Profile Photo

সালমান সাদিকOffline

  • SalmanSadique
  • Profile picture of সালমান সাদিক

    সালমান সাদিক

    3 years, 10 months ago

    গল্পঃ পলায়ন
    লেখকঃ সালমান সাদিক

    ১.
    দুইটা পুরি খেতে ইচ্ছে করছিলো খুব। কিন্তু ফুটপাতে বসে আছি চুপচাপ। আসলে খেতে মন চাইলেও পকেটে মাত্র পাঁচটা টাকা আছে। ভাবছি, একটা পুরিও তো হবে। ওইটা খেয়ে অন্তত ইচ্ছাটা মিটাই। তারপরেও ফুটপাত থেকে উঠতে মন চাচ্ছিলো না। সময়ের কাটাটা এই সময়গুলোতে খুব ধীর হয়ে যায়। সন্ধ্যার পর থেকে নিয়ে রাত দশটা এগারটা পর্যন্ত বাইরে এভাবেই বসে থাকতে হয় একা একা। ইদানিং বাসা থেকে বের হতেও ইচ্ছে করে না। কিন্তু উপায় নেই না বের হয়ে। আসলে বাসায় যে শান্তির জন্য মানুষ ফিরে যায় আমার জন্য সেই শান্তিটুকু নেই সেখানে। অতীতে যদিও এতো অশান্তি ছিলো না। কিন্তু এখন, বর্তমান বা ভবিষ্যতের সময়গুলো আমাকে খুব করে মরে যেতে উদ্বুদ্ধ করে। আসলে কি, আমি ভাবি, মানুষ কি সত্যিই বেঁচে থাকার তাগিদেই এতো দৌড় ঝাপ করে না কি আসলে বেঁচে থাকার কষ্টটা ভুলতেই নিজেকে ব্যস্ত রাখে। অবশ্য এগুলো খুব ফালতু চিন্তা ভাবনা।
    ফেলে আসা আটটা বছরের কথা মনে পড়লে ভেতরটা হু হু করে ওঠে। বৃষ্টিতে ভেজা ফুটপাতে বসে রাস্তায় পড়ে থাকা সিগারেটের ফিল্টারগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। এই মুহূর্তে দুইটা কুকুর শুয়ে আছে আমার পাশে। কুকুর দুটো পাশাপাশি শুয়ে থাকলেও মনে হচ্ছে দুটো যেন আলাদা দুই জগতের বাসিন্দা। বৃষ্টির ভয়ে লোকজন বের হয়নি আজ। রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা। দূরে কিছু ছেলে গিটার বাজাচ্ছে আর বেসুরো গলায় গান গাচ্ছে। হুটহাট দু একটা রিক্সার ক্রিংক্রিং বা গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ বাদ দিলে ওদের কোলাহলটা খুব বেশি করে কানে বাজছে। আমি নিরবে নির্জনে বসে থাকতে চাইছিলাম আসলে। কবরের নিস্তব্ধতা পেতেই মূলত এই শূন্য রাস্তায় বসে আছি। তারপরেও ওদের বেসুরো গলার গান আর ছন্দহীন বাজনা খারাপ লাগছে না।
    ফোনের স্ক্রিনটা অন করলাম। ধুর এখনও দশটাও বাজেনি। আর কতক্ষণ এভাবে বসে থাকা যায়! তা ছাড়া গতকাল দুপুর থেকে পেটে দানা পানি কিছু পড়েনি। পেটটা পাজরের হাড্ডিগুলার সাথে লেগে আসতে চাইছে। পাজরের হাড্ডিগুলা এই চাপ নিতে নিতে তাদের অসন্তুষ্টি আমাকে জানান দিচ্ছে। বাধ্য হয়েই ফুটপাত থেকে উঠে দাঁড়ালাম। মাথা সামান্য ঘুরে উঠলো আর আশপাশ কেমন অন্ধকার অন্ধকার হয়ে এলো। হাঁটতে শুরু করতেই অবশ্য সব ঠিক হয়ে এলো। ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম বাসার দিকে। ভাবছি পথে একটা পুরি খেয়ে নিবো। কিন্তু রাত তো বেশ হয়ে গেছে, এখন তো ওই তেলে ভাজা গরম পুরিগুলা পাবো না। তাই রাস্তার পাশে এক টংয়ে বসে এক কাপ দুধ চা খেয়ে নিলাম। খাওয়ার পরেই গলার কাছে কফ উঠে আসতে চাইলো। কেমন একটা বমি বমি ভাব আর মনে হচ্ছে পেটের ভেতর সবকিছু পচে গেছে। এই কফ উঠে আসার ব্যাপারটা কয়েকদিন ধরেই ঘটছে। মূলত এ জন্যই কিছু খাচ্ছি না গতকাল থেকে। খেলেই মনে হয় পেটের ভেতর সব পচে গেছে আর সব বমি হয়ে উঠে আসতে চায়। কিন্তু বমি তো হয়ই না, আর সেই সাথে অস্বস্তির মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিতে ভাত ভাত গন্ধ করা কফ গলার কাছে উঠে আসে। যতোই পানি টানি খাই না কেন এই ভাব দূর করা যায় না। এখন মনে হচ্ছে চা-টা খেয়ে ভুলই করলাম। ওর চেয়ে টাকাটা রেখে দিলেই ভালো হতো।
