Profile Photo

Vision 2020Offline

  • vision2020
  • Profile picture of Vision 2020

    Vision 2020

    • 1 month, 2 weeks ago

    রম্যগল্প:
    সিংহ বাবু ও তোতা পাখি
    মামুন সরকার

    আমাদের গ্রামের ক্ষিতীশ বাবুর আসল নাম ছিল ক্ষিতীশ চন্দ্র বর্মণ। কিন্তু ওনার বাবা শখ করে ওনার ডাকনাম রেখেছিলেন ‘সিংহ’। এই একটা নামই ওনার জীবনের সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নামের সাথে গুণের বিন্দুমাত্র মিল ছিল না। ক্ষিতীশ বাবু মানুষটা ছিলেন রোগাপটকা।দুই হাত উঁচিয়ে একটা মশা মারতেও ওনার তিনবার হাঁপাতে হতো। আর স্বভাবের দিক থেকে উনি ছিলেন পরম শান্তিপ্রিয়। অর্থাৎ যাকে বলে ঘোরতর ভীরু। অথচ নামের কারণে সবাই ওনাকে নিয়ে সারাক্ষণ ঠাট্টা-তামাশা করত। বাজারে গেলে বন্ধুরা বলত, কী রে সিংহ! আজ খাঁচা থেকে বের হলে কখন? মাংস নাকি স্রেফ পুঁইশাক দিয়ে ভাত খেলে?

    ক্ষিতীশ বাবু এসবে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। ওনার একমাত্র শখের জায়গা ছিল ওনার বসার ঘরের বারান্দায় ঝোলানো একটা সুন্দর খাঁচা। আর তার ভেতরের এক জ্যান্ত তোতাপাখি। পাখিটার নাম উনি রেখেছিলেন ‘পণ্ডিত’। ক্ষিতীশ বাবু সারাদিন বাজারে লোকজনের কথা আর ঠাট্টা শুনে বাড়ি ফিরে বারান্দায় আরাম কেদারায় বসতেন। তারপর তোতাপাখিটার সাথে সুখ-দুঃখের গল্প করতেন।

    সেদিন ছিল চৈত্রের এক গুমোট বিকেল। ক্ষিতীশ বাবু বারান্দায় বসে পাখিটাকে ছোলা খাওয়াচ্ছিলেন আর আফসোস করে বলছিলেন, বুঝলি পণ্ডিত, মানুষের জীবনটা বড় অদ্ভুত। নামেই শুধু মানুষ স্বাধীন। আসলে আমরা সবাই এক একটা খাঁচায় বন্দি। তোকে আমি লোহার খাঁচায় আটকে রেখেছি। আর সমাজ আমাকে নামের খাঁচায়, নিয়মের খাঁচায় আটকে রেখেছে। আমার নাম সিংহ হলেও আমি একটা বিড়ালের চেয়েও নিরীহ!

    ঠিক তখনই ঘটল এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড। তোতাপাখিটা ছোলাটা গিলে নিয়ে মাথাটা একটু বাঁকিয়ে, মানুষের মতো স্পষ্ট গলায় বলে উঠল, ঠিক বলেছ সিংহ বাবু! তোমরা মানুষরা আসলে বড্ড বোকা।

    ক্ষিতীশ বাবু চমকে উঠে চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়ার দশা। উনি চোখ বড় বড় করে বললেন, অ্যাঁ! পণ্ডিত! তুই মানুষের মতো কথা বলছিস? তুই তো শুধু ‘রাধা-কৃষ্ণ’ আর ‘ভাত খামু’ বলতে পারতিস!

    পণ্ডিত খাঁচার ডালটায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে ডানা ঝাপটে বলল, আরে ওগুলো তো তোমাদের দেখানোর জন্য বলতাম। আসলে তোমাদের মানুষের জীবন আর আমাদের পশুপাখির জীবনের তুলনা করলে দেখা যাবে, তোমরাই বেশি খাঁচায় বন্দি। এই যে তোমার নাম সিংহ, অথচ তুমি সারাজীবন চোর-পুলিশের মতো পালিয়ে বেড়াও কেন? কারণ তুমি নিজেকে নামের ডালপালায় আটকে রেখেছ।

    ক্ষিতীশ বাবু অবাক হয়ে পাখিটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। পণ্ডিত বলতে লাগল, তোমাদের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী জানো? তোমরা ভেতরে এক রকম, আর বাইরে দেখাও আরেক রকম। বাঘের মতো গর্জন করতে চাও, অথচ ভেতরে ইঁদুরের মতো কাঁপো। ডানা আছে মুক্ত আকাশে ওড়ার—অর্থাৎ বুদ্ধি আর বিবেক আছে বড় কিছু করার, অথচ তোমরা হিংসা, অহংকার আর পরনিন্দার ছোট্ট খাঁচায় নিজেদের স্বেচ্ছায় বন্দি করে রাখো। আমার তো শুধু এই লোহার খাঁচাটা ভাঙলেই আমি মুক্ত, কিন্তু তোমাদের মনের খাঁচা ভাঙবে কে?

