-
ছোটগল্প : পাপ
আহমেদ ফারুকঘরটাকে অনেক অন্ধকার মনে হচ্ছে। চারদিকে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আলোর হালকা রেশ পর্যন্ত নেই। মনে হচ্ছে কব্বরের মধ্যে শুয়ে আছেন। বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা।
মাহতাব সাহেব কিছুটা শঙ্কিত। তার কিছুই মনে পড়ছে না। শুধু মনে পড়ছে ঘুমানোর আগে তিনি দুটো ইউনেকটিন খেয়েছিলেন। ইদানীং তার একেবারেই ঘুম হয় না। অথচ ডাক্তার বলেছে ঘুম তার শরীরের জন্য অত্যন্ত জরুরি। যেভাবেই হোক রোজ আট ঘণ্টা ঘুমাতে হবে।
মাহতাব সাহেব উঠে বসলেন। নিয়ম করে তিনি কথনোই কিছু করতে পারেননি। তার জীবন কোনো নিয়মের মধ্যে কখনো ছিল না। তিনি গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে এদিক-ওদিক হাত বাড়ালেন। তিনি বিছানার ওপরেই উঠে বসলেন। তার অজ্ঞাত ভয়টা একটু কমেছে। হঠাৎ করেই মনে হচ্ছিল তিনি আর বেঁচে নেই। ঘুমের মধ্যে নিঃশব্দে মরে গেছেন। এমন হলে অবশ্য মন্দ হতো না। ইদানীং আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না।
চারদিকে ভয়াবহ অন্ধকার। এত অন্ধকার তিনি কখনো দেখেননি। নাকি কোনো কারণে তার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। এমন হতেই পারে। বয়স তো আর কম হলো না; ছাপ্পান্ন। এদেশের মানুষের গড় আয়ু সাতান্ন হলে তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছেন। এ সময়ে ছাপ্পান্ন বছর বেঁচে থাকাটাই এক অলৌকিক বিস্ময়।
তিনি নাকের কাছে হাত দিলেন। জোরে জোরে কয়েকবার নিঃশ্বাস নিলেন। এবার তিনি নিশ্চিত। মৃত্যু জাতীয় ভয়াবহ কুৎসিত ব্যাপারটা এখনো ঘটেনি। তবে সম্ভবত তিনি অন্ধ হয়ে গেছেন। এ কারণে কিছুই দেখতে পারছেন না।
এমন হওয়ার সম্ভবতা আছে। কারণ পৃথিবীর সেরা দশ পাপীর নামের তালিকা করা হলে সেখানে তার নাম থাকবে। প্রথম দিকেই থাকবে। পাপীদের জন্য আল্লাহতায়ালা যে সাতটা দোজখের ব্যবস্থা করেছেন। তার মধ্যে নিকৃষ্টতম হচ্ছে হাবিয়া। তার ধারণা মরার পর তিনি ডাইরেক্ট হাবিয়া দোজখে যাবেন।
মাহতাব সাহেব বিছানা থেকে নামলেন। ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চমকালো। এক মুহূর্তের জন্য ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠল। তিনি স্পষ্ট দেখলেন। তার মানে তার চোখ ঠিকই আছে। তিনি জানালার পাশে এসে দাঁড়ালেন। কালো রঙের পর্দা সরালেন। ক্ষীণ আলো চোখে পড়ল।
বাইরে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ঝড় আসছে। সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে দেবে। তবে তিনি মোটেও বিচলিত নন। তিনি ঝড় ভয় পান না। কোনো ঝড়ই তাকে বিচলিত করে তোলার ক্ষমতা রাখে না।
মাহতাব সাহেব কিচেনের দিকে গেলেন। কিচেনের দূরত্ব বেশি না। তারপরও অনন্ত পথ মনে হচ্ছে। মনে মনে গান গাইতে ইচ্ছে করলÑ এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো…।
এক সময় গান ভালো লাগত। এখন পানসে হয়ে গেছে। সব কিছুরই একটা বয়স থাকে। মানুষ সেই বয়সের অদৃশ্য তালে বদলাতে থাকে।
মাহতাব সাহেব ঠাণ্ডা পানির বোতল হাতে নিলেন। গলা ভেজালেন। কারো সাথে কথা বলতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু তা সম্ভব না। এ বাড়িতে কেউ নেই। তিনি এখন একেবারে একা। কবরের মতো জীবনযাপন করছেন। কোথাও কেউ নেই।
তিনি গত আট দিন হলো মোবাইল ব্যবহার করেন না। আফ্রীর বিয়ের পরই তিনি বাসার ল্যান্ডফোন কেটে দিয়েছেন। আট দিন আগে যেদিন আফ্রী কানাডা চলে গেল; সেদিনই তিনি মোবাইল ফোনটা ড্রাইভার রহমানকে দিয়েছেন। সাথে দিয়েছেন এক মাসের ছুটি। অগ্রিম এক মাসের বেতনও দিয়েছেন। রহমান বলল, স্যার একা একা কিভাবে থাকবেন? বাসার কেয়ারটেকার, মালী, বুয়া সবাইকে একবারে ছুটি দিয়ে দিলেন?
এ পৃথিবীর সবাই একা। আমরা সবাই মিছেমিছি একাকিত্ব ঘুচানোর চেষ্টা করি। তাছাড়া একা থাকার অভ্যাস করছি।
রহমান কিছুই বলেনি। বুড়া বয়সে মানুষের বাহাত্তর রকমের পাগলামি থাকে। তাই হয়তো এসব নিয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই। অগ্রিম এক মাসের বেতন পাওয়া গেছে, এটাই বড় কথা।
সে একাকিত্ব ঘোচানোর জন্য গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। এই আটদিনে মাহতাব সাহেব মেয়ের কাছে দু’বার ফোন দিয়েছেন। ওপাশ থেকে আফ্রী ফোন ধরেই বলল, ঘটনা কী বাবা? তোমার মোবাইল বন্ধ। ল্যান্ডফোনেও কল ঢোকে না। হয়েছেটা কী?
