Profile Photo

Nasima KhanOffline

  • NasimaNasima1971
  • Profile picture of Nasima Khan

    Nasima Khan

    3 years, 11 months ago

    স্ল্যাং ( ১ম পর্ব)
    ——নাসিমা খান
    এই অসভ্য মহিলা, তোর ঘৃণা হবে না কিছুতেই? তোর লজ্জা নেই? তুই আমাদের সংসারে অশান্তি করিস?

    কথা কয়টি সুনিতা ঠান্ডা মাথায় শুনলো। মেয়েটির দিকে তাকালো ভালো করে। মেয়েটির বয়স বিশ বাইশ হবে। এতটুকুন মেয়ে তার সাথে এরকম আচরণ করতে পারে জানা ছিল না সুনিতার। হেসে উড়িয়ে দিতে পারতো অথবা ড্যাম কেয়ার করে না শোনার ভান করে চলে যেতে পারতো। কিন্তু এখানে তার অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। সে খুশিতে ডগমগ হওয়ার মতো কিছুই শুনিনি।

    সে দাঁড়াতেই মেয়েটি তারস্বরে চেঁচাতে লাগলো। হ্যাঁ হ্যাঁ আমি তোকেই বলছি, তোর কী ঘৃণা পিত্তি কিছুই নেই? বেশ্যা! বাজে মহিলা।

    সুনিতা দেখলো মেয়েটি দেখতে মোটামুটি। ছোট করে চুল ছাটা। সালোয়ার কামিজ পরা। মুখে মেকাপের বিন্দুমাত্র নেই। ঠোঁট দুটি বেশ গোলাপি রঙের। মেয়েটিকে কিছুতেই খিঁচতি করা বস্তির মেয়ে মনে হচ্ছে না। কিন্তু নিজের কানকে তো অবিশ্বাস করা যায় না। সুনিতা পিছন ফিরে হাঁটতে শুরু করলো। বিষয়টাকে বেশি মূল্য দেওয়া ঠিক হবে না। ইতিমধ্যে দুচারজন পথচারীর কৌতুহলী দৃষ্টি এদিকেই রয়েছে। লজ্জা করছে তার। অবশ্য মেয়েটি বলছে সুনিতার লজ্জা নেই। এসবে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। সুনিতা পিছন ফিরে হাঁটতে শুরু করা মাত্র মেয়েটি আবার চিৎকার করে উঠলো, এই মাগী, তুই হাঁটছিস যে বড়ো? তোর কানে যাচ্ছে না? তুই আমাদের সংসারে আগুন দিচ্ছিস ক্যানরে বেয়াদব মেয়েছেলে?

    সুনিতা চারিদিকে তাকালো। পথচারীদের অনেকেই দাঁড়িয়ে গেছে। সবার ভিতর কেমন টান টান উত্তেজনা। কী শুনবে? কী হতে পারে এবার?

    সুনিতা দাঁড়িয়ে গেল। মেয়েটির কাছে গিয়ে চোখে চোখ রাখলো। মেয়েটির চোখ থেকে ক্রোধের আগুন ঝরছে। ফণা তোলা নাগিনীর মতো ফোঁস ফোঁস করছে সে।
    সুনিতা ঠান্ডা কণ্ঠে বললো, আগে বলোতো মেয়ে তুমি কে? তুমি আমাকে চিনো অথবা আমি তোমাকে? কোথাও দেখা হয়েছে এর আগে আমাদের?

    মেয়েটি হাঁপাচ্ছে রাগে। কর্কশ কণ্ঠে বললো, দেখা হলে আমি তোকে জুতা পেটা করতাম, আমি ব্যারিস্টার রজব আলীর মেয়ে। তুই আমার বাবার পথ থেকে কবে সরে দাঁড়াবি?

