Profile Photo

Rakib JoyOffline

  • Rakibjoy28
  • Profile picture of Rakib Joy

    Rakib Joy

    3 years, 8 months ago

    ” ঘুম ”

    সকাল ৯টায় ভার্সিটির ৩য় বছরের ১ম ক্লাসের জন্য অয়ন ক্লাসরুমে প্রবেশ করে, পিছনের একটি বেঞ্চে বসে, দুই হাত হাইবেঞ্চ এ রেখে মাথাটা দিয়ে, চোখ দুইটা বন্ধ করতেই, ক্লাসরুমে ম্যাম এর আগমন।
    ম্যাম- আজ তোমাদের ৭ম সেমিস্টার মানে ৩য় বর্ষের প্রথম ক্লাস। আমি তোমাদের সাথে নতুন, আজ ক্লাস বিষয়ে না, তোমরা নিজেদের মতো করে আমার সাথে পরিচিত হবে। এই যে আপনি, আপনার নাম কি?
    ছাত্র- আমার নাম রকি আহমেদ।
    ম্যাম- বাসা কোথায় এবং আপনার প্রিয় একটি জিনিসের নাম বলুন, কারণ সহ।
    রকি- ম্যাম আমার বাসা নাটর জেলায়। আমার প্রিয় জিনিস বাইক। আমি আমার ফাঁকা সময়ে এটিকে নিয়ে অনেক ভাবে বিনোদন লাভ করে থাকি এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে এটি আমার অনেক কাজে লাগে।
    ম্যাম- আচ্ছা, বসেন৷ আপনি দাঁড়ান৷ নাম কি, বাসা কোথায় এবং পছন্দের একটি জিনিস বলেন?
    ছাত্রী- ম্যাম আমার নাম ইসমাত। ম্যাম আমার বাসা নওগাঁ জেলায়। আমার প্রিয় জিনিস হলো বই, আমি বই পড়তে খুব পছন্দ করি, কেননা বই আমাকে অনেক কিছু শিক্ষা দেয়, পাশাপাশি আমি আমার ফাঁকা সময়ে বিভিন্ন ধরনের বই পড়ে বিনোদন ও লাভ করি।
    এভাবে একে একে সবার জানা শেষে, শেষ পর্যায়ে এসেছে অয়ন।
    ম্যাম- এই যে আপনি, আপনি দাঁড়ান, আপনি এতো অগোছালো কেনো? চুল গুলোর ঠিক নাই, দেখে অসুস্থ মনে হচ্ছে, চোখ গুলা লাল হয়ে আছে, কি ব্যাপার? সারারাত কি শুধু অনলাইন আর আড্ডা দিয়ে ঘুম হয়নি?
    অয়ন- না ম্যাম আসলে তা না।
    ম্যাম- আপনার নাম কি? বাসা কোথায়?
    অয়ন- ম্যাম আমার নাম, মোঃ আল-রাব্বী অয়ন। আমার বাসা, নওগাঁ জেলার, মান্দা উপজেলার,প্রত্যন্ত একটি গ্রাম ভারশোঁ- তে।
    ম্যাম- সবাই তো একটি করে পছন্দের জিনিসের নাম বলে গেছে, এবার আপনি আপনার একটি অপছন্দের জিনিসের নাম বলেন?
    অয়ন- ম্যাম পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে অপছন্দের জিনিস হচ্ছে, ঘুম।
    কথাটি শুনে ক্লাসের ৩৯-৪০জন শিক্ষার্থী একসাথে হেসে উঠলো। ম্যাম সাথে সাথে সবাইকে চুপ করতে বলে, নিজেও একটু হাসি মুখ নিয়ে অয়ন কে জিজ্ঞেসা করলেন, এমন অদ্ভুত অপছন্দ কেনো?
    অয়ন- ম্যাম, কথাপ্রসঙ্গে আগেই বলেছি, আমি প্রত্যন্ত একটি গ্রামের ছেলে, স্বাভাবিক ভাবে একটি খুব সাধারণ পরিবারের ছেলে আমি, পড়াশোনার প্রবল ইচ্ছে শক্তির কারণে অর্থের সংকট থাকা সত্বেও আমি আপনাদের প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। যেখানে পরিবারে, ভাত আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে আমার ভরনপোষণ এর দ্বায়িত্ব পরিবারের পক্ষে টানা অনেকটায় আকাশচুম্বী। সকল কারণ গুলোর জন্য আমার নিজের অর্থ নিজে জুগান দিয়ে হয়। আর তার জন্য ম্যাম আমাকে টিউশানির পথ বেছে নিতে হয়েছে, ভার্সিটিতে সকাল ৯টা থেকে ১টা অব্দি ক্লাস শেষ করে, দুপুর ২টার মধ্যে ছাত্র বাসায় যেয়ে একে একে ৪টা টিউশনি শেষ করে রুম এ ফিরে আসতে রাত ৯টা বেজে যায়, তারপর একটু ফ্রেশ হয়ে খাওয়াদাওয়া শেষ করতে করতে ১০.৩০টা থেকে ১১টা বেজে যায়, তারপর ভার্সিটির অ্যাসাইনমেন্ট এবং নানান হোম-ওয়ার্ক শেষ করতে রাত ১/২টা বেজে যায়, পরের দিনের টিউশনি প্রস্তুতি নিতে আমাকেও কিছু সময় পড়তে হয়, এই যে ম্যাম এই রাত ১/২টা বাজলেই আমার শরীরটা এতো ক্লান্ত হয়ে যায় আর এতোটা ঘুম পায়, যা আপনাকে আমি বলে বুঝাতে পারবো না, তখন নিজের ওপরে নিজের এতোটা রাগ হয় আর ঘুম এর ওপর এতোটা আক্ষেপ হয়, মাঝে মাঝে বলেই ফেলি জানোয়ার আমার এখনো টিউশনির প্রস্তুতি নেয়া বাকি আছে, তুই একটু পরে আই। সে সময় ম্যাম আমার মনে হয়, ঘুম এর মতো বিরক্তিকর জিনিস পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না।
    এর জন্য ম্যাম আমার অপছন্দের একটি জিনিস হলো ঘুম।
    তার এই উত্তর এ পুরো ক্লাসরুম একদম চুপ, ঝড়ের আগে যেমন সবকিছু থমকে থাকে, ক্লাসরুমটাও তেমন থমকে গিয়েছে-
    ম্যাম কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে, আচ্ছা এবার বলো পৃথিবীতে তোমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা কি?
    অয়ন- একটু ঢোক গিলে, কিছুটা সময় নিয়ে, ম্যাম পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে পছন্দের জিনিস হলো ঘুম।
    সবাই আবার ও হতভম্ব হয়ে গেলো, সবাই অয়ন এর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যেনো অয়ন সবাইকে তার দিকে আকৃষ্ট করে রেখেছে!
    ম্যাম- কেবল ই না বল্লে, ঘুম তোমার সবচেয়ে অপছন্দের জিনিস। তাহলে এটিই আবার পছন্দের হয় কিভাবে?
    অয়ন- ম্যাম, ইতিমধ্যেই আমি আপনাদের বলেছি, ঘুম আমার কেনো অপছন্দের তালিকায় শীর্ষে। আসলে ম্যাম এই ক্লাস, টিউশনি, নিজের পড়া, টিউশনির প্রস্তুতি, মাঝে মাঝে চাকরির প্রস্তুতি এসব নিয়ে মাঝে মাঝে এতোটা ব্যাস্ত হয়ে পড়ি যে ২-৩দিন না ঘুমিয়ে আমার সময় পার হয়ে যায়, হটাৎ একটি বৃহস্পতিবার রাত আমার কাছে ঘুম ভিক্ষে করতে আসে, এবং কানে কানে বলে যায়, আগামীকাল শুক্রবার। তুমি ঘুমাতে পারো, এই যে ম্যাম শরীরের এতোটা ক্লান্তি নিয়ে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে যখন আমি ঘুমানোর জন্য, বিছানায় শুয়ে, নিশ্চিন্তে একটু চোখটা বন্ধ করি, তখন মনে হয়, পৃথিবীতে আমার মত সুখী ব্যাক্তি আর কেউ হতে পারে না৷ আমি সেই মূহুর্তে এতোটা প্রশান্তি লাভ করি যা আপনাকে আমি বলে বুঝাতে পারবো না, মনে মনে একটা কথা বলি, ঘুম তোমাকে বড্ড ভালোবাসি, বলতে বলতে যে কখন ঘুমিয়ে যায় নিজেই জানি না।