আসলে ফোনটা রহমানকে দিয়ে দিয়েছি।
দিয়েছ ভালো কথা, নতুন মোবাইল নাও। বাসার ল্যান্ডফোন চালু করো। তোমার সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। একা একা আছো। কত রকম টেনশন হয়। সেদিকে খেয়াল আছে?
সে দেখা যাবে।
কত করে বললাম আমাদের সাথে কানাডা চলে আসো। ওখানে একা একা কী করবে শুনি?
আমি আসব না, তা কিন্তু বলিনি। একদিন দেখবি চলে আসব। এদিকের কাজটা একটু গুছিয়ে নিই।
আচ্ছা বাবা, আমি ছাড়া তোমার আর কে আছে বলো?
তিনি হেসেছেন। কোনো তর্কে তিনি জড়াতে চান না। তার তর্ক ভালো লাগে না। তিনি শুধু আপন খোঁজার জন্য সারাটা জীবন পার করেছেন। আসলেই কি আপন বলে কিছু আছে?
অঢেল টাকা-পয়সার মালিক হলে মানুষের নানারকম বদ অভ্যাস থাকে। নারীর টান থাকে। বিদেশী হুইস্কি না গিললে ঘুম আসে না। ঘুম ভাঙলে দামি ব্র্যান্ডের সিগারেট টানতে ভালো লাগে। কিন্তু এসবের কোনো অভ্যাসই তার নেই। তবে ভয়াবহ একাকিত্ব তার আছে। এ কারণে তার ঘুম হয় না। তিনি সত্যিই একা। তিনি এটাও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন।
একাকিত্ব মানুষকে দুর্বল করে তোলে। তিনি হয়তো সে দলেই পড়ে গেছেন। নইলে এত রাতে ঘুম ভাঙবে কেন? তিনি জানেন কোনো কিছুই কারণ ছাড়া হয় না। অযথা তার ঘুম ভাঙার কথা না। তাই আজই তার বেরিয়ে পড়তে হবে। আজই সঠিক সময়।
বেশিক্ষণ সময় নিলেন না তিনি। চট করে রেডি হয়ে নিচে নামলেন। ঝড়ের পর অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। এই বৃষ্টি সহজে থামবে না। কুত্তা-বিড়াল বৃষ্টিটা পড়তেই থাকবে।
একবার ভাবলেন গাড়ি নিয়ে বের হবেন। কিন্তু আজ তিনি নিঃস্ব হয়ে বের হতে চান। জীবনের নানান বাঁকে তিনি যে বিশাল প্রতিপত্তির মালিক হয়েছেন তা তাকে সুখ দিতে পারেনি। তার একাকিত্ব ঘোচাতে পারেনি। তাই তিনি বেরিয়ে পড়লেন।
প্রবল বৃষ্টিতে তিনি ভিজে যাচ্ছেন। তার পায়ে একটা চটি স্যান্ডেল। গায়ে রিমনির উপহার দেয়া শার্ট। আজ থেকে ছত্রিশ বছর আগে রিমনি শার্টটা কিনে দিয়েছিল। লাল রঙের ছোপ ছোপ প্রিন্ট করা শার্ট। এই সময়, এই বয়সে এমন রঙ ঠিক মানায় না। তারপরও তিনি বেশ আরাম বোধ করলেন। যেন বহু বছর পর তার হৃদয়ে বৃষ্টি নামল।
শার্টটা বৃষ্টিতে যত ভিজছে ততই শরীরের সাথে লেগে যাচ্ছে। যেন বহু বছর পর রিমনি তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। এমন অন্ধকার ঝড়ের রাতে একাকিত্বে ডুবে থাকা এক দুর্বল মানুষের কাছে এর চেয়ে বড় সুখ আর কী হতে পারে?
মাহতাব সাহেব হাঁটলেন। বেশ ভালোই হাঁটলেন। অনেক টাকা-পয়সা মানুষকে ফার্মের মুরগি বানিয়ে ফেলে। খাঁচার মাঝে জীবন শুরু, খাঁচার মাঝেই শেষ। নিট প্রফিট কিছু চর্বি।
বৃষ্টিতে ভিজে তিনি একাকার। তারপরও তার কোনো ভাবনা নেই। হাঁটতে হাঁটতেই যদি চলে যেতে পারতেন তবে ভালোই হতো। কিন্তু তা তো আর সম্ভব না। পথ যে অনেক। তাছাড়া তিনি যেভাবে চাইবেন তা তো হবে না। বাস্তবতার একটা কঠিন নিয়ম আছে। এই নিয়ম কেউ ভাঙতে পারে না। তিনি নিয়ম ভাঙতে চান না।
কাকভেজা হয়ে তিনি বাসস্টেশনে এসে পৌঁছলেন। ততক্ষণে আকাশ ফরসা হতে শুরু করেছে। দূরের এক মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। পাশের চায়ের স্টলে তিনি দাঁড়ালেন।
ভার্সিটি লাইফে খুব চা খেতেন। সে সময়টা ছিল দুরন্ত। পৃথিবীর সব কিছু হাতের মুঠোয় মনে হতো। সে সময়টা সত্যিই চমৎকার ছিল। পকেটে এখনকার মতো কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ছিল না। কিন্তু মনের আনাচে-কানাচে সুখ ছিল।
