-
গল্প- তোর কাছে আমার অনেক কথা বলার ছিল
পর্ব-১
স্পর্শিতার মাথা একদমই কাজ করছেনা। ওর বাবা মা একটা ছেলে দেখেছে তার জন্য। ও আগে থেকেই বলছে ও কোনো ভাবেই রাজি না। তবুও বাবা মা জোড় করে বললেন,-‘ছেলেটা ভালো আছে, একবার পরিচয় করেই দেখ। সব ঠিক হবে।’
-‘না, আমি জানিনা আপনারা কেন এভাবে আমাকে ফোর্স করছেন। আমি তো বলেছিই আমি বিয়ে করবো না।’
এই বলে সে তার রুমে দৌড় দিলো। জানালার পাশে বসে চুপচাপ নিকষ কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর মাথা পুরোটাই খালি হয়ে আছে। মনে হচ্ছে কোত্থেকে যেন টপকে পড়লো।
পেছনে মা এসে বলল,
-‘কি হয়েছে রে মা? বিয়ে করতে তোর সমস্যা কি?’
-‘দেখেন, আমি জানিনা আমি কেন বিয়ে করতে চাইনা। আমি নিজেকে মনে করতে করতেই হিমশিম খাচ্ছি, আর বিয়ে করে একটা সংসার কিভাবে করবো?’
-‘ছেলেটা সব মেনে নিয়েছে তো। ও তোকে সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা দেবে।’
-‘মানুক আর না মানুক। আমার মন সায় দিচ্ছেনা। আমার কেন জানি সবসময় মনে হচ্ছে আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করছে।’
-‘এগুলো সব তোর মনের ভুল। কে অপেক্ষা করবে তোর জন্য? মাথা থেকে এগুলো ঝেড়ে ফেল আর ছেলেটাকে জানার চেষ্টা কর। কাল আবার আসবে তোকে দেখতে। আর বিয়ের আলাপ আলোচনা হবে।’
রাত ৯ টা। স্পর্শিতা কিছুই বুঝতে পারছেনা কি করবে। সব কিছুই যেন অচেনা লাগে। প্রথম যখন চোখ খুলেছিল, তীব্র মাথার বেথা নিয়ে আশে পাশে দুটো মানুষকে দেখতে পেয়েছে। জিজ্ঞেস করতে তাকে বলা হয়েছে তারা তার বাবা মা। বিশ্বাস না হলেও মেনে নিয়েছে। কারণ কোনো মানুষই এত টাকা খরচ করবেনা একজনের জন্য। হসপিটালে এমনেই খরচ, খাওয়া দাওয়া, সব কিছুই তারা শর্তহীনভাবে দিচ্ছে, বাবা মা ছাড়া কোনো মানুষই এমন করবেনা।
পরদিন সন্ধ্যা বেলা,
স্পর্শিতা যদিও একটা সেফ জায়গায় আছে কিন্তু তবুও তার মনে হচ্ছে বদ্ধ জায়গায় আছে।সিম্পল ডিজাইনের একটা শাড়ি পড়ে বসে আছে রুমে। মা বলেছে অপেক্ষা করতে, সময় হলে এসে নিয়ে যাবে।
কারও সাথেই দেখা করতে মন চাচ্ছেনা তার। কি যেন তাকে বাঁধা দিচ্ছে। দ্বিতীয় বার না ভেবে সে সরাসরি বাসা থেকে বের হয়ে গেলো।
অজান্তেই হাটা দিলো অজানায়। কিছুটা দূর এসে সে পেছনে কয়েকজনের চিল্লা চিল্লি শুনতে পেল। তার মধ্যে একজনের আওয়াজ শুনে মনে হলো এটা তার বাবা। সে আরও জোড়ে দৌড় দিলো।
