Profile Photo

Md Joynul AbedhinOffline

  • J.A.Sagor
  • Profile picture of Md Joynul Abedhin

    Md Joynul Abedhin

    3 years, 8 months ago

    গল্পঃ বদনা
    করাইল বস্তির পাশের এক এলাকার টিনের শেড দেয়া ঘরে থাকে আবিদ। তিতুমীরে ইংরেজিতে পড়ে চাকুরীর জন্য বেশ হন্যে হয়ে ঘুরছে। আজ এক পরিচিত বড় ভাইয়ের অফিসে কম্পিউটার রিলেটেড একটা কাজের জন্য ভাইভা দিতে হবে। কাল রাতে ভাল করে ঘুম হয়নি। সাত সকালেই যেতে হবে। যারা বেকার তারা চাকুরীর ভাইভা দিয়েও মনে সুখ পায়। ভাবে কিছু একটা তো হচ্ছে। মনে আশা জাগে- যদি কিছু হয়ে যায়। বিছানায় শুয়ে মনে হয় যদি চাকুরি হয়ে যায় তাহলে কি কি করা যেতে পারে, কোন সুন্দরী মেয়ের ছবিও যে মাথায় আসে সেটাও স্বাভাবিক। আহ যদি একটা চাকুরী হত- কত মানুষেরই তো হচ্ছে!

    নিজের রুম থেকে বেড়িয়ে, টয়লেটে বসে আবিদ দেখলো – পানি নেই। ততক্ষনে আবিদ পোয়েন্ট অফ নো রিটার্নে। ভাবা যায়! রাগে বদনায় একটা কষে আছাড় মারলো আবিদ। বদনায় পানি না থাকা জগতের এক নির্মম পরিস্থিতি। এ মানা যায়না , ভাবা যায়না। অনেক টেপ ঘুরিয়েও কোন ফায়দা হলনা। রাগে টয়লেট থেকে বের হয়ে এল। গেট খুলে একটু পরেই টি এন্ড টি মাঠ।

    গুলশানের আলো চোখে আসছে। করাইল বস্তি আর গুলশানের মাঝে শুধু লেইক। ওপাশে আভিজাত্যের আলো আর এপাশে টিমটিমে নিষ্প্রভ আলো। আবিদের মনে হলে- ওদের বদনায় অনেক পানি। কি ভাগ্যবান ওরা। ওদের বদনার পানি কোনদিন ফুরায় না আর এখানে- টেপের মাথা ধরে হাজার ঘুরিয়েও কাজ হয়না। মানিক বাবুকে মনে পড়ে গেল। আজ যদি ওর জায়গায় মানিক বাবু থাকতেন তাহলে লিখতেন- ঈশ্বর থাকেন ঐ ভদ্রপল্লীতে কারণ ওদের বদনায় পানি থাকে সব সময়। যেখানে বদনায় পানি থাকেনা সেখানে ঈশ্বর থাকেনা। পরে মনে পড়লো ওরা অনেক আগেই বদনা ব্যবহার করা ছেড়ে দিয়েছে। বদনার মত অত আন্সমার্ট খ্যাঁত জিনিস গুলশানের বাসায় নেই। এমন পরিপাটি জায়গাতেই তো ঈশ্বর থাকবেন তাতে আর অবাক হবার কি আছে।

    রাগ কমানোর জন্য এই ভোরের বাতাসেও কাজ হচ্ছেনা। বদনা জনিত চিন্তায় মাথা ভারী হয়ে আসছে। ইংরেজিতে পড়ার এই এক জ্বালা। সব কিছুতেই দর্শন চলে আসে। বদনা দিয়েও মানুষের শ্রেনী বিভাগ করা যায় তা আজ উপলব্ধি করলো আবিদ।