রোজ ভোরে এক কাপ চা আর এক টুকরো পাউরুটি খেয়ে ছুটতে হতো টিউশনি করতে। বড়লোকের ছেলেপুলেদের পণ্ডিত বানিয়ে ফিরতে হতো ক্লাসে। মাস শেষে যে টাকা পাওয়া যেত তাই দিয়ে চলত স্বপ্ন পূরণ।
সে সময়ের স্বপ্নগুলোও অদ্ভুত ছিল। সেই গোনা পয়সা দিয়ে ছোট ছোট যে স্বপ্নই পূর্ণ হতো তাতেই আনন্দের সীমা থাকত না। আর আজ কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দিয়ে একটা স্বপ্নও ধরে রাখতে পারেন না।
চায়ের স্টলের সামনে একটা ভাঙা টুল। টুলে বসলে ছোটখাটো একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তারপরও তিনি বসলেন। বসলেন সেই ভার্সিটি লাইফের তরুণ মাহতাবের মতো। পা দোলাচ্ছেন। দোকানি আড়চোখে একবার তার দিকে তাকাল। কিছু বলল না।
চায়ের পানি গরম হচ্ছে। কড়া করে এক কাপ চা খেলে মন্দ হতো না। কিন্তু তিনি আজ কিছুই খাবেন না। আজ তার সব কিছু ভিন্ন নিয়মে চলবে।
বাসটা ছাড়ল ভোর পাঁচটায়। বহুদিন পর তিনি লোকাল বাসে চড়লেন। অথচ এক সময় এই লোকাল বাস ছাড়া তার জীবন ছিল অচল। সেই সময়টাই ছিল অদ্ভুত। রিমনি আর তিনি বাসে চড়লে পাশাপাশি বসতেন। সারাটা পথ হাত ধরে থাকতেন। এক সেকেন্ডের জন্যও হাত ছেড়ে দিতেন না। হাত ধরে থাকার মধ্যেই আপন করে নেয়ার স্বপ্ন ছিল। নিমিষেই এক হয়ে যেত দুটো আত্মা।
আজ তার সব আছে। শুধু রিমনি নেই। পৃথিবীর সব ভালোবাসায় কোথাও না কোথাও খাদ থাকে। কিন্তু তার ভালোবাসায় তিনি তো কোনো খাদ রাখেননি। তারপরও রিমনিকে পাওয়া হয়নি।
ভাগ্যের দোষ তিনি দেন না। কিছু কিছু ভাগ্য মানুষ নিজে তৈরি করে। রিমনিকে তিনি ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু সেই দুরন্ত সময়ে কেন এমন করেছিলেন তার উত্তর আজো তিনি পাননি।
ছত্রিশ বছর রিমনির সাথে দেখা নেই। তার দু’চোখ তিন যুগ তাকে দেখেনি। সত্যি কথা যে রিমনির সামনে যাওয়ার মতো সাহস তার ছিল না। তাকে প্রত্যাখ্যান করা যদি তার পাপ হয় তবে তিন যুগেও তিনি সে পাপ খ-াতে পারেননি।
সব মানুষেরই জীবনে কোনো না কোনো গোপন স্বপ্ন থাকে। কিছু স্বপ্ন কখনো প্রকাশ করা যায় না। স্বপ্নর সাথে পাপের একটা সম্পর্ক আছে। যে মানুষের স্বপ্ন যত বেশি সে মানুষের পাপও বেশি।
রিমনিকে শেষবারের মতো দেখাই যে তার শেষ স্বপ্ন। এই স্বপ্নের মধ্যেও পাপ আছে। তিনি এই স্বপ্নটা পূরণ করার জন্য আফ্রীকে মিথ্যা কথা বলেছেন। সে বারবার বলছিল, এদেশে থেকে তিনি কী করবেন? তিনি বলেছেন, এদেশে তার মায়ের কবর, তাকে ছেড়ে তিনি কোথাও যাবেন না।
আফ্রী কথাটা বিশ্বাস করেছে। মাঝে মাঝে সত্যির চেয়ে মিথ্যার ক্ষমতা বেশি থাকে। তাছাড়া সত্যি কথা বলার মতো সাহস তার নেই। রিমনি নামের একজনকে তিনি আজো বুকে ধরে রেখেছেন, এটা কেউ জানে না। এই মেয়েটার স্বপ্ন নিয়েই তিনি সারাটা জীবন কাটিয়েছেন, এই সত্যটাও কেউ জানে না। এটা আফ্রীকে বলার মতো কথাও না। সব সত্য বলা যায় না।
রিমনি যে কেবলই একান্ত ভেতরের মানুষ। তাকে কোনো দিন তিনি বের করে আনেননি। অনুভব করেছেন, তার সাথে একাকী সময়ে কথা বলেছেনÑ এটাই সবচেয়ে বড় কথা।
এ জীবনে তাকে পাওয়ার আর কোনো ইচ্ছা তার নেই। তাকে পাওয়াও সম্ভব না। হয়তো এখন সে বদলে গেছে। বৃদ্ধা হয়ে গেছে। এত বছর পর সে দেখতে কেমন হয়েছে? মাহতাব সাহেব তা জানেন না।
শুধু জানেন পানতারা গ্রামের রইস সিকদারের বাড়িতে গেলেই রিমনিকে শেষবারের মতো দেখা যাবে। কিন্তু সেই বাড়িতে তিনি যাবেন কোন পরিচয়ে? কিভাবে তাকে শেষবারের মতো দেখবেন? আর যদি এত বছর পর সে তাকে চিনে ফেলে? তবে কি সে তার সামনে আসবে?
