Profile Photo

প্রদীপ্ত দে চৌধুরীOffline

  • Pradiptadey12006024
  • গল্পঃ সময়স্রোতের জীবন

    আজকে থেকে দুদিন আগের কথা বলছি। অফিসের সামনে প্রাইভেট কারে উঠতে দেখলাম একজন মহিলাকে। তার সাথে দুটো বাচ্চা আছে- ছেলেটা বড়, মেয়েটা ছোট। মহিলার গায়ে কাতান শাড়ি। বার্ধক্যে স্বাভাবিক রেখার খেলা চোখে মুখে,আঁচলের ঘোমটার বিপরীতে চুলগুলো কমে গেছে বুঝতে পারা যায়- ওই মহিলাকে চিনতে পারলাম আমি। আমার একসময়কার বড্ড আপন মানুষ ছিল সে।

    সাদেক ভ্রু কপালে তুলে জিজ্ঞেস করলো, কি বলছেন – ছিল – এখন নেই-মানে-
    – উহু! নেই। ও বড্ড আগের কথা। বলছি, আগে একখিলি পান খাওয়াও।

    সাদেক পাশ কেটে যাওয়া একটা লোককে ডেকে এক খিলি পান নিলো। সাধারণত ৫ টাকা- ট্রেনে উঠার জন্য বাড়তি ৫ টাকা। বুড়ো লোকটি পান নিয়ে মুখের এককোণে রেখে চিবোতে লাগলেন – চোখ বন্ধ করে। তারপর গব গব স্বরে বললেন, সাদেক আমি তোমার চেয়ে বয়সে বড়। বয়সে বড় হলেই কাউকে কেন সম্মান দিতে হয় তা তুমি বুড়ো হলে বুঝতে পারবে। দুনিয়ার বেশিরভাগ ভুল তুমি করে ফেলেছো, অভিজ্ঞতার একটা পাহাড় তোমার ভেতরে, একটা ঘটনা দেখেই তুমি বুঝে ফেলতে পারো- এর পরে কি ঘটতে চলেছে। তারচেয়েও বড় কথা- তুমি বুঝতে পারো, এই পৃথিবীর সবকিছুই পরিবর্তন হয়- কাউকেই ধরে রাখা যায় না, স্থির অপরিবর্তিত করে রাখা যায় না। সময় মানুষের চিন্তা- চেতনা-পছন্দকে বদলে দেয়। এ এক ভয়ানক সুন্দর ব্যাপার!

    সাদেকের কলিগ হয় বুড়ো লোকটি। সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট। এইযে সময় পরিবর্তন আর তার সাথে চিন্তা চেতনা পরিবর্তন -এই কথাটি উঠেছে সাদেকের থেকেই। অফিসের কাজে সাদেক আর তার সিনিয়র বস যাচ্ছেন দূর শহরে। সাদেক একটু বইপড়ুয়া মানুষ ছিল আজীবন- তার ঘরে বিশাল একটা শোকেসে বিশাল সংখ্যক বই। তবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে তাতে নতুন বই নেই- দশ বছর আগে আপডেট হয়েছিলো শোকেসটা, তারপর থেকে বইগুলো শুধু রাখার জন্য রাখা। কেন- কারণ সাদেকের এখন আর বই পড়া হয়না। ৮ টা- ৫টা অফিস, তারপর সংসার, বাজার, বাচ্চাদের দেখাশোনা- এখন বই পড়ার সময় কোথায়!যুবক বয়সে সাদেকের ইচ্ছে ছিল- সে কবি হবে। পাঞ্জাবি পড়ে গভীর চিত্তে মাঝে মাঝে উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকতো আকাশের দিকে। তারপর যখন চাকরি নিল, সংসার হলো- কর্পোরেট অফিসের চাপে কোথায় পালালো তার উদাসীনতা আর কোথায় সেই কবি হওয়ার তাড়না।
    দশ বছর পর কি মনে করে সাদেক কবিতার বই নিল- রেলস্টেশনে। ট্রেনে উঠবার আগে একটা বইয়ে চোখ আটকে গেল তার। একটা কবিতাসমগ্র, দশ বছর আগে শুধুমাত্র টাকার অভাবে এই বইটা কিনতে পারেনি।বইটা হাতে নিল, তারপর কি ভেবে শেষমেষ কিনে ফেললো বইটা। তার ইচ্ছে ছিল -ট্রেনে একটা দীর্ঘ যাত্রা হবে, সেখানে সে একটা দুটো করে কবিতা পড়ে ফেলবে। কিন্তু যা ভাবল সাদেক, তার কিছুই হল না। ট্রেন ঝিক ঝিক করে যখন চলতে শুরু করলো বটে কিন্তু সাদেকের কবিতা পড়া আর হয় না। সাদেক কোন কবিতাই ভালো করে পড়তে পারলো না- কিছুটার অর্থ বুঝলো না- কয়েকটা পড়ে বিষম অনাগ্রহে তার মাথাটা ধরে এল।
    সামনে থাকা বৃদ্ধ সিনিয়রের দিকে বিরক্তি নিয়ে বললো, আমি বুঝতে পারলাম না, এই কবিতার বইয়ের জন্য একসময় আমি পাগল ছিলাম! কি সব লিখেছে এতে! দুটো কবিতা পড়লাম- ছাই পাশ লাগছে সব।

