বিনয় : নক্ষত্রের আলো ছড়াতে ছড়াতে
বিনয় মজুমদারের সাথে পরিচয় ম্যারিয়েটার মাধ্যমে। গুলিস্তানের পাশে স্টেডিয়ামের দোতলায় ছিলো দোকানটি। আমাদের গ্রীনরোডের বাসার পাশে ফার্মগেট বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে চেপে ঢাকা স্টেডিয়ামে চলে আসতাম।
একদিন বই ঘাটতে ঘাটতে, সেটা ১৯৮৩ কি ৮৪ সাল হবে, “বিনয় মজুমদারের শ্রেষ্ঠ কবিতা”, এই বইটি হাতে পড়ে যায়। ভারতীয় মূল্য ১০ টাকা। আর বাংলাদেশী টাকায় তখন তিনগুণ দামে ইন্ডিয়ান বইগুলো কিনতে হতো। সেই অর্থে ৩০ টাকা দিয়ে বইটি কিনলাম। আরো অনেক পরে আলাদা আলাদাভাবে, ‘গায়ত্রীকে’, ‘ফিরে এসো, চাকা’,’ অঘ্রানের অনুভূতিমালা’, ‘ঈশ্বরীর’, ‘বাল্মীকির কবিতা’, ‘আমিই গণিতের শূন্য’, ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’ এই বইগুলি হাতে এসে পৌঁছলো।
“বিনয় মজুমদারের শ্রেষ্ঠ কবিতা” বইটি পড়ে প্রথমে ওভাবে আলোড়িত না হলেও, মাঝেমাঝে উল্টেপাল্টে পড়তাম। তখন একটু একটু করে মনে গাঁথতে শুরু করলো কবিতাগুলো।
শুরুতেই যে ব্যাপারটা বিনয়ের কবিতা পাঠ করতে গিয়ে একটু ধন্ধে পড়ে গিয়েছিলাম, সচরাচর যে শব্দগুলো গদ্যে অধিক ব্যবহৃত হয়, সে-রকম গোটাগোটা শব্দ কিভাবে তিনি কবিতায় খুব সহজেই নিয়ে আসতে পারলেন, সেই বিস্ময় কাটতে অনেক সময় লেগেছিলো। তার সমসাময়িক অন্যান্য কবিরা যেভাবে ইঙ্গিতধর্মী ও প্রতীকী কবিতার একটা ধারা সামনে নিয়ে আসলেন, বিনয় সেখানে গদ্য-গন্ধি শব্দের গাঁথুনিতে বাক্যের একটা লজিক্যাল প্যাটার্ন কাব্যের তানে বেঁধে ফেললেন। এখানেই বিনয়ের অনন্যতা। যাকিছু বর্তমান, যাকিছু ঘটমান, কিংবা ঘটে গেছে বা যাকিছু তেমন কল্পিত নয়, এরকম একটা চিরন্তন জগতকে কেন্দ্র ক’রে তার ভাষার কারিশমা বাংলা কবিতার ইতিহাসে নূতন এক পথের সন্ধান দিলো।
তাঁর সমসাময়িক কবিদের বয়ানে এমনও বলতে শোনা গেছে, বিনয় যত না আধুনিক তারচেয়ে বেশি ক্ল্যাসিক্যাল। হ্যাঁ, এই ক্লাসিক্যাল সুর যে বিনয়ের একান্ত নিজস্ব ও স্বতন্ত্র তা কোনো কালের সীমানায় আর আটকে থাকলো না।
কখনো গদ্য ভঙ্গীতে কিন্তু পয়ারে, কখনো নিরেট ন্যারেটিভ ফর্মে, আবার একটা সাংগীতিক সুরও যেনো সেই গদ্য-গদ্য ভাবের কবিতাগুলোতে বেজে উঠলো।
এই যে গদ্যের চারিত্র্যকে কবিতার প্রতিমায় দাঁড় করানো, কবিতার বাক-বদলের ইতিহাসে জনাকয়েক কবি-ই সমর্থ হয়েছেন, আর এভাবেও যে কবিতা লেখা যায় সেই সাহসটা আমরা বিনয়ের হাত ধরেই পেয়েছি।
বিনয় আমার প্রিয়তম কবি। আত্মার আত্মীয়। বিনয়ের কবিতা পড়ে যে ঘোর জেগেছিলো তা এখন পর্যন্ত বলবৎ আছে। মাঝেমাঝেই আড্ডায় আমার এই প্রিয় কবির কবিতা বন্ধুদের পড়ে শোনাই।