    সুনিতা ভ্রুকুঞ্চিত করে তাকিয়ে আছে। মেয়েটি রজব আলীর মেয়ে কবিতা? কিন্তু এরকম মুখের ভাষা কীভাবে সম্ভব! সুনিতার ভিতরটা কেমন করে উঠলো। বেদনা, জ্বালা, অভিমান, রাগ সব বুকের ভিতর হুল্লোড় তুলছে। কান্না আসছে না কিন্তু চোখ জ্বালা করছে।

    সুনিতা অস্পষ্ট উচ্চারণে বললো, তুমি রজব সাহেবের মেয়ে? ভাবতে কষ্ট হচ্ছে? এরকম স্ল্যাং আমি আগে শুনিনি!

    তুই কী শুনেছিস আর না শুনেছিস সেটা তোর নিজের ব্যাপার। ফার্দার আমার বাবার সাথে যোগাযোগ রাখলে তোকে আমি কুকুর দিয়ে খাওয়াবো? ওকে? মনে রাখিস নোটি!

    সুনিতা শান্ত কণ্ঠে বললো, কথাগুলো তোমার বাবাকে বললেই আমি খুশি হবো আর মেয়ে আমি জানতাম রজব সাহেব সম্ভ্রান্ত এলাকায় থাকে। বস্তি বা কুলি শ্রেণির কেউ নন তিনি। কিন্তু তোমার মুখের ভাষা এতো জঘন্য। ন্যুনতম ভদ্রতাটুকুও তুমি শেখীনি? লেখা পড়া শিখেছিলে জানতাম! এখন দেখছি তোমার ভিতর কুশিক্ষায় ভরা। লেখাপড়া করলেই সবাই শিক্ষিত হয়ে যায় না এটা তোমার কাছ থেকে শিখলাম।

    কবিতা চোখ দিয়ে খেয়ে নিচ্ছে সুনিতাকে। চোখ ছিটকে বেরিয়ে আসবে মনে হচ্ছে। সে রাগে কাঁপছে। কবিতা আবার স্লাং ইউজ করলো, বেশ্যা তোর কাছে আমার শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট নিবো না। তুই আমার বাবার সাথে কোনো যোগাযোগ করতে পারবি না। এটা লাস্ট ওয়ার্নিং আমার। আমাকে চিনিস না!

    সুনিতাদের কথোপকথন পথচারী শুধু শুনছে না তারা বলছেও। এক পথচারী মহিলা বললো, আচ্ছা করে জুতোপেটা করে দাও মেয়ে, এইসব মহিলাদের জন্য সমাজটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

    একজন যুবক দাঁড়িয়ে শুনছিল। যুবক বললো, শুধু মহিলার দোষ? ঐ মেয়েটার বাবা, রজব আলী না ফজর আলী তার দোষ নেই? বাবাকে বলতে না পেরে মহিলাকে গালি দিচ্ছে? এটা কী ভদ্রলোকের কাজ?

    একজন বৃদ্ধা মহিলা দাঁড়িয়ে শুনছিল। সে বললো, যেমন কুকুর তেমন মুগুর।

    একজন চাকুরীজীবি মহিলা বললো, এসব পারিবারিক কলহো রাস্তায় কেন? মেয়েটির বাবার মান সম্মান বাড়ছে বুঝি? মেয়েটি নিশ্চয় নিরক্ষর। যত্তসব ফাউল!

    সুনিতার কানে আশেপাশের গুঞ্জন যাচ্ছে না। তার মাথা ঝিমঝিম করছে। সে দৌঁড়ানোর মতো করে ভীড় ঠেলে সামনে এগিয়ে একটা রিকশায় উঠে বসলো। থমথম বুকের ভিতর হিমশীতল হাওয়ায় কেমন নিথর হয়ে পড়ে রইলো সুনিতা। রিকশা কিছুক্ষণ চলার পর রিকশাওয়ালা বললো, কই যাবেন আপনে?

