Profile Photo

শাহাদাতুর রহমান সোহেলOffline

  • sr.sohel
  • ব্যঙ্গরসে সৃজনশীলতার দ্বন্দ্ব—আবিদ আনোয়ারের “কোলাব্যাঙের কবি-ভাব” কবিতার সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
    – শাহাদাতুর রহমান সোহেল

    বর্তমান বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি আবিদ আনোয়ারের “কোলাব্যাঙের কবি-ভাব” কবিতাটি নিচে দেওয়া হলো:

    কোলাব্যাঙের সর্দি হলো দু’দিন ভিজে বৃষ্টিতে,
    ছাতায় ছিলো ফুটো-ফাটা, ভুল করেছে সৃৃষ্টিতে।
    গিন্নি বলে: ভুল হবে না করলে এতো ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ?
    গান গেয়েছিস কাজের ফাঁকে, তুই তো বোকার হদ্দ ব্যাঙ!
    ঘাট হয়েছে ঘর করি যে, হতো যদি অন্য কেউ
    চলেই যেতো বাপের বাড়ি, ফিরতো না সে কিচ্ছুতেও।
    ও মা, এ কী! টেম্পারেচার উঠে গেছে একশ’ চার–
    দিতেই হবে জলপট্টি, তাপ বেড়েছে কপালটার।
    ব্যাঙের মুখে জবাব সোজা: জাগলে মনে কবি-ভাব
    গান গাবো না-করবোটা কী? সকল কবির এই স্বভাব!
    ভালোবাসার গালি খেয়ে হই না মোটে সুখহারা–
    হাজার কবি সর্বদা খায় আপন বউয়ের মুখনাড়া।

    ভূমিকা
    আধুনিক বাংলা কবিতায় ব্যঙ্গরস একটি শক্তিশালী প্রকাশভঙ্গি । কবি আবিদ আনোয়ার এর “কোলাব্যাঙের কবি-ভাব” কবিতাটি একটি বাহ্যতঃ সরল ছড়ার ভেতর দিয়ে এক জটিল সামাজিক ও মানসিক বাস্তবতাকে হাস্যরসের মাধ্যমে অন্বেষণ করেছে। কোলাব্যাঙ, একজন সৃজনশীল মানুষের প্রতীক, যার কবিত্ববোধ তার ঘরোয়া ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। এই প্রবন্ধে আলোচ্য কবিতাটির ব্যঙ্গচেতনার পেছনের সমাজ-মনস্তত্ত্ব ও কবির সাংস্কৃতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করা হবে।

    কোলাব্যাঙ: একটি প্রতীকী কবিচরিত্র
    কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র “কোলাব্যাঙ” বাস্তব জীবনের একজন মধ্যবিত্ত কবির রূপক। বৃষ্টিতে ভিজে ঠান্ডা লাগা, ফুটো ছাতা, স্ত্রীর বকুনি ইত্যাদি ঘটনার পেছনে রয়েছে গভীর প্রতীকী ব্যঞ্জনা। এখানে ব্যাঙ হলো সেই শিল্পমনস্ক মানুষ, যে বাস্তবের চেয়ে কল্পনা ও আবেগের জগতে বেশি সময় কাটায়। তার ঠান্ডা লাগার কারণ যেমন প্রকৃতি (বৃষ্টি), তেমনি তার নিজস্ব উদাসীনতাও—“গান গেয়েছিস কাজের ফাঁকে”—এই বাক্যে বোঝা যায়, সে দায়িত্বের চেয়ে অনুপ্রেরণায় বেশি মগ্ন।

    সৃজনশীলতা বনাম বাস্তবতা: দ্বন্দ্বের চিত্রায়ন
    ব্যাঙের স্ত্রী একজন বাস্তববাদী চরিত্র, যে ঘর-সংসার রক্ষায় ব্যস্ত। তার চোখে কবিত্ব যেন একটি অসুখ। “তুই তো বোকার হদ্দ ব্যাঙ!”—এটি কেবল ব্যঙ্গ নয়, বরং সমাজের সেই চিরন্তন দৃষ্টিভঙ্গি, যা কাব্যিক সৃজনশীলতাকে অব্যবহারিক ও বোকার কাজ হিসেবে বিবেচনা করে। এখানে পারিবারিক জীবনের সঙ্গে কবির সংবেদনশীল আত্মা এক ধরনের সংঘাতে লিপ্ত, যাকে আমরা পুঁজিবাদী সমাজে ‘অপ্রয়োজনীয়’ ও ‘অদ্ভুত’ হিসাবে গণ্য করি।

    মানসিক বাস্তবতা ও সাংসারিক অসামঞ্জস্য
    ব্যাঙের অসুখ—উচ্চ তাপমাত্রা, কপালে জলপট্টি—এ সবই রূপক হিসেবে পাঠ করা যায়। এটি শিল্পীর ভেতরের আবেগাত্মক দহন ও মানসিক ক্লান্তির প্রতীক। সে কোনো বড় অর্জনের আশায় নয়, বরং নিজের ‘কবি-ভাব’ বজায় রাখার চেষ্টায় অটল:
    “জাগলে মনে কবি-ভাব / গান গাবো না করবোটা কী?”
    এখানে কবি আত্মপক্ষ সমর্থন করেন, দেখান যে সৃজনশীলতা তার নিয়তির অংশ। এই পঙক্তিগুলো ব্যক্তি স্বাধীনতা, শিল্পীর অবিচ্ছিন্ন অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিরুদ্ধে এক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান।

    ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সামাজিক ব্যঙ্গ
    কবিতার শেষ দুই লাইন—
    “ভালোবাসার গালি খেয়ে হই না মোটে সুখহারা—
    হাজার কবি সর্বদা খায় আপন বউয়ের মুখনাড়া।”
    —এখানে একটি কৌতুকপূর্ণ সার্বজনীন বাস্তবতাকে তুলে ধরা হয়েছে। কবি স্বীকার করছেন, প্রেম বা সংসারে তিনি স্ত্রীর রাগ-রোষের শিকার হলেও এটি কবির ভাগ্য, এমনকি ভালোবাসার রূপ। এটি কেবল একটি কৌতুক নয়—এটি একটি পর্যালোচনা, যা মধ্যবিত্ত দাম্পত্যজীবনের দৈনন্দিন ব্যঞ্জনা এবং তাতে সৃজনশীল ব্যক্তির অবস্থানকে প্রকাশ করে।

    উপসংহার
    “কোলাব্যাঙের কবি-ভাব” কবিতাটি একটি ক্ষুদ্র অথচ গভীর সাহিত্যকর্ম, যা ব্যঙ্গরসের আবরণে সৃজনশীলতার বিরুদ্ধ বাস্তবতাকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করে। আবিদ আনোয়ার এই কবিতার মাধ্যমে কবির সামাজিক নিঃস্বতা, সংসারের চাপ ও মানসিক বিচ্ছিন্নতাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যা বাংলা সাহিত্যে ব্যতিক্রমী। এই কবিতার মূলে রয়েছে কবি ও সমাজের সম্পর্ক, যা বর্তমান সমাজ পরিবেশে সব সময় সমানভাবে প্রাসঙ্গিক থাকবে।

    6
    5 Comments
Skip to toolbar