-
গল্পের নাম “লিয়াকত”।
————————————————ছাত্রজিবনে যেমন মধুর স্মৃতি থাকে ঠিক তেমনি দুঃখ বেদনার স্মৃতিও থাকে। আজ যে গল্প ও স্মৃতির কথা বলছি সেটা এখনো আমাকে এবং আমাদের বন্ধু মহলে যথেষ্ট কষ্ট দেয়। সেই ঘটনা আমরা কোনো দিন ভুলব না,ভুলতে পারব না..।
…আমরা ৪ বন্ধু ছিলাম পাশাপাশি একই গ্রামে একই মহল্লায়। লিয়াকত,ছাত্তার, রফিক এবং আমি সহ সবাই এক সাথে ঘুরাফেরা, আড্ডা, সিনেমা, যাত্রা পালা,গান শুনা, রাত জেগে গল্প করা, মাঝে মাঝে একই বিছানায় ঘুমানো সবই হত। আবার মান অভিমান, ঝগড়াও হত। রফিক দের বাড়িতে মাইক, গ্রামোফোন ছিলো ওর বাবা রাত্রিতে বাসায় এসে আব্দুল আলিম, আব্বাস উদ্দিন, ফেরদৌসী রহমান, ফরিদা পারভীন,জগ্ময় মিত্র,হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, রূপবানের রেকর্ড বাজাতেন আমরা বন্ধুরা দল বেধে গান শুনতাম ও আড্ডা দিতাম । ওদের বাসায় কলের গানের গ্রামোফোন এবং হারমোনিয়ামও ছিল। আবার রফিকের বড় ভাই গোলজারের বড় টেপ রেকর্ডার ছিল ঐ রেকর্ডারে আশা ভোসলে, লতা মঙ্গেসকার, মান্না দে, হৈমন্তী শুকলা, বিভিন্ন নামকরা শিল্পীর গান আমরা ৪ বন্ধু রাত জেগে শুনতাম….।
..ওদের বাসায় বিনোদনের কোন অভাব ছিল না। আর একটি কথা বিরহ দুঃখের গান গুলো মধ্য রাতে মনোযোগ সহকারে শুনলে খুব ভালো লাগে এবং গান গুলো যেন হৃদয় ছুয়ে যায়। জগ্ময় মিত্রের একটি গান ” চিঠি ” তুমি আজ কত দুরে…..। এটা যে কত শুনেছি তার হিসেব নাই। যারা প্রথম প্রেমে পড়েছে বা প্রেম করছে, অথবা বিরহ চলছে তাদের কাছে এই গানটি একটা টনিক হিসেবে কাজ করে..।
…. প্রতি বছর দুই ঈদের জন্য চাতক পাখির মত অপেক্ষা করতাম কখন ঈদ আসবে আর সবাই মিলে মজা করব। ঈদের দিনে সবাই একত্রে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বড়দের সালাম করা,আশীর্বাদ নেওয়া, খাওয়া দাওয়া করে সময় অতিবাহিত করতাম।..
…কোনো কোনো দিন কার্ড খেলা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার হত। সকালে পুকুরে এক সাথে গোসল করতে যাওয়া.. বিশেষ করে শীতের দিনে কেউ খুব সহজে পানিতে নামতে সাহস করতনা আগে রোদে গাঁ গরম করে হঠাৎ কাউকে ধাক্কা মেরে পানিতে ফেলে দেওয়ার আনন্দই ছিল অন্যরকম। তার পর এক সাথে গোসল.. একজনের গায়ে অন্যজনের পানি ছিটানো ইত্যাদি। মাঝে মাঝে বাড়াবাড়ি হয়ে যেত একজন অন্যজনকে পানির নিচে মাথা চেপে ধরে রাখা। থাপ্পর, কিল, ধাক্কা ধাক্কি এর পর যথারীতি মন খারাপ।.. বিকেলে আবার খেলাধুলার সময় সব ঠিক হয়ে যেত….।
…প্রতি মাসে দু’ একদিন পাড়া মহল্লায় নারকেল,ডাব, পেয়ারা, আতা,খেজুরের রস, পেঁপে, আখ চুরি করে সবাই আনন্দ করে খেতাম। এগুলো সবই চুরি করা হত আত্বীয় স্বজনের বাড়ী থেকে।