    খারাপ কিছু হলেই আজকাল আল্লাহর উপর রাগ পড়ছে। বদনায় পানি নেই – এই রাগও আল্লাহর উপর গিয়েই পড়ছে। তা সব কিছু যদি তোমার ইশারাতেই হয়- তাহলে আজ আমার বদনায় পানি নেই কার ইশারায়? আল্লাহর মহাবিশ্ব পরিকল্পনায় যে আবিদের বদনাও আছে – এটা আবিদকে বেশ বিরক্ত করলো। একটা হাদিসও মনে পরে গেল। যিনি গাছের একটি ছোট পাতাকেও তার পরিকল্পনা থেকে বাদ দেন নি তিনি যে আবিদের বদনাকে ভুলে যাবেন তা ভাবা যায়না।

    ‘’হা আল্লাহ, কেন এত ছোট ছোট বিষয়েও তোমার এত পরিকল্পনা? ’’ – এমন বিরক্তি নিয়ে মেসের দিকে হাটা দিল আবিদ। টিনের গেট সরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই টয়লেটের দিক থেকে পানি ছড় ছড় করে পড়ার শব্দ কানে এল। খুশিতে দৌড় লাগালো আবিদ। বদনা উলটে আছে, পানি পড়ছে টেপ দিয়ে।

    ”আল্লাহ তুমি মহান।” আবিদ আর দেরি না করে ভিতরে ঢুকল।

    আল্লহর উপর রাগ আর নেই। শেইভ করে ক্লিন হয়ে নিজের পোশাক রেডি রাখলো আবিদ।

    ময়নার মা আসতেই তাড়া দিল আবিদ। আজ তাড়াতাড়ি করতে হবে সব কিছু, ভাইভা আছে। ময়নার মা কথা কানের তোলার লোক না। পাত্তা দিয়েছে বলে মনে হলনা আবিদের। কি এক জীবন – কেউ পাত্তা দেয়না।

    ময়নার মা কিন্তু আগেভাগেই সব রান্না করে ফেললো। আবিদ কে ডেকে বললো- নেন খায়া নেন। আপনি নাকি কই যাইবেন?

    রেডি হয়েই ছিলো আবিদ। খেয়েই দৌড় লাগালো ওয়ারলেইস গেটের দিকে। পায়ে হেটেই গুলশানে যাওয়া যায়। আজ লোকাল বাসে চরে প্যান্ট নষ্ট করার কোন মানে হয়না। অফিসের সামনে এসে যখন দাঁড়ালো তখন ৯ টা বাজতে ২০ মিনিট বাকি। বড় ভাইকে ফোন দিল আবিদ। তিনি অফিসের ভিতরে ডাকলেন। যা ঝা চকচকে অফিস। চোখ ধাধিয়ে গেল আবিদের। মেঝে টাইলস আর দেয়ালগুলি দারুনভাবে রঙ করা। তিন তলায় এল আবিদ। বড়ভাইয়ের ডেস্কের কাছে একটি চেয়ার দেয়া হলে আবিদ বসে গেল। আশেপাশে নজর দিতেই দুই তিনটা সুন্দরী মেয়ের দিকে চোখ পড়লো। আহা বস্তিতে এদের দেখা মেলেনা। ভাল জায়গায় চাকুরী করলে শুধু বেতন না- সুন্দর মেয়েও দেখতে পাওয়া যায়। গরীব মানুষ সব সুবিধা থেকেই বঞ্চিত। আর যাই হোক অন্তত সুন্দরী মেয়েদের দেখেও তো একটা সুখ আছে- বস্তিতে থেকে শুধু ময়নার মা ছাড়া আর কিছু দেখার যো নেই। আল্লাহ শুধু বদনায় পানি নয় অনেক দিক থেকেই গরীব মানুষকে বঞ্চিত করেছেন। যাদের টাকা আছে তাদের ঘরেই সব সুন্দরী মেয়ে। অথচ উল্টোটা হলে কি ভালই না হত- অন্তত গরীব বাবারা মেয়ের বিয়েটা দিতে পারতেন। আবিদ দেখলো আবার আল্লাহর উপর রাগ উঠে যাচ্ছে। এ ভাল লক্ষণ নয়- অন্তত ভাইভার আগে আল্লাহর উপর রাগ দেখানো ঠিক হবেনা। বড় ভাই কথা বলায় এক দিক দিয়ে ভালই হল, চিন্তায় ছেদ পড়লো।

