Profile Photo

প্রদীপ্ত দে চৌধুরীOffline

  • Pradiptadey12006024
  • *প্লাটফর্ম

    চার্জে রাখা ফোনটা ভনভন করে নড়ে ওঠল।

    লেখাজোখায় ডুবে ছিলাম। শব্দ হতেই অন্যমনস্কভাবে একবার তাকিয়েই ফের আগের কাজ শুরু করে দিলাম। রাত তখন ১২ টা ছুঁই ছুঁই। এখন কে মেসেজ দেবে!

    কে আর, সিম কোম্পানিরাই হয়তো। এতটাকায় এত ইন্টারনেট, নয়তো ওতো টাকায় ওত মিনিট! তাই বলে রাত বারোটায় কেন মেসেজ দিবে! বিরক্তকর বিষয়-আশয়!

    মাসের শেষ। অফিসের রিপোর্ট জমা দিতে হবে। তাই যাই হোক, আজ রাতে ঘুম হোক বা না হোক অফিসের মাসিক হিসাব লেখা শেষ করতে হবে। রিপোর্ট লিখতে লিখতেই অন্যমনস্কভাবে টেবিল ঘড়ির দিকে চোখ পড়ল- বারোটার উপর কাটা নড়ছে।

    কিছু হিসাবপত্র মেলানো শুরু করলাম। কাগজে কাগজে শব্দ হচ্ছে। এরই মাঝে, কেন জানি না, হুট করেই কোন দিক থেকে একটা শব্দ মাথায় ঢুকে গেল। শব্দটা হল “ফারিন”!

    আমার কাজ থমকে যায়। চোখ বড়বড় করে থাকি কতসময়। আচ্ছা, ফারিন মেসেজ দেয় নি তো? ঠিক বারোটার সময় প্রতিদিন তার মেসেজ পেতাম এককালে। একটা মুহুর্তের জন্যও মনে হল না, এতকাল পরে কেন তার কথা হুট করে মাথায় আসল!

    আমার শ্বাস প্রশ্বাস গভীর হয়ে পড়ে। চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে সোজা চার্জারটা খুলে ফোনটা হাতে নিই। ফোনের লক খুলতে গিয়েই দেখি, মেসেজ নয়, একটা ইমেইল এসেছে! ইউজার নেমের জায়গায় বড় বড় করে লেখা ” তাসনোভা ফারিন”!

    আমি কিছু সময় বরফ শীতল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। নাক বেয়ে দ্রুত শ্বাস পড়তে থাকে, হাঁতগুলোতে স্পন্দন শুরু হয়। ফারিন ইমেইল করেছে আমাকে?

    কি লিখেছে ফারিন আমাকে? গলাটা শুকিয়ে যায় কেন জানি। দ্রুতই লক খুলে ইমেইলটা খুললাম। ইমেইলটা ছোট্ট, এক নিঃশ্বাসে পড়লাম সবটুকু। একবার, তারপর আরো কয়েকবার।

    ” আগামীকাল ট্রেনে করে যাবো এয়ারপোর্টে। কানাডায় কালকেই যাওয়া হচ্ছে। পারলে দেখতে এসো একবার প্লাটফর্মে। সন্ধ্যা সাতটায় ট্রেন।

    ফারিন”

    ফারিন কানাডা যাচ্ছে? আমার চোখগুলো দিগবিদিক ঘুরোঘুরি করতে লাগল। ফোনটা রেখে দিয়ে একবার বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করলাম। তারপর কোল বালিশে হাত পা জড়িয়ে কিছুসময় শুয়ে থাকলাম। তারপর আবার উঠে পায়চারী শুরু করলাম। মনে একটাই প্রশ্ন, “ফারিন, ফারিন কি তাহলে আমায় ক্ষমা করে দিয়েছে?”

    ঘরের বারান্দার এদিক থেকে ওদিকে অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে হাঁটতে চিন্তা করলাম আর মেলাতে থাকলাম সবকিছু। ফারিনের সাথে অবশ্যই আমার বিয়ে হয়নি, তার তাহলে কানাডার একজনের সাথে বিয়ে হয়েছে। সে বাংলাদেশে এসেছে ঘুরতে, অনেকদিন ঘুরাঘুরি করে যাওয়ার দিন তার আমাকে দেখবার ইচ্ছে হয়েছে। যত যাই হোক, প্রথম প্রেম-এত সহজে কি ভুলা যায়! প্রশ্নটা এর আগেও নিজেকে করে ফেলেছি কয়েকবার, এখন আবার করলাম, “ফারিন কি তবে আমায় ক্ষমা করে দিয়েছে?”
    জবাব এল, “অবশ্যই দিয়েছে, নয়তো ইমেইল পাঠিয়ে কেন আসতে বলবে প্লাটফর্মে?”

