Profile Photo

mahamuda khaunOffline

  • mahamuda
  • Profile picture of mahamuda khaun

    mahamuda khaun

    4 years ago

    বিষয়ঃ চিঠি
    লেখনীতে মাহামুদা খাতুন

    প্রিয় পুত্র
    লোকে বলে বার্ধক্য নাকি দ্বিতীয় শৈশব। সে অনুযায়ী আমি এখন দ্বিতীয় শৈশব পার করছি। তবে তা প্রথম শৈশবের মত সবার কাছে বাঞ্ছিত না। শুনেছি আমার দুনিয়াতে আগমনের মুহূর্তে পরিবারের মানুষদের খুশির অন্ত ছিলনা। পর পর তিনটা কন্যা সন্তান হওয়ার কারণে দাদীমার কাছে মাকে অনেক কটু কথা শুনতে হয়। বাবাকে দ্বিতীয় বিয়ে করানোর জন্য তার চেষ্টার অন্ত ছিলনা। অনেক কষ্টে বাবা তা থেকে নিজেকে নিবৃত করেছেন। কত নির্ঘুম রাত আমার মাকে জায়নামাজ ভিজাতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কষ্টের পরে স্বস্তি আসে, কথাটা মোটেই মিথ্যা না। তাইতো দীর্ঘ নয় বছরের সাধনা শেষে তিন মেয়ের পর মায়ের কোল আলো করে আমার আগমন ঘটে। সেসময় বাচ্চা হওয়ার জন্য হাসাপাতালে শুধু বনেদী ঘরের লোকেরা যেত। তোমার তিন ফুফুর জন্ম বাড়ির আঁতুড় ঘরে পারিবারিক দাঈমার হাতেই হয়েছে। কিন্তু আমার সময় বাবা কোনরকম ঝুঁকি নিতে রাজি ছিলেন না। তাই শহরের সবথেকে নামী হাসপাতালে মাকে ভর্তি করানো হয়। আমার আগমনকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য সমস্ত বাড়িটা লাল-নীল মরিচবাতি দিয়ে সাজানো হয়।
    বংশের বাতি হিশাবে বেহিসাবী আদরে কেটেছে আমার শৈশব, কৈশর এমনকি যৌবনকালও। সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রেও বাবার ছিল একচোখা নীতি। তার সমস্ত সম্পত্তি আমার নামে লিখে দিলেন। বোনেরা তাতে আপত্তি করেনি। কারণ আমি যে তখন তাদেরও চোখের মণি ছিলাম।
    একদিকে আমার বিত্ত-বৈভব আর অন্যদিকে আমি ছিলাম বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। তাই মান বজায় রাখতে বাবা শহরের নামকরা ব্যবসায়ীর মেয়েকে পুত্রবধূ হিশাবে বাড়িতে আনলেন। বাবা-মা আর স্ত্রী নিয়ে ভীষণ রঙিন ছিল জীবনটা। তারপর আস্তে জীবনের আকাশে মেঘ জমতে শুরু করল। বাবা-মাকে নিয়ে তোমার মায়ের সাথে দ্বন্দ্ব বেঁধে গেল। বাবা-মাকে বাদ দিয়ে আমাকে নিয়ে আলাদা সংসার পাতল। তাদের দুজনের জন্য আমার দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আমার বোনদের কাছে ঠায় হল তাদের। যাদেরকে সম্পদ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল তারাই ছিল তাদের একমাত্র ভরসাস্থল। কাছে না থাকলেও প্রথমদিকে তাদের যাবতীয় খরচাপাতি আমিই দিতাম। তখন বাধ না সাধলেও তোমার জন্মের পর ব্যাপারটা পছন্দ করেনি তোমার মা। সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য হলেও এসব বাজে খরচ বন্ধ করার জন্য আমাকে চাপ দিতে লাগল। তখন কি বুঝেছিলাম জানিনা, তোমার মায়ের কথায় বাবা-মাকে মাসোহারা পাঠানো বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু মজার ব্যাপার কি জানো? বাবা-মায়ের মৃত্যর পর জানতে পারলাম আমার পাঠানো কোন টাকাই তাদের পিছনে খরচ করেনি আমার বোনেরা। সব টাকা তোমার নামে ব্যাংকে রেখে দিয়েছিল তারা। তবুও আমার প্রতি তাদের কোন অভিযোগ ছিলনা। একই শহরে বাস করলেও তাদের সাথে আমার কালে-ভাদ্রে দেখা হত।
