Profile Photo

Ashfaqul-IslamOffline

  • Ashfaqul-Islam
  • Profile picture of Ashfaqul-Islam

    Ashfaqul-Islam

    4 years ago

    ।।নামফলক।।

    মা’কে কি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে শানু। কিছুদিন হলো, মনের ভিতরে এ কথাটিই আসছে বার বার। প্রায় চার বছর হলো মা সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন। তারপরও বাড়িতে গেলে সব সময়ই মা’কে খুঁজে পেতো সে। মা হারা সবার বোধহয় এমনই হয়। গেট দিয়ে ঢোকার সময় বাতাসে ভেসে আসতো, ‘বাবা আইছ্যাও, চলো ভিতরে তুমার আব্বা আছে। ‘ তার কন্ঠে আগের মতই অনেক আনন্দ ও খুশি। ভেতরে গিয়ে প্রথমেই আব্বার ঘর। ঘরে বসে কথা বলার সময় টের পেতো, মা দরজায় দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে, পৃথিবীর সব আনন্দ যেন তার মুখে এসে জড়ো হয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই মায়ের অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়। মা একসময় বলেই ওঠেন, ‘উপেরে যাও, হাত-মুখ ধুয়ে আসো।’ এখন শানুকে দোতলায় যেতে হবে, ফ্রেশ হয়ে এসে দুপুরের খাবার খাবে। দোতলা বাড়ির নীচতলায় আব্বা থাকেন, একজন কেয়ারটেকারও থাকে। সব ভাই-বোন বাড়িতে এলে নীচতলা-দোতলা মিলে কোন জায়গা আর ফাঁকা থাকে না। শানু রংপুরে থাকে, সকালে রওনা দিলে দুপুর ১-২টার মধ্যে পাবনা পৌঁছে যায়। পাবনা শহর থেকে রিকশায় ১৫ মিনিটের দুরত্ব। শহর থেকে খুব দূরে নয়, তবুও গ্রামের সব সৌন্দর্য্যই বিদ্যমান। এতো মায়ামাখা! তাদের বাসাটা গ্রামের ভেতর সবচেয়ে নিরিবিলি জায়গায়। রাস্তার পাশেই ছোট চাচার বাসা, তারপরই শানুদের বাসা। বাসার পেছনে ছোট্ট একটা বাগান – সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নানা ধরনের পাখির কিচিরমিচির শব্দ। কাঠবিড়ালীদের খেলাধুলা চলতে থাকে সারাদিন ধরে। মাঝে-মাঝে অনেকগুলো বেজী দেখা যায়। কখনো কখনো ‘সাত ভায়রা’ নামক পাখিগুলো আপনমনে ঝগড়া করে, সরব করে তোলে চারিদিক। বাগানের পাশেই একটা পুকুর, আর বাসার চারপাশ জুড়ে নানা ধরনের গাছ। সবসময়ই এখানে অদ্ভুত একটা শান্তি বিরাজ করে।

    ফ্রেশ হয়ে নীচে নামতে দেরি হলে, সিড়ি দিয়ে মায়ের দৌড়ে ওঠার আওয়াজ পায় শানু। মাকে সবসময় দৌড়াদৌড়ি করে কাজ করতে দেখেছে সে। ছোটোখাটো একজন মানুষ, অনেক পাতলা গড়ন। কিন্তু কাজ করার ব্যাপারে কোনো অনিহা নেই। সংসারের কাজগুলোর মধ্যে অন্যরকম আনন্দ খুঁজে পেতেন মা। তাঁর আর একটি বৈশিষ্ট্য ছিল সময়ের কাজ সময়ে করা। এজন্য তার বৌমারা অনেক সময়ই চাপের সম্মুখীন হতো। খাওয়ার সময় হলে আর দেরি করা যাবে না। সবাইকে ডাকাডাকি শুরু করতেন। একটা আনন্দময় হৈ চৈ ব্যাপার শুরু হয়ে যেতো।

    নীচে খাবার টেবিলে খাবার সাজানো হয়ে গেছে। সব ভাই-বোন খেতে বসলো। ভাবীরা সবাই ব্যস্ত খাবার পরিবেশনে। শানু টের পায়, মা দাঁড়িয়ে আছেন পাশেই। তিনি সামনে নেই, কিন্তু মনে হচ্ছে, তার নির্দেশেই হচ্ছে সবকিছু। খাওয়া শেষ হলে ভাবীরা খেতে বসলেন। মা যে চেয়ারে বসে খেতেন, সেদিকে তাকিয়ে ঝাপসা চোখে মাকে দেখে তাড়াহুড়ো করে খাচ্ছে। কি এক অদ্ভুত ব্যস্ততা বিরাজ করছে তাঁর মাঝে!