    সুনিতার সম্বিত ফিরে এসেছে। সে বললো, হুম! ও আচ্ছা! ঝিকাতলা যাবো।

    বাসায় এসেই সুনিতা তার পরোলকগত স্বামীর ছবির সামনে এসে দাঁড়াল। বোবা পাথরের মতো নিস্প্রভ চোখে ছবির দিকে তাকিয়ে আছে সে। তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরছে। কী বলতে চেয়েছে সুনিতা নিজেই জানে না। কী বলার আছে অকালে ছেড়ে চলে যাওয়া এই মানুষটাকে? তাহলে কেনই বা সেখানে মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই ছবির দিকে? সুনিতা কিছুই জানে না।

    ছায়া সুনিতার মেয়ে। মাস্টার্স এর ছাত্রী সে। রুমের কলিং বেল বাজতেই দরজা খুলে দিয়ে ওয়াশরুমে গিয়েছিল। এসে থমকে দাঁড়ালো মায়ের কাছে। বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে কেন কাঁদছে তার মা? মাকে তো কখনো এমন করে বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখিনি সে। ছায়া সুনিতার ঘাড়ে হাত রাখলো। সুনিতা চমকে উঠে চোখ মুছলো। তারপর কান্না লুকিয়ে ম্লান হাসলো সুনিতা। আসলে কান্না লুকিয়ে হাসা খুব কঠিন কাজ। চোখ ছলছল অথচ ঠোঁট বাঁকিয়ে এ হাসির নাম কী হতে পারে সুনিতা জানে না। তবুও জোর করে মুখে হাসি টেনে সুনিতা বললো, কীরে ছায়া? কী হয়েছে মা?

    ছায়া দীর্ঘশ্বাস লুকালো না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, কিছু হয়নি মা। তুমি ঠিক আছো? কী হয়েছে তোমার?

    সুনিতা ভিতরের রুমে যেতে যেতে বললো, দুপুরে ঠিকঠাক খেয়েছিলি তো? টেবিলের উপর কচু ভর্তা ছিল, ঢাকনা উঁচু করে দেখেছিলিস? খেয়েছিস তো?

    ছায়া সুনিতার পিছু পিছু যেতে যেতে বললো, আর একটু ঝাল ঝাল হলে আরও জোস হতো! এমনিতে খারাপ লাগিনি। তুমি ভর্তা করেছো বলে কথা!

    মুগের ডাল খেয়েছিস?

    সব সব খেয়েছি মা। পুঁটি মাছ ভাজি, কচু ভর্তা আর মুগের ডাল রান্না। আর কিছু ছিল?

    সুনিতা হাসলো। বললো, আরে নারে মা! সকালে অত সময় পাবো কোথায় আর কিছু করবো? একঘণ্টার বেশি সময় লাগে অফিস যেতে তারপর রাস্তায় যা জ্যাম, অফিস যেতে প্রতিদিন লেট হচ্ছে। কবে যে বসের বকুনি শুনবো!

    ছায়া সুনিতার দিকে তাকালো। সুন্দরী বলতে যা বোঝায় তা তার মা নয়। গায়ের রঙ চাপা, চোখ দুটো স্বাভাবিক। নাক ঠোঁট কিছুই আকর্ষণীয় নয়। কিছু না থাকা সত্ত্বেও তার মা বেশ সুন্দর। উঁচু লম্বা ফিগার, মোহনীয় ব্যক্তিত্ব। কিন্তু সারাক্ষণ দুঃখের এক গভীর সমুদ্রে ডুবে থাকে তার মা। মাকে সে বুঝতে পারে। মায়ের বুকের ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাস গুলো তাকে খুব কষ্ট দেয়। কিন্তু ছায়া তার মাকে কিছুই বলে না। ছায়ার এমনই স্বভাব, চুপচাপ থাকে। বান্ধবীদের সঙ্গে আড্ডা নেই। নেই অহেতুক ঘোরাঘুরি। নিরবে সব কিছু পরিমাপ করে। মনের ভিতর তার নিজস্ব রাজ্যে সারাদিন সে একা একা ঘোরে। কাউকে বিরক্ত করা বা কাউকে ঝামেলায় ফেলা তার স্বভাবে নেই। সে এমনই। গান শোনা, গল্প কবিতা লিখে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া এসব করে তার অবসর কেটে যায়। কাউকে গাল মন্দ করা, কাউকে অপমান করার কথা তার মাথায় আসে না।

    ছায়া আজ বুঝতে পেরেছে তার মার আজ মন খারাপ। ভয়ানক কিছু ঘটেছে। মায়ের কাছে বসে মায়ের কাছে প্রশ্ন করা অথবা মায়ের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলতে ছায়ার কোথায় যেন বাঁধে। এটা কী তার আর তার মায়ের ভিতর দূরত্ব তৈরি করছে। হতেও পারে। ছায়া এসব নিয়ে আদৌও ভাবতে চায় না। শুধু জানে আজ তার মায়ের মন খারাপ। মাকে একা ছাড়তে হবে এখন। মা একা থাকলেই হয়তো মার ভালো লাগবে।

    সুনিতা ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে বললো, রাতে কী রাঁধবো ছায়া?

