Profile Photo

Ahmed-FaruqOffline

  • Ahmed-Faruq
  • Profile picture of Ahmed-Faruq

    Ahmed-Faruq

    3 years, 10 months ago

    ছোটগল্প : দশ মিনিট
    আ হ মে দ ফা রু ক

    একটা অজানা আলো এসে পড়েছে সেয়ন্তীর মুখে। আলোটা ঠিক তীব্র নয়। আবার ক্ষীণও নয়। কিন্তু আলোটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
    সেয়ন্তী একটা স্টেজে বসে আছে। তার গায়ে একটা লেহেঙ্গা। জড়ির উপর পাথরের কাজ করা। আধুনিক বিয়েতে এখন সবাই এমন লেহেঙ্গা পরে। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। যদিও প্রচণ্ড গরমে অস্থির লাগছে তার। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই।
    কমিউনিটি সেন্টারের লবিতে একদল শিশু প্রচণ্ড হই চই করছে। বড়রাও নানা আলাপে মত্ত। পাশাপাশি চলছে ফুল ভলিউমে গান। এসব শব্দের কম্বিনেশনে একটা অদ্ভুত নীরবতা ঘিরে ধরল সেয়ন্তীকে। এত কোলাহল, অথচ সে চুপ করে বসে আছে। এত কথার কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করছে না।
    সেয়ন্তী বসে আছে ঘোমটা টেনে। ঠিক ঘোমটা না। লেহেঙ্গার সাথে দেয়া ওড়না মাথায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। এখন সে তার মেহেদি রাঙা হাত ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। যদিও তাকে ঘিরে স্টেজে বসে আছে তার বান্দবীরা। তারাও তার সাথে কোনো কথা বলছে না। বিয়ের পাত্রীর সাথে এত কথা বলা যায় না।
    সেয়ন্তীর বিয়েটা হচ্ছে পারিবারিকভাবে। ছেলেকে সে চেনে না। এনগেজমেন্টের দিনও ভালো করে মুখ দেখা হয়নি তার। অবশ্য ছবি দেখেছে। সানগ্লাস পরে গালদোলা একটা ছেলে তাকিয়ে আছে। মুখের অর্ধেকটা ঢেকে গেছে সানগ্লাসে।
    সেয়ন্তীর ভাবনাটা আরো গাঢ় হয়ে এলো। এমন একটা ছেলেকে তার বাবা কেন পছন্দ করলেন? কী এমন আছে তার মধ্যে? সে একটা ফার্মে ভালো চাকরি করে এটাই কি মূল কারণ? কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারে না সে।
    যে ছেলেকে সেয়ন্তী কোনো দিন দেখেনি, তার আচার ব্যবহার কেমন তাও জানা নেইÑ তার সাথে কিভাবে থাকবে? এর চেয়ে সাজু ভাইকে তার পছন্দ ছিল। কিন্তু তাতেই বা কী আসে যায়। সে যে তাকে পছন্দ করত এটা তো কেউ জানে না। এমন কি সাজু ভাইকেও কখনো বলা হয়ে ওঠেনি।
    কি সুন্দর করেই না কথা বলে সাজু ভাই। কথা বলার সময় তার চোখ দুটো হাসে। যে ছেলের চোখ হাসে তার চেয়ে সুন্দর কোনো পুরুষ কি পৃথিবীতে আছে? সেয়ন্তী চোখ বন্ধ করে দেখে। সাজু ভাইয়ের হাসি হাসি মুখ ভেসে ওঠে।
    সেয়ন্তীর মনটা কেন জানি খারাপ হয়ে গেল। যে লোকটার সাথে তার বিয়ে হচ্ছে তার নাম লোকমান। পুরো নাম লোকমান হোসেন। কেমন যেন একটা ক্ষেত ক্ষেত নাম। এমন একটা মানুষকে সে স্বপ্নেও কখনো ভাবেনি।