    খাওয়া শেষ হতেই নীচতলার টিভি রুমের বিছানায় গা এলিয়ে দিলো শানু। টিভি চালু করে চ্যানেল পরিবর্তন করছে। জানে, একটু পরেই মা আসবে। মাথার পাশের সোফাতে বসবেন। শুরু হয়ে যাবে নানা গল্পকথা। এতোদিনে এ এলাকায় ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা একে একে শুনবে সে। বাসার পোষা বিড়াল -কুকুরের গল্পও বাদ পরবে না। তারপর কোনো এক চ্যানেলের তার প্রিয় সিরিয়ালের কথাও বলবেন। যেন কোনো এক বন্ধু গল্প করেই যাচ্ছে। শানু একনিষ্ঠ শ্রোতা মায়ের, অসম্ভব ভালো লাগা নিয়ে তাকিয়ে থাকে। বিছানায় শুয়ে একসময় তন্দ্রার ভাব চলে আসে। ঘুমিয়ে যাওয়ায় আগে বিশ্বাস করতে চায়, মা বসে আছে তার পাশে, মাথায় হাতের পরশ পাওয়ার ইচ্ছে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ে সে।

    ছোট বেলা থেকেই শানু বেশ দূর্বল ছিলো। তাছাড়া টিটেনাস হওয়ার কারণে তাকে দ্বিতীয় বার হাঁটাও শিখতে হয়েছিলো। তাদের বাসার সামনে অনেক বড়ো মাঠ। সেখানে বিভিন্ন বয়সের বাচ্চারা খেলাধূলা করতো। দূর্বল হওয়ার কারণে বেশির ভাগ সময় তাকে খেলতে নিতো না। মা বারান্দায় বসে তার দূর্বল ছেলের দিকে খেয়াল রাখতেন। মন খারাপ করে মায়ের কাছে ফিরে আসলে স্মিত হেসে বলতেন, ‘তুমার খেলা লাগবি না, আসো’; বুকে জড়িয়ে ধরতেন। একারণেই ঐ বয়সে মায়ের সাথে তার অনেক সময় কেটেছে। টুকটাক সংসারের কাজ করে দেয়া, কাছের দোকান থেকে কিছু কিনে নিয়ে আসা – মায়ের সাথে অনেক মজার সময় কাটতো। সবচেয়ে আগ্রহের বিষয় ছিল, মায়ের মুখে ‘ঠাকুমার ঝুলি’ বা ‘রাশিয়ার রূপকথা’ শোনা। অল্প সময়ের মধ্যেই রূপকথার কোনো এক চরিত্র হয়ে ঘুরতে থাকতো মায়ের গল্পের সাথে সাথে।

    খুলনার বয়রার পালপাড়া রোডের বাসার পাশেই ছিলো ছোট্ট একটা ডোবা পুকুর। ঘরের ভেতর থেকে জানালা দিয়ে পুকুরটা দেখতো সে। বর্ষাকালে বিষয়টা ছিল অনেক আনন্দের। টিনের চালাওয়ালা বাড়ি। সুন্দর এক মনোহরা সুর সৃষ্টি হতো। বাতাসের তীব্রতার সাথে সাথে সুর-লহরীর ওঠা নামাটা মনোজগতে কি যে ভালো লাগা তৈরি করতো। ষোল কলা পূর্ণ হতো যখন পাশের রান্নাঘর থেকে খিচুড়ির সুবাতাস বয়ে আসতো। এই আবহে মায়ের হাতের সাধারণ খিচুড়ি ও সরিষার তেল হয়ে উঠতো বাসার সকলের আনন্দের অনুসংগ।