    দুপুরের যা আছে তাতেই চলবে মা। তুমি রেস্ট নাও ভাতটা আমি রান্না করে নেব।

    সুনিতাও চোখ বুজে পড়ে থাকতে চায়ছে। তার মনের সাথে শরীরও অবস হয়ে আসছে। খুব কষ্ট পেলে তার শরীরের শিরা ধমনী সব যেন শিথিল হয়ে পড়ে। তার খুব ঘুম আসে। তার ক্লান্তিতে অবস দেহ ঘুমুতে চায়।

    সুনিতা শুয়ে পড়ে। ছায়া ঘরের বাতি নিভিয়ে পর্দা টেনে তার রিডিং রুমে এসে পড়তে বসলো। সে শুনতে পাচ্ছে তার মায়ের ফোন বেজে চলেছে
    বেজে বেজে থেমে গেল রিংটোন। তার মা ধরছে না কেন ফোন। আবার ফোন বেজে উঠল।এটা বিশেষ কারো ফোন। এই ফোন যদি সুনিতার অজ্ঞান অবস্থায়ও বাজে সুনিতার জ্ঞান ফিরে যাবে। তবুও আজ তার মা জেগে থেকেও ফোন কেন ধরছে না। ছায়া পায়ে পায়ে সুনিতার রুমের ভিতর ঢুকে দেখলো সুনিতা কেমন নিথর হয়ে পড়ে আছে। ফোনটা বেজে চলেছে।

    ছায়া ডাকলো, মা ঘুমিয়েছো?
    সুনিতা ক্লান্ত কণ্ঠে বললো, না ছায়া ঘুমাইনি

    ফোন বাজছে, মা।

    থাক, বাজুক।

    ফোনটা ধরো

    জরুরি নয় ছায়া

    তোমার কাছে দিয়ে যাবো মোবাইলটা?

    আচ্ছা, দে।

    ফোন দিয়ে ছায়া রুম ত্যাগ করলো। এই বিশেষ রিংটোন ছায়ার একদম পছন্দ নয়। কিন্তু মায়ের যে খুব প্রিয় রিংটোন। মায়ের প্রিয় কল। সুনিতা যদি এতে শান্তি পায় তাতে ছায়ার ক্ষতি কী! তার ভিতরে ভিতরে খুব ক্ষোভ কাজ করে। কিন্তু ছায়া কিছুই প্রকাশ করে না। কখনো বলে না, মা তুমি আর উনার সাথে কথা বলবে না, এই রিংটোন আমার বুকের ভিতর ছিঁড়ে ছিঁড়ে যায়। ভীষণ ক্ষত সৃষ্টি হয়।

    কিন্তু ছায়া কিছুই বলে না। নিরবে রুম ত্যাগ করে অথবা চুপচাপ পাশে শুয়ে থাকে। মা সাধারণত সংসারের খুঁটিনাটি বিষয়, অফিস সহকর্মীরা কে কি বলেছে। আজ কী রান্না করেছে। আগামী দিন কী প্রোগ্রাম আছে এইসব বিষয়ে আলাপ করে। প্রেম ভালোবাসা জাতীয় কিছুই বলে না। হয়তো তার মায়ের এটাই প্রেম। ছায়া নিরবে শোনে। মা শিশুর মতো হাসে। খুব সামান্য বিষয় যা না বললে কিছুই হতো না সুনিতার আলাপের বিষয় সেই গুলো।