মাহতাব সাহেব জানেন না তিনি শেষবারের মতো তাকে দেখতে পাবেন কি না? সেই যৌবনের রিমনির মাঝে তার জন্য ভালোবাসার লেশটুকুও হয়তো নেই। হয়তো মাহতাব নামের এক সময় একজনকে ভালোবাসত তা সে ভুলেই গেছে। সব মানুষ ভালোবাসা মনে রাখে না। আরো গভীরভাবে বললে সবাই ভালোবাসতে পারে না।
ভালোবাসা ইবাদতের মতো। সবাই এটাকে ধারণ করে না। তিনি কতটা ধারণ করেছেন তা সময়ের হলুদ হাওয়ায় লেখা আছে। লেখা আছে একাকিত্বের পাতায় পাতায়। কেউ কখনো জানেনি। কেউ কখনো বোঝেনি। শুধু তিনি জানেন রিমনি কী করে সারাটা জীবন তার মাঝেই বসবাস করছে।
একাকী সময়ে তিনি রিমনির সাথে কথা বলেন। অতীতের স্বপ্নগুলোকে মনে মনে বাস্তবতায় নিয়ে আসেন। এসব কেউ কখনো জানবে না। জানার কথাও না। তিনি জানতে দিতেও চান না।
আজ এত বছর পর কাছের মানুষকে এক পলক দেখার অভিপ্রায় নিছক পাগলামি ছাড়া আর কিছুই নয়। তারপরও তিনি মনের গহিনের টানকে অস্বীকার করতে পারেন না। রিমনি যে তার হৃদয়ের সবটুকু জুড়ে এটা তাকে না হারালে হয়তো কোনো দিনই বুঝতে পারতেন না।
মাহতাব সাহেব জানেন গত ছত্রিশ বছর একটা দিনের জন্যও তিনি রিমনিকে ভুলে যাননি। বলা যায় ভুলে যেতে পারেননি। সব কাজেই তিনি তাকে দেখতেন। খুব নীরব সময়ে তিনি তাকে অনুভব করতেন। মাঝে মাঝে মনে হতো এই তো সে আমার পাশেই আছে।
কিন্তু বাস্তবতা যে অনেক কঠিন। রিমনিকে হারানোর বেদনা ভুলে যাওয়ার মিথ্যে অভিনয় করতে করতে তিনি ক্লান্ত হয়ে যেতেন। সংসারে নানান মিথ্যের মায়া না থাকলে জীবনকে হয়তো জীবনই বলা যায় না। মিথ্যে না থাকলে অনেক মানুষ বেঁচে থাকতেও পারত না। মিথ্যে অভিনয় সত্যি সৃষ্টিকর্তার এক অদ্ভুত দান।
মাহতাব সাহেবও মিথ্যে বলতেন। মাধবীর সাথে তার সংসার জীবন ছিল মাত্র পাঁচ বছরের। বলা যায় ফড়িং জীবন নিয়ে এসেছিল সে। একটা স্বপের মতো। মাধবীকে তিনি ভালোও বেসেছিলেন। কিন্তু সে ভালোবাসা ভিন্ন জগতের। ভিন্ন স্বভাবের।
ফড়িং জীবনের সময়টাতে মাধবী কেবল জানত মাহতাবই আমার সব। কিন্তু এই কাছের মানুষটার হৃদয়ের মাঝে যে কেবল রিমনির বসবাস তা সে জানত না। জানতে পারেনি কখনো।
মাধবী মারা যাওয়ার পর আফ্রীই তার জীবনের সব কিছু হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় কখন যে আফ্রী বড় হয়ে উঠল, কিভাবে যে সময়ের চাকা ঘুরে গেল ভাবতেই পারেন না। সময় কত না দ্রুত চলে যায়।
এত বছর পর রিমনির সাথে আজ যদি সত্যিই তার দেখা হয় তাহলে সে কি তাকে চিনতে পারবে? নাকি অপরিচিত মানুষই তিনি থেকে যাবেন? আর সত্যিই যদি চিনতে পারে তবে কী বলবেন তিনি? ভাবনার পাখা এখন যে আর আগের মতো দৌড়ায় না।
লোকাল বাসটা বেশ দ্রুতই এসেছে। পানতারা গ্রামে তিনি নামলেন বেলা একটায়। জায়গাটা বেশ ফাঁকা। মূল রাস্তায় কয়েকটা দোকানপাট ছাড়া আর কিছুই নেই। দূরে একটা মাটির মসজিদ। মাথার ওপর রোদ খাঁ খাঁ করছে। এমন বিষণœ দুপুরে তিনি পথের পাশে দাঁড়ালেন।
সিকদার বাড়ি কোন দিকে? কিভাবে যেতে হয় তা তিনি জানেন না। কাউকে জিজ্ঞেস করতে হবে। তিনি ধীর গতিতে সামনের দিকে এগোলেন। কয়েক পা ফেলতেই থমকে দাঁড়ালেন।
একটু দূরে একটা দোকানের সামনে রিমনি কাঁদছে। তাকে ধরে আছে আটাশ-ত্রিশ বছরের এক ভদ্রলোক। গোঁফওয়ালা লোকটা চেষ্টা করছে রিমনির কান্না থামানোর।
থমকে দাঁড়ালেন মাহতাব সাহেব। নিজেকে সামলে নিলেন পরক্ষণেই। এত বছর পর সে রাস্তার পাশে কাঁদছে এটা হতেই পারে না। তার চোখে সত্যিই সমস্যা হয়েছে। তিনি চশমা খুলে মুছলেন। মনে মনে একটু হাসলেন। রিমনিকে হারানোর পর এমন হতো। দূর থেকে কোনো মেয়েকে দেখলে তাকেই রিমনি মনে হতো।
সামনে এগিয়ে এসে মাহতাব সাহেব দাঁড়ালেন। মেয়েটা রিমনি না। তবে রিমনির সাথে চেহারার বেশ মিল আছে। বেশ ভদ্র ঘরের মেয়েই মনে হচ্ছে। তবে কাঁদছে বিশ্রীভাবে।
কান্না সব সময়ই বিশ্রী। তারপরও কেউ কাঁদলে কেন জানি মায়া লাগে। তিনি আরো একটু সামনে গেলেন। তখনই একটা রিকশা এসে থামল। মেয়েটাকে রিকশায় তোলা হলো। গোঁফওয়ালা ভদ্রলোক সম্ভবত মেয়েটার স্বামী। সে তার স্ত্রীকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।
গোঁফওয়ালা ভদ্রলোক সত্যিই মেয়েটার স্বামী হলে সে বেশ সুখী। কারণ ভদ্রলোক বেকুব শ্রেণীর। বেকুব শ্রেণীর স্বামী মেয়েদের জীবনকে সুখী করে তোলে।
আফ্রীর বরটা বেকুব শ্রেণীর হয়নি। এটাই চিন্তার বিষয়। চতুর শ্রেণীর মানুষ নানান রকম ঝামেলায় জড়িয়ে যায়। তার দায়ভার পড়ে স্ত্রীর উপর। ঝামেলা গিট্টুর মতো কেবল পেঁচিয়ে যায়। এক সময় স্ত্রীর মাধ্যমে শ্বশুরের ওপর ঝামেলা মেটানোর দায় চাপে। শুরু হয় নতুন যন্ত্রণা।
মাহতাব সাহেব দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালেন। মেয়েটার কান্নার কারণে এখানে ভিড় জমে গেছে। একজন বলল, মাও মারা গ্যালে মাথার ঠিক থ্যাকে?