    আজ একটু তাড়াতাড়িই বাসায় ফিরলাম বোধহয়। নিচে গেইটে এখনও তালাটা আটকায়নি চাচা। গেইট খুলে উপরে উঠে এলাম। বাসার সামনে দাঁড়িয়ে নক করতে গিয়েও হাতটা আবার সরিয়ে নিলাম। নাহ, এতো তাড়াতাড়ি বাসায় গিয়ে করবোটা কী! তারচেয়ে চিলেকোঠায় গিয়ে বসা যাক। চিলেকোঠা বলতে সিড়ির মাথায় ছাদের সামনে যে ছোট্ট বদ্ধ জায়গাটা ওটার কথাই বলছি। ছাদে রেলিং নেই বলে সব সময় তালা দিয়ে রাখে চাচা। আমি মাঝে মাঝে ওই ছোট্ট জায়গাটায় গিয়ে বসে থাকি। এখানকার নিরবতাটা অন্যরকম। রাস্তার রিক্সা বা রাতের বেলার যে বালু সিমেন্টের ট্রাকগুলো যায় ওগুলোর আওয়াজও এখানটায় তেমন করে পৌছায় না। আর তা ছাড়া নিচের ফ্ল্যাটগুলোতে স্বামী স্ত্রীর ঝগড়া বা ছোট মেয়ের কান্নার শব্দগুলা খুব অস্পষ্ট শোনা যায়। আমার কাছে ব্যাপারটা ভালো লাগে। মনে হয়, আমি যেন কোনো অডিও শো শুনছি। কখনও চুপচাপ এইসব শুনতে থাকি বা সিড়িঘরের জানালা দিয়ে দূরের কোনো ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে থাকা পুরুষের কার্যকলাপ বা ফোনে প্রেমালাপ করতে থাকা কোনো মেয়ের অঙ্গভঙ্গি দেখি। আজকে উঠে এসে অবশ্য একজন সঙ্গী পেয়ে গেলাম। দেখি, ছাদের যে দরজাটা আছে সেটার একেবারে কোণায় গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে একটা বিড়াল। আমি আসাতেও বিড়ালটা কোনোরকম নড়াচড়া করলো না। আমি খুব আস্তে আস্তে নিঃশব্দে গিয়ে ওর পাশে বসলাম। একটা হাত ওর শরীরে বুলিয়ে দিতে লাগলাম। ও মৃদু গরগর শব্দ করে আমাকে স্বাগত জানালো বুঝি। যদিও চাঁদনি রাতের রূপালি আলোয় সবকিছু আবছা আলো-আঁধারির মাঝে লুকোচুরি করছে তবু সিড়ির মাথায় এই জায়গাটা একদমই ঘুটঘুটে অন্ধকার। আর এই আঁধারের মধ্যে বিড়ালটার চোখ জ্বলজ্বল করছে। আমার চোখও কি ওর মতো জ্বলছে? মনে হয় না। আমি তো আর বিড়াল না। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, মানুষ হওয়ার থেকে একটা বিড়াল হতে পারাটা খুবই ভাগ্যের ব্যাপার। যদিও আমার ইচ্ছা করছে, বিড়াল হয়ে যেতে। কিন্তু কে কী হবে সেই সিদ্ধান্ত তো আর তার নিজের না। বাধ্য হয়েই মানুষ হয়ে চিলেকোঠায় বসে থাকতে হচ্ছে বিড়াল হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে। যদিও বিড়ালটা মানুষ বা অন্যকিছু হতে চায় কি না সে ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। এমনকি বিড়াল হিসেবে যে তার অনুভূতি কী রকম বা তার কোনো কষ্ট বা নিরাশা আছে কি না সে ব্যাপারেও আমার কোনো ধারণা নেই। কিন্তু তবু মনে হচ্ছিলো, ইশ যদি বিড়াল হতে পারতাম!

    ২.
    একটা অন্ধকার ঘরে বসে আছি আমি। ছোট্ট টিভি স্ক্রিনে একটা সিনেমা চলছে। অবশ্য সিনেমা কি না বলতে পারবো না। নেটওয়ার্কের কারণে হোক বা অন্য কোনো কারণেই হোক স্ক্রিনটা ঝিরঝির করছে। সবকিছু কেমন ঘোলা ঘোলা আসছে। এর মধ্যে যে ব্যাপারটা বুঝতে পারছি, এক লোক সিলিংয়ে রশি ঝুলিয়ে গলায় ফাঁস দিচ্ছে। একটু পর পায়ের নিচে যে চেয়ারটা ছিলো সেটা লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দিতেই গলায় ফাঁসটা শক্ত করে আটকে গেলো আর দেহটা শূন্যে ঝুলতে থাকলো। এখনও লোকটা পা নাড়াচ্ছে অস্থিরভাবে আর গলা দিয়ে ঘড়ঘড় আওয়াজ করছে, যেমনটা জবাই করা গরু ছাগল করে থাকে। এর মধ্যেই সিলিংয়ের পাশে কড়িকাঠের দিকে স্থীর হয়ে রইলো তার দৃষ্টিহীন অক্ষী কোটর। ঘাড় ভাঙার অস্বস্তিকর আওয়াজ গায়ে কাটা দিয়ে ওঠার মতোন। এই সময়ে ক্যামেরা ফোকাস করছে কড়িকাঠে নখের খোচায় লেখা অনেকগুলো নাম। ঝিরঝিরে স্ক্রিনে অবশ্য নামগুলো পড়া গেলো না।
    টিভি স্ক্রিন ঝিরঝির করতে করতে থেমে গেলো। পুরো ঘর জুড়ে এখন শুধু অন্ধকার। অন্ধকার ঘরটাতে আমি একলা বসে আছি। ঘরটায় কি কোনো জানালা আছে?
