লাল টুপি, লাল লাঠি

লাল টুপি, লাল লাঠি

গজার

আমি অনেক ছোট ছিলাম
তাই মাছগুলো খুব বড় লাগল দেখে
বিশাল পুকুর অনেক পানি
সবাই দেখলাম খাবার ছিটায় লেকে
বাপ বলে এই যে দেখ
অনেক পুরনো গজার
আমি হাসি ফ্যাক ফ্যাক
মাছগুলো দেখতে মজার
পাখার আওয়াজ ওপরে তাকাই
ছাই রঙের এক ঝাঁক পাখি
মা বলে এরা জালালি কবুতর
বাক বাকুম জুড়ায় আঁখি
গজার মাছকে দেখে মনে হয়
হাসছে, সে যেন, দাঁত পড়া বুড়ি
নড়াচড়ায়, করতে লাগে ভয়
পানির ভিতরে কিসের সুড়সুড়ি?
সাপ না তারা
সাপের চেয়ে মোটা!
মাথার ওপর
দুই চোখ গোটা গোটা!
মাঝে মাঝে মনে হয়
বুঝি গায়ে জান নেই
পানির ওপর ভেসে রয়
ঘুমের ঘোরে স্বপ্নেই
মা বলে এত বড় মাজার
আল্লাহর কি কুদরত!
বাপ বলে ইতিহাস তো হাজার
কিছু মিথ্যা কিছু হাকিকত!

ঢাল

বয়স খুব ছোট
কিন্তু চোখ ফুটেছে
ছোট্ট বিড়ালছানা যেভাবে
চোখ ফুটলে দেখে দুনিয়া
মাটিতে পড়ে থাকা কাপড় খুঁটে দেখে
এর ভেতর কী আছে? ঠিক তেমন।
আমি দেখতাম রিকশা করে,
মিরপুর ১ যাওয়ার সময় একটা জায়গায় এসে ;
সব রিকশাওয়ালা নেমে যায়,
প্যাডেল মারলে কাজ হয় না!
কী যেন তাদেরকে টেনে ধরে রাখে!
সামনে এগোতে বাঁধা দে!
অনেকে আবার নেমেই বাম দিকে হাত উচু করে সালাম দে!
অনেকে আবার অপু দশ বিশের মতো বুক ঠোঁট কপালে ঠেকায় নিজের ডান হাতের তর্জনী!
কেউ কেউ কিছু না করে গামছা বেঁধে রিকশা টানতে থাকে!
কয়েকদিন যাওয়ার পর বুঝলাম মিরপুর ১ উঁচু।
আমরা যে রাস্তায় থাকি তা নিচু।
সেই ঢাল বাওয়া খুব কষ্ট। তাই এত কারসাজি।
আবার একদিন দেখি এক মামা লাফিয়ে লাফিয়ে প্যাডেল মেরে রিকশা থেকে না নেমেই সে ঢাল পার করে ফেলল।
সালামও নেই, অপু দশ বিশও নেই।
বুঝলাম মামার অনেক শক্তি। জোয়ান বয়স।
শক্তি থাকলে উঁচু নিচু সব সমান।