চমকে উঠলেন মাহতাব সাহেব। মৃত্যুর কথা শুনলেই তার বুক ধক করে ওঠে। কেন জানি তিনি সহ্য করতে পারেন না। অথচ এই জীবনে তিনি তো আর কম মৃত্যু দেখলেন না। তার সামনেই কত আপন মানুষ মারা গেল। মারা যাওয়ার সময় মনটা ভয়াবহ খারাপ থাকে; তারপর সব সয়ে যায়। আপন মানুষ পর হতে থাকে। স্মৃতিতে ধুলা পড়ে যায় দ্রুত। আপন পরের প্রভেদ আমরা আর ধরতে পারি না।
তিনি দোকানিকে বললেন, এখানে রইস সিকদারের বাড়ি কোথায় বলতে পারেন?
মরা বাড়িতে যাইবেন? রিকশা নিয়া যান। আছরের নামাজের পর মাটি হইব।
কিসের মাটি? কে মারা গেছে?
সিকদার বাড়ির বড় বউ। ওই যে মায়াডা গেল না। হের মা অয়।
ওর মায়ের নাম কী?
তা তো কইতে পারুম না। আরমান সিকদারের বউ আছিল। তাই খালি জানি। এত বছর আমরিকা আছিল। গত বছর গেরামে ফিরছে।
মাহতাব সাহেব অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। রিমনির মৃত্যু সংবাদটা তাকে ধাক্কা দিচ্ছে। তিনি কী বলবেন খুঁজে পেলেন না। কেন জানি হাত-পা ঠা-া হয়ে এলো। মাথা চক্কর দিলো তার। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। তিনি বেঞ্চে ধপ করে বসে পড়লেন?
দোকানি বলে উঠল, চাচাজানের কি শরীর খারাপ?
মাহতাব সাহেব কথা বললেন না। সত্যিই তিনি নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না। মনে হচ্ছে সব কিছু ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। দোকানি উঠে এলো। তাকে ধরে বলল, আপনার কি বেশি খারাপ লাগতাছে?
তিনি মাথা দোলালেন। দোকানি পাশের একজনকে বলল, এই কলসির পানি আন। মাথা ঘুইরম্যে দিছে।
তিনি হাতের ইশারায় কিছুই করতে হবে না বোঝালেন। কিন্তু তারা শুনল না। গলগল করে পানি ঢালতে শুরু করল মাথায়। আশ্চর্য কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি বেশ আরামবোধ করেন।
উঠে বসলেন তিনি। দোকানির গন্ধমাখা গামছা দিয়েই মাথা মুছছেন। সেই পুরনো দিনের গন্ধ পেলেন তখন। যখন তিনি ভার্সিটির হলে থাকতেন। সেই সুদূর অতীতে। তখন আধোয়া গামছায় এমন ভ্যাপসা গন্ধ থাকত। সেই গন্ধে থাকত ভয়াবহ দুরন্তপনা।
সব কিছু উপেক্ষা করে রিমনির ভালোবাসায় নিমজ্জিত ছিলেন যে তখন। তখন বুকের ভেতর ছিল একরাশ মেঘ। চোখে ছিল অনন্ত নক্ষত্রবীথি। আর আজ বুকের ভেতর কেবলি ঝুমবৃষ্টি আর চোখে শূন্যতা।
চাচাজান এখন কি আরাম ঠেকে?
তিনি মাথা দোলান। পরক্ষণেই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, সিকদার বাড়ি কতদূর?
