয়োজিত করতে পারে।তারা বিশ্বাস করে তবেই তারা পাপের মুক্তি পাবে।ওরাঁওদের কাছে পরিবার হলো ধার্মেস এর পূজা-অর্চনা করার একমাত্র মন্দির।
    পাত্রি খোঁজা ঃ বিবাহ হলো পবিত্র শুভকাজ। ওরাঁওরা বিশ্বাস করে এটা ধার্মেস দ্বারা নির্ধারণ হয়।পাত্রি খোঁজার আগে ওরাঁওরা তাদের ধার্মেসকে স্মরণ করে নেয়।পাত্রি খোঁজার জন‍্য ধার্মেস এর কাছে প্রার্থনা করে।পাত্রি খোঁজার জন‍্য ছেলের পিতা দুহাতের অঙ্গুল দিয়ে একটি আমের আঁঠি উপরে দিকে টিপে দেয়।আমের আঁঠি যে দিক পড়ে সেই দিক পাত্রি খোঁজতে বেরিয়ে পড়ে।কিন্তু বর্তমান যুগে আর এই প্রথা দেখা যায় না।সবার সাথে অবাধ মেলামেশার ফলে বাবা মার আগেই জীবন সঙ্গীনি বাছাই করে রাখে।বাবা মার কথা আর কার্যকর হয় না।স্বগোত্রের এবং রক্তের সম্পর্কিত আত্মীয়ের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ থাকলেও তাদের মধ‍্যে বিয়ের প্রবণতা বাড়ছে।ফলে নবীন ও প্রবীণদের মধ‍্যে বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে।
    নিমন্ত্রণ ঃ ছেলে মেয়েদের পিতা মাতা আপন আত্মীয় স্বজন এবং সবাইকে নিমন্ত্রণ দেওয়ার জন‍্য চাউলে হলুদ মাখায়।নিমন্ত্রণ দেওয়ার আগে তারা ধার্মেসকে স্মরণ করে এবং প্রার্থনা করে যেন বিবাহ অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারে।উঠানে এক জায়গায় গোবর লেপন দিয়ে ধূপবাতি জ্বালায়।হলুদ মাখা চাউল সেখানে ছিটিয়ে তারা প্রার্থনা করে। হে আমার পিতৃপুরুষগণ আজ আমি আমার ছেলে/মেয়ে কে বিবাহ দিতে যাচ্ছি,সেজন‍্য সবাইকে নিমন্ত্রণ করছি।ছোট বড় সবাইকে,জাত কুটুম,বৌ,বেটি জামায় আর গ্রামের যারা অন‍্যের পিড়ালিতে থাকে সেই অসহায়দের নিমন্ত্রণ করছি।আমার ভুল ভ্রান্তি থাকলে ক্ষমা করো।সবাই বিয়েতে আমোদ প্রমোদ করুক উৎসবে দুঃখ দিও না। হে ধার্মেস তুমি আমাদের আর্শীবাদ করিও।প্রার্থনা পর নিজে অথবা কাউকে দিয়ে হলুদ মাখানো চাউল দিয়ে প্রত‍্যক গ্রামে নিমন্ত্রণ করে।যে পরিবারকে হলুদ মাখানো চাউল দিবে তারাই নিমন্ত্রিত।ব‍্যর্তমান অনেকেই কার্ড ছাপানো পত্র দ্বারাও নিমন্ত্রণ দেয় তবে তাতেও হলুদ রং দিয়ে নেয়।
    বরযাত্রীদের বরণ ঃ ওরাঁওরা কাঁড়শা ভান্ডা করে বরযাত্রীদের বরণ করে নেয়। কাঁড়শা ভান্ডা হলো মাটির একটা ছোট পাতিল।ভান্ডার গোলায় ধানের শিস দিয়ে সুসজ্জিত করে রাখে।ভিতরে আতব চাউল তিনটি কাঁচা হলুদ দেয়।ভান্ডার মুখ ঢাকনি দিয়ে বন্ধ করে তার উপরে চারটা মাটির প্রদীপ জ্বলায়।কাঁড়শা ভান্ডা হলো মিলনকেন্দ্র অর নবদম্পতির আর্শীবাদের প্রতীক।বরযাত্রীরা এক জায়গায়িলন হবার পর কাঁড়শা ভান্ডা তিনবার ঠেকায়।তারপর কাঁড়শা নাচ করে এবং হলুদ জল আমপাতা দিয়ে ছিটিয়ে বরযাত্রীদের বরণ করে নেয়।বিবাহ উৎসব ছাড়াও ওরাঁওরা সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্টানে কাঁড়শা ভান্ডা ব‍্যবহার করে থাকে।
    বিবাহ অনুষ্ঠান ঃ বরকে কাঁড়শা ভান্ডা দিয়ে বরণ করার পর কন‍্যা পক্ষ বরকে ঘাড়ে বহন করে,আগে থেকেই কনে,তার দাদি,নানি বা বড় বৌদিরা অপেক্ষায় থাকে সেই ঘরে নিয়ে আসে।ঘরের মেজেতে আগে থেকেই হলুদ বাটা,পাথর আর জোয়াল সাজানো থাকে তার উপর ফরকে দাঁড় করায়।বর কনের পিছন থেকে নিজ পায়ের বুড়ি আঙ্গুল দিয়ে কনের পায়ের গোড়ালি চেপে ধরে এবং সেই মূহুর্তেই কনের সিঁথিতে সিন্দুর দেয়।কিন্তু বর্তমান ওরাঁও সমাজে এ নিয়ম আর তেমন দেখা যায় না।
    সাভা অনুষ্ঠান ঃ বিয়ের পর বর কনে মাড়োয়ার নিচে বর কনেকে তেল মাখানো হয়।তেল মাখানো শেষ হলেই বর কনেকে পূর্বদিক করে বসানো হল।তার পর শুরু হয় চুমান।গ্রামবাসী তাদের সামর্থ‍্য অনুযায়ী টাকা, থালা ,বাটি, কাপড়, ঘড়ি,রেডিও ইত‍্যাদি দান চুমান দেয়।গ্রাম বাসীদের জন‍্য খাবারের ব‍্যবস্থা করা হয়।বিবাহ অনুষ্ঠানে মদ পরিবেশন করে আর বিয়ের বিভিন্ন ধরনের তাদের ভাষায় গান ও নাচ করে।ওরাঁওরা ঝুমুর নাচে ভীষণ দক্ষ।বিবাহ অনুষ্ঠান বাদেও তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ঝুমুর গান গায় ও নাচে।

    8
    6 Comments
Skip to toolbar