মাছ চুরি করার মত ঘটনাও ঘটত…।….আত্বীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী কমবেশী জানতো এগুলো আমাদের কাজ। কেউ কিছু বলত না, মাঝে মাঝে কাউকে বলতে শুনেছি এগুলো ঐ শয়তান দের কাজ। ওরা ছাড়া আর কে করবে..। খুবই উপভোগ্য.. দারুন সময় কাটত আমাদের এ সব করে।
আমার মনে হয় কিশোর বয়সে কম বেশী সবার জিবনে দুই চারটি ঘটনা আছে যেটা মনে পরলে এখনো হাসি পায়..।
….রফিক পড়ত গোটেংড়া প্রাইমারী স্কুলে আর আমরা ৩ জন বরাট প্রাইমারী স্কুলে। বিকেলে আবার ৩ জনের দেখা,একত্র হওয়া, হা- ডু- ডু, দাঁড়িয়াবান্দা, গোল্লাছুট,
বৌছি যথারীতি খেলাধুলা ছিল প্রতি দিনের রুটিন…।…চাঁদনি রাতে, রাত ১০-১১ টা পর্যন্ত খেলাধুলা আড্ডা হত। এর পর বাসায় আবার আড্ডা মেরে ক্লান্ত হয়ে ঘুমানো। রফিকের ফুটবলের দিকে একটু ঝোক ছিল বেশী, ও টুকু, বকু,মোজাম্মেল, ফজলু, লাল,মাসুদ, লালটু,নিরাঞ্জন, রাঙা,ওদের সাথে কাশিনাথপুর মাঠে নিয়মিত খেলত..।
….আমরা প্রাইমারী পাশ করে সবাই কাশিনাথপুর স্কুলে ভর্তি হলাম। আমি, রফিক বিজ্ঞান বিভাগে আর ছাত্তার কমার্স বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। অন্যদিকে লিয়াকত আমাদের পরম ভাই/ বন্ধু সংসারের কিছু সমস্যার কারনে লেখাপড়া বেশিদুর এগুতে পারেনি। ওর কাশিনাথপুর স্কুলের ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল… ।
…. কিন্তু ও ছিল খুব মেধাবী প্রাণ চঞ্চল সহজ সরল একজন মানুষ। লিয়াকত দের বাড়িতে শাড়ির ফ্যাক্টরী ছিল। ও ফ্যাক্টরীর প্রডাকশন, বিপনন, শাড়ির নক্সা,ডিজাইন সবই ওর হাতে হত। ওর হাতের ছুয়ায় শাড়ী গুলো যেন বেনারসী শাড়ি হয়ে যেত। ওদের শাড়ি ফুলবাগানের খলিফা বাড়ির সাইদার কিনে বাজারে বিক্রি করত। লিয়াকত পারিবারিক এবং ব্যবসার কারনে আমাদের থেকে একটু দুরে সরে গেলেও নিয়মিত ওর সাথে সব কিছু আগের মতই চলতো..।
….আমাদের আড্ডা দেওয়া, ঈদের পরে শাহজাদপুর গিয়ে হলে সিনেমা দেখা, বাসের ছাদে চড়ে হৈ হুল্লোড় করে বাড়িতে ফিরে আসা সবই চলছিল আগের মত।
আমাদের ৪ বন্ধুর ঘুরা ফেরা সিনেমা দেখা এবং বিনোদনের নব্বই ভাগ খরচ ওর পকেট থেকে হত। এর জন্য লিয়াকতের কোনো মন খারাপ হত না বরং ও খুশী হত আরো বেশী…।….যেহেতু অল্প বয়সে ব্যবসায় প্রবেশ করেছিল তাই টাকা খরচ করতে ওর কোনো সমস্যাই হত না। অল্প বয়সে বিয়ে করতে হয়েছিল মাকে সংসারে সাহায্য করার জন্য। আমরা সবাই ধুমধাম করে ওকে বিয়ে করিয়ে দিয়ে ছিলাম। বিয়ের কিছুদিন পরে একটা ছেলে সন্তান জন্ম হয়েছিল। আদর করে সন্তানের নাম রেখেছিল সাহেব..।
….আমার মেট্রিক পরীক্ষার আগে ও আমাকে ডিসেকশন বক্স কিনে দিয়েছিল প্রাকটিক্যাল করার জন্য সেটির দাম আমি ওকে কোনো দিন দিতে পারি নাই। মাঝে মাঝে ও আমাদের সবাইকে সাহায্য করতে কোনো প্রকার কার্পন্য করত না। এক কথায় লিয়াকত উদার মন মানুসিকতার মানুষ ছিলেন…. ।
…. ব্যবসা বাণিজ্যের কারনে ওকে প্রতিমাসে নারায়নগঞ্জ, আতাইকুলা,শাহজাদ পুর, বাবুরহাট যেতে হত।