বেশি দূর না। হ্যাঁটেও যাওয়া যায়। আপনি তাদের কী হন? আগে তো কুনোদিন দেখি নাই।
তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। এক সময়ে তিনি ছিলেন রিমনির হৃদয়। আর আজ তিনি কী? কিছুই না। সময় মানুষকে এভাবেই মুছে দেয়। তিনি সেই সময়ের পথ ধরে একেবারে শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে। সেখানে তিনি রিমনির কী হন এটা এখন আর কোনো মুখ্য বিষয় না। এখন তিনি কেবলই অপরিচিত মানুষ। কোনো সম্পর্কই এখন আর নেই।
তিনি কথা ঘোরাতেই বললেন, হেঁটেই যাই। শরীরটা ঝরঝরে হবে।
অবশ্য বেশি দূর না। এই যে কাঁচা রাস্তাটা দেখতাছেন এইডা ধইরা আগায়ে যান। আরো অনেকেই যাইতাছে। সামনে গেলেই পাইবেন।
মাহতাব সাহেব অপেক্ষা করলেন না। হাঁটতে শুরু করলেন। কেন জানি তার পা ভারী হয়ে এলো। পথটাকে দীর্ঘ মনে হচ্ছে। রিকশা নিলেই ভালো হতো। কিন্তু কান্না লুকানোর জন্যই তিনি হাঁটছেন। এই বয়সের কান্না কেউ মেনে নেয় না। যদিও কষ্টের কোনো বয়স নেই। সব বয়সেই একই রকম। বরং বয়স ভারী হলে কষ্ট আরো কঠিন হয়। কারো সাথে শেয়ার করা যায় না।
মরা বাড়ির সামনে বেশ ভিড়। বাড়ির ভেতরের কান্নার শব্দ রাস্তা থেকেও শোনা যাচ্ছে। মাহতাব সাহেব বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। সব অপরিচিত মানুষ। কাউকে তিনি চেনেন না। কেউ তাকে চেনে না।
বাড়ির ভেতরে রিমনির লাশ পড়ে আছে। ওখানটায় মহিলাদের ভিড়। কয়েকটা আগরবাতি জ্বালানো হয়েছে। আগর আর আতরের গন্ধই বলে দেয় এ পৃথিবী থেকে একজন চলে গেছে একাকিত্বের দেশে।
কয়েকজন মাদ্রাসাপড়–য়া ছাত্র একটা পাটিতে বসে একমনে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করছে। তাদের গুনগুন আওয়াজ অলৌকিক জগতের একটা আবহ তৈরি করেছে। চিরসত্য অসীম জগতের অদৃশ্য গন্ধ অনুভব করছেন তিনি। এই গন্ধটা সবাই পায়। কিন্তু অনুভব করে না।
এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন মাহতাব সাহেব। তার চোখ বেয়ে অশ্রু পড়া শুরু হলো। তিনি আটকাতে পারছেন না। কেউ দেখে ফেললে বিপদ। হয়তো ভাবতে পারে তিনি কে? মুর্দার তিনি কী হন? এত মায়াকান্না কাঁদছেন কেন? আসলেই তো তাই। তিনি মায়াকান্না কাঁদার কে? তিনি তো কেউ না।
রিমনিকে একবার দেখার জন্য এসেছেন তিনি। শুধু একবার। কোনো কথা না। কোনো অধিকার না। কোনো বাক্য বিনিময় কিংবা কুশলাদিও না। কেবলই এক নজর দেখবেন। শুধুই একবার।
কিন্তু তাকে দেখার কোনো উপায় নেই। মহিলাদের মৃত্যুর পর তাদের লাশ বাইরের কাউকে দেখানো হয় না। অতি আপনজনের মাঝে কেউ কেউ অবশ্য লাশ দেখতে যাচ্ছে। কিন্তু তার যে কোনো অধিকার নেই। তিনি তো আপনজন না। তিনি অপরিচিত মানুষ।
রাস্তায় যে মেয়েটাকে তিনি দেখেছিলেন সে রিমনির মেয়ে। খোঁজ নিয়ে জানলেন তার নাম রূপ। সে দেখতে মায়ের মতো হয়েছে। রিমনির জোড়া ভ্রƒ ছিল। রূপেরও তাই। তার কণ্ঠ শোনার পর তিনি বারবার চমকে ওঠেন। কোথায় যেন রিমনির সাথে মিল আছে।
তিনি রূপের সামনে গেলেন। মেয়েটা হঠাৎ কান্না থামিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকল। বুকের ভেতর কষ্টের বৃষ্টি নামতে শুরু করল। হঠাৎ করেই মনে হলো এটা রূপ না। এটা আফ্রী।
মৃত মানুষের জন্য কান্না একেক সময় একেক রকম হয়। কেউ কাঁদে মনের দুঃখে, আর কেউ কাঁদে স্বার্থের জন্য। রিমনির জন্য কে কী কারণে কাঁদছে তিনি তা জানেন না। তার জানার ইচ্ছেও নেই। কেন জানি কোনো কিছুই তার জানতে ইচ্ছে করছে না।
ইমাম সাহেব এলেন বিকাল তিনটায়। তার হাতে একটা জয়তুন কাঠের তসবি। প্রয়োজন ছাড়া তিনি যেমন কথা বলেন না তেমনি প্রয়োজন ছাড়া চোখও মেলেন না। কুচা মুরগির মতো ঝিম মেরে কাঠের চেয়ারে বসে আছেন। মাথায় একটা মক্কার স্কার্ফ। বেশ একটা সুফি সুফি ভাব। গা থেকে ভুর ভুর করে আতরের গন্ধ আসছে। সেই গন্ধে মাথা ধরে আসছে তার।
মাহতাব সাহেব তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। হুট করে হুজুর তার দিকে তাকিয়ে বলেন, কাজটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না।
মাহতাব সাহেব চমকে উঠলেন। বললেন, মানে?
মুর্দা দাফনে এত দেরি করা ঠিক না। এতে মুর্দার গোড়ে আজাব হয়। আপনারা শিক্ষিত বুঝমান মানুষ। বোঝার চেষ্টা করেন। তাড়াতাড়ি একটা ব্যবস্থা নেন।
কথাটা বলেই তিনি আবারো চোখ বন্ধ করলেন। যেন কষ্ট করে চোখটা খুলেছিলেন এই কথাটা বলার জন্যই।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন মাহতাব সাহেব। বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলেন তিনি। এই বয়সে হৃদয়ের গভীরের টান কাউকে দেখানো যায় না। কাউকে বোঝানো যায় না। এই বয়সটা কেবলই অপেক্ষার। দুর্ভাগ্যের অপেক্ষা, না পাওয়ার অপেক্ষা, কষ্ট পাওয়ার অপেক্ষা। সারা জীবনের না পাওয়ার বেদনার হাহাকার কেবলই কুরে কুরে খায়।
একজন এসে বলল, হুজুর কি অজু করবেন? মুর্দার গোছল শ্যাষ হইছে। জানাজা শুরু করতে হইব।
চলো, জলদি করো। আমার আবার বিকালে মিলাদ আছে। রাতে সৈয়দ সাহেবের বাড়িতে দাওয়াত। উনার মেয়ের বিয়ে। চটজলদি সব সুরাহা করতে হইব।
মাহতাব সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। জানাজার লাইনের জন্য সবাই জড়ো হচ্ছে। কয়েকজন বীরদর্পে সামনের সারিতে দাঁড়ালেন। তারা এ বাড়ির লোক। লতায়পাতায় হলে মুর্দার আত্মীয়। তাদের সামনের সারিতে দাঁড়াতেই হবে। পেছনের সারিতে দাঁড়াবে অন্যরা।
খাটিয়ায় করে লাশটা এনে ইমামের সামনে রাখা হলো। তিনি হেঁটে হেঁটে খাটিয়ার সামনে গেলেন। চোখ বন্ধ করে বিড় বিড় করে দোয়া পড়ছেন তিনি। বললেন, সবাই সূরা ফাতেহা একবার, সূরা এখলাস তিনবার আর দরুদ শরীফ সাতবার পড়েন।
মাহতাব সাহেব চোখ বন্ধ করলেন। সূরা ফাতেহা একবার, সূরা এখলাস তিনবার পড়লেন। কিন্তু দরুদ শরীফ সাতবার পড়তে গিয়ে উল্টাপাল্টা করে ফেললেন। বারবার মনে হচ্ছে সাদা কাফনের নিচে নিশ্চয়ই নিষ্পাপ মুখটা চোখ বন্ধ করে আছে। যাকে একদিন তিনি এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কষ্টটা দিয়েছিলেন। কেন দিয়েছিলেন?