    আমি অন্ধকার ঘরটার দেয়ালে দেয়ালে হাতড়াতে লাগলাম। কিন্তু কোনো জানালা খুঁজে পেলাম না। তবে একটা দরজা পেয়ে গেলাম। দরজাটা খুলবো কি না ভাবছি। যদ্দুর মনে পড়ে আজ পূর্ণিমা। বাইরে চাঁদের রূপালি আলোয় সবকিছু খুব সুন্দর লাগার কথা। কিন্তু এটাও অবশ্য জানি না, যে এখন রাত না দিন। দরজাটা খুললে অবশ্য জানা যেতে পারে। কিন্তু কী করবো বুঝতে পারছি না।
    দীর্ঘ আটটা বছর কারাবন্দী থাকার যে অনুভূতি সেটা আমাকে মুক্ত স্বাধীন ভাবতে দেয় না। যদিও কারাগারে থাকতে যখন ছোট্ট মাঠটায় দিনের বেলা আমাদের ছেড়ে দেওয়া হতো কিছু সময়ের জন্য তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে বিশাল জগতটার কথা ভাবতাম। খুব ইচ্ছে করতো এই জগতে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে। রাতে যে রুটি দিতো ওরা, তা অল্প বাঁচিয়ে রাখতাম। মাঠে এসে এক কোণে রুটির টুকরো ছড়িয়ে দিলে কাক চড়ুই আসতো মাঝে মাঝে। খুটে খুটে রুটির টুকরোগুলো খেতো ওরা। কাছে গেলেই উড়ে পালিয়ে যেতো। ওদের উড়ে যাওয়া দেখতাম তখন। এই ছোট্ট কাজটা আমার রুটিনে পরিণত হয়েছিলো। আর রাতের বেলায় ছোট্ট সেলের মধ্যে নির্ঘুম বসে থাকতাম। সেলের দক্ষিণপাশে লোহার শিক দেওয়া ঘুলঘুলি মতো ছিলো। কখনো বৃষ্টি হতো আবার কখনো দক্ষিণা হাওয়া বইতো। ওই শিক গলে হাত বের করা সম্ভব হতো না। তারপরেও শিক ধরে চেয়ে থাকতাম। মেঘলা দিনে চাঁদ দেখার আশা আর চাঁদনিরাতে রাতের আকাশে বাদুড়ের উড়ে যাওয়া দেখতে চাইতাম। এই দীর্ঘ আটটা বছরে খুব করে চাইতাম খোলা আকাশের নিচে পৃথিবীর বুকে হেঁটে বেড়াতে।
    দরজার নবে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। খুলবো কি না ভাবছি এখনও। খুলতে ইচ্ছে করছে না। আবার অন্ধকার এই আবদ্ধ ঘরটাতে থাকতেও ইচ্ছে করছে না। পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে ঘরটা ছেড়ে। কিন্তু উপায় নেই। জানি, ওরা আমাকে দেখছে। আমি যদি পালিয়ে যেতে চাই তাহলে ওরা আমাকে ধরে নিয়ে আবার কারাগারের সেই ছোট্ট সেলটাতে ফেরত পাঠাবে। এই যে দরজা খুলতে পারার স্বাধীনতা, এটাও হারাবো তখন। কিন্তু আসলেও কি দরজা খুলতে পারার শক্তি আমার আছে বা স্বাধীনতা! আমি এখনও নব ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। যদিও দরজার ওপাশে উন্মুক্ত পৃথিবী আর লোক কোলাহলে ভরপুর রাস্তাঘাট নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সেই কোলাহলে আমি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারি না। কেউ আমার দিকে ফিরে চায় না। আমার অস্তিত্ব আছে কি নেই সেটা নিয়েই তখন সন্দিহান হয়ে যাই।
    আগপিছ ভাবতে ভাবতেই নব ঘুরিয়ে দরজাটা খুলে ফেললাম। শত দ্বিধা ঝেড়ে বাইরে পা দিলাম। কিছুদূর হাঁটতেই বুঝতে পারলাম সবকিছু আগের মতোই অন্ধকার নিরব নিষ্প্রাণ। আরো কিছুদূর যেতে যেতে মনে হলো আমি শূন্যে ঝুলছি। পায়ের নিচে কোনোকিছুর অস্তিত্বই টের পাচ্ছি না। হাওয়ায় ভাসছি যেন। যেতে যেতে একটা সময়ে শূন্য থেকে পড়ে যেতে লাগলাম। পড়ছি তো পড়ছিই। মনে হচ্ছে কোনো তলহীন গহ্বরে আমি। ভাসছি বা ঝুলছি অথবা পড়ছিই হয়তো এখনও নিচের দিকে। কিন্তু আশপাশে কোনো বাতাস নেই। গাঢ় অন্ধকারে আমি শুধু পড়ছিই।

    ৩.
    আমার অপরাধটা কী? এই প্রশ্নটা শুরুর দিকে বারবার মাথায় আসতো ঘুরে ফিরে আর আমি পাগল হয়ে যেতাম। প্রথম দিকে আমি কয়েকবার পালানোর চেষ্টাও করি। কিন্তু প্রত্যেকবারই ধরা খেয়ে যাই আর অন্ধকার সলিটারি সেলে আটকে থাকতে হতো মাসের পর মাস। প্রথম বছরটা ছিলো এমনই। বেশিরভাগ সময় কেটেছে সলিটারি সেলের অন্ধকার নির্জনতায়। আমি কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারছিলাম না। অসহ্য নির্জনতা আমাকে উন্মাদ করে তুলতো। কিন্তু এই জেলের ভেতর উন্মাদের জন্যও যেন বিশেষ কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিলো না।
    এভাবেই চলতে থাকতাম হয়তো এবং এক সময়ে গিয়ে মরেই যেতাম। কিন্তু এই সময়ে কিছু বন্ধু জুটেছিলো, যারা জেলের ভেতরে খুব পরিশ্রম আর খাটাখাটনি করে ছোট্ট একটা পাঠাগার গড়ে তুলেছিলো। সপ্তায় একদিন করে চেইক হতো প্রতিটা সেল আর এরপরই ট্রলিতে করে বই নিয়ে আসতো এক কয়েদি। সবাই তাকে জেরেমায়াহ বলে ডাকতো। অদ্ভুত প্রাণশক্তি আর ভাবালুতায় সে জেলের মধ্যেই সময় কাটাতে শিখে গেছে। বই পত্তর নিয়ে ডুবে থেকে সে পার করে দিতো জেলের একঘেয়ে দিনগুলো। তো একবার এমনই এক চেইকের পর আমার সেলের পাশ দিয়ে যেতে যেতে আমার হাতে জোর করে একটা বই ধরিয়ে দেয় সে। আমার যদিও বই পড়ার নেশা কোনোকালেই ছিলো না। অবশ্য আমার জীবনটাই তো শুরু এই কয়েদখানার চার দেয়ালের মধ্যে। বইটা হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতেই মনে হলো আর কী-ই বা করার আছে!