    বড়শি দিয়ে টাকি মাছ ধরতো পাশের ডোবা থেকে। মায়ের হাতের টাকি মাছ ভর্তা দিয়ে ভাঁপ-ওঠা সাদা ভাত – খাওয়ার শুরুতেই ক্ষুধা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতো। একদিন অনেক কষ্ট করে শোল মাছের পোনা ধরেছিলো শানু, গামছা দিয়ে। ডোবায় নেমে মাছ ধরার অভিজ্ঞতা খুব আনন্দের ছিল না। অল্প পানিতে নামতেই প্যাঁচপেচে নরম কাঁদায় পা ডেবে যাওয়ার বিশ্রি অনুভূতিটা এখনো মনে করতে পারে সে, সাথে বাজে একটা গন্ধ। টিপ টিপ বৃষ্টির মধ্যেই অল্প কিছু পোনা ধরেছিলো। পানি থেকে উপরে উঠলে পায়ের নিচের অংশে দু’তিনটি জোঁক দেখা গেল। মা লবণ দিয়ে দিলো, শানু অবাক হয়েছিলো রক্তমাখা জোঁকগুলোকে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে দেখে। পোনা’র চচ্চড়িটা অমৃত ছিল!

    খুলনার নদী-খাল সবখানেই জোয়ার-ভাটা হয়। বন্ধুদের সাথে খেলতে গিয়ে ডগরা মাছ ধরতো ভাটার সময়। নদীর পাড়ে কাদার মধ্যে ছোট ছোট গর্তে বাস করে ডগরা মাছ। এক গর্তে আংগুল ঢুকিয়ে দিলে অন্য গর্ত দিয়ে মাছ বেরিয়ে আসে। এ মাছ ধরা সহজ ও খুবই আনন্দদায়ক। তবে মাঝে মাঝে গর্ত থেকে নির্বিষ ডোরা সাপের বাচ্চা বেরিয়ে আসে। এই থ্রিল এখনো অনুভব করতে পারে সে। ভাগে যেটুকু মাছ পেতো, বাড়িতে নিয়ে আসলে মা খুব খুশি হতেন। মায়ের আনন্দটুকু দেখার জন্যই বার বার এই অভিযানে যেতো শানু।

    মা মারা গেলে একমাত্র খালা এসেছিলেন। খালা বয়সে মায়ের চেয়ে বড়ো। বাসায় কয়েকটা দিন থাকতে বললে তিনি তাড়াহুড়ো করে চলে যেতে চাইলেন। মায়ের এতো জীবন্ত স্মৃতির মাঝে উনি থাকতে পারছিলেন না। হ্যাঁ, জীবন্ত স্মৃতি। সংসারের প্রতিটি জায়গায় তার উপস্থিতি। পোশাক, হাঁড়ি-বাসন, তেলের শূন্য বোতল, এমনকি পুরাতন পরিত্যাক্ত বস্তা – সবকিছুতেই মাকে খুঁজে পায় শানু। বাড়িতে গেলে হাত বুলায়, মাকে খুঁজতে খুঁজতে চোখ ঝাপসা হয়ে যায় বার বার।

    মা মারা যাওয়ার পর অদ্ভুত একটা ঘটনা নিয়মিত ঘটতো। শুরুটা হয়েছিলো কুড়িগ্রামে, অফিসের কাজে গিয়েছিল। সেবার সরকারি ডাকবাংলোতে ছিলো শানু। ভোর বেলায় স্বপ্নের মতো মা এসেছিলেন তার রুমে। তীব্র দ্যুতিময় আলোতে চোখ খুলতে পারছিলো না।
    ‘বাবা ওঠো’ পরিস্কার মায়ের কন্ঠ।
    ঘুম ভেঙে গেলো। তাকাতে পারছে না, তীব্র আলোর ছটা তখনও টের পাচ্ছিলো সে। রাজশাহীর Warisan Residential Hotel এ থাকতে গিয়েও একই ঘটনা ঘটেছিলো। ঘুম ভাঙতেই শোনা যেত ফজর নামাজের আহবান – ধ্বনিত হচ্ছে আশেপাশের সব মসজিদ থেকে। এখন আর মায়ের ডাক শুনতে পায় না সে, আজান ঠিকই ধ্বনিত হয়। সময় চলে যায় নিজস্ব গতিতে।