পয়ারে লেখার জন্য বিখ্যাত হলেও, অল্পকিছু কবিতা মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লিখেছেন বিনয়। এই কবিতাগুলো সেভাবে খুব একটা প্রচারিত নয়। কেউ কেউ বলেন, বিনয় সারাজীবনই প্রেম-বিষয়ক কবিতাই লিখে গেছেন। কিংবা ভুট্টা সিরিজের কবিতা নিয়ে অনেককেই মুচকি হাসতে দেখা যায়। তবে গুটিকয়েক চারিত্র্যের বিচারে বিনয়ের কবিতাকে চিহ্নিত করলে আমরা তার সামগ্রিক কবিতার স্বাদ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবো।
তার অনেক বিখ্যাত আর জনপ্রিয় কবিতার লাইন আছে যেমন, ‘ভালোবাসা দিতে পারি, তোমরা কি গ্রহণে সক্ষম?’, এরকম কিছু চরণ দিয়ে খুব দ্রুত বিনয়ের কবিতার মূল্য বিচার করতে গেলে ভুল হবে। বরং আমরা যদি বিনয়ের নির্বাচিত কবিতার “আমাদের অভিজ্ঞতা” কিংবা “ফিরে এসো চাকা” বইটির ১৩ নম্বর ওই এক-ই কবিতাটিকে একবার স্মরণে আনি তবে বুঝতে পারবো প্রেমের সব বিখ্যাত কবিতার পাশাপাশি এই কবিতাটির ভেতর যে দার্শনিক ও নান্দনিক উপলব্ধি কাজ করেছিলো সেটি কতো গভীর ও চিন্তা উদ্রেককারী :
আমাদের অভিজ্ঞতা
(বিনয় মজুমদার)
আমাদের অভিজ্ঞতা সিক্ত গিরিখাতের মতন
সংকীর্ণ, সীমিত; এই ক’দিন যাবত কুয়াশায়
মেঘে সব ঢেকে আছে — উপত্যকা, অরণ্য, পাহাড়।
পৃথিবীতে বহুবিধ আহার্য রয়েছে, তবু বলো,
বিড়ালের ব্যর্থতর জিহ্বা তার কত স্বাদ পায়?
অথচ তীক্ষ্ণতা আছে, অভিজ্ঞতাগুলি সূচিমুখ,
ফুলের কাঁটার মতো তীক্ষ্ণ, নাগালের অনেক বাহিরে।
যাই হোক, তা সত্বেও বিশাল আকাশময় বায়ু,
বিশাল বাতাস বয়, বিরুদ্ধ বাতাসে বেধে যায়।
সর্বদা কোনো না কোনো স্থানে দেশে ঝড় হতে থাকে।
এ সকল অনিশ্চিত অস্থিরতা দ্বন্দ্ব ভেদ ক’রে
তবুও পাইন গাছ ঋজু হয়ে ক্রমে বেড়ে ওঠে,
প্রকৃত লিপ্সার মতো, আকাশের বিদ্যুতের দিকে।
( ১৩, “ফিরে এসো চাকা”/আমাদের অভিজ্ঞতা, “বিনয় মজুমদারের নির্বাচিত কবিতা” )
আর যে কথাটা বলছিলাম, বিনয় পয়ারের কবি হিসেবে বিখ্যাত হলেও প্রথম কাব্যগ্রন্থ “নক্ষত্রের আলোয়”-এর “কেন মনোলীনা” কবিতাটিতে তার কবিতার মূল স্বাক্ষর প্রেমের আবেদন কাজ করলেও মাত্রাবৃত্তে ছন্দ হওয়াতে বিনয়কে আমরা আরেকবার নূতনভাবে আবিষ্কার করি :
কেন মনোলীনা
(বিনয় মজুমদার)
কেন তবে তুমি দিঘির শরীরে ছুড়েছিলে ঢিল?
চেয়েছিলে শুধু দেখতে কী ক’রে জলের বৃত্ত
নেচে নেচে যায়, সবুজ আলোয় করে ঝিলমিল?
কেন অকারণে দেখতে চাইলে দিঘির নৃত্য?
এসেছিলে কাছে, বসেছিলে ধীর সবুজ ছায়ায়
কু সুমে তোমার লোভ নেই যদি, নাই বা তুললে।
প্রতিদিন আসে অনেকেই, ব’সে ফের চ’লে যায়।
কৌতুকে তুমি কেন মনোলীনা অমন দুললে?
দেখেছো কেবল জল তরঙ্গে দিঘির শিহর।
জানো না তো তুমি দূর সঞ্চারী জলের বৃত্ত
অবশ পদ্মবনে নেচে নেচে গেছে পরপর,
দুলিয়ে দিয়েছে অপেক্ষমাণ ফুলের চিত্ত।
আনমনা এক কুসুমকে তুমি জাগিয়ে তুললে।
শুধু কৌতুকে কেন মনোলীনা অমন দুললে?
জীবনানন্দ পরবর্তী বাংলা কবিতায় বিনয় মজুমদার কবিতার ইন্দ্রজালে এখন পর্যন্ত যেভাবে আমাদের আবিষ্ট ক’রে রেখেছেন, তার তুলনা একেবারেই অসম্ভব। তাঁর আবিষ্কৃত পথ ধরে তিনি একাই হেঁটে গেছেন নক্ষত্রের আলো ছড়াতে ছড়াতে।
![]()