    কথাটা ক্ষিতীশ বাবুর বুকে তীরের মতো বিঁধল। উনি ভাবলেন, একটা সামান্য পাখি এত বড় সত্যি কথা বলে দিল!
    উনি পন্ডিতকে বললেন, তাহলে আমি এখন কী করব বল তো?

    তোতা পাখিটা চোখ টিপে বলল, আজকে আমাকে এই খাঁচা থেকে মুক্ত করে দাও। আর তুমিও নিজের ভেতরের ভয়ের খাঁচাটা ভেঙে সত্যি সত্যি সিংহের মতো বুক ফুলিয়ে বাঁচতে শেখো। লোকলজ্জার ভয় আর অন্যের ফালতু কথার খাঁচা থেকে নিজেকে বের করো।

    ক্ষিতীশ বাবুর মাথায় যেন নতুন বুদ্ধির আলো জ্বলে উঠল। উনি আর এক মুহূর্তও দেরি না করে খাঁচার দরজাটা খপ করে খুলে দিলেন। পণ্ডিত ডানা মেলে মুক্ত আকাশে ওড়ার আগে ওনার কাঁধে এসে বসল। ওনার কানে কানে বলল, ধন্যবাদ সিংহ বাবু! আজ থেকে তুমি খাঁচার তোতা নও, খাঁটি সিংহ হলে।

    তারপর ও এক ঝটকায় নীল আকাশে মিলিয়ে গেল। ঠিক তখনই ক্ষিতীশ বাবুর বাড়ির সদর দরজায় ওনার প্রতিবেশী হারু মোড়ল এসে চিল-চিৎকার শুরু করল, ওরে ক্ষিতীশ। তোর পেয়ারা গাছ থেকে আমাদের ছাগলটা দুটো পাতা খেয়েছে বলে তোর বউ ছাগলটাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। বের হ দেখি, আজ তোকে দেখে নেব।

    অন্যদিন হলে ক্ষিতীশ বাবু খাটের নিচে লুকাতেন। কিন্তু আজ ওনার কানে বাজছিল পণ্ডিতের কথা—’মনের খাঁচাটা ভেঙে ফেলো’। ক্ষিতীশ বাবু চট করে নিজের লুঙ্গিটা কাছা মেরে কোমরে বাঁধলেন। তারপর বারান্দা থেকে উঠোনে নেমে একদম সিংহের মতো গমগমে গলায় গর্জন করে উঠলেন, হারু মোড়ল। নিজের ছাগল সামলে রাখো। এরপর যদি ওটা আমার সীমানায় আসে, তবে ছাগলসহ তোমাকেও কিন্তু আমি কোর্টে টেনে নিয়ে যাব। মনে থাকে যেন।

    ক্ষিতীশ বাবুর এই রুদ্রমূর্তি আর সিংহের মতো হুঙ্কার দেখে হারু মোড়ল তো থতমত খেয়ে গেল। সে লাঠি ফেলে এক দৌড়ে নিজের বাড়ির দিকে পালাল।
    জানলা দিয়ে ক্ষিতীশ বাবুর বউ এই কাণ্ড দেখে হাঁ করে চেয়ে রইল। আর ক্ষিতীশ বাবু উঠোনে দাঁড়িয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসলেন। উনি বুঝলেন, লোহার খাঁচা ভাঙা সহজ, কিন্তু জীবনের আসল আনন্দ আর স্বাধীনতা লুকিয়ে আছে নিজের মনের ভেতরের ভয় আর সংকোচের খাঁচাটা ভেঙে ফেলার মধ্যে।
    *****

    4
    8 Comments
    • Vision 2020, গল্পটা পড়ে দারুণ লাগল, বিশেষ করে তোতা পাখির বলা কথাগুলো আমাদের সবার জীবনের জন্য কতটা সত্যি তা ভেবে দেখেছেন কি?

      • অসংখ্য ধন্যবাদ লেখাটি পড়ার জন্য। প্রাণিত হলাম।

    • প্রিয় গল্পকার, গল্পটা পড়ে মন খুলে হাসলাম অনেকক্ষণ! এমন গল্প সেই ছোটবেলায় বার্ষিক পরীক্ষা শেষে, বাসে বসে পড়তে পড়তে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে যেতাম। আমার সেই সুন্দর ছেলেবেলা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য এক আকাশ ভালোবাসা জানাই!

      • আমার গল্পটা আপনার শৈশবকে নাড়া দিতে পেড়েছ এটাই আমার সার্থকতা। ধন্যবাদ নিরন্তর।

    • আসলেই গল্পটা দারুণ মোহনীয় ।

    • আপনার লেখনীতে মনের খাঁচা ভাঙার বিষয়টি অসাধারণ উপমায় ফুটে উঠেছে এবং শেষ মুহূর্তের দৃশ্যটি বেশ প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য হয়েছে। আপনি চাইলে এই গল্পের মূল সুরটিকে আরও সংক্ষেপিত আকারে লিখে দেখতে পারেন, তবে এই রূপেই আপনার উপস্থাপনা চমৎকার।

    • অসাধারণ লেখক ❤️❤️❤️

Skip to toolbar