রাতের বেলায় রাস্তাটায় খুব মানুষ নেই। তবে মাঝে মাঝে একটা দুইটা গাড়ি যায়। সামনে এসে একটা স্ন্যাক্স বার দেখতে পেল। শপটা সুন্দর করেই সাজিয়েছে মনে হচ্ছে। এক পার্শ্বে ক্যাশ কাউন্টার। আর বাকিটা রুম জুড়ে ছড়ানো ছিটানো গোল গোল টেবিল, দুই একজনের বসার মত জায়গা। আর সেই টেবিল গুলোর মাঝে মাঝে কয়েকটা চকোলেট ভেন্ডিং মেশিন। এক একটার মধ্যে এক একরকম চকোলেট। ক্যাশ কাউন্টারের সামনে একটা মেয়ে বসে ছিল। শপটায় সেই একটা মেয়ে ছাড়া অন্য কাওকে দেখতে পেলো না সে। ভিতরে ঢুকে সে জলদি তার কাছে যেয়ে বলল,
-‘আপু প্লীজ আমাকে হেল্প কর। আমাকে কিছু মানুষ খুঁজছে। কিন্তু আমি যেতে চাইনা তাদের কাছে। আমি সব খুলে বলবো, শুধু আমাকে একটু জায়গা দাও লুকিয়ে থাকার জন্যে। ওরা চলে গেলে আমি সব বলবো।’
মেয়েটার চেহারায় একটা মায়া দেখতে পেল। তাকে দেখে মনে হলো সে হেল্প করতে ইচ্ছুক। একটু অবাকও হলো স্পর্শিতাকে দেখে। কিন্তু নিজেকে অনেক পারদর্শীতার সাথে সামলে নিলো। মেয়েটা তাড়াতাড়ি বলল,
-‘আসলে আমি জানিনা আমি কীভাবে কি করবো। তবে আমার কাছে কিছু জিনিস আছে তুমি সেজে নিজেকে চেঞ্জ করে নিতে পারো যাতে অন্যরকম দেখায়। আর এই ড্রেসটা নাও, যত জলদি সম্ভব পড়ে নাও।’
দুই মিনিটও লাগেনি স্পর্শিতা শাড়িটা খুলে ড্রেসটা চেঞ্জ করে আইভির দেওয়া জিনিস গুলো ঘাটলো। তার মধ্যে সবার আগে দেখলো লেন্স, মেয়েটা বলেছে আজকেই এটা কিনেছিল আর এটা সে ব্যবহার করতে পারেনি এখনও। স্পর্শিতা লেন্সটা নিয়ে চোখে পড়ে ফেলল কিন্তু সে যে পড়তে পারে সেটা সে জানেই না। ফাউন্ডেশনটা চোখে পড়তেই হাতের জন্মদাগটা মুছে নিল। আইভি যেই শেডের ফাউন্ডেশন কিনেছে সেটা স্পর্শিতার গায়েও সুট করে।
হঠাৎ শুনলো কিছু লোকের আওয়াজ। সে বুঝতে পেরেছে তার বাবাও আছে ওদের মধ্যে। স্পর্শিতা ভয় পেয়ে গেলো, ওর এখনও সাজা শেষ হয়নি, ওর বাবা যদি এখানে এসে পরে? কিন্তু ভাগ্যবশত লোকগুলো চলে যায় শুধু একটা প্রশ্ন করেই।
সে যতদূর সম্ভব তাড়াতাড়ি করতে চেষ্টা করলো। স্টাফ রুমে বসে আর কি করবে কিছুই মাথায় আসছেনা তার। তাই সে ক্যাশিয়ার মেয়েটার দেওয়া ওড়নাটা মাথায় পেঁচিয়ে নিলো যাতে চিনতে না পারে। পুরোপুরি অন্যরকম না লাগলেও, কিছুটা বদলাতে পেরেছে খুব কম সময়ে। স্পর্শিতা জিজ্ঞেস করলো,
-‘আমি কাপড় পড়তে যাওয়ার সময় কেউ কি এসেছিল? লোকের শব্দ শুনেছিলাম বোধহয়।’
-‘এসেছিল, জিজ্ঞেস করে গেছে শাড়ি পড়ে যাওয়া কোনো মেয়েকে দেখেছি কিনা। আমি অন্য একটা দিকে ইঙ্গিত করে বললাম সেদিকে যেতে দেখেছি।’
-‘থ্যাংক ইউ আপু। আমি যত দ্রুত সম্ভব তোমার ঋণ শোধ করে দেব।’
-‘ওই কথা বাদ, আর আমি কোনো আপু-টাপু না, আমাকে দেখতে ম্যাচিউর লাগলেও আমি এখনও মাত্র উনিশ বছরের মেয়ে। আমি আইভি। আমি ছোট তোমার থেকে। আচ্ছা এবার আমাকে বলো তুমি কেন এভাবে ভেগে আসলে, আর লোকটা কে হয় তোমার?’