    তার দুইটি উত্তরে পুরো ক্লাস এতোটাই প্রজ্জ্বলিত ছিলো যে, নিজেদের অজান্তেই সকলেই তার জন্য তালি দিয়ে উঠলো। ম্যাম সবাইকে শান্ত করে, শুধু একটি কথায় বল্লেন, আয়ন, তুমি আজ আবারো একটি কথার বাস্তব উদাহরণ দিয়ে গেলে, মানুষ পৃথিবীতে সবচাইতে যেটি ভালোবাসে, সময়ের পরিপেক্ষিতে হয়তো সেটিকেই মানুষ সবচাইতে বেশি ঘৃণা করে। প্রচন্ড ঘৃণা করার জন্য যেমন প্রচন্ড ভালোবাসার প্রয়োজন, ঠিক তেমনি প্রচন্ড ভালোবাসাও একটি সময় প্রচন্ড ঘৃণার পরিনত হতে পারে।
    অয়ন- ম্যাম আমি আসলে এতো কিছু জানি না। আমি শুধু এটাই চাই, জীবনের শেষ ঘুমটা যেনো আমার প্রশান্তির ঘুম হয়। আর মানুষের জীবনে যেটি আসবে সেটিকে অবশ্যই আগে থেকে গ্রহনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখা উচিৎ।
    এরি মধ্যে ক্লাসের সময় শেষ হয়ে আসে এবং ম্যাম অয়নকে একটি ধন্যবাদ জানিয়ে ক্লাস থেকে বিদায় নেন।

    কে জানে-
    এই হয়তো,
    বিকেলের রৌদ্রুমাখা উঠানে, হঠাৎ ই অন্ধকার নেমে আসবে, আত্মাহীন শরীরটা ঘুমিয়ে রবে বিকট চিৎকারের মাঝে।

    9
    7 Comments
Skip to toolbar