    যেদিন আংটি পরাল সেদিন কেমন লোভীর মতো তাকিয়ে ছিল তার দিকে। যেন ক্ষুধার্থ এক বাঘ। কেবলই মাংস চাই। চাই রক্ত।
    চোখের ভেতর নাকি মানুষের যাবতীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লেখা থাকে। সে বৈশিষ্ট্য পড়া যায় সহজেই। সেয়ন্তী কি সে বৈশিষ্ট্য পড়তে পেরেছে? সে তা জানে না। তবুও কেন জানি অজানা একটা ভয় তাকে ঘিরে ধরছে। অজ্ঞাত একটা কান্না এসে জমে যাচ্ছে চোখে।
    সেয়ন্তী চোখ খুলে। তীব্র আলোটা আরো তীব্র হচ্ছে। কিছুতেই অজানা মানুষটাকে আপন করতে পারছে না সে। যে মানুষের মুখটাও চোখ বন্ধ করে দেখতে পারে না সে তার সাথে সারাজীবন সে কিভাবে থাকবে? বেশ কয়েকবার চোখ বন্ধ করে লোকমানের মুখটা ভাবার চেষ্টা করল। দেখতে পেল না। বরং ভেসে উঠল সাজু ভাইয়ের মুখ। তবে কি ভুল পথে যাচ্ছে সে?
    বিয়ে মানে কী? বিয়ে মানে কি শুধু একটা আনুষ্ঠানিকতা? সামাজিক একটা বন্ধন, নাকি মনের গভীরের একটা উপলব্ধি। যদি মনের গভীরের উপলব্ধিই না থাকে তাহলে এমন বন্ধনের মানে কী?
    অদ্ভুত কোলাহলটা আরো তীব্র হচ্ছে। অথচ এই কোলাহলের মাঝেই প্রচণ্ড এক নীরবতা সেয়ন্তীর মনে। যেন সুনসান একটা নীরবতা তার হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে। এমন সুনসান নীরবতার মাঝে কোথাও সে লোকমানকে খুঁজে পায় না।
    কেন জানি মনের গভীরে অন্ধকার জমে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে মা-বাবার সাথে থাকা আনন্দময় জীবন দূরে চলে যাচ্ছে।
    জন্মের পর সেয়ন্তীদের একটা কাঠের বাড়ি ছিল। দোতলা বাড়ি। কাঠের সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতে হতো। দোতলার বেলকনিতে বাবার কোলে বসে বৃষ্টি পড়া দেখত। ঝলমল শব্দে অলৌকিক এক শব্দ বাবার সাথে তার আত্মার বন্ধন গড়ে দিত।
    আর মা! সে তো এলোমেলো ব্যস্ততায় পড়ে থাকত সংসার নিয়ে। তারপরও চা বানিয়ে আনত বাবার জন্য। বাবা এক চুমুক খেয়ে চুমুক দিতে বলত সেয়ন্তীকে। সে শব্দ করে চুমুক দিলে মা ধমক দিতেন। বলতেন, মেয়েদের শব্দ করে খেতে নেই।
    সেই মা-বাবা, সেই আপন মানুষ। সেই কাঠের ঘর, সেই আঙিনা, সেই ছোটবেলার বৃষ্টি, সেই প্রাণঢালা গ্রেট মমতা নিয়ে বড় হওয়া সেয়ন্তীর জীবনের কোনো অংশই লোকমান ছুঁয়ে যায়নি। যেন শত ক্রোশ দূরের একটা অজানা মানুষ সে।
    সেয়ন্তী চোখ খোলে। তার ভাবনায় ছেদ পড়ে। হুর হুর করে একদল মানুষ এসে দাঁড়ায় স্টেজের সামনে। তাদের মাঝে বাবাও আছেন। একটু দূরে চাচা দাঁড়িয়ে। তার পাশেই কাজী সাহেব। তার গা থেকে ভুড় ভুড় করে আতরের ঘ্রাণ বের হচ্ছে। জাফরানি আতর। ঈদের দিনে বাবাও এই আতর ব্যবহার করেন।
    কাজী সাহেব সামনে এসে দাঁড়াল। তার পেছনে উকিল বাবা। কাজী সাহেব মিষ্টি কণ্ঠে বলছেনÑ
