Profile Photo

Md. Tariqul IslamOffline

  • tariqulmasum
  • Profile picture of Md. Tariqul Islam

    Md. Tariqul Islam

    3 years, 8 months ago

    মেঘের দেশে একদিন
    দিনটি ছিল ০৩/১০/২০১৫ ইং

    কুরবানীর ঈদের সপ্তাহ খানেক পর, ট্যুর এ যাওয়া হবে পাহাড়ী দেশে, সুযোগ হাতছাড়া করলাম না ৷ তখন পড়তাম ঢাকার সরকারি বিজ্ঞান কলেজে ৷ থাকতাম ফার্মগেটের পূর্ব রাজা বাজার একটি মেসে ৷
    মেঘের দেশ সাজেকে গিয়েছিলাম চার বছর আগে ৷ সময়টি ছিল ২০১৫ ইং সালের অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ ৷ মেঘের দেশ সাজেক রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন সাজেক ইউনিয়নের একটি প্রধান পর্যটন কেন্দ্র ৷

    এটি রাঙ্গামাটি জেলার সর্বউত্তরের আর ভারতের দক্ষিণ পশ্চিমের সীমান্ত ঘেষে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর একটি উঁচু উপত্যকা ৷ যার ভিতর দিয়ে লুসাই নদী প্রবাহিত ৷ সাজেকের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য আর পূর্বে ভারতের মিজোরাম রাজ্য ৷ বর্তমানে পর্যটকদের কাছে অন্যতম জনপ্রিয় ভ্রমণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এই সাজেক ভ্যালি ৷
    আমাদের ট্যুরটি ছিল রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় ৷ আমরা ছিলাম প্রায় আশিজন ৷ ঢাবি, বুয়েট আর সরকারী বিজ্ঞান কলেজের ছাত্র ছিলাম সবাই ৷ অক্টোবরের এক তারিখ রাত দশটায় শ্যামলী পরিবহনের দুটি বাসে করে রওয়ানা হলাম ৷ পরেরদিন সকালে ৭টার দিকে আমরা পৌঁছাই খাগড়াছড়ি শহরে৷ সকালের নাস্তা সেরে উঠলাম চাঁদের গাড়িতে (কেউবা বলে চান্দের গাড়ি) ৷ প্রথমদিনের লক্ষ্য ছিল বিকালের মধ্যে সাজেক পৌঁছানো ৷

    মেঘের দেশ সাজেক রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও রাঙ্গামাটি শহর থেকে দুরত্ব প্রায় ১৩০কিমি আর খাগড়াছড়ি থেকে প্রায় ৭০ কিমি ৷ তাই সাজেক যেতে হলে খাগড়াছড়ি শহর থেকে যাওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক ৷ যাইহোক, এই ৭০কিমি এর মধ্যবর্তী স্থান বাঘাইছড়ি ৷ শহর থেকে ৩৫ কিমি, আর বাঘাইছড়ি থেকে সাজেক ৩৫ কিমি (সেনাবাহিনীর অধীনে নির্মিত) ৷ বাস বা পরিবহণে করে দীঘিনালা পর্যন্ত সরাসরি যাওয়া যায় এবং দীঘিনালা থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৪৯ কিলোমিটার। আর রাঙামাটি থেকে নৌপথে কাপ্তাই হয়ে এসে অনেক পথ হেঁটে সাজেক যাওয়া যায়।

    সাজেক রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও এর যাতায়াত সুবিধা খাগড়াছড়ি থেকে ৷ খাগড়াছড়ি শহর অথবা দীঘিনালা হতে স্থানীয় গাড়িতে (জিপ গাড়ি, সি.এন.জি , মটরসাইকেল) করে সাজেকে যাওয়াই হচ্ছে বর্তমানে সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় মাধ্যম । এক্ষেত্রে পথে পড়বে বাঘাইহাট পুলিশ ও আর্মি ক্যাম্প। সেখান থেকে ভ্রমণরত সদস্যদের তথ্য দিয়ে সাজেক যাবার মূল অনুমতি নিতে হবে । একে আর্মি এসকর্ট বলা হয় । আর্মিগণের পক্ষ থেকে গাড়িবহর দ্বারা পর্যটকদের গাড়িগুলোকে নিরাপত্তার সাথে সাজেক পৌঁছে দেয়া হয় । দিনের দুইটি নির্দিষ্ট সময় (সকাল ১০:৩০ এবং বিকাল ৩:৩০) ব্যতীত আর্মি ক্যাম্পের পক্ষ হতে সাজেক যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না । পর্যটকদের সর্বাধিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই এই নিয়ম অনুসরণ করা হয় । সাজেকগামী জিপ গাড়িগুলো স্থানীয়ভাবে চান্দের গাড়ি নামে পরিচিত । সাজেক যাওয়ার পথে বাঘাইহাটে হাজাছড়া ঝর্ণা অবস্থিত । অনেক পর্যটকগণ মূল রাস্তা হতে সামান্য ট্রেকিং করে গিয়ে ঝর্ণাটির সৌন্দর্য উপভোগ করে থাকেন ৷