    আর বলো না, আজ তো বাসটা ধরতে ধরতে ফেলই করলাম, পরের বাসে অফিস গেলাম।

    ওদিক থেকে শুধু, আচ্ছা, হু এই জাতীয় শব্দ ভেসে আসে।

    এইসব কথা কী ছায়ার মা ছায়ার সাথে শেয়ার করতে পারতো না? হয়তো পারতো। হয়তো পারতো না। অথবা পারলেও আনন্দ খুঁজে পেত না।

    আসলে এটাই সত্য প্রত্যেক মানুষের এইসব আবোলতাবোল গল্প শোনার জন্য একজন বিশ্বস্ত সঙ্গীর প্রয়োজন। একজন ভালো লাগার ভালো বাসার মানুষের দরকার। কিন্তু ছায়া কী তার মায়ের প্রিয়জন হতে পারে না? ছায়ার কাছে এসব শেয়ার করতে তো পারে। বাইরের একজন মানুষের কী দরকার!

    ছায়ার ভিতর এইসব চিন্তা ঘুরপাক খায়। কিন্তু কখনো সে মুখ ফুটে মাকে বলতে পারে না। কোথায় যেন একটা দেওয়াল আছে। সেই অদৃশ্য দেওয়াল দুজনের ভিতর ফারাক তৈরি করে দিয়েছে।

    সুনিতা নিজেও উপলব্ধি করে ছায়া কিছুতেই চায় না রজব সাহেবের সাথে কথা বলুক। কিন্তু মেয়েটা তার নিজের মুখে বলতে পারে না। সুনিতা তো ইচ্ছে করলেই রজবের সাথে সম্পর্ক শেষ করতে পারে না। নাকি সেটা সম্ভব!

    ছায়ার বাবা যখন ক্যান্সারে আক্রান্ত। রজব আলীই সারাক্ষণ পাশে থেকে সাহস যুগিয়েছে। সেবা দিয়ে, সঙ্গ দিয়ে পাশে থেকেছে। ছায়ার বাবা সুমিত বারবার বলে গিয়েছে, রজব এদের কার কাছে ছেড়ে যাবো বল? আমার সুনিতা, বাবন আর ছায়াকে দেখে রাখিস।এই পৃথিবীতে ওদের দেখার যে কেউ থাকবেনা রজব।

    রজব আর সুমিত সেই ছেলেবেলার বন্ধু ছিল। কলেজ, ভার্সিটি এক সাথে কাটিয়েছে। একসাথেই দুজন উকিলবারে প্রাক্টিস শুরু করেছিল। রাহেলা আর রজবের সাথে তখন ধুম প্রেম চলে। রাহেলা নিজেও বহুদিন বহু পথ্য কিনে এনেছে। সুমিতের কঠিন অসুখে রাহেলাও চোখ মুছেছে।

    সুমিত বেঁচে থাকতেই রাহেলা রজব বিয়ে করে নেয়। সুমিতের তখন আছে কি নেই এই অবস্থা। রজব কোর্টকাছারি ফেলে পড়ে থেকেছে সুমিতের কাছে। সুনিতা অনেক বলেছে, রজব ভাই, তুমি আর কত রাত জাগবে? এই দায়িত্ব আমার। আমাকেই পালন করতে দাও।

    সুনিতা, এই সুমিত আমার প্রাণের বন্ধু।ওর শেষ সময় আমাকে কাছে থাকতে দাও, তুমি বোঝো না আমার সুমিত কত কষ্ট পাচ্ছে?

    সুমিত চলে যাবার পর রজবের ঘাড়েই যেন সব দায়িত্ব পড়ে গেল। বাবন তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। ক্যাডেট কোচিং করতো। ক্যাডেটে দিবে বাবনকে সুমিতের খুব শখ ছিল। সুমিতের মৃত্যুর পর বাবনের সব দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়েছিল রজব। বাবনকে ক্যাডেটে দেওয়ার পর রজবের মনে হয়েছিল সুনিতা শিক্ষিত মানুষ। নিজের পায়ে দাঁড়াক। নিজেকে আর মেয়ে ছায়াকে নিয়ে ভালোভাবে বাঁচুক। ঢাকা শহরের উপর অনেক খরচ। সুমিতের রেখে যাওয়া সম্পত্তির প্রায় সব শেষের পথে। ঝিকাতলার এই দ্বিতলার ফ্ল্যাট ছাড়া তেমন কিছু আর নেই। এই মুহুর্তে একটি চাকুরির ব্যবস্থা করে দেওয়া দরকার। একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকুরির ব্যবস্থা করে দিয়ে রজব হাঁফ ছেড়ে বেঁচে ছিল।

