Profile Photo

আবির হাসান সায়েমOffline

  • Abir-Hassan-Sayem
  • #ধারাবাহিক
    একমুঠো জোনাকি (পর্ব-২০)
    ~ আবির হাসান সায়েম

    ঘুম ভাঙল টুংটুং শব্দে। কে যেনো অনবরত বেল বাজাচ্ছে। আমি উঠে বসলাম। নাবিলা আমার পায়ের দিকে মাথা দিয়ে গোল হয়ে শুয়ে আছে। স্নিগ্ধ সূর্যের আলো এসে পরেছে তার মুখে। দেখে বুঝার কোনো উপায় নেই মেয়েটা শ্যামলা। আলোয় জ্বলজ্বল করছে তার মুখ। কপালে একটা টিপ পরলে বেশ লাগত। কি থেকে কি ভাবছি, নিজের উপর বিরক্ত লাগছে। আমি উঠে গিয়া দরজা খুললাম। শিলা দাড়িয়ে আছে। চোখের নীচে কালি পরেছে। বিয়ের আগে সব মেয়েরই চোখের নীচে কালি পরে৷ তারা বিয়ের আগের কয়দিন রাতে ঘুমুতে পারে না। তারপর পার্লারে দুই থেকে তিন ঘন্টা লাগিয়ে শুধু এই কালো দাগ ঢাকে। আমি একটু সড়ে গিয়ে বললাম,
    “ভিতরে আয়। ”
    শিলা সোজা আমার ঘরে চলে গেলো। আমিও গেলাম শিলার পিছু পিছু। নাবিলা তখনো ঘুমুচ্ছে। শিলা আমার দিকে কঠিন চোখে একবার তাকিয়ে তারপর নাবিলাকে সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল,
    ” ওঠ। জন্মের ঘুম ঘুমিয়েছিস।”
    নাবিলা ধড়ফড় করে উঠে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে আমার আর শিলার দিকে তাকাচ্ছে। কিছুই বুঝতে পারছে না, ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠলে চিন্তা জগৎ এলোমেলো লাগে। শিলা আমার দিকে ফিরে বলল,
    “তুই কি এইখানেই ঘুমিয়েছিলি?”
    “হ্যা। ”
    “একই খাটে?”
    “হু। কিন্তু তুই যা….
    আমার কথা শেষ করার আগেই শিলা নাবিলার দিকে ফিরে শান্ত গলায় বলল,
    “তুই গিয়ে গাড়িতে বস, আমি আসছি৷ ”
    নাবিলা চলে গেলো। শিলা গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। আমি চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বললাম,
    “বস। তুই যা ভাবছিস তেমন কিছুই হয় নি। ”
    ” না বসব না। তোর সামনে দাড়াতেও আমার ঘিন্না করছে। অনেক কথা বলতে এসেছিলাম। কিন্তু এখন তাও বলতে ইচ্ছে করছে না। শুধু যতটুকু না বললেই নয়, ততটুকু বলছি। এইটা পড়, যতটুকি আন্ডালাইন করা অতটুকু পড়বি। ”
    আমি আগে খেয়াল করি নি। শিলার হাতে একটা ডায়েরি ছিলো। ডায়েরিটা সে আমার দিকে এগিয়ে দিলো। খুব সুন্দর ডায়েরি, দেখেই বোঝা যাচ্ছে কারো পারসোনাল ডায়েরী। ডায়েরির কভারে লেখা, ” ডেইলি ওয়ার্ক -হাফিজা মেহজাবিন নাবিলা “।আমি শিলাকে বললাম,
    ” তোরে গোষ্ঠিতে সবাই ডায়েরি লিখে নাকি? আর আরেকজনের ডায়েরি আমি কেনো পড়ব?”
    শিলা কর্কশ গলায় উত্তর দিলো,
    “আমরা সব কাজিনরাই ডায়েরি লিখি। তোর সাথে অযথা বাক্য ব্যায় করতে ইচ্ছে করছে না৷ যা বলেছি তা কর। ”
    আমি বাধ্য ছেলের মতো ডায়েরিটা খুললাম। গোটা গোটা হাতের লেখা। শিলা মাঝের দিকের একটা পেজ বের করে দিলো। উপরে তারিখ দিয়ে নীচে লেখা হয়েছে। এর মধ্যে আন্ডারলাইন করা কিছু লাইন। আমি পড়তে আরম্ভ করলাম।
    ” আজ শিলা আপার সাথে তার একটা বন্ধুকে দেখতে হাসপাতালে গেলাম। লোকটা বরই অদ্ভুত। শিলা আপা যদিও কাজটা ঠিক করেননি, তারপরও এভাবে বকা দেয়াটা তার ঠিক হয় নি। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, শিলা আপা যখন রাগ করে কেবিন থেকে বের হয়ে গেলেন তখন আমার ইচ্ছে করল, লোকটার সাথে বসে কিছুক্ষণ কথা বলি। শিলা আপা চলে যাবার পরও আমি কিছুক্ষণ বসে ছিলাম। কিন্তু লোকটা আমাকে চলে যেতে বলায় আর বসতে পারলাম না। ”
