-
৪র্থ খন্ডঃ
রূপ কথা নয়,সত্য ঘটনা অবলম্বনে
আমাদের ছোট বেলার একটি মজার গল্প৪.
ডিসেম্বর মাস প্রচন্ড শীত পড়েছিল সে সময় সারা দেশে..। স্বাধীনতার পর মানুষ খুব অভাব অনাটনের মধ্যে পড়েছিলো ও অনেক কষ্ট করে সময় অতিবাহিত করতো বেশীর ভাগ মানুষ, তাদের কোনো কাজ কর্ম ছিলো না। বেকার মানুষ স্বল্প পরিসরে নিজেদের জমি অথবা বর্গা জমি চাষ আবাদ করে জিবিকা নির্বাহ করতেন।শীতকালে আকাশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকলে চাঁদনী রাতে আকাশ খুব ঝলমল করে। এ সময় গ্রামের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা চাঁদনী রাতে বসে গল্প অথবা খেলধুলা করে সময় অতিবাহিত করতো। শীতের মৌসুম এলে শীতকালে আকাশে চাঁদনী রাতের আধো আলো ছায়ায়,.. লক্ষ লক্ষ তারা ও চাঁদ ঝল মল করে, চারিদিকে হিমেল হাওয়া কনকনে শীত প্রবাহিত হয়।
মাঝে মাঝে রাতে হালকা মৃদু ঠান্ডা হাওয়া প্রবাহিত হয়। .. এখন কার দিনের মত..মানুষের শীত নিবারনের জন্য.. এত শীত বস্ত্র ছিল না।.. আর সে সময় গ্রামাঞ্চলে এত বেশী লোকের বসবাস বা ঘন বসতি ছিলো না, এত কোলাহল ছিল না।..বেশীর ভাগ মানুষ সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরে আসতো. শীতের পচন্ড তীব্রতার কারনে…। গ্রামের সাধারণ গরীব মানুষেরা গায়ে চাদর অথবা শাড়ি লুঙ্গি ভাজ করে শরীরে পেচিয়ে..গা গরম করতেন।
..গ্রামে বাড়ি ঘর কম ছিল.. গাছ পালা বেশী থাকার কারনে..রাতে শীত খুব তীব্র কনকনে আরো বেশী অনুভূত হত।..তখনও এলাকায় বিদ্যুৎ আসেনি তাই সন্ধ্যার পরে অন্ধকার নেমে আসত..। সন্ধ্যার পর বৃদ্ধ- বৃদ্ধা, দাদা-দাদি, বাবা-মা,সকলে উনুনের আগুন,..অথবা.. মাটির আইল্যাতে ধানের তুষ, গোবরের ঘুটো এক সাথে মিশিয়ে..অথবা জ্বলন্ত কাঠ কয়লা একত্র করে.. পুড়িয়ে তাপ তৈরী করে সন্ধ্যার পর ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা প্রতিদিন দল বেধে উনুনের আগুন পোহানো ছিলো নিত্যদিনের ঘটনা।
..শীত কালে রাত ৮টা-৯টার পর মানুষের কোনো কোলাহল থাকতো না।.. সন্ধ্যার পর ভুতের ভয়ে গা ছম ছম করত।.. দাদা – দাদিরা ছোটদের সব সময় বলতেন তেতুল গাছ, হিজল গাছ, বট গাছ, হরা গাছে ভুত থাকে।.. তাই বিকেল বেলা, সন্ধ্যার পর কেউ বাঁশ ঝাড়ে, বাগানে যেতে ভয় পেত।.. শীতের মৌসুমে জ্যোতস্না রাতে বড় বড় গাছের ডাল পালার ছায়া মাটিতে পড়ে থাকলে দুর হতে মনে হত.. কে যেন সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।.. অনেকেই ভুতের ছায়া মনে করে.. রাতের বেলায় সবাই হারিকেন, কুপি জ্বালিয়ে ঘুমাতেন।