    সাজেকগামী উঁচুনিচু পাহাড়ের বুক চিড়ে এই আঁকাবাঁকা রাস্তাগুলি ঠাঁই করে নিয়েছে ৷ পথে পড়বে তিনটি ঝর্ণা আর আলুটিলার গুহা ৷ আমরা হাজাছড়া ঝর্ণা, রিসাং ঝর্ণা ও দ্বৈতছড়া ঝর্ণাগুলিতে গেলাম৷ দ্বৈতছড়া ঝর্ণার পথটা অনেক সরু আর পথে একটি বিশাল বটবৃক্ষ পড়বে ৷ এসবগূলি দেখতে দেখতে এগোতে থাকলাম সাজেক ভ্যালীর দিকে ৷ আমরা সাজেক পৌঁছাই দুই অক্টোবর বিকাল চারটায় ৷ দুপুরের খাবারের কথা না বললেই নয় , উপজাতিদের রেস্তোরা ৷ ছিল ভাতের সাথে মুরগীর মাংস, ডিম ভাজা, ডাউল আর বাশঁ ভাজি (কচি বাশেঁর কোড়ল) ৷ খাবারের মূল্য ১০০ – ২০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল ৷

    রাতে থাকলাম কাঠনির্মিত ঘরে৷ বর্তমানে অনেক আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে ৷ আছে সৌন্দর্যমন্ডিত কটেজ৷ উল্লেখযোগ্য রিসোর্টগুলির মধ্যে রয়েছে প্যারাডাইজ সাজেক, মেঘপুন্ঞ্জি রিসোর্ট, রয়েল রিসোর্ট, মেঘ বালিকা রিসোর্ট, মেঘ কাব্য রিসোর্ট, শিন্ঞ্জন রিসোর্ট, সিনারী হোটেল প্রভৃতি ৷ আর সেনাবাহিনী পরিচালিত একমাত্র রিসোর্ট রুণময় রিসোর্ট, এখানে থাকতে হলে প্রথম শ্রেণির সরকারি অফিসার কর্তৃক রিকমান্ডেড হয়ে আসতে হয়৷ভাড়া পড়বে রুমপ্রতি ৫০০০ – ৭০০০ টাকা, যেখানে প্রতি রুমে ৪জন থাকা যায় ৷ আর সিঙ্গেল রুমে দুই জন করে থাকা যায়, ভাড়া পড়বে ৩০০০ – ৪০০০টাকা ৷ তবে অফ সিজনে ৩০% ছাড় পাওয়া যায় ৷ সাজেকে প্রধানত লুসাই, পাংখোয়া, ত্রিপুরা আদিবাসীরা বসবাস করে ৷ এখানকার কলা ও কমলা বিখ্যাত, পাহাড়ে ভ্রমণে এগুলো অত্যাবশ্যকীয় খাবার হিসেবে সুপরিচিত ৷

    সাজেকের আবাসিক রোডের পাশে একটি গির্জা রয়েছে, অধিকাংশ খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী হওয়ায় এখানে নানাবিধ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান করা হয়৷বিদ্যুতের সুব্যবস্থা না থাকায় সোলার পদ্ধতিতে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয় ৷ পানির উৎস হিসেবে ঝর্ণাই প্রধান, ঝর্ণা থেকে পানি সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়া হয় ৷ আর যোগাযোগের জন্য রবি ও টেলিটক মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে হয়, অন্য কোন অপারেটর এখানে নেটওয়ার্ক পায় না ৷

    পরের দিন সকালে আমি একটূ তাড়াতাড়িই ঘুম থেকে উঠেছিলাম ৷ একাকী হাটতে লাগলাম সাজেক আর্মি ক্যাম্পের দিকে ৷ মসজিদে ঢুকলাম ফজর নামাজের আযানের সাথে সাথে ৷ এটি রাঙ্গামাটির সর্ব উত্তরের সর্বশেষ আর্মি ক্যাম্প ও মসজিদ ৷ মসজিদে উপস্থিত ছিলেন ইমাম, ক্যাম্প কমান্ডার মেজর (মুয়াজ্জিন)৷ অনেক বিষয়ে উনাদের সাথে আলাপ হলো ৷ জানালেন পাহাড়ের অনেক ইতিহাস আর পাহাড়ী মানুষদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে ৷ আমার কাছে ছিল লাল রঙের গামছা, গলায় ঝুলিয়ে রাখা যেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দীকি বীর উত্তম সাহেবের পার্টির লোক ৷ মেজর সাহেব একখানা টূপি আমার মাথায় পড়িয়ে গামছা দিয়ে পাগড়ী বাধার মত বেধে দিলেন ৷ অবশ্য এতক্ষনে অনেক সৈন্য মসজিদে প্রবেশ করেছেন, অতপর জামাতের সহিত নামাজ শেষ করে আবার আলাপ হলো ইমাম আর ক্যাম্পের এক সেনা সদস্যের সাথে ৷

