Profile Photo

Md Joynul AbedhinOffline

  • J.A.Sagor
  • Profile picture of Md Joynul Abedhin

    Md Joynul Abedhin

    3 years, 8 months ago

    গল্পঃ পটল তোলা
    সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠে বুকে শন শন শব্দ নিয়ে বাড়ির ধারের পুকুরের পাশে পাতানো টঙয়ে বসল আলিম উদ্দিন। অতি বৃদ্ধ তিনি। প্রতি নিঃশ্বাসে শন শন শব্দ হয় , আশে পাশের মানুষ সে শব্দ শুনতে পায়। আলিম উদ্দিন এই শব্দকে নিঃশ্বাস নেয়ার একটা অংশ হিসাবে ধরে নিয়েছেন। শীত আসছে। এবার শীতে টিকবেন কিনা তা নিয়ে তার সন্দেহ আছে। হয়ত টিকতেন কিন্তু ছেলের বৌয়ের কথায় যা ধার তাতে না টিকলেও অবাক হবার কিছু নেই। তার বয়সী যারা তারা সবাই মোটামুটি পটল তুলেছে, আর যারা হয়ত আর ক বছর উৎরে যেত কিন্তু ছেলের বৌরা ধরে বেঁধে পটল ক্ষেতে পাঠিয়েছে। মনে আছে ও পাড়ার রহমানের কথা। দুই বছর আগের কথা, মরার আগে এসে নিজের ছেলের বউয়ের অত্যাচারের কাহিনী কাশতে কাশতে বলে গিয়েছিল। সে কি স্বাভাবিক কাশি! আলিম তখনই বুঝেছিল- আর বেশিদিন নেই। ছেলের বউ নাকি ঠাণ্ডা লাগিয়ে রাখে- ঠান্ডা পানি, ঠান্ডা পান্তা ভাত ইত্যাদি খাইয়ে নাকি কাশ বাড়িয়ে রাখে যাতে শীত না পেরোয়। তা ছেলের বৌয়ের চেষ্টা বৃথা যায়নি। শীতের শেষ দিকে রহমান গেল-কাশতে কাশতে, বুকে নাকি সাঁই সাঁই করছিল বেদম। বুড়ো শরীরে বেশি ক্ষণ টানাহেঁচড়া চলে নি।

    বুকের শব্দ বেড়ে যাচ্ছে ইনালার নেয়া দরকার। প্রতি মাসে আলিম উদ্দিনের এই একটাই খরচ। এটাই কিনে দেবার আগে রাজ্যের কথা শুনিয়ে দেয় ছেলের বৌ। এমন ভাবে তাকিয়ে থাকে যেন বেশিদিন বেঁচে থাকাটা মস্ত অপরাধ- বিশ্রী রকমের অপরাধ। ছেলে থাকে ঢাকায়। দুই তিন মাসে একবার বাড়ি আসে। টাকা অবশ্য প্রতি মাসেই পাঠায়। নিত্য খরচের মাঝে আলিম উদ্দিনের ইনহেলার একটি ঝামেলা মাত্র। আলিম উদ্দিন এই অঙ্ক বোঝেন। ভাত তিনি কম খান। ছেলের বৌকে তিনি দেখানোর চেষ্টায় থাকেন- এক ইনহেলার ছাড়া তিনি কিন্তু ভাত তেমন খান না, তার জন্য আসলে অত খরচ হয়না। কিন্তু ভাত কম খেলে বৌ আবার কথা শুনিয়ে দেয়।

    ‘’বেশি করেই খান, পাছে মানুষকে আবার বলে বেড়াবেন ছেলের বৌ ভাত দেয়না। মানুষ আবার আপনার ছেলেকে বলবে- না খাইয়ে মেরেছে তোর বাপকে। সব চেনা আছে, নিন নিন বেশি করে নিন।’’

    এরপর কেমন যেন টং টং শব্দ করে, ভ্রু কুঁচকে গজ গজ করে যেভাবে ভাত তুলে দেয় তাতে আলিম উদ্দিন বুঝেন- তার ভাত খাওয়া অন্ন ধ্বংস ছাড়া আর কিছু নয়। সংসার এক চিড়িয়াখানা,একই কাজের অর্থ একেক জনের কাছে একেক রকম। তাই চাইলেও তিনি ভাত কম করে খেতে পারতেন না।

    টংয়ে বসে বুকের দম সামলানোর বৃথা চেষ্টা করলেন। রোদ পেলে নিঃশ্বাসে একটু সুবিধা হয় কিন্তু আজ যেন ঠিক কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। মনে হল মানুষের বেশি দিন বেঁচে উচিৎ নয়। একটা সময় পেরিয়ে গেলে তার বেশি দিন বাঁচা মানে নিজের উপর অত্যাচার ডেকে আনা। আশেপাশে তখন কিছু মানুষ আড় চোখে চেয়ে থাকে ধেড়ে বুড়োটা কখন পড়বে এই আশায়।

    তবে আলিম উদ্দিন তাদের দোষ দেননা। ঠিকই তো- তার আর কাজ কি? সে নিজেও কি আর বাঁচতে চায়? এই নিঃশ্বাসের যন্ত্রণা, ক্ষণে ক্ষণে দম ধরে আসা, বুকের হাড় ফুলে উঠা। এই বাঁচা আর কত!