    যোগাযোগটা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল রজব আলীর। যেটা রাহেলা সহ্য করতে পারিনি। একদিন রজব আলীকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো, উনাদের সকল ব্যবস্থা করে দিয়েছো, ভালো কাজ করেছো। বন্ধুর দায়িত্ব পালন করেছো। কিন্তু একজন বিধবা মহিলার কাছে এতো ঘনঘন যাওয়াটাকে আমি ভালো চোখে দেখছি না। তুমি কী দুর্বল হয়ে পড়েছে ঐ বিধবা মহিলার প্রতি?

    রজব আলী বিস্মিত হয়েছিল! সত্যি কী সে সুনিতার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে? সম্ভব সেটা? নাকি মহিলাদের স্বভাব এটা? স্বামীকে একার সম্পত্তি বানিয়ে নেওয়া। হয়তো তাই স্ত্রীগণ হয়তো মনে করেন স্বামী মানেই পুরোপুরি একজনের উপর অধিকার, তার বাবা থাকবে না, মা থাকবে না, আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধব কেউ থাকবেনা। কারো কোনো অধিকার থাকবে না। সব অধিকার শুধুই স্ত্রীর।

    রজব আলীর কাছে রাহেলার প্রশ্নটা নিছক সাধারণ প্রশ্ন মনে হয়নি। এটা রাহেলার সন্দেহ। একবার স্ত্রী মনে সন্দেহ ঢুকে গেল তা আর কিছুতেই যায় না। রজব আলী চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। সুনিতা তাকে ডাকলে তাকে নানা অজুহাতে না করার ক্ষমতা কী তার হবে?

    দুদিন একবারের জন্য মোবাইল ও করেনি রজব আলী। সেকি শুধুই রাহেলার নিষেধের জন্য। নাকি নিজেকে পরীক্ষা করতে চেয়েছিল সে? হতে পারে নিজেকে যাচাই করার জন্য । পুরুষ মানুষ কবে কখন স্ত্রীর জন্য নিজেকে শাস্তি দিয়েছে? স্ত্রীর জন্য নিজের ইচ্ছেকে কবে গলা টিপে হত্যা করেছে? রজব আলী দুদিন ধরে বহু প্রশ্নে নিজেকে ক্ষত বিক্ষত করেছে।

    স্ত্রীর সন্দেহ ষোলো আনা খাঁটি না হলেও বারো আনা খাঁটি তো বটেই। রজব আলী তৃতীয় দিন নিজেকে আর সামলাতে পারিনি। মোবাইল করেছে, সুনিতা বলো তোমরা কেমন আছো?

    তুমি দুদিন খবর নিলে না যে?

    খুব বিজি ছিলাম, সময় হয়নি

    কোর্টকাছারির মানুষ গুলো বিজিই থাকে। তো সময় করে রাহেলা ভাবিকে নিয়ে একবার এসো, সেতো সুমিত চলে যাবার পর আর আসিনি। আমাকেও তো যেতে বলোনি। নিজে ইচ্ছে করে কীভাবে যাই বলো তো?

    রজব আলী হেসেছে। সে যে রাহেলাকে এই মোবাইল করার কথা জানাতেও ভয় পাচ্ছে সে কথা সুনিতাকে কীভাবে বলবে সে? সুনিতা প্রশ্ন করেছে, চুপ করে গেলে যে তুমি? আমাকে তোমার বাড়িতে নিতে চাও না বুঝি?