বাপি ও বাবা

দিন যত যায় কৌতূহল বাড়ে
প্রশ্ন অনেকদিন জমতে থাকে তেরপলের পানির মত
তারপর উপচে পড়ে মাটিতে
ঢাল নামার সময় এত বড় মসজিদের মত জিনিসটা আসলে কী?
যদি মসজিদই হয় তাহলে বোরকা পরা মহিলাদের কাজ কী?
শুধু তাই না, মাঝে মাঝে সিঁদুর দেওয়া মহিলারাও ঢোকে!
বাগদাদ কোন বাগদাদ?
যে বাগদাদের আন্ডারগ্রাউন্ড-এ কম দামে পাওয়া যায় চেক শার্ট আর মোবাইল প্যান্ট?
নাকি যে বাগদাদ টিভিতে দেখায়, যেখানে যুদ্ধ চলতেছে?
শাহ মানে কী, এটা কি শাহ সিমেন্টের মালিকের বাসা?
বাবা মানে কী? বাবা আর বাপ কী এক জিনিস?
নাকি এক দুইজনের বাপ হলে আব্বা আব্বু বাপ বাপি,
অনেকজনের বাপকে কী বাবা বলে?
এসব প্রশ্ন ইয়ো ইয়ো সুতার মত আমার মগজে পেঁচ লাগায়?
আমি বাপির কাছে জানতে চাই।
উত্তর পাই বাগদাদ (যুদ্ধ চলা বাগদাদ) থেকে এক সুফি আসেন,
এখানে তিনি মানুষকে মুসলমান হওয়ার দাওয়াত দেন,
মানুষ মুসলমান হয়,
তারপর তিনি মরার পর তার এ বিশাল জায়গা তার যারা মুরিদ আছেন তারা দেখভাল করতে থাকেন, তার কবর পাহারা দেন, তার কিচ্ছা কাহিনী মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেন।
উনার নাম ছিল শাহ আলী, বাগদাদ থেকে আসায় তাকে বাগদাদি বলে।
আমি বলি এইটা মসজিদের মতো কেনো?
বাপ বলে এইটা মসজিদ না, এইটা মাজার, ঐ যে আমরা সিলেটে গিয়ে গজার মাছ দেখলাম, ঐটাও মাজার, ঐটা শাহ জালাল, এইটা শাহ আলী।
মাজার কী? সুফি কী? মসজিদ মাজারে তফাত কী? মুরীদ কী? শাহ কী?
এসব প্রশ্ন আমি আর বাপিকে করি না। তেরপলে বৃষ্টির পানির মতো প্রশ্ন জমতেছে, সময় মতো ঠাস করে মাটিতে পড়বে,
সময় আসুক।

মাজার বাজার

বিশাল মিনার।
বিশাল গেইট।
চারপাশে রঙবেরঙের প্লাস্টিকের মালা।
এক দোকানে অনেক ধরনের মিষ্টি নিমকি
যাদেরকে তবারক বলে।
বাজারে যাওয়ার চিপায়
অনেক বড় চুলের মানুষ,
গলায় মালে, তাবিজ, হাতে অনেক আংটি।
কয়েকজন টিয়ে পাখি নিয়ে বসে থাকত,
সামনে কয়েকটা চিঠি,
প্রেরক প্রাপক অজানা।

অনেকের মাথায় পাগড়ি,
কেউ বড় পাঞ্জাবি পরে, কেউ কাপড় পেঁচিয়ে থাকে, গান গায় অনেকে, বাউল, সাউন্ড সিস্টেম,
মাটির জিনিসের দোকান,
নানারকম পাথরের দোকান,
আঙ্গুলের ডগায় চুন লাগানো লাল ঠোঁটের কিছু মহিলা,
ফাটা ফাটা কণ্ঠ,
ময়লা জামা কাপড়,
হিজড়া
পলিখিনে খিচুড়ি,
কয়েকজনকে দেখলে ভয় লাগে পাগড়ি মাথায় হাতে লাঠি, চুলে জট।
পাগল, পাগল।
ক্ষ্যাপা, চেঁতা।
এদেরকে সব জায়গায় দেখা যায় না,
এই জায়গায় দেখা যায়,
যেদিক দিয়ে আমি ইদ্রিস মিয়ার ভ্যানে চড়ে ফার্মের মুরগির মতো স্কুলে যাই।
মাজারের আশপাশে,
মাজার আর বাজারের চিপায়।