    বইটা পড়তে শুরু করলাম। এটা ছিলো সুন্দর একটা উপন্যাস। উপন্যাসটা আমাকে আটকে রেখেছিলো কাহিনির ভেতর। দিনে বাইরে মাঠে বেঞ্চে বসে বা এক কোণে দেয়ালে ঠেস দিয়ে পড়তাম আর রাতের বেলা সেলের বাতি নিভিয়ে দেওয়ার পরও করিডোরের আবছা আলোয় পড়তে থাকতাম। উপন্যাসটা আমার সামনে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করে দিলো। কারাগারের একঘেয়েমি আর বদ্ধতার ভেতর এক নতুন জগতের সন্ধান পেলাম আমি। বইটা দু দিনেই শেষ করে ফেলি। তারপর জেরেমায়াহর সাথে দেখা করে বলি, ভাই, বইটা তো দারুণ ছিলো। এরকম আর কোনো বই কি আছে তোমার কাছে? জেরেমায়াহ মৃদু হেসে বলল, আসো আমার সাথে। তার পিছে পিছে চলে গেলাম পাঠাগারে। ছোট্ট ঘরটায় সাকুল্যে পঞ্চাশটার মতো বই ছিলো। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছিলো, এত্তো বই! আমি হা করে তাকিয়ে ছিলাম বইয়ের আলমারিটার দিকে। এভাবেই শুরু হয় আমার বই পড়া আর জেরেমায়াহর সাথে বন্ধুত্ব।
    জেরেমায়াহ ভাল লিখতে জানতো। মাঝে মাঝেই তার লেখা পড়তে দিতো আমাকে। তার লেখার মধ্যে এক ধরণের দীর্ঘশ্বাস লুকানো থাকতো। লেখাগুলো যেমন স্বপ্ন দেখাতো তেমনি স্বপ্নের রঙগুলোকে কেড়ে নিতো। তার লেখার মধ্যে একটা সাদামাটা ভাব ছিলো। জীবনটা যে খুব আহামরি কিছু না আর এখানে খুব বেশি চাওয়া পাওয়াও যে থাকা উচিত না এটাই তার লেখার মধ্যে খুঁজে পেতাম।
    জেরেমায়াহর একটা লেখায় এক ইদুরের কথা এসেছিলো। ইদুরটা থাকতো জেরেমায়াহর সেলে। তারা দুজন একসাথে খেতো, একসাথে ঘুমাতো। কিন্তু একদিন সেল চেইকের সময় এক প্রহরী ইদুরটাকে মেরে ফেলে। জেরেমায়াহকে তারা বলে, ইদুর একটা বিপজ্জনক প্রাণী, ভয়ংকর সব রোগ ছড়ায় আর কাপড় চোপড় সব কেটে ফেলে। জেরেমায়াহ বিষয়টা মেনে নিতে পারেনি। তাই সে ওই লেখার মধ্যে ব্যঙ্গ করে লিখেছিলো, সব প্রাণের মধ্যেই বিপদ আছে। আমাদের উস্তাদরা আমাদেরকে প্রাণের বিপদ থেকে রক্ষা করতে সদা তৎপর। এমনকি ইদুর কিংবা পিপড়াও যেন আমাদের ক্ষতি করতে না পারে, সে বিষয়েও উস্তাদরা সজাগ দৃষ্টি রাখেন।
    আমরা জেল প্রহরীদেরকে উস্তাদ বলে ডাকতাম। যদিও এখানে সবার সাজা আট বছর করে নির্ধারিত তারপরও কেউ কেউ আরো দু তিন বছর সাজা ভোগ করে যেতো। এর পেছনে ঠিক কী কারণ ছিলো সেটা যদিও আমি কখনো বের করতে পারিনি। তবে আমার মনে হয় প্রতি সোমবারে আমাদেরকে যে কাউন্সিলিং করা হতো সেটা এই স্বেচ্ছা কারাভোগের অন্তর্নিহিত কারণ হতে পারে। অবশ্য যারা সিনিয়র কয়েদি ছিলো তাদেরকে আলাদাভাবে ডেকে নিয়েও বিভিন্ন ওয়াজ নসিহত করা হতো। এই কাউন্সিলিংটা শুরুর দিকে আমার ভেতর দারুণ প্রভাব ফেলতো।
    তারা আমাদেরকে আশা দেখাতো। আর এই আশা খুবই ভয়ানকভাবে আমাদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতো। বিশেষ করে নতুনদের জন্য এ ছিলো বিরাট বড় এক প্রলোভন। প্রথম দিনের কিছু কিছু কথা আমার মনে আছে। একজন বেশ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন উস্তাদ আমাদেরকে নিয়ে বসলেন। তিনি বলছিলেন, দেখো তোমাদেরকে এখানে আটকে রাখা হয়েছে এর মানে এই না যে তোমরা কোনো অপরাধ করেছো। আসলে এখানে তাদেরকেই নিয়ে আসা হয় যাদের মধ্যে ভালো হওয়ার একটা সম্ভাবনা রয়েছে। তোমরা এখানে থেকে পরিমিতিবোধ অর্জন করবে। দেখো, লোভ হলো এমন রোগ যা তোমার মধ্যেকার অপরাধের সুপ্ত বীজকে অঙ্কুরিত করতে সাহায্য করে। আমরা চাইছি, তুমি তোমার চাহিদাটা সঠিক ক্ষেত্রে ব্যয় করো। এটা শিখতে পারলেই তুমি সমাজে মঙ্গলের দূত হয়ে সমাজটা পরিবর্তন করতে পারবে।