..এছাড়া শীতকালে ঘরের টিনের চালের উপর কোনো গাছ পালা থাকলে মধ্য গভীর রাতে ফোটা ফোটা কুয়াশার পানি সব সময় পরত।..বাঁশ বাগানের ভিতর দিয়ে চলাচল করলে.. পানির ছোট ছোট কনা গায়ে পরতো,..মনে হত কে যেন গায়ে পানি ছুরে মেরেছে..।
আর খালি পায়ে ঘাসের উপর দিয়ে হাটলে পা ভিজে যেত কুয়াশার পানির কারনে। মাঝে মাঝে রাতের বেলা হঠাৎ বেঙ অথবা ইদুর পায়ের সাথে ধাক্কা খেলে ভয়ে লোকজন লাফিয়ে ওঠত।.. হঠাৎ ক্ষুধার্ত বিড়াল রাতের বেলায়.. মানুষকে দেখলে খাওয়ার জন্য পায়ের কাছে এসে মিউ মিউ করে ডাক দিলে লোক জন ভয় পেয়ে যেত।…
ভুত পেত্নীরা নাকি রাতের বেলায় বিড়ালের বেশে অথবা মানুষের বেশে সাদা কাপড় পড়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে।.. এ সমস্ত কথা নানি,দাদি দের কাছে ঘুম পাড়ানোর গল্প শুনে..শুনে..আমরা সবাই বড় হয়েছি।
..গ্রামের বেশীর ভাগ দরিদ্র মানুষের পায়ের জুতা ছিলো না..তাই তারা খালি পায়ে থাকতো..। কারন মানুষের খুব কষ্টের জিবন ছিলো, শুধু দু’ বেলা ছেলে মেয়েদের অন্ন জোগাতে গরীব পিতা মাতা হিমশিম খেত।
..ঘুমানোর আগে পা ধৌত করে লাড়া বা খড় দিয়ে বিছানো.. এক ধরনের তৈরী বিছানায় এই সব গরীব মানুষ ঘুমাতো..। কিছু অবস্হা সম্পন্ন লোকের ছেলে মেয়েরা জুতা পরতো,..সে সংখ্যা খুব একটা বেশী ছিল না। জুতা বলতে এক ধরনের রাবারের তৈরী সেন্ডেল অথবা গাড়ির চাকার টায়ার কেটে বানানো জুতা পড়তো..।
..পল্লী গ্রামে বিনোদন বলতে রেডীও শুনতেন কিছু কিছু মানুষ।.. তাই রাত একটু গভীর হলে সবাই শুয়ে পরতো তাড়াতাড়ি.. কেন না.. আবার সকালে ঘুম থেকে সকাল সকাল উঠতে হবে।.. কেহ রাত্রিতে কোনো আত্বীয় স্বজনের বাসায় গেলে.. হারিকেন জ্বালিয়ে পায়ে হেটে যাইতে দেখা যেত।
.. গ্রামে গাছ পালা ছিল প্রচুর.., যেমন..নারকেল, সুপারি, খেজুর গাছ, বাঁশঝাড়, বট গাছ, মাঝে মাঝে দেখা যেত। এ গুলো প্রত্যেক গ্রামে কম বেশী চোখে পড়তো রাস্তার ধারে অথবা বাগানের ভিতর।
..সন্ধ্যার পর এবং সকালে পাখির কলরবে মুখরিত হত গ্রামের পরিবেশ।.. গভীর রাতে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ বা শিয়ালের হুক্কা হুয়া ডাক শুনে মনে হত বাড়ির পিছনে হয়তো শিয়াল ডাকছে।
…হুতোম পেঁচা ও কানা কুয়া, কোয়াক পাখির ডাকে.. অনেক সময় গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে যেত। সকালে পাখির কলরব..ঘুঘু পাখির ডাক..কাকের কা..কা.শব্দ .হাসের পাক..পাক ডাক, আবার কখনও মোড়গের ডাকে.. ঘুম চোখ থেকে পালাতো…।
.. আবার সকালে ঘুম থেকে উঠে কোনো কোনো দিন শোনা যেত.. সিঁধ কেটে চোর কোনো বাড়ির থালা বাসন, কাপড় চোপর, দামী গহনা,গরু চুরি করে নিয়ে গেছে। গরীব অসহায় মানুষের কান্নার রোলে.. আকাশ বাতাস ভারী হয়ে যেত…।