    বুড়ো লোকটি হাসলেন। বললেন, সাদেক আমাদের জীবনে সময় ব্যাপারটা খুব জরুরি। সময় পালটে যায়, সাথে সাথে পালটে ফেলে আমাদের সবকিছু। সেটাই নিয়ম- সেটাই স্বাভাবিক।
    বুড়ো লোক তারপর পাড়লেন দুদিন আগে দেখা এক মহিলার কথা। পান খেতে খেতে শুরু করলেন গল্প, সাদেক তোমাকে কল্পনা করতে হবে – একটা হাসনাহেনার বাগান। ভার্সিটির ট্যুরে আমরা সেখানে গিয়েছি। সাদেক তুমি হাসনাহেনা দেখেছো কখনো?
    সাদেক মাথা নাড়ালো।
    আমি হাসনাহেনার বাগানে প্রথম নীরাকে দেখলাম। নীরাকে আগেও দেখেছি – ভালো লাগতো- কিন্তু যখন ওই বাগানে দেখলাম তাকে- আমার কাছে মনে হল তাকে এর আগে এভাবে কখনো আমি দেখিনি। আমি অবাক হয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। নীরা খুব সম্ভবত বুঝতে পারলো আমি তার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছি । আমার সামনে এসে হেসে বললো, কিরে ওমনভাবে তাকিয়ে কি দেখছিস?
    আমি আমতা আমতা করে খুব আস্তে বললাম, তোমাকে ভালোবাসি…
    বলার পরেই সম্বিৎ ফিরে পেলাম। তৎক্ষনাৎ কোনমতে বিষয় পাল্টে- হাসনাহেনা নিয়ে তাকে কিছু জিজ্ঞেস করেছিলাম। লজ্জায় কোনমতে সে জায়গা থেকে পালিয়ে এসেছিলাম।
    আমার ধারণা ছিল নীরা কিছুই শুনতে পায়নি। তার একসপ্তাহ পরে টিফিন টাইমের এক ফাঁকে বসেছিলাম কয়েকজন। বাকিরা উঠে গেলে আমি-নীরা বসেছিলাম। নীরা খুব সন্তপর্ণে বললো, সেদিন হাসনাহেনার বাগানে আমায় কি বলেছিলি আমি শুনতে পেরেছিলাম।
    আমি চোখ বড়বড় করে রইলাম। লজ্জায় আমার হাত কাঁপতে লাগল।
    নীরা মাথা নিচু করে, তর্জনী দিয়ে বুড়ো আঙুল ঘষে বললো, আমারও – অনুভূতি- একই…… আর কিছু বলল না, বোধ হয় গুছিয়ে উঠতে পারলো না। নীরা উঠে গেল।
    সাদেকের মনে হল সে হাসনাহেনার বাগান আর নীরাকে সামনাসামনি দেখছে। আঙুলগুলো মুখে চেপে বললো, তারপর? থামলেন কেন -আশ্চর্য!
    বুড়ো বললেন, নীরাকে শেষ দেখলাম এই দুদিন আগে- একটা গাড়িতে উঠছে। সঙ্গে দুটো বাচ্চা। আমাদের কথা হল। আমি তোমাকে বোঝাতে পারবো না সাদেক, আমার নিজেকে চেনা তখনও বোধ হয় বাকি ছিল। আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে যে মানুষকে দেখেছিলাম, একই মানুষ- অথচ এতটুকু কোন কিছু অনুভব করলাম না। আর দশটা পরিচিত মানুষের মতো তার সাথে আমার কথা হলো! যেন পাশের ঘরের বিদেশ চলে যাওয়া কোন বান্ধবী- অনেকদিন পরে হয়েছে দেখা।
    অথচ নীরা যখন ছেড়ে চলে গেল আরেক শহরে। আমি তখন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কখনো বিয়েশাদী করবো না। এসব কিছুই হল না- বিয়েতে বসেছিলাম আমি। একবছর পর আমার মনে হল আমার স্ত্রীর চেয়ে সুন্দরী আর ভালো মানুষ- এ পৃথিবীতে আর কেউ হতে পারে না- কেন তার সাথে আগে কখনো আমার পরিচয় হল না!
    সাদেক, এই হচ্ছে সময়। সময় বদলে যায়, সাথে সাথে আমাদেরও বদলে দিয়ে যায়। আমাদের পছন্দগুলো প্রতিস্থাপিত হয়ে যায়। অথচ আমরা গো ধরে বসে থাকি, যাকে – যেসব জিনিসকে যেতে দিলে কিছু হয় না, সেসবকে যেতে দিতে অস্বীকার করি। এখন আমি মানুষকে বলি, সময় স্রোতে ভেসে জীবনটাকে দেখতে। কারণ মানুষ জানেই না, আজকে তার কাছে যে ব্যাপারটা খুব আকর্ষণীয়- আজ থেকে ক দশক পরে সেটা হয়তো প্রচন্ড বর্ণহীন কোন কিছু! কি অদ্ভুত সুন্দর আমাদের এই জীবনটা, তাই না?

