আমার দেখা কবি আহমেদ মুজিব: পরিচয়পর্ব ও পত্তর
১৯৯৩-৯৪ সাল জীবনে অনেক ঘটনাবহুল একটা সময়। মাত্র ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষের আমেজ, আর কি করে সময়টা পার করা যায়, সেই ভাবনা আমাদের কয়েকজন বন্ধুর। বছর দুয়েক আগে একুশে ফেব্রুয়ারিতে স্কুলে আমরা একটা চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করি। মফস্বলে ওই আয়োজনটা বেশ আলোচিত আর আগ্রহর সৃষ্টি করছিল। তো এবার আমরা ঠিক করলাম কাগজ করবো। একুশে সংকলন, একটা ছোট ম্যাগাজিনের আকারে। এই বিষয়ে কারো কোনো অভিজ্ঞতা নাই। মানে লেখাজোখা ছাড়া ম্যাগাজিন ছাপানোর জন্য কারো সাহায্য দরকার। বন্ধু বাবুর মামাতো ভাই ঢাকায় থাকেন, উনার এই বিষয়ে জানাশুনা থাকতে পারে। কেননা উনি লেখালেখির সাথে জড়িত আর ঢাকা ভার্সিটিতে পড়াশোনা করতেন। সবুজ ভাই এর সাথে দেখা করতে আমি আর বাবু গেলাম মোহাম্মদপুরের শেরশাহশুরি রোডের বাসায়। গলির শেষ চারতলা দালানের দোতলায় উনারা থাকেন। উনি আমাদের আগ্রহ দেখে বুঝলেন যে আমরা এই পথে নাবালক। অনেক কথার সাথে জানতে পারলাম, উনার ছোট ভাই কচি প্রিন্টিংএর কাজ করেন, কবিতা লেখেন। উনার সাথে দেখা হলেই হয়তো একটা রাস্তা বের হবে।
দুপুরের পর ছুটলাম কাঁটাবন সংলগ্ন সোনারগাঁ রোড প্রকাশ প্রিন্টিংয়ের অফিসে। কোলাপ্সিবলের গেট ঠেলে ঢুকতেই নাকে এলো বইয়ের আঁতুড় ঘরের গন্ধ। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় ছোট অফিস ঘর। কাটা কাগজ, রং আর আঠার রাজ্যে জানি কোন বইয়ের জন্মযজ্ঞ চলছে! আলোকিত টেবিলের উপরে ঝুঁকে খুব মনোযোগে কেউ একজন কাজ করছে। একহাতে চেপে ধরা ট্রেসিং-পেপার আর অন্যহাতে কাটার, আঙুলে সিগারেটের ছাই বাঁকা হয়ে ঝুলে আছে কোনো রকমে! আমাদের আগমনের শব্দ শুনতেই তাকালেন আর মৃদু হাসলেন। মোটা মোছের নিচে ওই হাসিটা যেনো অনেক পরিচিত, অনেক কাছের! অবাক করার মতো কোনো অবয়ব না, কিন্তু বুঝি ওই মানুষ ইদানীং খুব বেশি অবাক হন না আর কি! সব শুনে রাজি হলেন। আমরা চা খেলাম। ‘পত্তর’ এর অর্থ জানতে চাইলেন। এরপর আমি অনেক বার ম্যাগাজিনের কাজে ওই প্রেসে গেছি। তারও অনেক পরে জানতে পারি উনার পুরা নাম ‘ আহমেদ মুজিব’ আমরা জানি কচি ভাই বলে। একমাত্র কবিতার বই ‘প্রেসের কবিতা’! বাংলা ভাষায় ট্রেডল মেশিন, সীসার অক্ষর আর পুরানো যুগের লেটার প্রেস নিয়ে একমাত্র কবিতার বই। একসময় উনি আবিদ ভাই এর (কবি আবিদ আজাদ) শিল্পতরু লেটার প্রেসে কাজ করতেন। উনার জীবনের ওই সময়টা উনি বন্দি করেছেন বইটাতে বলতে পারেন। মজার ব্যাপার এখনো কেউ কেউ বইটার নাম “প্রেমের কবিতা” পড়ে ভুল করেন।