    আমি বেশ কয়েক পৃষ্ঠা উল্টানোর পর আবার আন্ডারলাইন করা লেখা পেলাম।
    “লোকটা বাসায় এসেছেন। শিলা আপা লোকটাকে বাসায় নিয়ে এসেছেন। ধুরু বারবার লোকটা লোকটা কেনো বলছি, লোকটার নাম আবীর। পুরো নাম জানি না। শিলা আপার মুখে শুধু আবীর নামটাই শুনেছি। শিলা আপা সারাক্ষণ তাকে নিয়ে গল্প করে। আবীর এইটা আবীর ওইটা। শিলা আপার কথা শুনে মাঝে মাঝে আমারও ইচ্ছে করে তার সাথে গিয়ে গল্প করতে। ”
    এবার আর বেশি দূরে যেতে হলো না। পৃষ্ঠা উল্টেই আন্ডারলাইন করা লেখা পেলাম।
    “শিলা আপার সাথে হয়তো আবার তার ঝগড়া হয়েছে। এখন তিনবেলাই খাবার আমি নিয়ে যাই। বিকেলে তার সাথে গল্প করতে যাই। তার সাথে গল্প করতে আমার খুব ভাল্লাগে। কি সুন্দর করে হাসেন, ইচ্ছে করে ঠোটটা একটু ছুয়ে দেখি। আমি রাতে যখন তিনি ঘুমিয়ে যান তখন তার রুমে গিয়ে বসে থাকি। মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে যখন জোছনা এসে তার মুখের উপর পরে তখন দেখতে কি যে অপূর্ব লাগে। তিনবার আমার সাথে তার চোখাচোখি হয়েছে। আমার এতো লজ্জা লেগেছিলো। আমি পালিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গিয়েছি। জানি না কেন এমন হচ্ছে, আমার একটু পর পর তাকে দেখতে ইচ্ছে করে।আমি একটু পর পর এসে তার রুমে উঁকি দিকে যাই। এখন ভাইয়্যা বলে ডাকতে ইচ্ছে করে না। ইচ্ছে করে তুমি বলে ডাকি। বিয়ের পর নিশ্চয়ই ভাইয়্যা ডাকতে হবে না। ধুর ছাই কি ভাবছি এইসব। ”
    দুই পৃষ্ঠা উল্টানোর পর আবার আন্ডারলাইন কথা লেখা পেলাম। কয়েকটা অক্ষর একটু ছড়িতে গেছে। চোখের পানি পরে হয়তো এমন হয়েছে৷
    ” সে এমনটা কেনো করল? আমাকে বললেও তো হতো। তিনি কেনো শিলা আপাকে বললেন,আমি তার রুমে গভীর রাতে গিয়ে বসে থাকি? শিলা আপা আমাকে অনেক বকেছেন, থাপ্পরও দিয়েছেন, আমার ততটা খারাপ লাগে নি। কিন্তু যখন বললেন, আমি আর ওই ঘরে যেতে পারব। আমার বুক টুকরোটুকরো হয়ে গেলো। ইচ্ছে করেছে বলি যে, আমি তার কাছে যাবো না তো কে যাবে? আমার শুধু তাকে দেখতে ইচ্ছে করে। বিকেল হলেই তার সাথে গল্প করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কিছুই করার ছিলো না। আমি মাঝে মাঝে তার রুমে উঁকি দিতাম। প্রায় সময়ই দেখতাম জানালার সামনে তিনি বসে আছেন। উদাস মনে আকাশের দিকে চেয়ে আছেন। ইচ্ছে করে তার মাথাটায় হাত বুলিয়ে দেই। আমাদের যখন একটা বাবু হবে তখন তার কোলে বাবুটাকে বসিয়ে দিবো। দু’জনে মিলে আকাশ দেখবে, জোছনায় ভিজবে৷ ”
    পাতা উল্টাতে হলো না। নীচেই আন্ডারলাইন করা লেখা পেলাম।
    ” তিনি তার বাসায় চলে গিয়েছেন। তাকে সারাক্ষণ দেখতে ইচ্ছে করে৷ মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে তার বাসায় চলে যেতে। আজ সেই সুযোগ হয়েছে। ফরিদ এসে তার জন্যে খাবার নিয়ে যেতো কিন্তু ফরিদ অসুস্থ। বেচারার অনেক জ্বর উঠেছে। দেখতেই মায়া লাগে। আজ আমি খাবার নিয়ে যাবো তার বাসায়। তাকে প্রাণ ভরে দেখব। আকাশটা খুব মেঘলা। আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে, আমি তার বাসায় গিয়ে আটকা পরব। ঝড়ের কারণে আর ফিরতে পারব না। যদি এখন হয় তাহলে প্রাণ ভরে সারা রাত তাকে দেখতে পারব। হয়তো মনের কথাটাও বলে ফেলব। কি জানি ঝড় হবে কিনা তাকে প্রাণ ভরে দেখতে পাবো কিনা। আমরা প্রায় সময়ই যা ভাবি তা হয় না। ”

    চলবে..

    7
    4 Comments
Skip to toolbar