    কি হয়েছে শানুর? নিজেকে বার বার প্রশ্ন করে সে। ক্যানো মাকে আগের মতো খুঁজে পাচ্ছে না। যতক্ষণ বাসায় থাকে নিরবে খুঁজে ফিরে। অস্থিরতা বাড়তেই থাকে। বাড়িটার শূন্যতা ক্রমশঃ গ্রাম ছাড়িয়ে পৃথিবী পরিমাণ হতে থাকে। যুক্তিবাদী মানুষ সে, নানাভাবে মনকে শান্ত করতে চায়। সব যুক্তি দুমড়ে-মুচড়ে একাকার হয়ে অশ্রু হয় প্রতিবার। সবকিছুই অসহ্য লাগে, দোতলার এতো ফাঁকা জায়গা বাতাসশূন্য মনে হয়। না, আর থাকতে পারছে না। বাইরে যেতে হবে। নীচতলায় নেমে আব্বাকে বলে, ‘চলেন, গোরস্থানে যাই’। আব্বা বই পড়ছিলেন। মুখ তুলে তাকালেন, কিছুক্ষণ দেখলেন। ‘চলো’ বই বন্ধ করতে করতে বললেন। গোরস্থানে গেলে শানুর সব অস্থিরতা দূর হয়ে যায়, নিজেকে খুব শান্ত মনে হয়। এখানেও গেট দিয়ে ঢোকার সময় শুনতে পায়, ‘বাবা আইছেও? মায়ের অনেক আনন্দ টের পায় সে। মায়ের কবর পর্যন্ত যেতে একটু হাঁটতে হয়। শানু বুঝতে পারে, মা পাশেই আছেন, খলবল করে কতোকিছুই না বলতে চাচ্ছে। কবর জিয়ারতের সময় মনে হয় তার মা শিশুর মতো আনন্দে খেলছে। সেই আনন্দে দুলতে থাকে কবরের চারপাশে ঘিরে থাকা তার প্রিয় মোরগফুলগাছগুলো। ফিরে আসার সময় একটা প্রশান্তি বিরাজ করে শানুর মনে।

    আজও কিছুটা শান্তি পেতে সে গোরস্থানে গেলো। কিন্তু গোরস্থানে ঢুকতে গেলে আগের মতো শুনতে পেলো না, ‘বাবা আইছেও?’ ভেতরে ঢুকেই বড়ো ধাক্কা খেলো।

    ‘মা কোথায়?’

    সব কবর মাটি দিয়ে সমান করে দেয়া হয়েছে। বাঁধানো কবরগুলো সব ভেঙে দেয়া হয়েছে। কবরস্থানের উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। যেখানে মায়ের কবর, সেখানে একটা নামফলক ছিলো। সেটা আশেপাশে কোথাও পাওয়া গেলো না। জিয়ারত শেষে অস্থির হয়ে খুঁজতে থাকলো। না পেয়ে বাসায় ফিরে এলো, আবারও পিছু নিলো একরাশ অস্থিরতা। যদিও কবরকে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা, সাজিয়ে রাখা বা বাঁধিয়ে রাখা কোনোটাই সে সমর্থন করে না। তারপরও কেন যেন শানু মেনে নিতে পারছে না। মায়ের প্রিয় মোরগফুল গাছ লাগানো ছিল কবরের চারপাশে, সেগুলো আজ নেই। মায়ের খুশিও বোঝা গেল না।

    রাতে আবারও অদ্ভুত এক স্বপ্ন এলো। তীব্র আলোতে শানু দেখছে, বালিয়াহালট গোরস্থানে মায়ের কবরের ওখানে কে যেন দু’হাত দিয়ে মাটি সরাচ্ছে। নিজেকে মনে হলো অনেক উঁচুতে আছে। ‘তাহলে আমি কি আকাশে ভাসছি?’ – শানু ভাবছে। ফ্লাশ লাইটের মতো সব আলো যেন ঐ মানুষটার উপরে ফোকাস করা হয়েছে। কি এক ব্যস্ততা তার, কোনো দিকে মনোযোগ নেই। সমানে মাটি সরিয়েই যাচ্ছে। শানু চিৎকার করে বলতে চাইলো, ‘তুমি কে? কি করছো?’ কোনো আওয়াজ বের হলো না। হঠাৎ লোকটার ব্যস্ততা থেমে গেলো। মাটির ভেতর থেকে কিছু একটা টেনে বের করছে। আরে ওটাতো একটা নামফলক! আলোতে চকচক করছে সাদা পাথর। এখন আরো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। লোকটা খুবই আনন্দিত। দুই হাত দিয়ে ফলকটি উঁচু করে ধরে লাফাচ্ছে। শানু আরো ভালোভাবে দেখতে চাইলো। সাথে সাথে মনে হলো উঁচু থেকে দ্রুত ভেসে নীচে নেমে এলো। অবাক বিশ্ময়ে শানু নিজেকে আবিষ্কার করলো ঐ মানুষটির ভেতরে। বাতাসে ভেসে ভেসে সে নিজের আনন্দ উদযাপন দেখতে লাগলো।

    6
    5 Comments
Skip to toolbar