    সাদেক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ট্রেন ছোট ছোট গ্রাম পেরিয়ে শহরে যায়, দৃশ্যের বদল হয় দ্রুত- প্রতিটা দৃশ্য নতুন; এক দৃশ্যের অবতারণায় পূর্বের দৃশ্যের আবেদন স্তিমিত হয়ে আসে- এই তো বাস্তব, এই তো জীবন!

    সাদেক কবিতার বইটি ফের খোলে। তারপর কি ভেবে আলতো করে বইটা রেখে দেয় ব্যাগের ভেতরে। কর্পোরেট সাদেকের প্রকাশে কবি সাদেকের মৃত্যু হয়েছে- সময়ের এই বাস্তবিক বদল স্বাভাবিক মনে হয় তার।

    6
    3 Comments
    • সময় পালটে যায়, সাথে সাথে পালটে ফেলে আমাদের সবকিছু। সেটাই নিয়ম- সেটাই স্বাভাবিক।

    • সময় আমার কাছে অলীক মনে হলেও সময়ের গল্পগুলো ভীষণ বাস্তব লাগে। অনেকদিন পর এত সুন্দর গল্পটির জন্যে অফুরান শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা রইল লেখকপ্রিয়!

    • সময় একটা নদী। যার প্রবাহে ক্ষয়ে যায় অনুভূতি।

Friends

Skip to toolbar