    সাজেকের অধিকাংশ রিসোর্টগুলো রুইলুই পাড়ায়, এই পাড়ার গোড়াপত্তন হয় ১৮৮৫ সালে ৷ অপর পাড়াটি কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় কংলাক পাড়া ৷ সকাল সাতটার দিকে সবাই ভ্যালীর হ্যালি প্যাডে এসে পৌঁছালো ৷ ভ্যালীর হেলিপ্যাড থেকে নিচের দিকে তাকালে শুধু মেঘই চোখে পড়বে ৷ এখানে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত দুটি হ্যালি প্যাড রয়েছে ৷ ঘন্টা খানিক পর আমরা রওয়ানা হলাম ক্যাম্প থেকে উত্তর পশ্চিমে প্রায় তিন কিমি দূরে দূর্গম পথ পেরিয়ে কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় ৷ যার উচ্চতা সমতল থেকে প্রায় ১৮০০ ফুট এবং সাজেক ভ্যালীর রুইলুই পাড়ার উচ্চতা প্রায় ১৭২০ ফুট ৷ কংলাক পাহাড়ের পথটা আঁকা বাঁকা রাস্তা হওয়ায় নিশানা হিসেবে লাল নিশানাধারী দুজনকে সামনে থাকার সিদ্ধান্ত হল৷ তার একজন আমার সবিক এর বড়ভাই লাল পান্জাবী পরিহিত পটুয়াখালীর দশমিনার সুবক্তা জনাব মোঃ শরফুদ্দিন ভাই , ঢাবি (ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান), অন্যজন ছিলাম গলায় লালগামছা ঝুলানো আমি ৷

    মেঠোপথ পেরিয়ে সাজেক ভ্যালি থেকে কংলাক পাহাড়ে যেতে সময় লাগত এক থেকে দেড় ঘন্টা, আর্মিদের লাগত ৪০-৫০মিনিট ৷ বর্তমানে সাজেক ভ্যালী থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তা পাকা করা হয়েছে ৷ বাকী আরও প্রায় আধা কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেটে পৌঁছাতে হয় কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় ৷
    পাহাড়ের চূড়ান্ত শেষপ্রান্তে পাথরের ভাঁজ বেয়ে উপরে উঠতে হয় ৷ সেখানে প্রায় চল্লিশটি পরিবারের শতাধিক মানুষের বাস ছিল ৷ বর্তমানে অর্ধ শতাধিক পরিবারের বাস সেখানে ৷ কংলাক পাড়ায় তাদের একজন গোত্র প্রধান বা হেডম্যান আছে, যাকে সবাই সম্মান করে এবং সব ক্ষেত্রে তার নির্দেশ মেনে চলে ৷ তবে আশ্চর্যের বিষয় মাত্র কয়েক বছর আগে নাকি এটি আবিষ্কার হয়েছে ৷ পুরোপুরি সভ্যতা পায়নি, কিছুটা শিখছে আর্মিদের মাধ্যমে ৷ আমার নিকট আরও বেশি আশ্চর্যের বিষয় ছিল পাথরে খোদাই করা এক খ্রিস্টান মিশনারীজের কবরের চিহ্ন আর ইটনির্মিত পুরনো একটি প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্রের ধ্বংসস্তুপ! হ্যাঁ, ঐ জায়গা থেকে আর একটু দুরে একটি ঘন জঙ্গল, ঐখানকার অধিবাসীরা তখনো সভ্যতার আওতায় আসেনি, ভাষা বোঝেনা , কাউকে দেখলে আক্রমণ করতে আসে ৷ তাই জনসাধারনের যাওয়া বারণ ৷ আর্মিরা প্রোটেক্টেড হয়ে যান ঐ জঙ্গলে ৷

    বেলা নয়টার দিকে আমরা ছিলাম কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় ৷ যেখান থেকে উত্তরে তাকালে মেঘ ছাড়া কিছুই পড়ে না চোখে ৷ নিচের দিকে তাকালে মনে হবে হয়তো সাগর প্রবাহিত হচ্ছে ৷ যতদূর চোখ যাবে মনে হবে সাগরের জলরাশি ৷ আসলে এগুলো মেঘপুন্ঞ্জি ৷ সেজন্যই বলা হয় মেঘের দেশ সাজেক ৷
    পাহাড়ের চূড়াতেই ক্যামেরা বন্দি হয়েছিলাম সেদিন বড়ভাই বিএমবি মামুনুর রহমানের সাথে ….
    আজ আর নয়… কাপ্তাই লেক ভ্রমন আর ফেরার গল্প আগামীর হয়ে থাকুক…
    Published title: “মেঘের দেশ সাজেক ” ভ্রমণের স্মৃতিকথা

    3
    1 Comment
    • সাজেকের কংলাক পাহাড়ের চুড়ায় খানিক বুক ভরে নিলাম… অনেক কৃতজ্ঞতা সুন্দর ও সাবলীলভাবে সাজেকের রূপের এমন বর্ণনা দেয়ার জন্যে এবং অবশ্যই অবশ্যই পর্যটক-বন্ধুদের কথা মাথায় রেখে সাজেকে যাবার, থাকার এবং ঘোরার প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গগুলো আলোচনার জন্যে… শুভ কামনা ও প্রীতিমুগ্ধতা প্রিয়…

Skip to toolbar