    কথাগুলো আমার খুবই ভালো লেগেছিলো। সত্যি বলতে ওই মুহূর্তে নিজেকে খুব দামী মনে হচ্ছিলো। যদিও পরবর্তীতে জেরেমায়াহ সহ আরো কিছু বন্ধু জুটেছিলো, যারা আমার এই মোহ ভেঙ্গে দিয়েছিলো। কিন্তু কিছু কিছু কয়েদি এমনভাবে প্রভাবিত হয়েছিলো, যে তারা সত্যি সত্যি সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতো এবং উস্তাদদের অনুসরণ করতো।
    জেরেমায়াহকে একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আচ্ছা বলতো আমরা কি সত্যি এতকিছু করতে পারবো কখনও? জেরেমায়াহ হেসে বলেছিলো, দেখো, এই কয়েদখানার ভেতরে থেকে তো কিছুই বলা সম্ভব না। আর তা ছাড়া আমরা সমাজকেও তো চিনি না, জানি না। যা তুমি জানোই না, যার সাথে তোমার পরিচয়ই নেই তা নিয়ে তুমি এতকিছু ভাবতে পারো কীভাবে! তবে এটা ঠিক, যে আমরা বের হওয়ার আগ পর্যন্ত অনেককিছুর সম্ভাবনাই আছে। বাস্তবতাটা টের পাবো বের হতে পারলে পরে। আমিও ভেবে দেখলাম, জেরেমায়াহ ঠিকই বলেছে। এরপর থেকে এই কাউন্সিলিং আমাকে খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারতো না। যদিও উস্তাদদের অনেক সুন্দর সুন্দর কথা আমি নোট করে রাখতাম।
    জেরেমায়াহর আট বছরের সাজা শেষ হয়ে আসছিলো। তাকে প্রায়ই বিষণ্ণ দেখতাম। তাকে জিজ্ঞেস করেও এর তেমন কোনো উত্তর আমি পাইনি। আমি মনে মনে বলতাম, তুমি তো মুক্ত স্বাধীন হতে যাচ্ছো, তুমি কেন এতো মনমরা হয়ে থাকবে! তোমার তো এখন হৈ হুল্লোড় করে আনন্দ স্ফূর্তি করার কথা। পাঠাগারের বইগুলো জেরেমায়াহর পড়া শেষ হয়ে গেছিলো বহু আগেই। অনেকগুলো বই তো পড়তে পড়তে মুখস্থই করে ফেলেছিলো সে। কিন্তু যখনই আমি বলতাম, তুমি কতো কিছু জানো! তোমার জীবনটা অনেক সুন্দর৷ জেরেমায়াহ তখন শুকনো হাসি হাসতো আর বলতো, অনেককিছুই তুমি এখনও জানো না। এই যে পড়াশোনা এসব শুধুই নিজের মনের ভার হালকা করার জন্য। বাস্তবে জ্ঞান মানুষের এতো কাজে আসে না। যে যত কম জানে সে তত সুখে থাকে। আমি মনে মনে ভাবতাম, ও হয়তো অনেকদিন কারাবদ্ধ থেকে থেকে আর এই ছোট্ট কামরায় একা থেকে মাথাটা বিগড়ে ফেলেছে। আমি এসব কথা আমলে নিতাম না, নিজের মতো পড়তে থাকতাম।
    এর মধ্যেই জেরেমায়াহকে বিদায় জানানোর সময় এসে গেলো। আমি চাচ্ছিলাম না, জেরেমায়াহ এখনই চলে যাক। চাচ্ছিলাম, ওর সান্নিধ্যে আরো কিছুদিন কাটাতে। আর ও-ও চাচ্ছিলো আরো বছর দুয়েকের জন্য এখানে থেকে যেতে। কিন্তু জেল কতৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলো। জেরেমায়াহকে তাই বাধ্য হয়েই চলে যেতে হচ্ছিলো। আমি ওর সেলে গেলাম বিদায় জানাতে। ও আমাকে আলিঙ্গন করে কেঁদে ফেললো। যাওয়ার আগে বলছিলো, এই ছোট্ট জগতটা খুব আপন হয়ে গেছিলো। এসব ছেড়ে বাইরের জগতে, অজানা অচেনা জায়গায় আমার কিছুতেই যেতে ইচ্ছে করছে না। তারপরেও যেতে তো হবেই। জীবনটাই এমন আসলে। ভালো থেকো তুমি। বেঁচে থাকলে বাইরে মুক্ত পরিবেশে দেখা হবে কখনো।

    ৪.