ইমাম সাহেব হাত তুলে বললেন, দিল থেকে সবাই তাকে মাফ করে দেন। মুর্দার ওপর কারো দাবি থাকলে তার আত্মীয়স্বজনকে জানান। কোনো দেনা থাকলেও জানান। তারা ব্যবস্থা নেবেন। আর অজানা কোনো রাগ থাকলে মাফ করে দেন। মানুষের জীবনে ভুলত্রুটি থাকে, মরার পর তা নিয়ে রাগ রাখলে মুর্দার গোড়ে আজাব হয়।
মাহতাব সাহেব মন দিয়ে ইমামের কথা শুনছেন। মনে মনে বললেন, তাকে সবাই মাফ করে দেবে। কিন্তু যে পাপ আমি তার কাছে করেছি তা সে কিভাবে ক্ষমা করবে? কে জানে রিমনি হয়তো আজো তাকে ক্ষমা করতে পারেনি। এ কারণেই শেষ দেখাটাও হলো না।
জানাজা শেষ হতেই লাশ নিয়ে পারিবারিক গোরস্থানের দিকে ছুটল সবাই। তিনি খাটিয়ার পাশে গিয়ে এক পাশটা কাঁধে নিলেন। রিমনির লাশ তিনি বয়ে নিয়ে যেতে পারছেন। এও এক বিশাল প্রাপ্তি। কেন জানি মনটা উদাস হয়ে এলো। বিভ্রম তৈরি হচ্ছে তার। যেন রিমনি তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। বলছে, তুমি পাপী। চলে যাও আমার কাছ থেকে।
কবরের সামনে এসে লাশ নামানো হলো। একজন বলল, আত্মীয়স্বজনদের শেষবারের মতো মুখটা দেখানো হোক। চমকে উঠলেন তিনি। শেষবারের মতো তিনি রিমনিকে দেখবেন। অপলক তাকিয়ে আছেন তিনি। কিছুতেই চোখ ফেলানো যাবে না।
রিমনির মুখটা এখন কেমন হয়েছে? জোড়া ভ্রƒ দুটো নিশ্চয়ই আগের মতোই আছে। ওর চোখের নিচের অঞ্জলি নিশ্চয়ই এখন আর নেই। তবে চোখ দুটো নিশ্চয়ই বন্ধ থাকবে। মৃত মানুষের চোখ বন্ধ করে দেয়া হয়। নইলে তার গভীর চোখ দুটো দেখা যেত। যে চোখের দিকে তিনি দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারতেন না।
আজ কি তিনি সেই চোখের গভীরতা আবারো দেখতে পারবেন? আজো কি তার হৃদয়ের অদৃশ্য ভালোবাসা কেঁপে উঠবে? আজো যে তার স্বপ্ন নগরীর দরজা খোলা শুধুই রিমনির জন্য।
তিনি অপলক তাকিয়ে আছেন। তার বুকের ধকধক বেড়ে চলছে। একজন এগিয়ে গেল রিমনির লাশের পাশে। কাফনে হাত দিলো। আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রিমনিকে দেখা যাবে।
ইস! রিমনি যদি হাসতে পারত? তাহলে চোখটা সেই আগের মতোই হেসে উঠত। গালে টোল পড়ত।
অপেক্ষার প্রহর শেষ। কাফনের কাপড়ের প্যাঁচানো কাপড়টা খুলে ফেলেছে লোকটা। শেষবারের মতো সবাই দেখার জন্য তাকিয়ে আছে। ঠিক তখনই ইমাম সাহেব বললেন, এই কী করেন? মেয়ে মুর্দার কাফনের কাপড় খোলা ঠিক না। এখানে কত বেগানা পুরুষ আছে। মুর্দার কত আজাব হবে জানো?