পত্রিকা বের করতে হলে লেখা লাগবে আর লাগবে টাকা। তো লেখা যে যা দিবে বন্ধুরা বা এলাকার পরিচিতরা আর বাকি যাদের লেখা আমরা প্রকাশ করতে চাই তাদের একটা তালিকা তৈরি করলাম আমরা বন্ধুরা মিলে। আর টাকার জন্য দান আর বিজ্ঞাপন যোগাড় করার পরিকল্পনা করা হলো। দিন কয়েক পর আবার ঢাকা এলাম। লেখকের তালিকাটা যখন কচি ভাইকে দিলাম, দেখে তিনি একটু হাসলেন। যাদের নাম ছিল তারা তখন অনেক পরিচিত লেখক কবি আর আমরা সবাই কম বেশি উনাদের লেখা পাঠ্যপুস্তক বা শখের বসে পড়েছি। মনে পড়ে, ওই লিস্টে শামসুর রাহমান , আল মাহমুদ , নির্মলেন্দু গুণ , মহাদেব সাহা… আখতারুজ্জামান ইলিয়াস স্যার সহ আরো অনেকে ছিলেন। কারো সাথে আমাদের লেখা চাওয়ার মতো যোগাযোগ নাই। শুধু জানি, উনার মাধ্যমে যাওয়া যেতে পারে; কেননা উনি এই লাইনে হাঁটছেন সে মেলা দিন। আর আমাদের উৎসাহ দেখে হয়তো উনার প্রথম অবস্থায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও না করতে পারেন নাই। নব্য তরুণ বা কিশোরদের ওই আবদারে উনি হয়তো একরকম আনন্দই পাচ্ছিলেন। যাই হোক উনার সেই অনিচ্ছা বা আনন্দের কথায় একটু পরে আসছি। লেখকদের বাসায় গিয়ে লেখা চাওয়ার কাজে উনি আমাকে প্রথম নিয়ে গেলেন কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ এর বাসায় কোনো একদিন বিকেলে উনার কাজের শেষে। প্রেসের থেকে যতদূর মনে পড়ে, হাঁটার রাস্তা গ্রীন রোডে। তখন মোবাইল ফোন ছিলনা। শুধু বাসা চিনে গিয়ে হাজির হওয়া আর কি! উনার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হল, এই রাস্তায় উনি অনেক পদধূলি দিয়েছেন; আর প্রধান ফটকের চাঁদের মতো লোহার আটকানিটা খুলে ঢুকে গেলেন। মরা পাতায় বিছানো ইটমাটির একটু উঠানে কয়েকটা গাছ পেরিয়ে পুরানো দালানটার দোতলায় থাকেন কবি। আঁধোছায়ার সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে দরজার করা নেড়ে নিশ্চুপ মাথা নত করে দাঁড়িয়ে কচি ভাই আর সাথে আমি। মান্নান ভাই এলেন , পরিচয় পর্ব শেষে আমার কাঁচুমাচু আবদার শুনলেন। কথায় যা বুজলাম, পাওয়া যাবে। লম্বা চুলের ওই চাহনি আমার ভুলার না। মনে মনে অনেক আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম সেদিন। আর যা দেখলাম যে, অগ্রজ কবি-লেখকদের প্রতি উনার কি অসম্ভব শ্রদ্ধা, সম্পূর্ণ সময়টাতে কচিভাই সবসময় ঘাড় নিচু করে বিনম্র ভঙ্গিতে, যেনো হেডমাস্টার এর সামনে অপরাধী ছাত্রের অবস্থা, অনেকটা এই রকম আর কি! যাই হোক কবিতা একটা পেয়েছিলাম, পরে কোনো একটা সময়ে কচি ভাইয়ের কল্যাণে। পত্তর এর প্রথম সংখ্যার জন্য মান্নান ভাইই বড় লেখকদের মধ্যে প্রথম লেখা একটা কবিতা দেন। পরবর্তীতে অবশ্য পরের সংখ্যার জন্য অনেক বার মান্নান ভাইয়ের ওই বাসায় গেছি। মনে পড়ে, দ্বিতীয় সংখ্যায় আমরা উনার একটা সাক্ষাৎকার ছাপছিলাম। এরপর কবি শামসুর রহমানের শ্যামলীর বাসায় নিয়ে গেছিলেন। আমার একধরনের আরাধনা পূর্ণ হলো বলতে পারেন। অনেক পড়েছি উনার প্রেমের কবিতাগুলা কিন্তু এই