যে সব কৃষকের জমি জমা বেশী ছিলো.. তারা সকালে লাঙল জোঙাল কাঁধে নিয়ে.. গরু সহ মাঠের দিকে যেত.. জমি চাষ করার জন্যে। সকাল বেলা মাঠে যাওয়ার আগে.. রাখালেরা গরুকে পেট ভরে খাওয়ানোর পর…যে খড় অবশিষ্ট থাকতো তাতে আগুন ধরিয়ে.. শরীর গরম করার জন্য প্রচন্ড শীতে.. আগুন পোহাতো।
..বাড়ির আশে পাশের গরীব লোকের ছোট ছোট ছেলেরা তাতে যোগ দিতো.. গল্প গুজব করে আনন্দে সময় কাটাইতো। আমরাও মাঝে মাঝে…যোগ দিতাম আগুন পোহানো শেষ হলে.. সেই ছাই কারো গায়ে নিক্ষেপ করে তাকে রাগান্বিত করতাম,.. সেও আমাদের গায়ে আগুন সহ ছাই ভস্ম ছুড়ে মারতো।
..সে কি যে আনন্দ পেতাম আমরা সবাই.. সেদিনের সেই ফেলে আসা দিনের ছাই..,ধুলো মাখামাখি খেলার কথা এখনো মনে হলে আমরা সবাই সেই পুরনো দিনের ফেলে আসা অতীত স্মৃতিতে হারিয়ে যাই। দিনের বেলায় আবার এক সাথে সবাই পুকুরে…পানি ছিটিয়ে স্নান করা.. কত যে আনন্দের ছিলো..সেই দিন গুলো..এখনো মনে পড়ে।
সারা দিন মানুষের কোলাহল..কাজের শান শুন শব্দ,…চাল ছাটাই করার জন্য ঢেকির শব্দ অথবা রাখালের রাখালিয়া গানের মধুর সুরে মানুষের দিন কেটে যেত। গভীর রাতে মালটানার জন্য গরুর গাড়ি, মহিষের গাড়ির চাকার শব্দ শোনা যেত প্রতিদিন.. অথবা.. সারা রাত রাইচ ও আটা ভাঙ্গানো মিলের ধুপ ধুপ শব্দ কত যে শোনা যেত রাতের বেলায়।
প্রতি রাতে ডাক হরকরা বা রানার.. এক হাতে একটা হারিকেন,..বল্লম,..কাঁধে জরুরী রাষ্ট্রীয় কাগজ পত্র…, চিঠি, মানি অর্ডারের ব্যাগ কাধে নিয়ে.. ঘন্টা বাজিয়ে চলতেন, আর বলতেন হুশিয়ার সাবধান.. রানার চলেছে.. আবার বলতেন হুশিয়ার সাবধান।.. এভাবে তারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ডাক পৌছে দিতেন। এটা ছিলো রানারের নিত্য দিনের কাজ। এখন আর এগুলো দেখা যায় না। সময়ের সাথে যুগের সাথে সব কিছু পরিবর্তন হয়েছে।
..ছোট বেলার শীতের সকালে আগুন পোহানো, খরের বিছানা, পুকুরে দল বেধে সাতার কাটা, খেজুরে রস, পাটালী গুড়, দই, মুড়ি মোয়া, নারকেলের নারু,গোয়ালার খাটি গরুর দুধ, শীতের পিঠা, রাখালের বাঁশির সুর আজ কোথায় হারিয়ে গেল? এখনো পুরনো স্মৃতি মনে হলে আবেগে আপ্লূত হই।
মোঃ আনিছুর রহমান
২৭/০৫/২০২২.4 Comments
Friends
Shubha-Jit-Datta
@shubha-jit-datta
Raju Barua
@raju-barua
রিফাত মাহমুদ
@rifat-mahmud
ফারুক আব্দুল্লাহ - Faruq Abdullah
@faruq-abdullah
সাকিব-উন-নবী দীপ্ত (নির্বাক)
@sakib-un-nabi-dipto
Kazi Adam
@kaziadam
এম.আর মুহাম্মাদ ইস্রাফীল
@misrafil420
মোঃ আরিফুল ইসলাম
@ammouriful
শাহাদাতুর রহমান সোহেল
@sr-sohel



ফেলে আসা দিনগুলি ভোলা যায় না। অনেক শুভকামনা।