-
পোড়োবাড়ির রহস্য
পর্ব_পনেরো
শব্দটা শুনেই তালহা সতর্ক হয়ে গেলো। খুব দ্রুত সেখান থেকে সরে পাশের ঘরের বারান্দায় চলে গেলো। সেই লোকটাই এসেছে বোধহয়, একটু আগে যে এসেছিলো। তালহা বারান্দার ভেতরে দিকে চলে গেলো। মনে হলো অনেকগুলো পায়ের শব্দ। গা শিউড়ে উঠলো তালহার। ‘ যদি ধরা পড়ে যায়!’ পায়ের শব্দ শুনে তালহা নিশ্চিত ঘরটাতে একজন নয় একাধিক লোক ঢুকেছে। ও আর একটু আড়ালে ঢুকে যায়। কিছুক্ষণ পর কথাবার্তার আওয়াজ শোনা যায়। তালহা কান পেতে কথা শোনার চেষ্টা করে। কিছুক্ষণ শোনার পর বুঝতে পারে অন্য কেউ নয় তার বন্ধুরা তাকে উদ্ধারের জন্য তালা খুলে ঢুকে পড়েছে। আড়াল থেকে বের হয়ে আসে তালহা। তিনজনে মিলে আরও কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটি করে তেমন কিছু পেলোনা। আর বেশীক্ষণ থাকাটা বিপদজনক হতে পারে ভেবে বেরিয়ে যেতে গিয়ে আবার দাঁড়িয়ে পড়লো তালহা। এতক্ষণ নজরে পড়েনি জিনিসগুলোর উপর। ঘরের একটা কোণায় চাদর দিয়ে ঢাকা পড়ে আছে ওগুলো। চাদর দিয়ে ঢাকা থাকলেও পিয়ানোটা চিনতে অসুবিধা হলোনা তালহার। কাছে গিয়ে চাদর তুলে থ মেরে গেলো ও।পিয়েনো, গীটার, ভায়োলিন, বেস গীটার, সাউন্ড বক্স, কংগা, ড্রাম সব মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট একটা চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। তালহা আবার চাদর দিয়ে সেগুলো ঢেকে দিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে গেলো। বের হওয়ার সময় দরজায় তালা মারতে ভুললোনা। ওর দেরি দেখে যায়িদ একবার উঁকি দিয়ে দেখেছে ও কি করছে তারপর দুজনে দরজার কাছে পাহারাদারের মত দাঁড়িয়ে ছিলো। তালহা বের হতেই ওরা দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করলো। যেতে তালহা বলল, ভেতরের ঘরটাতে অনেকগুলো মিউসিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট দেখলাম। সাধারণত এই ধরণের ইনস্ট্রুমেন্ট ব্র্যান্ডের দলের কাছেই থাকার কথা। ব্যাপারটা খতিয়ে দেখার মতো। ডায়েরীটাও মনে হচ্ছে কোন কাজে দিবে।
আজকে আর পোড়োবাড়িতে ঢুকবোনা? মুয়ায়েব তালহাকে জিজ্ঞাসা করলো।
ঢুকবো, বাড়িটা থেকে বের হয়ে সামনের দিকে এগোতে গিয়ে ডান পাশে একটা সরু গলি দেখতে পেলো তালহা। একমনে হেঁটে যাচ্ছিলো যায়িদ আর মুসায়েব। পেছন থেকে জামা টেনে ধরলো তালহা। তালহা টান দেওয়াতে ওরা দুজনেই দাঁড়িয়ে পড়লো। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো কীরে দাঁড়িয়ে পড়লি কেন?