    পুকুরের ধার ঘেষে সকাল বেলার আরাম রোদ আসে। আম আর নারিকেল গাছ দিয়ে পুকুরের চারিধার সুন্দরভাবে সাজানো। এ বাড়ির ও বাড়ির কিছু ছেলে বুড়ো চুলার ছাই কিংবা সুপারির ছাল আবার একটু অবস্থা সম্পন্নদের দুই একজন ব্রাশ নিয়ে পুকুরের ধারে আসে রোদ পোহাতে পোহাতে দাঁত মাজার জন্য। এখানেই অনেকে গল্পে মেতে উঠেন। সবাই এই অল্প সময়টুকু উপভোগ করেন। আলিম উদ্দিনের টং একটু তফাতে। টঙয়ে বসে গল্প শুনছেন আলিম উদ্দিন। গল্প শুনে বুঝলেন আজকের গল্পের বিষয় তেলের দাম। আবার নাকি বেড়েছে। তা বাড়ুক। তার কাছে বরং আরাম করে নিঃশ্বাস নিতে পারাটাই বড় কথা। ১০ বছর বয়সি বিন্তিকে বললেন ইনহেলারটা এনে দিতে। বৃদ্ধ মানুষের কষ্টের শেষ নেই- ইনহেলার নেয়ার জন্য একটু যে চাপ দিতে হয় সে শক্তিও তিনি পাচ্ছেন না। আবার দম ধরে রাখতে গেলে কাশ আসে, ইনহেলার তাই খুব একটা কাজ করেনা কিন্তু যতটুকু হয় তাতেই একটু আরাম হয়। বুকের সাঁই সাঁই কমে আসে কিন্তু মিলিয়ে যায়না।

    দুই ঘর পরের মাঝ বয়সী জব্বার আওয়াজ দিয়ে বললো- আলিম চা, ফির তো ত্যালের দাম বাল্লো?

    কথা বলাটা তার জন্য কষ্টের, বুকে দড়াম দড়াম করে। বিরক্তি নিয়ে বললেন-

    ‘’বাল্লে বাড়ুক’’- বলতে গিয়ে দম লেগে গেল। তার কথা না বলাই ভাল।

    জব্বার আর আগ্রহ পেল না কথা বলার।

    পুকুরে নানা জাতের কার্প মাছ খাবি খেয়ে যাচ্ছে- দেখতে বেশ লাগে হয়ত কিন্তু যার দমে কুলায় না তার কিছুই ভাল লাগেনা। আলিম উদ্দিনের দৃঢ় বিশ্বাস এই শীত পেরুবে না। বুড়ি রোজ ভোরের সপ্নে পান মুখে হাজির হয়, তার হাতে আরো একটি সাজানো পান থাকে-এর ইঙ্গিত তিনি কি বুঝেন না,বেশ পরিষ্কার ইঙ্গিত।

    পরের মাসে ছেলের বৌ বেশ গোলমালে পড়ে গেল। যে টাকা এসেছে তাতে নিত্য খরচই নাকি হচ্ছে না। উঠান ঝাড় দিতে দিতে পাশের বাড়ির আকুর মাকে উঁচু স্বরেই বলে যাচ্ছিল ছেলের বৌ। বাজার নাকি খুব চড়া । নিজের টিনের চালার ছোট ঘরে শক্ত বিছানায় শুয়ে সব শুনলেন আলিম উদ্দিন। কাল সকালে ছেলের বৌকে চুলোর পাশে গালে হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখেছে সে।

    রাতে শুবার আগে বিন্তির কাছ থেকে শুনলো- এ মাসে ইনালার কিন্যা দিব্যার পাবা লয় দাদু। মা কছে কম কম করে ইনালার ন্যাওয়ার জন্য।

    কি কস হে, মোড় ইনালার না শেষ হব্যার ধচ্ছে। এ মাসে না কিনলে হবা লয় তো, তোর মাক কস।