প্রথম দেখা। একদিন সকালে কথামতো গিয়া একটা কবিতা আমি আনছিলাম। কথা রেখেছিলেন। যাইহোক শিল্পতরুর কল্যাণে কচি ভাইয়ের একটা কাব্যিক জগত ও জানাশুনা ছিল সেটা আমাদেরও অনেক কাজে দিছিলো। এভাবে কবি আবিদ আজাদের বাসায় আমি আর কচি ভাই ‘পত্তর’ এর পরবর্তী কোনো এক সংখ্যার জন্য লেখা চাইতে গেছিলাম। আবিদ ভাইয়ের অস্ফুট চোখ, চশমা, ভারী মোছের ওই হাসি, আর খালিগায়ে আমাদের সাথে বসে আলাপের ভঙ্গিটা কোনো এক দুপুরে এখনো মনে আছে। লেখা সংগ্রহ অভিযানের আরো কিছু গল্প বলি: কবি নির্মলেন্দু গুণের আজিমপুরের তাসের আড্ডায়, কবি আলতাফ হোসেন এর পরীবাগের কোয়ার্টারে; আর কবি মুহম্মদ আব্দুস সালামের কর্মস্থল আই এফ আই সি ব্যাংকার গুলশান শাখায়ও আমরা যাই এবং সফল হই ! কিন্তু কবি আল মাহমুদ এর কবিতা চাইতে অনেকবার বিভিন্ন জাগায় হানা দিয়া ব্যর্থ হই। একদিন আমার আল মাহমুদকে নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে কচি ভাই কাঁঠাল বাগানের ঢালে শিল্পতরু অফিসে যেতে যেতে শুধু বলছিলেন, “প্রকৃত কবি কখনও খুনি হতে পারে না।” আমি আর বিপুল ঢাকা কলেজ এ পড়ার সুবাদে একদিন দুজনে সাহস করে কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে ক্লাসের পর আমাদের ইচ্ছার কথার বলি; কিন্তু বলাটা যত সহজ ছিল উনাকে রাজি করানো তারও বেশ কঠিন ছিল! আমার চেয়ে বিপুলের আফসোসটা বেশি ছিল, কেননা ওর গল্পের প্রতি জোঁক ছিল। আর যাদের লেখা কচি ভাই অদৃশ্যের মতো যোগাড় করে দিলেন তাঁরা হয় উনার সমসাময়িক কবি লেখক বন্ধু বা পরিচিত। উনাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম বলতে হয় : শামসেত তাবরেজী , কাজল শাহনেওয়াজ , তারেক সুজাত, খায়রুল হাবিব, বাহার রহমান, খায়রুল আলম চৌধুরী, রাজু আলাউদ্দিন, সরকার মাসুদ, জাহিদ হাসান জাহাঙ্গীর, হাফিজ ইবনে জামশেদ আর আবু হাসান শাহরিয়ার প্রমুখ। পত্তর এর দ্বিতীয় সংখ্যার আগে উনাদের কারো সাথে পরিচয় হয় নাই বোধ হয়। প্রকাশ প্রিন্টিং এর বাইরে বলতে আড্ডা বা প্রয়োজনে যেতে হতো শিল্পতরুতে আর আজিজ সুপার মার্কেট এ। তখন কেবল কাঠামোটা তৈরি হয়ে কিছু দোকান চালু হইছিলো। “প্রাকৃতজন” নামের একটা বইয়ের দোকান ছিল সবার প্রথম। অমি আর আরিফ ভাই নামের দুজনকে চিনতাম। দোতলা বা তিন তলায় বাহার ভাইয়ের স্ক্রিনপ্রিন্ট এ মাঝে মধ্যে যেতাম আমরা, আড্ডা আর চা খাওয়ার জন্য। তারও অনেক পরে মনে আছে কফিল ভাই আর কাজল ভাইয়ের সাথে পরিচয়। একদিন বিকেলে আমরা বাহার ভাইয়ের দোকানে বারান্দায় গ্রিল ধরে বসে চা খাচ্ছি , কেউ একজন বলে উঠলো, ওই তো রিফাত যায়। রিফাত ! আজিজের সামনের আইল্যান্ড ধরে একজন হেটে যাচ্ছিলেন, ডাক শুনে উপরে তাকিয়ে হাত নেড়ে হেসেছিলেন রিফাত ভাই।