    রজব আলী কি একটা কাজ মনে পড়েছে এমন ভাবে বলেছে, সুনিতা তোমার সাথে পরে কথা বলি আমার ক্লায়েন্ট আমাকে ফোন করেছে।।

    ক্লায়েন্ট কেউ ফোন করেনি। সিগারেট খেয়ে কুলি করে চকলেট খাওয়ার মতো, কল লিস্ট থেকে সুনিতার নম্বর মুছে বাসায় ঢুকেছে রজব আলী। রজব আলীর তাও খুঁতখুঁত ভাব যায় না। রাহেলা কী টের পেয়ে গেছে সে সুনিতাকে ফোন করেছে? অথচ তিনদিন আগেও ঘরে বসে লর্ড স্টাইলে সুনিতাকে ফোন করেছে। খোঁজ খবর নিয়েছে। না ছিল ভয়, না ছিল সংকোচ না ছিল এই লুকোচুরি । তাহলে কী সত্যি রজব আলী সুনিতার উপর দুর্বল হয়ে পড়েছে?

    রজব নিজেকে কন্ট্রোল করতে যোগাযোগ প্রায় বন্ধ করতে বসেছে। মোবাইল কলের অপেক্ষা নেই, নিজের ও কোনো তাড়া নেই। কিন্তু অবসর পেলেই সুনিতার ম্লান মুখটি তাকে অস্থির করে তুলেছে। বুকের ভিতর হাহাকার শূন্যতা শ্মশানচারী রাক্ষসের মতো বুকের ভিতর খেয়ে ফেলতে চায়। ক্লায়েন্টের ফাইল ছুঁতে ইচ্ছে নেই। একটানা বই পড়তে ভালো লাগছে না,প্রিয় গান অসহ্য হয়ে উঠেছে। রাহেলা কিছু বললে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। চিল্লাপাল্লা চেঁচামেচি করে দুনিয়া এক করে ফেলে।

    সেদিন চায়ে চুমুক দিয়েই ক্ষেপে উঠলো রজব আলী। সে চিৎকার করে ডাকতে থাকল, রাহেলা, এই রাহেলা

    তড়িঘড়ি করে রান্নাঘর থেকে ছুটে এলো রাহেলা, কী হয়েছে কবিতার বাবা?

    আমাকে মেরে ফেলতে চাও, জানো না আমার ডায়াবেটিস? চায়ে চিনি দিয়েছো কেন?

    রাহেলা বুঝে দেয়নি। হয়তো ভুল করে চায়ে চিনি দিয়ে ফেলেছে। সে অনুতপ্ত তার জন্য। কিন্তু রজবের তোপের মুখে রাহেলার কিঞ্চিৎ রাগও হয়েছে। একদিন না হয় ভুল করে চায়ে চিনি দিয়ে ফেলেছে। তার জন্য এত তর্জন গর্জনের কী আছে। চুপচাপ তাকিয়ে থেকে বলেছে, ভুল করে হয়ে গেছে। কাপটা দাও আর এক কাপ এনে দিই।

    না না আমার চায়ের দরকার নেই। তুমিই খাও।
    বলেই কাপটা ছুঁড়ে মেরেছে মেঝেতে। সুন্দর কাপটি ভেঙে খণ্ডখণ্ড।

    সেদিকে তাকিয়ে রজব আলীর নিজেরই অস্বস্তি লেগেছে। এটা তার অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি হয়ে গেল। রাহেলা বেগম রাগে কাঁপছে। নিজেকে সংবরণ করে বলেছে, ভুতে ধরেছে তোমাকে? এরকম থার্ডক্লাশ আচরণ তোমার সাজে কী?

    চলবে ——————————-

    7
    6 Comments
    • কটুক্তি ভয়ানক অপরাধ। সুন্দর লেখার জন্য অভিবাদন।

    • খুব গোছানো, পরিচ্ছন্ন লেখা। ভালো লাগল। যেন মেপে মেপে শব্দ বসানো। শুভেচ্ছা নিবেন।

    • যার নাম কবিতা তার মুখের ভাষায় একটুও কাব্যিক অভিব্যাক্তি খুজে পেলাম না। তবে গল্পের আরেক জায়গা খুব ভালো লাগলো। প্রিয় মানুষগুলোর মুখের আবোল তাবোল কথাগুলোও সুমধুর লাগে… একদম ঠিক কথা।

Skip to toolbar