ইমামের ওপর কথা বলার মতো সাহস কারো হলো না। সবাই তার কথা এক বাক্যে মেনে নিল।
লাশ নামানো হলো অন্ধকার ঘরটায়। রিমনি আজ থেকে সত্যিই একা হয়ে গেল। একদিন তাকেও একা হতে হবে। জীবনটাই এমন, সব উলঙ্গনৃত্যের অবসান কেবলই সাড়ে তিন হাত মাটির ঘর। শুধুই একা। সব গল্পের পরিসমাপ্তি সেখানে।
গল্প শেষে আর কিছুই থাকে না। এই গল্পটাও এমন। সবাই ঘরে ফিরে গেছে। এবার ভুলে যাওয়ার পালা। যত দ্রুত ভুলে যাওয়া যায় ততই মঙ্গল। জীবন এমনই চায়। চায় বলেই আমরা এমন।
মাহতাব সাহেব চোখ বন্ধ করে ফেলে। এ পৃথিবীর আলো তার আর দেখতে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে করছে কেবলই অন্ধকারে বসে থাকতে। এ পৃথিবীর কোথাও না কোথাও রিমনি ছিল। আজ থেকে সেও নেই। যে পৃথিবীতে রিমনি নেই। সেই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কেন ইচ্ছে তার নেই। তারও অজানা পৃথিবীতে চলে যেতে ইচ্ছে করছে।
কিন্তু মানুষ তার ইচ্ছের অধীন না। কে জানে রিমনিবিহীন পৃথিবীতে হয়তো তাকে আরো বহু বছর থাকতে হবে। রিমনি ছাড়া স্বপ্নহীন পৃথিবীতে বেঁচে থাকাই হয়তো তার জন্য সৃষ্টিকর্তার শেষ শাস্তি।
সন্ধ্যার আগেই শেষ হলো দাফন। সবাই তিন মুঠ মাটি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করল। তিনিও তিন মুঠ মাটি দিলেন। কবরের ওপর হাত রাখলেন। মাটি সমান করলেন।
সবাই চলে এলেও একজন মানুষ কোদার হাতে মাটি সমান করতে ছিল। তিনি তাকে সাহায্য করছিলেন। লোকটা বলল, চাচা একটু দূরে দাঁড়ান। মাটি তুলে পিটায়ে দিই। রাতে বৃষ্টি আসতে পারে।
তুমি তো দেখি বেশ ভালোই মাটি সমান করতে পারো। কবরটাও কি তুমি খুঁড়ছো?
হ। এই এলাকায় কেউ মারা গেলে আমি কবর খুঁড়ে দিই।
কেন?
কবর খুঁড়তে ভালো লাগে। মনে শান্তি আসে। খাস করে মনে পাপ থাকলে পাপ ক্ষয় হয়।
তোমার কি মনের পাপ আছে?
সবারই মনের পাপ থাকে। কারোটা বড় কারোটা ছোট।
আমারও তো পাপ আছে।
আমার সাথে কবরে মাটি সমান করেন। দেখবেন মনে শান্তি আসবো।
লোকটার সাথে কবরের মাটি তুললেন তিনি। মনে শান্তি এলো না। বরং মন আরো বিক্ষিপ্ত হতে লাগল। এতক্ষণ মরা বাড়ির মধ্যে তিনি বসেছিলেন। কেউ তাকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। কিন্তু এখন ভেতরে যাওয়া যাবে না। এখন সবার ভুলে যাওয়ার সময় এসেছে। মৃত মানুষকে নিয়ে পড়ে থাকার সময় আমাদের নেই।
মাহতাব সাহেব হাঁটতে হাঁটতে বাজারের দিকে গেলেন। টিনের একটা মসজিদের বারান্দায় তিনি বসে রইলেন। এশার নামাজ পড়লেন। সবাই যখন ইমাম সাহেবের পেছনে দোয়ার জন্য হাত তুললেন তখন তিনি বের হয়ে এলেন। তিনি কখনো দোয়া করেন না।
সৃষ্টিকর্তার কাছে তিনি কী চাইবেন? এ জীবনে চাওয়ার ছিল তো কেবলই একজন। তাকে তো আর পাওয়া সম্ভব না। অসম্ভবের জীবনে সে কেমন আছে কে জানে?
গভীর রাত পর্যন্ত তিনি এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করলেন। কোনো উদ্দেশ্য নেই তার। তবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে যেতে হবে।
গ্রাম এলাকা একটু রাতেই জনশূন্য হয়ে পড়ে। নিশুতি রাত মনে হয়। অথচ খুব বেশি রাত হয়নি।
হেঁটে হেঁটে তিনি সিকদার বাড়ির পেছনে এলেন। একটা শক্তিশালী লোক কবরটার পাশে লাঠি নিয়ে বসে আছে। পাশে হারিকেন। উদ্দেশ্য শিয়াল যেন লাশ না খেতে পারে। চোর যেন কাফনের কাপড় চুরি না করে।
কবরের কাছে যাওয়া যাবে না। এখানে কেউ তাকে চেনে না। ঝামেলা হতে পারে।
শক্তিশালী লোকটা তাকে চোর ভেবে মাথা ফাটিয়ে দিতে পারে। অযথা ঝামেলা বাড়ানোর দরকার কী? এ জীবনে তিনি অনেক ঝামেলা করেছেন। আর ঝামেলা করতে চান না।
মাহতাব সাহেব দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কাছে যাওয়ার সাহস তার নেই। শেষবারের মতো রিমনিকে তার দেখাও হলো না। জীবনের শেষ ইচ্ছাটা অপূর্ণই রয়ে গেল।
মানুষের জীবন যত গড়াতে থাকে অপূর্ণ ইচ্ছার সংখ্যা তত বেশি বাড়তে থাকে। মানুষ জানে না কত না অদ্ভুত পুতুল খেলাই না খেলছেন সৃষ্টিকর্তা। তিনি কেন এমন করেন?
এবার মাহতাব সাহেবের ফিরে যাওয়ার পালা। কিন্তু তিনি ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন। কেন আছেন জানেন না।
শেষ রাতে বৃষ্টি নামল। তিনি বৃষ্টিতে ভিজছেন। চোখ বন্ধ করে রিমনিকে অনুভব করার চেষ্টা করছেন।[email protected]
016804099777 Comments-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 29 July 2022 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
Friends
শেখ মোঃ লুলুল আল মারজান
@mdmarzan
নাজমুল হক জুয়েল
@nazmulhoqjewel
Humayun Kabir Surjo
@humayunkabir-surjo
আব্দুল্লাহ আল সিফাত
@abdullah-al-sifat
Raya
@khandker-raya-shafia
SHUBIR KUMER NATH
@shubir70
Mohammed-Habibullah
@mohammed-habibullah
Mohosen-Hossain
@mohosen-hossain
Lamia Haque puspita
@pus-pi-ta



চমৎকার!