    ‘রহিমাগঞ্জ নিবাসী আলহাজ সোলায়মান হোসেনের জ্যেষ্ঠ পুত্র মো: লোকমান হোসেনের সাথে বায়তুল নগর নিবাসী সালেহউদ্দিন ভূঁইয়ার একমাত্র কন্যা মোছাম্মৎ জান্নাতী বেগম সেয়ন্তীর ২ লাখ এক টাকা দেনমহর ধার্য করিয়া, ১ লাখ এক টাকা নগদ পরিশোধ করিয়া, ১ লাখ এক টাকা বাকি রাখিয়া বিবাহ করিতে আপনি রাজি আছেন। বলুন কবুল।’
    সেয়ন্তী মাথা নিচু করে বসে আছে। কাজী সাহেব বললেন, ‘বলুন মা কবুল,্ একটু জোরে বলুন।’
    স্টেজের চারপাশে আবারো অদ্ভুত নীরবতা। সবাই কবুল শোনার জন্য অপেক্ষা করছে। সেয়ন্তী মাথা নিচু করে বসে আছে। তার ঠোঁট কাঁপছে। বুকের ভেতরের অচেনা সেয়ন্তী বার বার কেঁপে উঠছে। অজানা একটা মানুষকে বুকের একান্ত আপন ঘরে আশ্রয় দিতে হবে। চোখ বন্ধ করতে করতে সেয়ন্তী বলল, কবুল।
    আশ্চর্য! সেয়ন্তীর চোখের সামনে লোকমানের মুখটা ভেসে উঠল। তার মুখটা হাসি হাসি।
    কাজী সাহেব আবারো মন্ত্রের মতো বিয়ে পড়ানোর নিয়ম পড়ে বললেন, বলুন মা কবুল।
    সেয়ন্তীর বুকটা এবার আগের মতো কেঁপে উঠল না। যেন বুকের কোনো একটা অংশ হালকা হয়ে যাচ্ছে। অজ্ঞাত একটা সুখের বাউলা বাতাস বয়ে যাচ্ছে হৃদয়জুড়ে। সেই বাতাসে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। এলোমেলো সে বাতাসে সেয়ন্তীর চুল উড়ছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে লোকমান। হাসি মুখে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। সেয়ন্তী বলল, কবুল।
    লোকমান হাত বাড়িয়ে সেয়ন্তীর হাত ছুঁয়ে ফেলল। আনন্দময় একটা কম্পন বয়ে যাচ্ছে তার হৃদয়ে। সে এখন আঠো স্বপ্নের জগতের মেঘের ভেলায় দাঁড়িয়ে। সেখানে দাঁড়িয়েই সেয়ন্তী স্পষ্ট শুনতে পেল কাজী সাহেবের কথা। তিনি তৃতীয়বারের মতো জিজ্ঞেস করলেন, বলুন মা কবুল।
    সেয়ন্তীর চুল ছুঁয়ে একদল সাদা মেঘ উড়ে গেল। সে আস্তে আস্তে তার সব সত্তা ঢেলে দিল লোকমানের বুকে। যেন তার সব সত্তা এত বছর এমনই এক নীড় খুঁজে বেরিয়েছে। তার সত্তায় মাথা রেখেই সেয়ন্তী তৃতীয়বারের মতো বলল, কবুল।
    সেয়ন্তীর মুখের আলোটা উজ্জ্বল হতে লাগল। যেন আকাশ গলে জোছনা পড়ছে। সেই জোছনায় স্নাত হচ্ছে তার শরীর। আস্তে আস্তে চোখ খুলে সেয়ন্তী। সে এখন অন্য মানুষ।
    লোকমান এখন কোথায়? ও নিশ্চয়ই অন্য স্টেজে বসে আছে। মানুষটাকে ভালো করে দেখা হয়নি। অথচ অনেক কাছের মানুষ মনে হচ্ছে সেয়ন্তীর। যেন তার অস্তিত্বের জন্মই হয়েছে শুধু তার জন্য।
    আবারো চোখ বন্ধ করল সেয়ন্তী। লোকমানের হাসি হাসি মুখ ভেসে উঠল। এই মানুষটা কেন এত দিন এত দূরে ছিল। ভেবে পায় না সে।

    [email protected]
    01680409977

    8
    5 Comments
Skip to toolbar