Photo By: Jr Korpa | Unsplash

‘অনেকে পড়েনি’ থেকে কিছু কবিতা

আইসক্রিম
ডা: শাহজাহান সাজু-কে

আমি যেন ফুটপাথের কিনারায় ফেলে দেওয়া আইসক্রিমের কাপ।
তাতে একটু আইসক্রিম লেগে আছে।
কোনো ভিখারি আঙ্গুল দিয়ে তুলে এনে চেটে চেটে খাচ্ছে।

নদীর পাড়ের নির্জনতা
পার্থ দত্ত-কে

নির্জনতা কিন্তু আমি বড় ভালোবাসি।
হৃদয় মন দিয়ে সর্বসত্তায় অনুভব করি।
মনে হয় নদীর অনেক কথা বলবার আছে-বলেও নিশ্চয়ই।
আমার বড় ইচ্ছে করে যদি নদীর মনের কথা শুনতে পেতাম।
নদীর জলে থাকি কান পেতে, কাঁপে প্রাণ পাতার মর্মরেতে।
নদী কথা কয় ছলাৎ ছলাৎ।
যে-জলধারা কথা কয়, অতীতের আনন্দ কাহন।
মানুষের জীবনের কথা।
বাতাস এসে বলে গেছে কানে,চলে যাও নির্জনে।

সরস্বতী এখন
তানভির রশীদ-কে

রাসেল তোমার সরস্বতী
এখন থাকে ছয়সূতি
রেপিস্ট স্বামীর ঘর।
তোমার বাড়ি সরারচর
আমি বলতাম সচরাচর
তুমি বলতে চরাচর।
রেপিস্ট স্বামীকে কোনো আইন
শান্তি দিতে পারে না
সরস্বতীর বালিশ ভেজা কান্না।

নোট শীট
শামিম মূর্তজা মিঠু-কে

স্বামী নির্যাতিতা এক রমণীর কণ্ঠে
ফোনবাহিত খিলখিল হাসি।

২.
আকাশচুম্বী স্বপ্নের এক পরী
স্বপ্নহীন একদলা মানুষের মাংস নিয়ে
খেলা করে।

৩.
শাড়ি = মশারি।
মশারিটা হঠাৎ ফুলে ওঠে
হাওয়াভরা বেলুনের মতো।
মশারির ভিতর শাড়ির মশমশ শব্দ।

৪.
সকালের রুটি রাতে জেরক্স করে খাওয়ার হালত যার
সে কিনা আইফোন পকেটে রেখে ঘুরল এতদিন।

৫.
আমার তো বন্ধন কিছু নেই।
যখন হোক চলে গেলেই হল।
যাওয়ার সময় না হলে কেউ যায় না।
যাওয়ার সময় হলে ল্যাঠা চুকে যাবে।

৬.
লড়াই হচ্ছে নিজের সঙ্গে
বা হাতের সঙ্গে ডান হাতের
রক্তকণার সঙ্গে রক্তকণার
দ্বন্দ্বে দ্বন্দ্বে লড়াই অহর্নিশ
রেভলিউশন কত দূর?

৭.
শেষের সেদিন ভয়ঙ্কর,শুধু শেষ দিন নয়,
প্রতিটা দিনই এখন ভয়ঙ্কর।
একদিন প্রতিদিন ভয়ঙ্কর দিন।
সূর্যহীন অন্ধকার দিন। কালো সূর্যের দিন।
এখানে আকাশ কালো।

৮.
অনেক যন্ত্রণার পর একটা কবিতার জন্ম হয়।
শোণিত রাঙা পৃথিবীর ওপর
মানুষের প্রেম ও পাশবতার অপুর্ব অভিনয়।

৯.
আলো!
‘আলো’—অন্ধকারকে দূর করাই যার কাজ।
আমার জীবনের সব অন্ধকারকে দূর করে,
আলোতো ফুটে আছে।

চাঁপাফুল
মো. সোহেল রানা-কে

হলুদ শাড়ী পরা চাঁপাফুল।
চাঁপাফুলের আঁচল কাঁপছে খোলা হাওয়ায়।
চাঁপাফুল খুব চাপা স্বভাবের ফুল।
চাঁপাফুল চিরকালের ইন্ট্রোভার্ট।
চুপচাপ, ঠাণ্ডা, কুল।
আমি চাঁপাফুলের গন্ধ নিই, চাঁপাফুলও নেয় আমার গন্ধ।

ডিজিটাল কাকতাড়ুয়া
মারুফ খান-কে

কাকতাড়ুয়াটির পরনে ফাটা জিন্স।
রংচটা জিন্সের উপরে চক্রাবক্রা শার্ট।
শার্টের পকেটে আছে মোবাইল ফোন।
হাতে মাইকের মাথা। সে মাইকে আবার তার নেই।
মাইক্রোফোন সামনেই আছে।
খেতের উপর ডিজিটাল কাকতাড়ুয়া বলছে:
পাখি ওড়,ওড়,পাখি,হুস্,হুস্,হুস্…
ধানের শরীর ছুঁয়ে উড়ে যায় ধানপাখিগুলি।
ধানপাখিগুলি ভেসে যায় সবুজের বন্যায়।