এভাবেই ‘পত্তর’ এর চার ফর্মার চটি কাগজটার কাঠামো হয়েছিল। অনেক অনুরোধ করার পরও কচি ভাই এই সংখ্যায় নিজের কোনো কবিতা দেন নাই। উনি ‘পত্তর’ এর প্রচ্ছদটা করেছিলেন। ধুসর পাতার কঙ্কাল থেকে একফোঁটা সবুজ ঝরে পড়ছে। পত্রিকার ভিতরের চিত্রগুলা যোগাড় করেছিলেন , নিজের হাতে লেখকদের নাম লিখে দিয়েছেন; আর চিত্রশিল্পী ওয়াকিলুর রহমানের কিছু তুলির আঁচড় দিয়ে ফিলার দিয়েছিলেন। এখানে বলে রাখি, ওয়াকিল ভাইয়ের ওই কাজগুলা নিয়ে তিনি একটা প্রজেক্টের বেস্ট সময় পার করছিলেন তখন ওই প্রেসে। এভাবেই উনার সাথেও পরিচয় হয়েছিল। পরবর্তীতে ওয়াকিল ভাইয়ের আঁকা ‘বিন্দুর একাকীত্ব’ আর কচি ভাইয়ের দ্বিতীয় কবিতার বই ‘সামনে এক পিছন’ প্রকাশ হয়েছিল। লালসালুর মোড়কে, রুপালি মুদ্রণে, তিরিশ আউন্স মোটা কাগজে একটা রাজকীয় ঘরানার বই। নাতাশা হাবিব , মোহাম্মদ তাহসীন জিসান , শিবনাথ বিশ্বাস, মোমিন উদ্দিন খালেদ , মঈন আহমেদ আর ওয়াকিলুর রহমানের চিত্রকর্ম কচি ভাই এনে দিয়েছিলেন ‘পত্তর’ এর জন্য।
একদিন প্রেস এ যাওয়ার পর কচি ভাই আমাকে অন্য একটা রুমে নিয়ে গেলেন। ওই রুমে ম্যাকিনটোশ কম্পিউটার স্ক্রিন এ ভেসে উঠলো সংগৃহীত লেখাগুলার টাইপ করা চিত্র; আহা কি দারুণ লাগছিলো সব। একটু বলে রাখি, ওই সময় ঢাকা কিংবা বাংলাদেশে মাত্র কম্পিউটার মেশিনগুলা আসছে। সুতরাং এমন প্রিন্ট এ আমাদের বইয়ের লেখাগুলা ভীষণ আনন্দের খোরাক। একটা প্রিন্ট ভার্সন নিয়ে অনেকে দেখালেন, কিভাবে প্রুফ-রিড করতে হয়। তো আমি আস্তে আস্তে শুরু করি বানান শুদ্ধর কাজটা। শুরুতে সহজ মনে হলেও কাজটা অনেক মনোযোগ দাবি করে। আর বাংলা ভাষার ফলা জলাগুলা টাইপ করলে কেমন জানি সাপের মতো লেখার মধ্যে জড়ায়ে যায়। মাত্রা স্প্লিট করে, আকার ইকার হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। সবকিছুর একটা শুরু থাকে; আর আমাদের পত্রিকা প্রকাশের হাতে খড়ি কচি ভাইয়ের কাছে। ডিমাই, ১৬ পাতায় এক ফর্মা, পেপার ব্যাক বাইন্ডিং, কোনটা কত আউন্স এর কাগজ এমন করে সবকিছু কচি ভাইয়ের কাছে শিখেছি বিনা খরচে। আজকের এই লেখাটা ওই ঋণ শুধানোর একটা ব্যর্থ চেষ্টার প্রথম কিস্তি বলতে পারেন।
দেখতে দেখতে কয়েকমাস চলে গেল। সামনে ফেব্রুয়ারি। আমরা বন্ধুরা ভাবলাম বাংলা একাডেমী বই মেলাতে পত্তরের স্টল নিবো; তাহলেই পত্তর প্রকাশের উদযাপন ভালো মতো করা যাবে। এদিকে কিছু দান আর বিজ্ঞাপন পাওয়া গেল; সিমেন্টের গদি, ইটের ভাটা, গার্মেন্টস, টেইলার্স, মুদি দোকানির। একরামপুর বন্দর এলাকার শিক্ষিত ফ্যামিলির অনুপ্রেরণা পাওয়া গেল। কয়েকজনকে স্মরণ করতে চাই : আজাদ খান, গিয়াস উদ্দিন খান, শামসুল করিম, কুতুব খান, টেলু , লিটন, শ্যামল, মনোয়ার, রিপন, সুমন, বাবু, আয়ুব , চঞ্চল, নবী , আসাদ, টিটু আর খোকন সহ আরো অনেকে। এভাবে আমাদের বন্ধুদের পকেট উজাড় করে ‘পত্তর’ এর প্রেসের বিল দেবার জন্য সবাই মোটামুটি প্রস্তুত। এদিকে ঢাকাতে আমি প্রায় প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ থেকে যাতায়াত করি পত্রিকার কাজে। একদিন ফাইনাল প্রুফ দেখা শেষ, অন্যদিন ট্রেসিং বের হলো, আবার প্লেট করা হলো চার ফর্মার। এভাবে প্রতি রাতে বন্দর ফিরে সবাইকে আপডেট দিতে থাকি।