    গতকাল রাত থেকেই আগুন জ্বলছে। আগুন নেভাবার জন্য কোনো উদ্যোগ এখনও কেউ নেয়নি। আর এটা আগুন জ্বালানোরই পরিবেশ। কেউ আগুন নেভানোর কথা ভাবে না। আগুন জ্বালানোর ব্যাপারটার মধ্যে একটা শৈল্পিক সৌন্দর্য আছে। ওরা যেটা করছে, ছোট কাঁচের বোতলে পেট্রল আর কাপড় ভরে খালি বাস আর গাড়িতে ছুড়ে মারছে। আগুন জ্বলে ওঠার প্রক্রিয়াটা খুব সুন্দর। মনে করেন কেউ লাইটার দিয়ে বোতলের মুখে আগুন জ্বালিয়ে বাসের জানালা বরাবর একটা বোতল ছুড়ে মারলো। বোতলটা কাঁচের হওয়ায় ভেতরে গিয়েই ফেটে যায় আর পেট্রল ছড়িয়ে পড়ে এদিক ওদিক। বোতলের মুখে জ্বলতে থাকা কাপড় থেকে পেট্রল পড়ে থাকা জায়গাটা মুহূর্তে জ্বলে ওঠে। তবে এভাবে আগুন জ্বললে বাসগুলা পুরোপুরি নাও পুড়তে পারে। তাই বাস যাতে সুষ্ঠুভাবে পুড়তে পারে এ জন্য বিপদজনক কাজটা করতেই হয়। কোনো সাহসী যুবক তখন একটা সিগারেট জ্বালে। সিগারেটটা আয়েশ করে টেনে পাছাটা ঢুকিয়ে দেয় বাসের পেট্রল বক্সে। দিয়ে কিন্তু এক দৌড়ে আশপাশ থেকে দূরে সরে যায়। তবে ততক্ষণে ভুট্টা ফুটে পপকর্ন হওয়ার মতো করে ফুটে যায় বাসটা। এ এক অবর্ণনীয় দৃশ্য আর জটিল কার্যক্রম।
    মানুষ কেন এত বিক্ষুব্ধ হয়ে নিজেদের শ্রমে গড়ে ওঠা সবকিছু জ্বালিয়ে দিচ্ছে সেটা বুঝতে পারছি না। তবে যেটা হচ্ছে সেটার মধ্যেই আমি উপভোগ্য বিষয়গুলো দেখতে থাকি। গ্রীষ্মের গরমে আগুনের তাপে চারপাশ ফুটন্ত তেলওয়ালা কড়াই হয়ে আছে। তারপরেও ঘাড়ের কাছে শীতল ঘামের স্রোত বইছে।
    এরমধ্যেই চারদিকে ছুটাছুটি শুরু হয়ে গেলো। গুলির শব্দ হচ্ছে আর ধোয়ায় সবকিছু ঢেকে যাচ্ছে। আমার জন্য এ সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা।
    শহরটা ইদুরে ভরে গিয়েছিলো। আর চারদিকে প্লেগের মতো এক রোগ ছড়িয়ে পড়ছিলো। আর সবকিছু খুব জ্বলছিলো। মানুষেরা ছুটে পালাচ্ছিলো। ধোয়ার মধ্য থেকে হুটহাট গুলি ছুটে আসছিলো আর দু একজনকে ধরাশায়ী করছিলো। আমি অবশ্য জ্বলন্ত বাসের পাশেই ফুটপাতে বসে ছিলাম। এই দৃশ্যপটে আমার ভূমিকা কী হতে পারে, ভাবছিলাম।
    মানুষেরা যেদিকে ছুটে পালাচ্ছিলো সেদিক থেকে কিছু দৈত্যাকৃতির বিড়াল আসছিলো শিকারির মতো সন্তর্পণে নিরবে। ভিড়ের মধ্য থেকে তারা বেছে বেছে খেতে লাগলো মোটাতাজা ইদুরগুলোকে। বলতে গেলে এটা খুবই ভয়াবহ এক দৃশ্য। কিন্তু আমার ভেতরে কোনোরকম ভয় কাজ করছে না। এর পেছনে কি কোনো কারণ আছে?
    বিড়ালের ব্যাপারে এক মজার তথ্য কারাগারে থাকতে এক বইতে পেয়েছিলাম। সেখানে লিখেছে, বিড়াল এক অদ্ভুত প্রাণী। বিড়ালের মধ্যে মানুষের সুপ্ত আকাঙ্খা লুকিয়ে থাকে। মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়। আর বিড়াল সত্যিই স্বাধীনভাবে বাঁচে। বিড়ালেরা পুরোপুরি বশ্যতা স্বীকার করে না। বিড়ালরা যথেষ্ঠ আদর যত্ন পায়। কিন্তু ওরা নিজেদেরকে এসবের মায়ায় পড়তে দেয় না। এই সাহসিকতা যদিও মানুষের মাঝে নেই আর তারা সবকিছুতেই খুব করে প্রতিক্রিয়াশীল। কিন্তু এই নির্লিপ্ততা তাদের আরাধ্য বাসনা।

    ৫.