    ”বুঝলি আবিদ , যে স্যারেরা আজ ভাইভা নিবেন তারা তিনজনই এখন মিটিং এ। আর প্রস্তুতি নিয়েছিস তো? সব প্রশ্ন কিন্তু কম্পিউটার নিয়ে। বেশি কিছুনা- ওয়ার্ড , এক্সেল আর কিছু টুকটাক বিষয়ে জানতে চাইবে।”

    ”ওয়ারলেস গেটে তো একটা দোকানে তিন চার মাস ধরে এসবই শিখছি, দেখি কি হয়।”

    সাথী কম্পিটার্স নামে এক দোকানে রশীদ ভাইয়ের কাছে কম্পিউটার শিখছিলো আবিদ। রুবাইদার কথা মনে পড়ে গেল। সেও ওখানে কম্পিউটার শেখে। একই সাথে একই রুমে বসে ওরা। প্রথম যেদিন রুবাইদাকে দেখেছিলো সেদিন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে ছিলো কিছুক্ষণ। একটু কথাও হয়েছিলো। নাম জানতে চেয়েছিলো। অপরিচিত ভালো লাগার মেয়ে কিছু জানতে চাইলে ভালই লাগে। রাতে সপ্নে মরে যাওয়া নানু এসেছিলো। আবিদ অনৈতিক কিছু করলেই নানু আসেন, জেরা করেন। ছোট বেলায় ধর্মের গল্প নানুর কাছেই শুনতো আবিদ। কেন জানি মরে যাবার পর থেকে আবিদের সপ্নে তিনি আসেন।

    ”ওমন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে ছিলি কেন আজ ? ধর্মে ওভাবে তাকানো নিষেধ জানিস না? আকাশ থেকে নেমে এসে নানু মাটির একটু উপরে ভেসে থাকেন। সেখান থেকেই জেরা করেন নানু। পড়েন সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি।”

    ”আমার বয়স হয়েছে নানু, মেয়েদের দিকে চোখ তো যাবেই।”

    ”ছোটবেলার সব হাদিস তবে গুলে খেলি?”

    ”নানু , আমি রুবাইদার দিকে বিয়ের ন্যিয়তে তাকাই, অন্য কিছুনা। নানুর হাত থেকে বাঁচার এই এক শর্টকাট রাস্তা।”

    ”ঠিক বলছিস তো, ঝোপঝাড়ের কোন মতলব নেইতো?”

    ”কি যে বলনা নানু, তোমার কাছে শোনা হাদিসের গল্পের একটা শক্তি আছেনা? কোন মতলব নেই। তুমি নিশ্চিন্তে আসমানে যাও।”

    নানু মিলিয়ে গিয়েছিলেন। নানুর পক্ষে থাকলে নানু তাড়াতাড়ি জেরা শেষ করেন। আবিদ অনেকবার নানুকে সপ্নে দেখে শেষে এই বুদ্ধিই বের করেছে । নানু তখন জ্বালান না।

    দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে ভাইভা শুরু হল। পদ দুটি কিন্তু ত্রিশ জনের মত হাজির। এই জনবহুল দেশে কোথাও শান্তি নেই। ভাইভা দেয়া শেষ করে , বড় ভাইয়ের সাথে দেখা করে মেসে ফিরে গেল আবিদ।

    কদিন পর সকাল বেলা পেপার পড়ছিলো আবিদ। বড় ভাইয়ের ফোন এল। একটু উত্তেজনা ছিল আশা তো মানুষের থাকে- ভাইভা তো খারাপ হয়নি।

    ”সাবাস , তোকে অভিনন্দন, চাকুরি হয়েছে, অফিসে জয়েন করার জন্য রওনা দিস কাল।”