    রাতে ঘুমালাম অনেক দেরিতে, ঘুম যখন ভাঙল তখন সকাল এগারোটা বাজে। অথচ দশটায় আমার অফিস ছিল, আজকে রিপোর্ট করবার দিনও ছিল। তোয়াক্কাই করলাম না, ফারিন ডেকেছে আমায় আজকে। এর চাইতে বড় কাজ আর কি হতে পারে। হ্যা, ট্রেন অবশ্য সাতটায়- তবু একটা প্রস্তুতির ব্যাপার স্যাপার আছে না!
    কোলবালিশে পা দিয়ে আরাম করে ফারিনের সাথের দিনগুলো কল্পনা করতে থাকলাম।

    একটা লেকের ধারে বসে আছি। ফারিন নীল রঙের একটা সালোয়ার কামিজ পরা, আমি হাবাগোবা সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পরে বসে আছি। দুটোই ঝোলা টাইপের কাপড়, হাঁটলে মনে হয় একটা প্যারাসুট নিয়ে হাঁটছি। স্বভাবে এমনই একটু নির্জীব ধরনের মানুষ আমি। বোকাসোকা নিজেকে বলতে লজ্জা লাগে, তাই নির্জীব বলি। কিন্তু সেইদিন লেকের ধারে বসে কথা বলবার সময় হঠাৎ করে বুদ্ধিমান হয়ে গেলাম।

    -“ফারিন!”
    -” হু? ”
    হাতে একটা ছোট লাঠি নিয়ে পানিতে ঝাপটিয়ে বললাম, “বুড়ো হবে আমার সাথে?”
    ফারিন ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকায়, কিছুক্ষণ ভাবে কি বলতে চেষ্টা করছি। তারপর দ্বিধা নিয়ে বলে, “তুমি কি আমায় প্রেমের প্রস্তাব দিচ্ছো, শাহেদ মিয়া?”
    আমি মাথা নেড়ে না করলাম। বললাম, “উহু, প্রেম নয়, বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছি!”

    ফারিনের চোখ কপালে উঠে গেল। ছোট্ট করে বলে, “আচ্ছা!” তারপর একটু সময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,”এই…এই বুড়ো হবার… না কি লাইনটা বললে, এটা কি নিজে বানিয়েছো? সুন্দর তো!”

    আমি একটু লাজুক হাসি হেসে বললাম, ” ইয়ে..আসলে, ইন্টারনেট থেকে পেয়েছি। কালকে সার্চ দিয়েছিলাম, এর মধ্যে মানে এই লাইনটা ভালো লেগেছিল…”

    ফারিন কতসময় অবাকভাবে তাকিয়ে থাকে, তারপর মুখ কুঁচকে রাগী গলায় বলে, “মানে, প্রপোজ করতেছো, সেটাও ধার করা লাইন নিয়ে?” উঠে পড়ে ফারিন, চোখ ছোট করে বলে, “আগে নিজে থেকে লাইন বানিয়ে প্রস্তাব পাঠাও, তখন দেখা যাবে উত্তর হ্যা না- না আসে!কিছু ইউনিকনেস শেখো, শাহেদ মিয়া। বিয়ে করতে হলে বরের যোগ্যতা দরকার হয়, যোগ্যতা! বুঝলা?” বলেই মুখ ঘুরিয়ে চলতে শুরু করে ফারিন।

    আমি হাসি হাসি মুখ নিয়ে তাড়া দিয়ে বললাম, “আরে দাঁড়াও, চাঁপা ফুলগুলো যে এনেছি, নিয়ে যাবে না!”

    (আগামীকাল শেষ পর্ব❣️)

    5
    4 Comments
    • এক দীর্ঘ দিনের প্রতীক্ষায় রইলাম। প্রীতি ও শুভেচ্ছা এত সুন্দর গল্পটির জন্য।

    • অভিনন্দন। রেখে দিলাম; একসঙ্গে পড়বো।

    • (আগামীকাল শেষ পর্ব❣️) এত কষ্ট দিলেন ! ইস ! যদি আগামী কাল থেকে পড়তাম ।।

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন নিন! আপনার এই লেখাটি আজ 31 May 2021 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

Friends

Skip to toolbar