নানু

জীবনে যেদিন প্রথম শাহ আলি মাজারে ঢুকলাম
সেদিন আমার সাথে আমার নানু ছিলেন।
নানু পরহেজগার মানুষ।
ইবাদত বন্দেগি তার কাছে শ্বাস প্রশ্বাসের মতো, তার গায়ে লাগে না,
জায়নামাজ তার শরীরের চামড়ায় পরিণত হয়েছে,
আমাকে বলল, “ এক্কানা শাহ আলীর মাজারে যাইতাম, আঁই চিনতান ন, তুঁই যাইতে হাঁইরবা নিঁ আঁর লগে?”
আট নয় বছর বয়সে বংশের বড় নাতি হিসেবে পারব না বলার মতো কাপুরুষ আমি ছিলাম না,
বললাম, “হারুম, আঁন্নে বাসায় থাকেন, আঁই রিকশা লই আঁইয়ের।“
রিকশা থেকে নামার পর, নানু মিষ্টি মতো দেখতে কিছু জিনিস কিনলো। গোল, গোল, সাদা, সাদা,
আমাকে একটা দেওয়া হলো, প্রথমে মিষ্টি লাগলেও, চুষতে চুষতে ভেতরের অংশ আসলে একটা তেতো ভাব আছে।
ঢোকার পর দেখলাম, হাতের বাম পাশে অনেক উঁচু জায়গা, উঁচুতে একটা বড় বট গাছ, সামনে গেলে একটা কবর, যেখানে
অনেক সুতা বাঁধা, টাকা পড়ে আছে, অনেক টাকার নোট, পয়সা, কবরের আশপাশে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেক পাগল বসে
আছে, চুপচাপ, চোখ লাল, তাকিয়ে কী যেন ভাবছে, অনেক ভিক্ষুক, তাও কেউ ভিক্ষা চাইছে না।
এক হিন্দু মহিলা কবরের সামনে সেজদাহ দিচ্ছে,
নানুকে বললাম, “নানু চাঁন নাহেঁতি হিন্দু, হেঁতি নামাজ হড়ের,”
নানু বলল, “আল্লাহরে ব্যাঁকে বুলাইতে হাঁরে, সমস্যা নাই।“
নানু মসজিদ খুঁজে সেদিকে গিয়ে নামাজ পড়োল,
মহিলাদের জন্য আলাদা জায়গা করা,
এ প্রথম দেখলাম মহিলাদের মসজিদ।
নামাজ পইড়ে তবারক বিলি করল মাজারের ফকিরদের, তারা খুব খুশি হলো, কয়েকজন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
আমার মনে হল সবাই কিছু চাইতে আসে এখানে,
তবে যা পায় তাতেই খুশি হয়।
আমার ক্লাসমেটগুলোর মতো না এরা, পঞ্চাশে পঁয়তাল্লিশ পেলেও বলে, “ম্যাডাম আমার গোনায় ভূল হয়েছে, আরও তিন নম্বর বাড়বে।“

লাল টুপি, লাল লাঠি

তখন চারপাশে ছেলে ধরা ট্রেন্ডিংয়ে,
ছেলেদেরকে ধইরা নিয়া যায়, আর ফেরত দেয় না,
শোনা যায় বিল্ডিং তুলতে হইলে নাকি এরকম কয়েকটা ছেলের মাথা লাগে,
লালকুঠিতে নাকি কয়েকজনেরে ধরসে,
বাপ মার আতংকের শেষ নাই,
স্বর্ণলতার টোস্ট, দুধ চায়ের লগে খাইতে মজা,
আম্মার সাথে গেসি বাজারে, টোস্ট আর হাবিজাবি কিনতে,
রিকশা থেইকা নামতেই এক লাল পাগড়ির লোক লাল কাপড় পেঁচানো লাঠি নিয়া আম্মার কাছে টাকা চাইল,
লোকটা ভিক্ষুকের চেয়ে বেশি মাস্তানের মতো দেখতে,
আম্মা কইল, “মাফ করেন!”
লোকটা কয়, “টাকা লাগব না, তোর পোলাটারে শাহ আলীর দরবারে দিয়া দেয়, বাবা খুব খুশি হইব,”
এই কথা শোনা মাত্রই আম্মা ঝাড়ি দিয়া উঠল, কইল “ যান এইখান থেকে। ”
কাঁচা বাজারের কেনা কাটা শেষে আমি পাকনামি কইরা চইলা গেলাম স্বর্ণলতার সামনে, আম্মুর হাতে বাজারের ব্যাগ, তাই আমার যাওয়াটা সে খেয়াল করে নাই।
ঐ লোকটা তখনও বাজারের সামনে ঘুরাঘুরি করেতেসে,
আমি আম্মুরে দেখতেসি মাগার আম্মু আমারে দেখতেসে না, তয় আম্মায় ঐ লাল পাগড়ির মানুষটারে দেখসে আর দেইখাই
আম্মা চিল্লাইয়া কান্দা শুরু করসে, এইটা দেইখা ঐ লোক আবার আম্মার দিকে তাকাইয়া মাথা ঝাঁকাইয়া একটা হাসি দিল,
আম্মার কান্না আরও বাইড়া গেলো,
আমি কোনরকম আম্মার কাছে গেলাম,
আম্মায় আমারে দেইখা কইলজায় পানি ফেরত পাইল,
লাল পাগড়ি তখনও হাসতেসে, হালা পাগল,
আম্মায় তাড়াতাড়ি রিকশা লইয়া বাসার দিকে রওনা দিল,
আজকেও চায়ের লগে মুড়ি খাইতে হইব, স্বর্ণলতার টোস্ট নেওয়া হইল না।