    আমাদের সমস্ত মনযোগ ছিল তোমাকে ঘিরে। তোমার যাতে একরত্তিও অযত্ন না হয় তার জন্য চারটা পরিচারিকা রাখা হয়। আমাদের মূল্যবান সময় দিয়ে তোমাকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করি। দেখতে দেখতে তুমিও পরিণত বয়সে পা রাখলে। তোমাকে বিয়ে দিয়ে একটা ফুটফুটে বউ নিয়ে আসলাম। ভেবেছিলাম ছেলে-বউ না, মেয়ে হিশাবে দেখব তাকে। মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। আমরা মেয়ে ভাবলেও তোমার বউ আমাদের একদমই সহ্য করতে পারেনি। এক মাসের মাথায় শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে তোমাকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যায়। যাওয়ার সময় একমাত্র উত্তরাধিকারী হিশাবে আমার সব সম্পত্তি তোমার নামে লিখে দেওয়ার আবদার করে বসলে তুমি। আমি দিতে অস্বীকৃতি জানাই বলে তুমি সেই যে আমাকে ছেড়ে গেলে আর ফিরে আসলেনা।
    গত বছর আমি ৭৫ বছরে পা দিয়েছি। প্রাচুর্য আমাকে শান্তি দিতে পারেনি। যে কথা জানাতে তোমাকে এই দীর্ঘ চিঠি লেখা, তা হল আমার এই প্রতিদিনকার রঙহীন জীবন কিছুটা সময়ের জন্য হলেও রঙিন হয়ে ওঠে রায়হানের আগমনে। অনেক ভাগ্যগুণে এমন ছেলের বাবা হয়েছ। ও আমাদের মত কুলাঙ্গার হয়নি। দাদাভাই আমার যেমন অন্যকে সম্মান দিতে জানে তেমন নিতেও জানে। প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া এবং আসা, এই দুই সময় ও আমার কাছে আসে। তখন আমার সব কিছুর তদারকি সেই করে। বাকি সময়গুলো আমার দেখশোনার জন্য দুইজন পারিচারক নিয়োযিত আছে। তারাও আমার খুব খেয়াল রাখে।
    আমার সকল সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী ছিলে তুমি। তারই সূত্র ধরে আমার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রায়হানের নামে লিখে দিতে চাইলেও ও তাতে আপত্তি জানায়। সে বলে, তোমার বাবা মেয়েদের ফাঁকি দিয়ে তোমাকে যে সম্পদ দিয়ে গেছে সময় থাকতে এখনই তা নিয়মানুযায়ী তাদের মাঝে বণ্টন করে দিয়ে দায়মুক্ত হওয়া উচিৎ তোমার। অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করে আগুন দিয়ে উদর পূর্তি করার কোন ইচ্ছা নেই ওর। তারপর আমার অপেক্ষা না করে উকিলের সাহায্যে সবার মাঝে তাদের ন্যায্য সম্পদ ফিরিয়ে দিয়ে তবেই ক্ষ্যান্ত হয়েছে।
    ওকে দেখলে মনে হয় ও যেন আল্লাহ্‌র তরফ থেকে আমাদের জন্য পাঠান এক সতর্কবার্তা। ঘোর অমানিশায় ও এক চিলতে পূর্ণিমাও বটে।
    দীর্ঘ ১৮ বছর তোমার আমার সাক্ষাৎ হয়না। কিন্তু দাদাভাই ঠিকই তার শেকড়ের সন্ধানে এখানে এসে পড়েছে। আমরা দুজনে বাবা-মায়ের হতভাগা সন্তান। কিন্তু রায়হান তোমার সোনার টুকরা সন্তান। ওকে আগলে রাখতে কার্পণ্য কর না। পারলে একবার এস।
    তোমার হতভাগা বাবা

    9
    6 Comments
Skip to toolbar