    কারাগারের দিনগুলো চলে যাচ্ছে একঘেয়েমির মধ্যে। ইদানিং বই পড়াও ছেড়ে দিয়েছি। উস্তাদদের কাউন্সিলিংগুলো সবচেয়ে বিরক্তিকর লাগে এখন। কিন্তু তর্ক করার উপায় নেই। এদের সাথে ঝামেলা করলেই বিশেষ নজরদারিতে পড়তে হবে, সলিটারি সেল, খাবার বন্ধ করা সহ আরো নানাভাবে বিরক্ত করবে এরা। তাই কোনোরকম তাল দিয়ে যাই। আমার মুক্তির সময়ও কাছিয়ে আসছে। এ জন্য কোনো ঝামেলায় যেতে চাচ্ছি না।
    যাইহোক এভাবেই কারাগারে দিনগুলো চলে যায়। যদিও ইদানিং এক ধরণের উদ্বিগ্নতা কাজ করছে। কী হবে এরপর? বা সত্যিই কি মুক্তি পেতে চলেছি তাহলে! এ ধরণের বিভিন্ন জিজ্ঞাসা আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়।
    এখানকার নিয়ম হলো মুক্ত হওয়ার সাথে সাথে তারা আপনার জন্য একটা কাজ ঠিক করে দেবে। যদিও বেশিরভাগ কাজই কিছু নিম্নশ্রেণীর তারপরেও একেবারে বেকার থাকার চাইতে কোনোকিছুতে ব্যস্ত থাকা ভালো। সে হিসেবেই এই কাজটা এরা করে। আমার জন্য তারা রাস্তা পরিষ্কার, পয়ঃনিস্কাশন জাতীয় কিছু কাজ ঠিক করে দিয়েছে। তারা মুক্তির দিন আমাকে একটা মিটিংয়ে ডাকলো। এখানে সংক্ষেপে তারা আমার ভবিষ্যত কর্মপন্থা বলে দিচ্ছে। জেল সুপার এক বুড়াকে দেখিয়ে বলল, এই যে এনার আন্ডারেই তুমি কাজ করবে। আর শোনো, এই কাজটায় তোমার রিপোর্ট ভালো এলে ইনি তোমাকে আরো ভালো কাজের জন্য রেফার করবেন। দেখো এখান থেকে যারা বের হয় তারা এখানকার আদর্শিক বার্তা সমাজে পৌছে দেয়। আমাদের একটা গুড উইল আছে। আশা করছি তুমিও সেটা রক্ষা করবে।

    বের হওয়ার সময় তারা নতুন দুই জোড়া পোশাক আর একটা হাত ঘড়ি দিলো। আমি এক প্যাকেট সিগারেটের জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু সেটা আমাকে দেওয়া হয়নি। এর বদলে একটা চকলেট দিয়েছে এরা, সেই সাথে এ-ও বলে দিয়েছে, সিগারেট তোমার ইমেজকে নষ্ট করবে। তুমি এতোদিন এখানে থাকার ফলে তোমার প্রতি সমাজের লোকেদের অন্যরকম একটা নজর থাকবে। এসব আজেবাজে জিনিস তোমার প্রতি ওদেরকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলবে। তোমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেটা পালন করতে হলে একটু ভালোভাবে চলবে।
    কিছু করার ছিলো না। এতে অবশ্য আমার কোনোও খেদ ছিলো না। ফটক পেরিয়ে আমি এসে দাঁড়ালাম একটা মহা সড়কে। পার্কিং লটে আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এমনকি একটা গাড়িও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার কোনো তাড়া ছিলো না। তাই আস্তে ধীরে চকলেটের খোসাটা ছিড়ে চকলেটটা মুখে পুরে দিলাম।

    আমি শহরে নিজের একটা বাসা পেয়েছি। সারাদিন কোনো কাজ থাকে না। বাসায় শুয়ে বসে কেটে যায়। আর ভোরে রাস্তা ঝাড়ু দিতে হয় আমাকে আরো অনেক অনেক কর্মীর সাথে। আমরা করতাম কি, ঝাড়ু দিয়ে ময়লাগুলো স্তূপ করে আগুন ধরিয়ে দিতাম। ময়লা বলতে বিভিন্ন ধরণে পলিথিন, ড্রিংকসের বোতল আর আজেবাজে কাগজ আর গাছের শুকনো পাতা। এগুলো মিলে জ্বলতো বেশ আর পলিথিন পোড়া ধোয়ায় আকাশ বাতাস অন্ধকার হয়ে আসতো। যদিও এগুলো বর্জ্য ফেলে দেওয়ার জন্য ট্রাকের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ট্রাক ব্যবহার নিষিদ্ধ। নগর কতৃপক্ষ মনে করে ট্রাক ব্যবহারে শহরের ময়লা দূর হবে না। এই ময়লা আবার ফিরে আসবে বাতাসে বাতাসে। আবুস সাআদাহ নামে আমাদের সাথে এক বুড়ো ঝাড়ুদার আছে, সে বলেছে, আমরা অনেক করে বলেছি এসব ধোয়া খুবই অস্বাস্থ্যকর। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
    একটা ব্যাপার খেয়াল করেছি। আমাদের উস্তাদরা বলতো, সমাজ তোমাকে ভিন্ন চোখে দেখবে। আমিও এমনটাই দেখছি। সাধারণ আট দশজন নাগরিকের যে সুযোগ সুবিধা সেটা আমার নেই। এমনকি ওদের মতো আমি কোনো রেস্তোরায় খেতে পারি না বা কোথাও যদি যাই তাহলে পুলিশেরা এসে বলে, তুমি কেন এখানে এসেছো? আমার তেমন কিছু বলার থাকে না। তারা আমার নিরবতায় ক্ষেপে গিয়ে গালি দিয়ে বলে ওঠে, কুত্তার বাচ্চা নিজের খোয়াড়ে ফিরা যা। নবাবগিরি দেখাবি না একদম।
    মাথা নিচু করে ফিরে আসতে হয়। আমার রুটিন তাই ধরা বাধা কিছু নিয়মের মধ্যে আটকে পড়েছে। আর এই রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার ব্যাপারটা আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না। আজকে সকালে পরিষ্কার করে আসলাম। দেখা যাবে কাল সকালে দিগুণ ময়লায় রাস্তা ভরে গেছে। এই ময়লা সাফ করো আবার কারা যেন রাতের বেলায় শহরের রাস্তায় রাস্তায় একই ময়লা ছড়িয়ে দিয়ে যায়। আবার সাফ করো। শুনেছিলাম বুড়ো আবুস সাআদাহর কাছে, যে এই সাফ করার কোনো বিরতি নাই। বছরের প্রতিটা দিনই তোমাকে আসতে হবে। একবার আইয়্যাস নামে এক লোক আসেনি এক সকালে। পরে আমরা তাকে আর কোথাও খুঁজে পাইনি। আমি জানতে চাইছিলাম, আচ্ছা শহরের বাইরে গিয়েও তো তাকে খুঁজতে পারতে। বুড়ো অবাক হয়ে বলেছিলো, আরে শহরের বাইরে মানে! শহরের বাইরে আর আছেটা কী!