    এত টুকু শুনে একজন মানুষ কত সুখী হতে পারে তা হয়ত আবিদকে না দেখলে বোঝা যাবেনা। খুশিতে কথাই বলতে পারলোনা কিছুক্ষণ। উল্টো বড় ভাই বললেন-

    ”আগে আন্টি কে জানা, দোয়া নে, আর কাল আমাকে ট্রিট দেয়ার টাকা নিয়েই আসিস, না থাক বেতন পেয়ে খাওয়াস ।”

    পরের দিন অফিসে জয়েনিং সাড়া হল। নতুন কলিগদের সাথে গল্প হল সাথে দুই তিনজন সুন্দরী কলিগও ছিল। বেশ ভালই গেল দিন।

    রাতে নানু সপ্নে এলেন।

    ”কিরে তুই যে রুবাইদাকে বিয়ে করবি বলে সপ্নে দেখতিস তবে আজ অফিসের মেয়েদের ওভাবে দেখলি কেন?”

    ”উফ নানু, মানুষের স্বপ্ন বদলায়। বেকার থাকলে স্বপ্ন এক রকম আর চাকুরী পেলে আরেক রকম। বেকার সময়ের স্বপ্নগুলি সাদাকালো, চাকুরী পেলে রঙ্গিন । রুবাইদা আমার ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট আমলের স্বপ্ন নানু।”

    ”হাদিসগুলি তবে গুলে খেলি রে।”

    ”শোন নানু, রুবাইদাকে আমি এমনকি ভালো লাগার কথাও বলিনি। তাই আমি কোন সমস্যা দেখি না।”

    ”আগে তো ওকে নিয়েই স্বপ্ন দেখতি, চাকুরী পেলে ওকে বিয়ের কথা বলবি এমনটাই তো আমাকে বলেছিলি। নিজের সপ্নের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা মানুষের উচিত নয় রে।”

    নানু বিষন্ন মনে আসমানে চলে গেলেন। আঠারো হাজার টাকা মাইনে। প্রথম কয়েক দিনের অফিস খুব দুর্দান্ত গেল। কম্পিউটারের কাজের এই এক সুবিধা- জানলে পানি- না জানলে গালে হাত । অভিজ্ঞতা আছে এমন কলিগরা হাতে ধরে শিখিয়ে দিলেন কি কি করতে হবে। খুব সহজ হয়ে গেল প্রথম কদিনেই। অফিসের সুন্দরী কলিগদের দেখে রাতে নানুর বিষন্ন মুখকে পাত্তা দিলোনা আবিদ। একটি সুন্দরী মেয়েকে পেতে হলে নানুর গোমড়ামুখে ওর কিছু যায় আসেনা। কোথায় প্যারিস ট্রয় ধ্বংস করিয়ে ছাড়ল কিন্তু তবু হেলেনকে ছাড়েনি। আর সে কিনা মরে যাওয়া এক নানুকে খুশি করতে যাবে। ধুর ধুর।

    সন্ধ্যা হয়ে গেল টিনশেডের মেসে আসতে। আজ পরিকল্পনা আছে ওয়ারলেস গেইটে গিয়ে সাথি কম্পিউটার্সে যাবে। রুবাইদাকে জানানো দরকার – চাকুরী হয়েছে। দারুন লাগবে। কল্পনা করেই সুখ পাচ্ছে আবিদ।

    সাথি কম্পিটার্সে পৌছে দেখলো রশীদ ভাই রুবাইদাদের শেখাচ্ছেন। জুতা খুলে রুমে ঢুকতে হয়। দরজা সরিয়ে ওকে দেখতে পেয়ে সবাই রে রে করে উঠলো। রশীদ ভাই বললেন,

    ”আরে আবিদ , কয়েকদিন ধরে খবর নাই, রুবাইদা তোমার সম্পর্কে একটু আগেও জিজ্ঞ্যেস করেছিলো।”

    ”খুব ঝামেলায় ছিলাম, দুই এক জায়গায় ইন্টারভিউ দিলাম। তাই এ কদিন আসতে পারিনি।”