হাত দিয়ে ডান পাশটা দেখিয়ে বললো, দ্যাখ এই গলিটা ওদিকে চলে গেছে। আমার ধারণা এটা পোড়োবাড়িটার সাথে গিয়ে মিশেছে। চল ওদিকটায় গিয়ে দেখি। তিনজন মিলে পথ পরিবর্তন করে গলিটার মধ্যে ঢুকে গেলো। প্রায় পাঁচ মিনিট হাঁটার পর দেখা গেলো গলিটা সত্যিই পোড়োবাড়ির সাথে মিশেছে। ভেতরে ঢুকতে গিয়ে মানুষের আওয়াজ শুনে থেমে গেলো ওরা। রাস্তাটার দুইপাশে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি দেবদারু গাছ। শব্দটা শুনে গাছের আড়ালে চলে গেলো ওরা। আড়ালে থেকে একটু মাথা বের করে দেখলো দুজন লোক বের হয়ে যাচ্ছে। একেতো অন্ধকার তার উপর দুজনই মাস্ক আবৃত থাকায় চেহারা দেখতে পারা গেলোনা। লোক দুজন বের হয়ে যাওয়ার পর তালহারা ভেতরে ঢুকে পড়লো। সিঁড়ি দিয়ে সোজা নিচে নেমে গেলো ওরা। নিচের দিকটা ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকার। নামতে নামতে আবার সেদিনকার মত সেই ঘ্রাণ নাকে এসে নাকে এসে লাগলো। ঘ্রাণের সাথে সাথে অদ্ভুত শব্দটাও কর্ণকুহরে ঢুকে আবেশ সৃষ্টি করতে লাগলো। সময়ের সাথে সাথে শব্দটা জোরালো হতে থাকে। নিচে নেমে লম্বা করিডোর ধরে হাঁটতে লাগলো তালহা। যায়িদ ও মুসায়েবের একজনকে সিড়ির কাছে এবং অন্যজনকে বাম পাশের ঘরগুলো দেখতে বলে তালহা একাই করিডোর ধরে একেবারে শেষ প্রান্তে চলে গেলো।
মুসায়েবকে সিঁড়ির গোড়ায় বসিয়ে বাম পাশের ঘরগুলোতে চলে গেলো যায়িদ। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। তবে কিছুক্ষণ পর চোখ সওয়া হয়ে গেলে চারিদিকটা দেখতে পেলো। ঢোকার মুখের ঘরটা ফাঁকা। একটা ফাইল কেবিনেট আর একটা খাট ছাড়া আর কিছুই নেই ঘরটাতে। তার পরের ঘরটা দেখেও হতাশ হতে হলো। কিন্তু ৩ নাম্বার রুমে গিয়ে যায়িদের চোখ ছানাবড়া। কতগুলো ড্রাম সারিবদ্ধ করে রাখা আছে। যায়িদ একটা ড্রামের ঢাকনা তুলে দেখলো বিকট গন্ধ বের হচ্ছে। হাত দিয়ে তাতে আঠেলো তরল বস্তু দেখতে পেলো। এর পরের ড্রামের ঢাকনা তুলে দেখা গেলো কতগুলো প্যাকেট স্তরে স্তরে সাজানো রয়েছে। একটা প্যাকেট হাতে নিয়ে দেখে ভেতরে সাদা রঙয়ের পাউডার। পর দুইটা ড্রাম ভর্তি করে সাদা প্যাকেট রাখা আছে। এর পরের ড্রামেও অনেকগুলো প্যাকেট স্তরে স্তরে সাজিয়ে রাখা আছে। এসব প্যাকেটে্র ভেতর পাউডারের বদলে আছে ছোট ছোট ট্যাবলেট দিয়ে। মোট পাঁচটা ড্রাম রাখা আছে ঘরটাতে। পঞ্চম ড্রামটার ঢাকনা খুলতে গিয়ে দেখলো বেশ শক্ত করে আটকানো। দুই হাত দিয়ে টেনে ঢাকনা খোলার চেষ্টা করেও কাজ হচ্ছে না।
এভাবে সারাদিন টানাটানি করলেও ঢাকনা খোলা তোমার পক্ষে সম্ভব হবেনা।
তুই জানিইই……………কে কে কথা বলে? তোতলাতে তোতলাতে কথা বলে পেছনে ফিরেই লোকটাকে দেখতে পেলো যায়িদ। শুধু চোখ ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছেনা লোকটার। অবাক হয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকলো যায়িদ। মনে মনে ভাবলো এখানে আসলো কি করে? মুসায়েবের সংকেত পাঠানোর কথা ছিলো কিন্তু ওতো কোন সংকেত শুনতে পায়নি। ঘুমিয়ে গেলো নাকি ছেলেটা।
কি ভাবছো? বন্ধুর কথা? সেও আমাদের হেফাজতে আছে। লিটন ওকে নিয়ে আয়তো। কিছুক্ষণ পরে একটা লোক হাত পিছমোড়া করে বাঁধা অবস্থায় মুসায়েবকে নিয়ে আসলো। লোকটার নাম লিটন। হ্যা এই নামটাই তালহার কাছে শুনেছে। যায়িদের মনে পড়ে গেলো। প্রথম লোকটা মুসায়েবকে ভেতরে ঢুকিয়ে যায়িদকে বলল, এখন দুই বন্ধু এখানে বসে বসে পরিকল্পনা কর। কথাটা বলতে বলতে ওদেরকে ঘরের মধ্যে আঁটকে রেখে বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। কিছুক্ষণ পর দরজাটা আবার খুলে গেলো। যায়িদ আর মুসায়েব ঘরটার চারিদিক চোখ বুলিয়ে বের হওয়ার পথ খুজছিলো। দরজা খোলার শব্দে তটস্থ হয়ে যায়। আবার আগের জায়গায় গুটিশুটি হয়ে বসে থাকে।
এবার শুধু লিটন নামের লোকটা ভেতরে আসে। তোমাদের বন্ধু কই? ঢুকেই প্রশ্নটা ওদের উদ্দেশে ছুড়ে দিলো।
প্রশ্নটা শুনে নিশ্চিত হওয়া গেলো যে তালহা ধরা পড়েনি। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো যায়িদ।
লিটন ধমকের সুরে আবার জিজ্ঞাসা করলো, বললেনা তোমাদের চালাক বন্ধুটা কোথায়?