    যতো দিন যেতে লাগলো আমার সবকিছু অসহ্য লাগতে শুরু করলো। হুটহাট আমি নিজেকে আজব আজব জায়গায় আবিষ্কার করি। কখনো মনে হয় আমার বুঝি স্মৃতিভ্রমের রোগে ধরেছে নয়তো ঘুমের ভেতর হাঁটার অভ্যাস হয়েছে। দম বন্ধ হয়ে আসতে চায় মাঝে মাঝেই। আমি তাই দৃঢ় পণ করলাম, পালাতে হবে। এই শহরে আর থাকা যাবে না।

    এখন রাত গভীর আর আমি শহর ছেড়ে পালাচ্ছি। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে শহর থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না। যতোই হাঁটছি পথ শেষ হয় না। আর এই সময়টায় শহরটা আশ্চর্যরকম নিস্তব্ধ হয়ে আছে। এভাবে হাঁটছি তো হাঁটছিই। পথও ফুরায় না আর রাতও শেষ হতে চাইছে না।
    একটা সময়ে পথটা এসে মিলেছে এক নদীর সাথে। নদীতে নেই কোনো নৌকা বা ফেরি। তবে নদীর পাড়ে ছোট্ট একটা ক্যাফে, যেখানে আলো জ্বলছে আর মৃদু বাজনা আর অস্পষ্ট সুরেলা কন্ঠ ভেসে আসছে। আমি ক্যাফের দিকে এগুলাম।
    ক্যাফে এল জলামে মৃদু আলো। লোক নেই বললেই চলে। আমি এক কাপ কফির অর্ডার দিয়ে ভেতরটা ভালো করে দেখতে লাগলাম। এক কোণে এক বৃদ্ধকে দেখতে পাচ্ছি। যদিও তাকে দেখে মনে হচ্ছে মোমের মূর্তি। পুরো ক্যাফেতে আর কেউ নেই। দেখে মনে হচ্ছে না এখানে কফি টফি কিছু পাওয়া যাবে। ভাবলাম, বুড়াটার সাথে সামনের পথঘাট নিয়ে আলাপ করি।
    তার সামনে গিয়ে চেয়ার টেনে সামনা সামনি বসলাম। চেয়ার টানার শব্দটা খুব জোরেই হলো। যদিও জ্যুকবক্সে অজানা ভাষায় গান চলছে। কিন্তু তারপরেও জায়গাটা প্রচণ্ড রকম নিরব। বুড়োর সামনে রাখা কাপটা থেকে ধোয়া উড়ছে। বাতাসহীন বদ্ধ পরিবেশে ধোয়া একটা কাব্যিক রেখা তৈরি করে অলসভাবে মিলিয়ে যাচ্ছে। একটু শব্দ করে কাশলাম বুড়োর দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য। কিন্তু বুড়োর চোখের পাতা ছিলো খোলা আর মুখ ছিলো অভিব্যক্তিহীন। বুড়োর চেহারার রেখাগুলো বাদ দিলে চেহারাটা আমার বেশ পরিচিতই মনে হতে থাকে। যদিও মনে করতে পারছি না, কে হতে পারে এই বুড়ো।
    এই যে শুনছেন? হাতটা তার মুখের সামনে নাড়তে নাড়তে বললাম। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। জ্যুকবক্সে গান বাজছে, “ইশ ও মাত মিন সুকাত”। আমারও মনে হতে থাকে সবকিছু খুব নিরব আর মৃত। যদিও মিউজিকটা হেভি কিন্তু নিষ্প্রাণ। যা বুঝলাম আমাকে নদী পার হয়ে যে করেই হোক পালাতে হবে। অন্যথায় এই বুড়োর মতোন এখানে মূর্তি হয়ে যেতে হতে পারে। আমি উঠে দাঁড়ালাম চেয়ার ছেড়ে। নৌকা না পেলে সাতরে পার হবো তাও এখানে আর এক মুহূর্তও নয়। আমি বুড়োকে পেছনে রেখে উঠে দাঁড়িয়েছি। আমার হাতে একটা মৃত ঠান্ডা স্পর্শ টের পেয়ে ফিরে তাকালাম। বুড়ো ঘড়ঘড়ে কণ্ঠে রেকর্ডারে বেজে ওঠা রেকর্ডের মতোন করে বলে উঠলো, পালাও! তুমি যতটা সময় কাটাতে থাকবে এখানে ততোই মরে যাবে। পালাও!
    আমি ভয় পেয়ে গেলাম। দৌড়ে বের হয়ে এলাম ক্যাফে এল জলাম থেকে। নদীটার কাছে এসে ঝাপ দিলাম কোনোকিছু না ভেবেই। ভাবাবাবির সময় এবং মানসিকতা কোনোটাই নাই অবশ্য আমার। কিন্তু কিছুদূর সাঁতরানোর পর মনে হলো আমি ওপারে যেতে যেতে ঠান্ডায় জমে মরে যাবো। আমার পেশিগুলো আড়ষ্ট হয়ে আসছে আর আমি এখন নিজেকে কোনোভাবেই ভাসিয়ে রাখতে পারছি না। দূরের ক্যাফে থেকে ভেসে আসছে, “য়ুকতাব আলা আবরিক কান রাগুল তয়্যিব ইশ ও মাত মিন সুকাত”। আর আমি ডুবে যেতে যেতেও প্রাণপণে সাঁতারাচ্ছি, পালাতে ব্যস্ত আছি। যদিও পালানোটা অসম্ভবই মনে হচ্ছে।

    9
    7 Comments
Skip to toolbar