-
আল্লাহর করুণা
……………………………….আশ্বিনের বিকেল। নিশিন্দার চরে শরতের মেলা বসেছে। প্রতি বছর এই মধ্য শরতের সময়ে মেলা বসে। নদীর পাড়ের মানুষগুলোর কাছে এই মেলা মানে উৎসব। সোনালি বালুর চরে তখন সেইসব মানুষগুলোর আসা যাওয়া বেড়ে যায়। অনেক দূরের চর থেকেও নৌকায় করে মানুষ আসে।
শামসুদ্দীন গরীব কৃষক। তার একমাত্র সন্তানকে নিয়ে সে মেলায় আসে। এই নদী, নদীর বাতাস, নদীর মানুষ, নদীর চর, আর চারপাশের পরিবেশের সাথে তার সন্তানকে সে নিবিড়ভাবে পরিচয় করিয়ে রাখতে চাই। মেলার মধ্যে ঘোরার সময় খেলনা আর খাবারের দিকে তার সন্তানের চোখ চলে যায় সেটা শামসুদ্দীন খুব খেয়াল করে। আর তার সন্তানও এই অতি অল্প বয়সে তার বাপের অপারগতা বুঝতে পারে। সে তার বাপের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে আব্বা, মা জান আইজকে কইছে রাত্রে শালুক ফুলের ঘণ্ট পাক করবে। এই বয়সে সন্তানের বোধ শক্তিতে শামসু বড় আশ্চর্যবোধ করে। সে তার সন্তানকে কোলে তুলে নিয়ে মেলার মধ্য থেকে বের হয়ে চরে নেমে আসে।
এই চরের জন্য ওর বুকে খুব মায়া। সে যেন এই চরেরই সন্তান। আর তার বুকের মধ্যে নিজের সন্তান এই সব মিলে তখন সব একাকার হয়ে যায়। সে খেলনা আর মেলার খাবারের কথা ভুলাতে তার সন্তানকে কিছু কাশফুল ছিঁড়ে দেয়। চরের বালিতে ছোট্ট একটা গর্ত করে তাতে পানি ঢালে। নদী থেকে একটা চাপিলা মাছ এনে সেই গর্তের মধ্যে ছেড়ে দেয়। মানুষের সন্তান আর মাছের সন্তানের খেলা চলে পড়ন্ত বিকেলে নিশিন্দার চরে।
শামসুদ্দীন ডুবে যাওয়া সূর্যের প্রতিফলন দেখে নদীর পানিতে। নদীর মধ্যে মনে হয় আর এক রাজ্য আছে। সে নদীর পানিতে অযু করে আবার চরে উঠে আসে। চরের একপাশে যেখানে কিছু ঘাস,লতা সেইখানে কাঁধের গামছাটা পাতে। আল্লাহু আকবার বলে নামাযে দাঁড়ায়। একটু দূরেই তার সন্তান সেই কাশফুলগুলো নিয়ে মাছের পিঠে বুলিয়ে আদর করার চেষ্টা করে। এটাই খেলা। ভালবাসার খেলা। ভালবাসতে পারবে কিন্তু ধরতে গেলেই ডুবে যাবে। খেলা করতে করতে সে তার বাপকে দ্যাখে। সে দ্যাখে এই নির্জন চরে তার বাপ কার সামনে যেন মাথা নিচু করে পড়ে আছে। এই দৃশ্য দেখতে তার ভাল লাগে। সে আস্তে আস্তে পিছন থেকে যেয়ে তার বাপকে জড়িয়ে ধরে বলে আল্লাহ, আল্লাহ। কখনো কখনো গামছার চারদিকে গোল হয়ে ঘুরতে থাকে।
শামসুদ্দীন নামায শেষ করে নিজের সন্তানকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। এই সন্তানের পবিত্র আর কোমল মুখের দিকে তাকিয়ে সে কোন ফেরেশতার মুখ মনে করার চেষ্টা করে। সে একবার সন্তানের মুখ দ্যাখে, একবার দ্যাখে এই বিস্তীর্ন চর, আর চরে নামতে থাকা সন্ধ্যা। শামসুদ্দীনের চোখে তখন আল্লাহর করুণার দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। সে তার বুকের সন্তান আর এই পৃথিবীর জন্য আল্লাহর প্রশংসা করে। সে বুঝতে পারে তার বুকের মধ্যে তার সন্তানের মুখের মত, অথবা এই চরের বালুর মত, অথবা নদীর পানির মত, কিম্বা সেই চাপিলা মাছের শরীরের মত একটা নরম জায়গা এই মাত্র তৈরি হয়েছে।
সে সন্ধ্যার আকাশে তাকায়। সন্ধ্যাতারাটা স্পষ্ট। কিছু বাদুড় উড়ে যেতে যেতে অদৃশ্য হয়ে যায়। কিছু জোনাকিপোকা সেই ঘাসলতার উপরে উড়তে থাকে। নদীর জল এখন শান্ত। নক্ষত্ররাজির ছায়া শান্ত নদীর জলে। মনে হয় যেন অসংখ্য তাঁরার ফুল ফুটে আছে পানিতে। আর নদীর বাতাসে শিশিরের ঘ্রাণ। রাত যত অন্ধকার হবে শিশিরের গন্ধ তত গভীর হবে। তার মনে হয় এইসবই আল্লাহর করুণা। সে গামছার পরে হাটুমুড়ে বসে আল্লাহর করুণা উপলব্ধি করে। দিনের সব ক্লান্তি তার নিমিষে ভাল হয়ে যায়।
এসব দেখতে দেখতে কিছু সময় পার হয়ে যায়। মেলার ভিতর থেকে কোলাহল কমে আসে। শামসুদ্দীন দ্যাখে তার সন্তান তার বুকে ঘুমিয়ে পড়েছে। সে আস্তে করে তাকে গামছার উপর শুইয়ে দিয়ে মোনাজাত ধরে। এই নিষ্পাপ সন্তানের ভালোর জন্য। এই পৃথিবীর মানুষের ভালোর জন্য। সে দরিদ্র, প্রায় নিঃস্ব, অথচ এই সন্তানকে যা যা কিছু ভালো তাই তাই দিয়ে যেতে চাই সে। তার জন্য সে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই, সামর্থ্য চাই। তার অর্থের অভাব যেন কোনদিন তার সন্তানের মধ্যে কোন দুঃখবোধের জন্ম না দেয়। তার সন্তান যেন তার সৃষ্টিকর্তার অপার করুণা উপলব্ধি করতে পারে। সে যেন মানুষকে হৃদয় দিয়ে, ভালবাসা দিয়ে বিচার করতে পারে। সে যেন তার যে সন্তান হবে তাকেও তার রবের অনুগ্রহের কথা উপলব্ধি করাতে পারে। এই বিস্তীর্ন চরে এসে এরকমই কোন এক সুন্দর সন্ধ্যাবেলায়।
2 Comments

Abrar Jahin Ratul
A slave of Allah, A son, A brother, A friend, A lover, A dreamer, A witness of nature
Friends
ইয়াসিন আরাফাত
@easir-arafat
Humayun Kabir Surjo
@humayunkabir-surjo
Md Rizwan Shuvo
@md-rizwan-ullah-shuvo
অসীম রহমান
@ashim_rahman
নাজমুল হক জুয়েল
@nazmulhoqjewel
ruba
@ruba91
Ashaduzzaman-Khokon
@ashaduzzaman-khokon
মো দানিয়াল আরাফাত (প্রমিস)
@md-daniel-araphat-promice
Zahidul Jamy
@zahidul

অসাধারণ