খারাপ

আমি একজন মুসলিম
এবং সেই হিসেবে আমার কেন মাজারে যাওয়া উচিত না তা আমারে বুঝাইতেসে জহির মাস্টার
লাল পাগড়ির পাগলের আতংকে এমনেই আমি ট্রমাটাইজ
এখন যোগ হইসে জহির মাস্টার,
শাহ আলি তো মুসলমান ছিল, মাজারে তো মসজিদ আছে, এসব কথা জহির শুনতে চায় না, তিনি পর্দার ফাঁক দিয়া
আমার খালারে দেখে আর ঠোঁট চাইপা হাসে।
গলা খাঁকারি দিয়া বলে, মাজারে ভালো মানুষ থাকে না।
সব খারাপ কাজ হয় মাজারে।
সো মাজারে যাওয়া যাবে না।
মাজার খারাপ জায়গা।
আমার তখনও খারাপ হওয়ার বয়স শুরু হয় নাই।
তবে আমি বুঝছি, খারাপ জায়গা মাজার।
মাজারে সব খারাপ লোকেরা থাকে।


রাত
রাতের নেশা, আমার জীবনে প্রথম নেশা,
আমার বাপ, মা, প্রেমিকা, বন্ধুমহল, ঘনিষ্ঠ ভাই বেরাদার, অনেকের মতে আমার মূল নেশা অনেক কিছু।
কিন্তু আমার কাছে আমার নেশা পরিস্কার,
আমার নেশা রাতের নেশা,
এই দুনিয়ার কাউ কাউ, গলা পরিস্কার করা, কফ ফালানো, গাড়ির প্যাঁ, পুঁ, ছাই আচঘে ছাই, পাটাপুতা ধার দেই, লাউ শাক, কচুর শাক, ঝিঙে পটল, বিরিং খেলা পোলাপাইনের চিল্লাচিলি,
রসায়ন, ফিজিক্স, টাকা পয়সা,
এসব বাল যখন ঘুমাইয়া যায়,
তখন বাতাসে এক পিনিক ছড়াইয়া যায়,
উফ পিনিক, মাথা নষ্ট,
এফ এম রেডিও, হেডফোন,
ডিম লাইট,
এই নেশায় আমার সব চইলা গেলো, বিশেষ কইরা পড়ালেখা, দিনে আমার ভালো লাগে না, রাতের পিনিক ওঠে,
পড়ালেখার যখন কেল্লা ফতেহ, তখন বাপ মায় একদিন দিল আচ্ছা মতো মাইর,
আমিও রাগ কইরা ঘর থেকা বের হইলাম,
ঐদিন এত পিনিক হইসি, রাতের পিনিকে, বলার মতো না,
গেলাম শাহ আলীর মাজারে,
দেখলাম কেউ ঘুমানো, কেউ জাগনা, কেউ বিড়ি খায়, পুরুষ, মহিলা, হিজড়া,
আমিও শুইলাম,
এক বড়লোকের পোলা আইল গাড়িতে কইরা, আইসাই বমি করতাসে, ঢুইলা ঢুইলা পইড়া যাইতেসে, ওয় মনে হয় মদ খাইসে, ওরে দেখলাম ড্রাইভার লেবু খাওয়াইতেসে।
সবাই যার যার মতো, কেউ কাওরে প্যারা দিতেসে না।
সবাই সবাইরে আগলাইয়া রাখসে। বাবার দরবারে মায়ের আদর।
মনে হইল আমার ঘর থাকলেও বেশিরভাগ লোকের ঘর এইটাই।
এত বড় দুনিয়া আল্লাহর, সবাই যার যার মতো গিলা খাইতেসে, এদের জন্য কোন জায়গা নাই।
কবে এক আল্লাহর বান্দা মরসে, ওর কবরের পাশে আইসা এরা ঠাঁই পায়। ঘুমাইতে পারে।
পিনিকে আমার চোখ বন্ধ হইয়া যায়, মশার কামড়ও তেমন
টের পাই না।

Loading

মীর অনাবিল— কবি। মিরপুর ১ এর বাসিন্দা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র।

Leave a Reply

Skip to toolbar