যদিও আইভি সবই জানে ওই লোকের সাথে স্পর্শিতার কি সম্পর্ক তাও সে না জানার ভান করলো।
আইভির কথা শুনে একটু ভরকে গেলো। তার চেহারায় কি বয়সের ছাপ আছে যে আইভি বলল সে তার থেকে ছোট? কিন্তু কথাটা পরোয়া না করে সে উত্তর দিলো।
-‘আ~ আসলে সে আমার বাবা। অনেক কাহিনী আছে, তুমি আমাকে হেল্প…’
কথা শেষ না করতেই বাহিরে আওয়াজ পেলো ওরা,
আইভি আবার ক্যাশ কাউন্টারে চলে গেলো।
লোকটা গম্ভীর মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-‘এখানে একটা মেয়ের আওয়াজ পেয়েছি, তাকে কি দেখা যাবে?’
-‘আমাকে দেখে কি মেয়ে মনে হয়না?’
-‘মেয়ে মনে হয়না, কিন্তু তোমার গলার আওয়াজ আর সেই মেয়েরটা এক না। তোমারটার সাথেই সেই মেয়েটার আওয়াজ পেয়েছি। ডাকো তো তাকে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আমার মেয়েটা এখানেই আছে।’
-‘আপনার মেয়ে কেন এখানে আসবে, ওটা এখানের স্টাফ।’
-‘ডাকো তাকে। না দেখা পর্যন্ত আমি যাবো না।’
আইভি একটু ভয় পেলো। কিন্তু তবুও ডাকলো অন্য এক নামে,
-‘মু~মুমতারিন… এদিকে এসো তো।’
মেয়েটা রুম থেকে বের হয়ে সামনে আসলো। মনের মধ্যে আতঙ্ক, মনে হচ্ছে এই বুঝি ওর বাবা ওকে বকে দিয়ে বলবে বাসায় যেতে। কিন্তু সে যেতে চায়না।
শুকনো গলায় বলল,
-‘আমাকে ডেকেছেন?’
আইভি লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-‘এটা কি আপনার মেয়ে?’
আইভিও মনে মনে অনেক ভয় পাচ্ছিল, সে জানে এর পরিণতি কি হবে। সে জানে লোকটা তাদেরকে সহ্যই করতে পারেনা। তবুও জিজ্ঞেস করলো।
লোকটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
-‘কি নাম তোমার? মুমতারিন? কে রেখেছে এই নাম?’
এই প্রশ্ন শুনে আইভি আর স্পর্শিতা নিরানব্বই ভাগ শিওর হয়ে গেলো ওর বাবা ওকে চিনে গেছে।
স্পর্শিতা ভয়ে ভয়ে যতটা সম্ভব গলার স্বর চেঞ্জ করে উত্তর দিলো,
-‘জ্বি, কেন?’
-‘না, মানে তোমাকে দেখতে অনেকটা আমার মেয়ের মত। তোমার গলার স্বরটাও। কোথায় থাকো তুমি?’
আইভি কথা কেড়ে নিয়ে বলল,
-‘সরি স্যার, আমরা আমাদের স্টাফদের ইনফরমেশন লিক করিনা। এটা আমাদের পলিসির বাইরে।’
-‘আরে ধ্যাৎ তোমাদের পলিসি, আমার মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছিনা আর পলিসি নিয়ে পড়ে আছো তোমরা। এসব কারণে একটা দুইটা রুল ব্রেক করলে কিচ্ছু হয় না।’
আইভি এবার কথা বানাতে বাধ্য হয়ে বলল,
-‘কুড়িপাড়ায় থাকে, ওর বাবা মায়ের সাথে।’
তবুও যেন লোকটার মনকে এই উত্তরটা স্বান্তনা দিলো না।
-‘আচ্ছা তোমার ডান হাতের কনুইটা দেখাও তো।’
1 Comment
Friends
Md. Junaid
@junaid-islam
মোঃ আবু মুনিফ আল মুকিম।
@munifalmukimrocky
Drako Shajib
@drako
মানজারুল ইসলাম দুলাল
@manjarulislamdulal
মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল
@ashraful710
Shoriful Shoron
@shoriful-shoron
মোখলেসুর রহমান
@mokhles
Moniruzzaman Sarjil
@zaman2802
মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম (সবুজ) সিকদার
@attokendrik


বেশ লাগলো।