চালাক বন্ধু? আপনি কার কথা বলছেন?
কি যেন নাম? কিছুক্ষণ মনে করার চেষ্টা করে বলল, মনে পড়েছে তালহা, তাইনা?
মিথ্যা বলাটা ঠিক হিবে কিনা বুঝতে পারছেনা যায়িদ। একটু ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করলো তালহা কে?
কেন চিনোনা তোমরা? ন্যাকামী না?
মুসায়েব বলল, আপনি কেমন করে চিনেন?
লিটন বুঝতে পারলো মুসায়েবরা চালাকি করছে। রেগে গিয়ে বললো চালাকি না করে ভালোই ভালো বলে দাও। নইলে কি করে কথা বের করতে হয় আমার জানা আছে। ওর মুখে তোমাদের নাম শুনেছি।
যায়িদ বলল, হ্যা আমরা তিন বন্ধু। কিন্তু এখানে ঢোকার পর আমরা তিনজন আলাদা হয়ে যাই। ও কোথায় গেছে আমরা জানিনা। মুসায়েবও যায়িদের সাথে সুর মেলালো।
ওদের দুজনের কথা বলার ভঙ্গী দেখে লিটন ওদের কথা বিশ্বাস করলো এবং দরজাটা আঁটকে দিয়ে চলে গেলো।
তালহা তাহলে ওদের হাতে ধরা পড়েনি? মুসায়েবের দিকে তাকিয়ে যায়িদ বলল কথাটা। তারপর ড্রামগুলো দেখিয়ে বললো, আমার ধারণা এই ড্রামগুলো সব নেশাজাতীয় পদার্থ দিয়ে ভরা।
তার মানে এরা মাদক পাচারের সাথে জড়িত।
হ্যা এবং এই বাসাটা এই কাজেই ব্যবহার করা হয়।
তাতো বুঝলাম কিন্তু রহস্য উদঘাটন করতে হলে আগে আমাদের এখান থেকে বের হওয়ার উপায় বের করতে হবে।
চল দেখি কীভাবে বের হতে পারি। যায়িদ আর মুসায়েব উঠে ঘরটার চারিদিকে নজর বুলাতে থাকে। একটাও জানালা নেই আর না আছে কোন বাথরুম। আশ্চর্য এরকম একটা ঘরে আমাদের রেখে গেলো যেখানে একটা ওয়াশরুমও নেই। রাগতস্বরে কথাটা বলল মুসায়েব।
যায়িদও বেশ রেগে গেলো। এরকম একটা বদ্ধ ঘরে আটাকে রাখার কারণে শ্বাসরোধ হয়ে আসছে। যায়িদ ঘরটার চারপাশ পায়চারি করতে লাগলো। হঠাৎ একটা দেওয়ালের একটা জায়গা দেখে ওদের সন্দেহ হলো। কাছে গিয়ে টোকা দিয়ে দেখলো ফাঁপা আওয়াজ করছে। মনে হলো পারটেক্স বা মেলামাইন বোর্ড জাতীয় কিছু একটা। একটু জোরে ধাক্কা মারতেই ঠিক দেওয়ালের মতো শক্ত মনে হলোনা জায়গাটাকে। দুইজন মিলে ধাক্কা দিতে লাগলো। প্রায় দশবার একাধারে ধাক্কা দেওয়ার ফলে জিনিসটা দেওয়াল থেকে আলাদা হয়ে পড়ে গেলো। অবশ্য পড়ার সময় ওদেরকে নিয়েই পড়লো। কিছুক্ষণ সেভাবেই থেকে দুজনেই উঠে দাঁড়ালো। যেখানে পড়েছে সেটাও আর একটা ঘর। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। মুসায়েব চোরা পকেট থেকে মিনি টর্চটা বের করলো। ব্যাগগুলো বেহাত হওয়ার ভয়ে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস বের করে রেখে ব্যাগগুলো দেবদারু ঘেরা ঘন বনের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে তালহা। এন্টিকার্টার, মাল্টি-নাইফ, মিনি টর্চ প্রতিটা একটা করে নিজে নিয়েছে এবং বন্ধুদের দিয়ে বলেছে, প্রয়োজনে কাজে লাগাতে ভুলবিনা কিন্তু।