১৯৯৪ একুশে বইমেলা শুরু হলো। আমরা বাংলা একাডেমীর সামনের রাস্তায় স্টলের বরাদ্দ পেলাম। রিয়েল এর রিলেটিভ সালাউদ্দিন বইঘর থেকে ধারে কিছু বই পেলাম, পোস্টার আর ষ্টেশনারী দিয়ে স্টল সাজালাম। প্রতিদিন রোস্টার করে বিপুল, বাবু, রিয়েল, মামুন, রিটন, ফারুক, পারভেজ, আনিস আর পার্থ বন্ধুরা সবাই স্টল এ বসি। কিন্তু সমস্যা হলো প্রেসের সময় পাওয়া নিয়া। ফেব্রুয়ারি মাস, সব প্রেসে যারপরনাই ব্যস্ত! এদিকে সাদা কর্ণফুলী কাগজ কিনে ফেলে রাখা হয়েছে, কিন্তু কে জানে যে, প্রেস এই মাসে এতো ব্যস্ত থাকে। কচি ভাই আমাদের বোঝাতে পারছেন না! আমরা অবুঝ! ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ যায়, ১০ তারিখ যায় কিন্তু প্রেসের সময় হয় না। হায়! টান টান উত্তেজনা! ১৯ শে ফেব্রুয়ারি ছাপার কাজ শুরু হল চার ফর্মা ৫০০ কপি। কিন্তু বাইন্ডিং করতে হবে, তারপর কাটিং, ওদের এই সময়ে পর্যাপ্ত শ্রমিক নাই। আমরা কচি ভাই কে বললাম, তাহলে কি ‘পত্তর’ ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে মেলায় আসবে না?
কচি ভাই শিল্পতরুর কিছু লোকের সাথে কথা বলে ঠিক করলেন। ওই রাতেই ছাপানো কাগজ ‘প্রকাশ প্রিন্টিং’ থেকে নেয়া হলো শিল্পতরু প্রিন্টিং এ। রাত জেগে বাইন্ডিং আর কাটিং কাজ হবে। আমি আর রিয়েল বইমেলা শেষে কচি ভাইয়ের কথা মতো এলাম প্রেস এ, কর্মচারীদের সাহায্য করার জন্য। রাতের খাবারের পর কচি ভাই চলে গেলেন। আমি আর রিয়েল শুধু কাগজ ফর্ম অনুসারে ভাঁজ করছি। অন্য একজন কর্মচারী সেলাই করছেন। আর আরেকজন শেষ আঠা দিয়া কভার মুড়ছেন। সারারাত আমরা চারজন মিলে শ’খানেক বই শেষ করতে পেরেছিলাম মনে হয়। পরদিন ২০ শে ফেব্রুয়ারি সকালেই ক্লান্ত শরীরে বই নিয়ে গেলাম ‘পত্তর’ এর স্টল এ, বাংলা একাডেমী বইমেলায়।
লিটল ম্যাগাজিন কি বা কেন? তখন পুরোপুরি মাথায় আসেনি। কচি ভাইয়ের বিশেষ অবদান ‘পত্তরে’র একটা সুন্দর শুরুতে শুধু আগাগোড়া জড়িত ছিলেন তাই না , তিনি আমাদের মাঝে লিটল ম্যাগাজিনের একটা স্বচ্ছ ধারণার বীজ রোপণ করেছিলেন। শুধু একটা ম্যাগাজিন করতে পেরেছি, তাতেই অনেক অনেক আনন্দ বলতে পারেন। ওই সময়ে আমরা কেউ ভাবিনি যে, কাগজটা চালিয়ে যাবো। কিন্তু আরো দুইটা সংখ্যা ওই লক্ষ্যে, লিটল ম্যাগাজিনের খসড়া বলতে পারেন। তবে চতুর্থ ও পঞ্চম সংখ্যাগুলাই লিটল ম্যাগাজিনের পরিপূর্ণ ভাবধারা নিয়ে অনেক অনেক দিন আমাদের মাঝে থাকবে। যেমন থাকবে কচি ভাই আর উনার স্মৃতি।
![]()