সেদিন খুব ভোরে রিক্সাযোগে কাপড়ের গাইট সহ তিন ভাই যাচ্ছিলেন আতাইকুলার হাটে। ঐদিন ছিল রবিবার ঠিক কাশিনাথপুর জনতা ব্যাংকের সামনে একটি ট্রাক গাড়ী ওদের বহন করা রিক্সা কে সজোড়ে ধাক্কা মারলে ৩ ভাই তিন দিকে ছিটকে পড়ে। আমি ঘুম থেকে উঠে খবর শুনার পরে দৌড়ে ঘটনাস্হলে গিয়ে দেখি বড় ভাই আবুল হোসেন, গুরতর আহত আর ওকে তেমন গুরতর মনে হচ্ছিল না, অন্য ভাই সাবেক মেম্বার কদ্দুছ অক্ষত ছিল। লিয়াকত আমাকে বলল,.. বড় ভাই আবুল হোসেনকে ঢাকায় নিয়ে যেতে….।…..আমি সকালে হাত মুখ না ধুয়ে শুধু লুঙ্গি শার্ট পড়ে ঘটনা স্হলে গিয়েছিলাম সবাই আমাকে ওর বড় ভাইকে নিয়ে গাড়িতে ঢাকায় পাঠিয়ে দিলেন।
আমরা যথা সময়ে ঢাকা মেডিক্যালে পৌছি এবং ডাক্তার রোগীকে দেখে বললেন, সে বিপদ মুক্ত। আমি ঐদিন রাতেই কাশিনাথপুর ফিরে যাই এবং শুনি লিয়াকতকে পাবনা মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়েছে। কারন আমরা যাওয়ার পর ওর রক্ত বমি হয়েছিল….।….১৯৮৭ সালের ২০শে এপ্রিল, (৬ই বৈশাখ), এরশাদের শাসন আমল পাবনাতে স্হাস্হ্যমন্ত্রী হাসপাতাল পরিদর্শনে আসবেন তাই রোগীর কাছ থেকে নিকট আত্বীয় দেরকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মন্ত্রী চলে যাওয়ার পরে দেখা গেল ওর নিঃশ্বাস বন্ধ ও আর বেঁচে নেই…। লাইফ সাপোর্ট না থাকাতে ওর মৃত্যু হয়েছে।
…এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল একটি জিবনের অধ্যায় একটি পরিবার একটি সংসার। সন্তান হয়ে গেলেন এতিম, স্ত্রী হলেন বিধবা, মা বাবা হলেন সন্তান হারা।
সেই দিনের ঘটনা আমরা আজও ভুলতে পারিনি। লিয়াকতের অকাল প্রয়ান,,, লিয়াকতের কথা মনে পড়লে মাঝে মাঝে আমাদের ঐ ঘটনা মনকে পিড়া দেয়। খুব কষ্ট অনুভব করি আমরা। ওর জন্য খুব কষ্ট পাই,… দুঃখ পাই… । বিধির বিধান কে খন্ডাইতে পারে… কিন্তু কারো কিছুই করার উপায় নাই। মাঝে মাঝে ওর কথা ভাবি আর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলি আর চিন্তা করি আমাদেরও তো একদিন চলে যেতে হবে…। অল্প বয়সে লিয়াকতের এ পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া মেনে নিতে কষ্ট হয়। কবির ভাষায়,
যেতে নাহি দিব হায়….
তবু যেতে দিতে হয়…।বন্ধু তুমি ওপাড়ে ভালো থেকো। বন্ধুদের পক্ষ হতে,
তোমার জন্য রইলো অকৃত্রিম ভালোবাসা আর দোয়া….।
হে বন্ধু বিদায়…..।মোঃ আনিছুর রহমান
১২/০৬/২০২২
6 Comments
Friends
Shubha-Jit-Datta
@shubha-jit-datta
Raju Barua
@raju-barua
রিফাত মাহমুদ
@rifat-mahmud
ফারুক আব্দুল্লাহ - Faruq Abdullah
@faruq-abdullah
সাকিব-উন-নবী দীপ্ত (নির্বাক)
@sakib-un-nabi-dipto
Kazi Adam
@kaziadam
এম.আর মুহাম্মাদ ইস্রাফীল
@misrafil420
মোঃ আরিফুল ইসলাম
@ammouriful
শাহাদাতুর রহমান সোহেল
@sr-sohel




সুন্দর