    মা কছে, এ মাসত ম্যালা খরচ।

    বিন্তির খালা এসেছে। আর একটাই ঘর মাত্র। বড় টিনের ঘরে ছেলের বৌ বিন্তি আর ছোট ছেলে নোটন থাকে ।পুরুষ অথিতি আসতে পারেনা এটা নিয়ে বিন্তির মায়ের আফসোস কানে এসেছিল। একজন বৃদ্ধ মানুষ হরেক পদের ঝামেলা তৈরি করে। তার বাড়ি, তার তোলা দুই ঘর অথচ তিনিই আজ ঝামেলা।

    বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই বুকের সাঁই সাঁই বেড়ে গেল। বিন্তির কথায় চিন্তা গেল বেড়ে। জন্ম নিতে কষ্ট হয় কি না জানা নেই তবে মরার কোন সহজ রাস্তা নেই। এই শীত পেরুবেনা তা নিশ্চিত হতেই যেন সব জিনিসের দাম বাড়তি। সেদিন পুকুর পারে দামের কথা শুনে ভাবতেও পারেন নি, এর জের তার বুকের পাঁজর ভেঙ্গে জেগে ওঠা নিঃশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত। দুচিন্তায় বুকের দম যেন ফুরিয়ে আসছে। ইনালার নিলে হয়ত ঠিক হবে কিন্তু এখন খুব মেপে ব্যবহার করতে হবে।

    বিন্তি ও বিন্তি, যা না একটু গরম পানি নিয়ে আয়। এই কথাটুকু বলতে তিনবার দম নিলেন আলিম উদ্দিন।

    বিন্তি কাঁথা গাঁয়ে সবে আরাম করে শুয়েছে।

    ও মা শুতিছে, এখন পানি চাল্যে গাল্যাবি।

    যা এনা যা।

    বিন্তি উঠে গেল। খুব জানা এখনি গজ গজ শুরু হবে। হলও তাই। আলিম উদ্দিন গজ গজের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন কিন্তু বুঝতে পারছেন না। কিন্তু পানি এল। খেয়ে একটু আরাম হল কিন্তু ভোরে হাড় ভাঙ্গা টান উঠে গেল। কম কম ইনালার নিয়ে শীতের মাঝামাঝি পর্যন্ত এসে আলিম উদ্দিন বুঝলেন ভোরের নিঃশ্বাসে এখন জিভ বেড়িয়ে আসার জোগাড় হয়।

    পুকুরের ধারের গল্প থেকে বোঝেন- দাম কমছেনা কিছুতেই। আবার অনেকে নাকি শহরে টিকতে না পেরে গ্রামে ফিরে আসছে। তা অবশ্য ভাতের প্লেট দেখেই বুঝে যান আলিম উদ্দিন। আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খাচ্ছেন বেশ কদিন ধরে, আগে আর যাই হোক ডাল থাকত মাঝে মাঝে শাঁক ছোট মাছ । মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়- ছেলের বৌ বাজার দরের কথা তুলে তাকে না আবার পটল ক্ষেতে পাঠিয়ে দিচ্ছে। রহমানের ছেলের বৌ কি করত সে গল্প তো সে জানে। কিন্তু কিইবা করার আছে?

    উত্তরের শীত। এক ভোরে বুকের দম আর যখন কিছুই মানছেনা তখন ইনালার নেয়ার জন্য চাপ দিতে গিয়ে আলিম উদ্দিন দেখলেন- তিনি টান দিয়ে ভিতরে গ্যাস নেবার আগেই বেদম কাশ আসছে। এদিকে পাঁজর যেন খুলে আসছে, বুকে যেন দম দম করে গা ঘামিয়ে দিচ্ছে এই শীতেও ।

    আলিম উদ্দিন বুঝলেন এই শেষ । বিন্তি সাথে নেই। দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে উলটো মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। আর উঠার শক্তি তো নেই, মাথা যেন বন বন ঘুরছে। মরার সময় কেউ কাছে থাকার সুখটুকুও জুটলোনা। মুখ দিয়ে শব্দ করার চেষ্টা করলে বুকের হাড় যেন চেপে ধরে। ইনহেলার হাতে নিয়ে আরেক চাপ দিতে গেলে হাত কাঁপছে শুধু। ইনহেলার মুখের ভিতর নিয়ে কামড়ে ধরে ডান হাতে চাপ দিয়ে বুঝলেন আর গ্যাস নেই। শক্তি প্রয়োগ করায় বুকের পাঁজর জমের আঘাত করল যেন। আলিম উদ্দিন অন্ধকারে আর বেশি প্রতিরোধ করতে পারলেন না।

    সকালে বিন্তি দাদুকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে তার মাকে ডেকে আনে। গ্রামবাসীও দেখল- আলিম উদ্দিন মাটিতে আর মুখে ইনহেলার যেন কামড় দিয়ে ধরে আছেন।

    8
    7 Comments
Skip to toolbar