মুসায়েব ছোট টর্চটা জ্বেলে চারিদিক দেখতে লাগলো। দেওয়ালে টর্চের আলো ফেলার সাথে সাথে ও আঁতকে উঠলো। চারিপাশের দেওয়াল জুড়ে অসংখ্য মেয়েদের ছবি। সবার চেহারাই খুব সুন্দর। যায়িদ একটা পেইন্টিং এর দিকে অপলক তাকিয়ে ছিলো। মুসায়েব ওকে ডেকে বলল, এদিকে এসে দ্যাখ।
পেইন্টিংটা হাতে নিয়েই মুসায়েবের কাছে চলে গেলো যায়িদ। কিরে কি দেখার জন্য ডাকলি?
মুসায়েব টর্চটা জ্বেলে দেওয়ালগুলো দেখিয়ে বলল, ছবিগুলো দ্যাখ।
যায়িদও অবাক হয়ে গেল। চারিপাশের দেওয়াল জুড়ে তিন সারিতে প্রায় একশটার উপরে ছবি আছে। প্রত্যেকটা ছবির নিচে নাম এবং সাল লেখা আছে। প্রথমে জন্মসাল ভাবলেও পরে দেখা গেলো ঐটা জন্মসাল না। সবগুলো ছবি বিশ্লেষণ করে ভালো করে পরখ করে দেখা গেছে ২০১৫ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত সময়টাকে বোঝাতে চেয়েছে। একটা ব্যাপার খেয়াল করছিস? মুসায়েবের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলো যায়িদ।
কি ব্যাপার?
প্রতিটা ছবি দেখে আমার মনে হচ্ছে সবাই একই বয়সের। মানে সবার বয়সই ১৭ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। অপহরণ কেসের সাথে মিলে যাচ্ছে না?
আরে না ঐটার সাথে এখানকার ছবির সংযোগ আছে বলে আমি মনে করিনা। তাচ্ছিল্যের সাথে বললো মুসায়েব।
আমি সেটা বলিনি। কিন্তু ভাবতে দোষ কী? রহস্য উদঘাটনের জন্য অনেক কিছুই ভাবতে হয়। এই পেইন্টিংটা দ্যাখ। সমসাময়িক কালের না। কম করে হলেও ৩০ বছর আগেরতো হবেই। অথচ একটুও ধূলা জমেনি। আমার ধারণা এটা সবসময় মুছে রাখা হয়। সারা ঘরে ধূলা, আর ঝুল মাখামাখি হয়ে আছে। ধূলিমলিন ঘরটাতে যেখানে সবকিছুতে ধূলার আস্তর পড়ে মলিন হয়ে আছে সেখানে এক কোণায় সযত্নে রাখা এই ছবিটায় সামান্য পরিমাণ ধূলা জমতে দেওয়া হয়নি। এ থেকে বোঝা গেলো কেউ একজন এই ছবিটা প্রতিদিন মুছে রাখে। খট করে একটা শব্দ হলো। যায়িদ কোনকিছু না ভেবে পেইন্টিংটা আগের জায়গায় রেখে একটানে মুসায়েবকে আগের ঘরটাতে ঢুকিয়ে বোর্ডটা আবার লাগিয়ে দিয়ে ঘরের এক কোণে সটান হয়ে দুজনে শুয়ে পড়লো।
চলবে6 Comments
Friends
Shoriful Shoron
@shoriful-shoron
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
Morsalin Islam Shouradip
@morsalinshouradip
জাস্রা জুমান
@nmafin4gmil-com
Hijbullah hiju
@hijbullah
মোঃ রিদওয়ান আল হাসান
@mridwanalhasan
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam



বেশ রোমাঞ্চকর!