পটভূমি সমুদ্র
মোস্তফা কামাল রনি-কে

সমুদ্র দেখতে একজীবনে এসেছি অনেক। সে অবশ্য সকলেই আসে।
দূর সমুদ্রে ঢেউয়ের ভিতর থেকে মৎস্যজীবীদের নৃত্য ।
চোখ জুড়ে থাকে সীমাহীন অতলান্ত সমুদ্রের সুনীল গভীরতা,
তার মধ্যে জেগে থাকে পৃথিবী।
পৃথিবীর আঁধারে খেলা করে মাছ নৌকা বাড়িঘর জলচর জীব।
হলুদ সি-বিচে বসে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকি।
সমুদ্র আমাকে বলেছিলো—নোনাজল খানিকটা নিয়ে যাও।

ছেঁড়াদ্বীপ
মেঘমল্লার বসু-কে

সমুদ্র… সমুদ্রই বলি,সেই সমুদ্রের মধ্যে একটা দ্বীপ,
আমি সমুদ্রবেষ্টিত একটি দ্বীপ দেখে এলাম। দ্বীপটির নাম ছেঁড়াদ্বীপ।
সেন্টমার্টিনের বাঙালি বউ। আমি বউয়ের পর্যটক।
সমুদ্রের জল যেন কাঁচের, কারণ তার ভিতরটা আমি দেখতে পাচ্ছিলাম,
সেখানে জলতলের নুড়ি, ছোট ছোট পাথর, জলজজীব,
জলঝিনুকের পাপড়ি,প্রাণীভূক উদ্ভিদ, বাদামি বালির দানা,সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
ছেঁড়াদ্বীপের কি মনে আছে,সে সেন্টমার্টিনের বউ।
ছেঁড়াদ্বীপের গর্ভে সন্তান আসেনি। স্বামীর বুকে মাথা রেখে ভেঙ্গে পড়ছে সে।
ঢেউ আর ঢেউ আর ঢেউ—উঠলো-পড়লো।
অবারিত জলরাশি,জলে নামা দূরে থাক,কাছে যেতেই ভয় লাগছে।
আমার কাছের মানুষ,এই ডোবে একবার,ভাসে একবার।

রঙিন ডার্করুম
শেখ তারেকুজ্জামান তারেক-কে

আজ এক অন্য দিন। অন্য চরিত্র। অন্য সম্পর্ক।
একটা ছেলে মাথা নিচে করে ডার্করুমে বসে আছে।
শরীরের অবস্থা পুরো ঝাঁজরা। তার লংজিভিটি শেষ হয়ে গেছে।
বেসিক জিনিসগুলি বরবাদ হয়ে গেছে। সে মৃত্যুর আগের স্টেশনে ওয়েট করছে।
তার মাথার ভিতরকার কম্পিউটারটা নষ্ট হয়ে গেছে। সে কি রঙিন স্বপ্ন দেখে?
একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে আঠা ঢেলে ব্যাগটা ঘষে।
তারপর ব্যাগের মুখে নাক মুখ চেপে শ্বাস নেয়।
রঙিন এক রঙের ফোয়ারা। আঠা তাকে স্বপ্ন দেখায়।
তীব্র রঙের স্রোতের ভিতর পড়ে থাকে সে।
দিগন্তে নোয়ানো কালো আসমানের তলায় রঙিন জীবন।

মিছিল
মাহমুদ-উল-হাসান বাপ্পি-কে

জনবিরল রাস্তায় গাড়ির ভিড় নেই। আকাশছোঁয়া বাড়িগুলি।
জনহীন নিস্তব্ধতাকে খানখান করে ভেঙ্গে দিয়ে,চলে যায় মিছিল।
আকাশস্পর্শী সৌধ সার সার খাঁড়া। আর রাস্তা জুড়ে চলেছে ভেড়ার পাল।
দেখতে দেখতে মনে হয় ভর দুপুরে রাস্তা আটকে মিছিল চলেছে।
রাস্তায় বাস ট্রাক গাড়ি মানুষ কিছুই নেই।

গোয়ালা
মাসুদ রানা-কে

ছাইমাখা ভোর।
গোয়ালার জীবনাকাশও মেঘাচ্ছন্ন।
একজন গোয়ালা মাঠা আর মাখন বিক্রি করতে বেরিয়েছে মাঠে।
তার চেহারা,শরীরের খাটো জামা,মাথায় গামছা,খালি পা,
বাঁকে করে বহন করে নেওয়ার ক্লান্তি,
আর বেচা-কেনার অনিশ্চয়তার দ্বন্দ্ব তার মুখমণ্ডলে।

অপার্থিব
হাবিবুর রহমান হাবিব-কে

মাঠের মধ্য দিয়ে হেটে চলেছে একটা পরিবার।
বাবা,মা আর কয়েকটি শিশু,তাদের হাতে আর পিঠে মালপত্র।
কারো মুখ দেখা যাচ্ছে না,শুধু চলার ভঙ্গিতে অসীম ক্লান্তি।
আকাশে প্রখর রোদ,ঘাসের উপর ওদের ছায়াগুলি আঁকাবাঁকা।
আমার মনে হচ্ছে এরা যেন ঠিক এই পৃথিবীর বাসিন্দা নয়!

Loading

3 Comments

  1. মাথা নষ্ট কবিতা৷

  2. এক লহমায় পড়ে শেষ করলাম। সবটাই ভালো লাগার তার মধ্যে নোট শীট, অপার্থিব আলাদা করে উল্লেখ করা যেতে পারে।

  3. খুবই ভালো লাগলো কবিতাগুলো। নদীর পাড়ের নির্জনতা ও অনেক যন্ত্রণার পর একটা কবিতার জন্ম হয় কবিতা দুটো অনেক বেশি ভালো লেগছে।

Leave a Reply

Skip to toolbar