    এবার রুবাইদা বললো – ”এ কদিন তাহলে এই কারনে আসেন নি, আমরা ভেবেছিলাম আপনি আর আসবেন না।”

    কেমন জানি ভাল লাগলো । আবিদের মনে কে যেন টিউলিপ ফুলের সুবাস দিয়ে গেল। অফিসের সুন্দরী মেয়েদের কথা মনেই আসছেনা। উলটো মন খুশি হয়েছে শ্যামলা রঙের রুবাইদার এই এতটুকু কথাতে। মন আসলেই হারামি।

    ”না জাস্ট একটু বিজি ছিলাম আরকি। কেমন ছিলে তোমরা?”

    মুসকানও হাসি মুখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।

    ”আমরা ভাল আছি ভাইয়া, আপনি কেমন আছেন?” বললো মুসকান।

    আমাদের আর ভাল, আমাদের বদনায় পানি থাকেনা ভাল থাকি কি করে এমন কিছু বলবে বলে মাথায় এল। সামলে নিল আবিদ। মাথাটা আর ঠিক নেই বলে মনে হচ্ছে। কবে যে এই বদনা সংক্রান্ত কারনে বিপদে পড়ে ঠিক নেই।

    ”ভাল আছি মুসকান।”

    কিন্তু চাকুরী পাবার মত এত বড় একটা বিষয় কি করে বলা যায়!

    ”রশীদ ভাই, আজ ক্লাশের পর আপনি, মুসকান আর রুবাইদাকে ঘরোয়ার খিচুড়ি খাওয়াতে চাচ্ছি।”

    মুসকান চেয়ার আবার ঘুরিয়ে নিয়ে বললো – ”কি ব্যাপার ভাইয়া, আপনি মনে হয় চাকুরী পেয়েছেন, তাই না?”

    রুবাইদা আর রশীদ ভাইও সে রকম কথাই বলে দিল- কিছু একটা তো হয়েছে।

    ”তা আমি আপনাদের ঘরোয়াতে বসেই বলি।”

    রুবাইদা এবার রশীদ ভাইকে বললো,

    ”রশীদ ভাই, আজ আর ক্লাশ হবেনা, আর খিচুরির চেয়েও জানতে ইচ্ছে করছে আবিদ ভাইয়ার আসলে কিছু হয়েছে কিনা, চলেন আর দেরি নয়।”

    ”আরে সবে তো আটটা বাজে, এখন ক্ষুধা নেই। একটু পরেই যাই।”

    ”না রশীদ ভাই, এক্ষণই ।” মুসকানকে উঠতে বলে দিল রুবাইদা।

    রুবাইদার এমন উত্তেজনা খুব ভাল লাগলো আবিদের। কেন জানি মেয়েটাকে আজ আরো ভাল লাগছে। অফিসের কারো কথা মনে আসছেনা। কারো না। বরং এই শ্যামলা মেয়েটার হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে মন চাচ্ছে- খুব চাচ্ছে।

    রশীদ ভাইও রাজি হলেন পাশের রুমের ছাত্রদের বলে দিলেন ।

    রাস্তার ওপাশে ঘরোয়া। চারজনে বসে গেল। ওপাশে রুবাইদা আর মুসকান। রাতে খিচুড়ি নেই আজ। শিক কাবাব খাওয়ার ফরমায়েশ হল।

    রশীদ ভাই বললেন,”এবার বলতো ভাই, কেইস টা কি?”

    মুসকান রুবাইদাও বেশ আগ্রহভরে তাকিয়ে আছে। আজকের মুল বক্তব্য শোনার জন্য সবাই উদগ্রীব।

    ”রশীদ ভাই, আমার একটা চাকুরী হয়েছে।”

    এতটুকু শুনেই মুসকান ওয়াও ওয়াও করে উঠলো। রুবাইদা বললো- ”আগেই জানতাম এমন কিছু হয়েছে।” রশীদ ভাই পিঠ চাপড়ে দিলেন। জানতে চাইলেন কোথায় আর স্যালারি কত।

    নিজের কোম্পানির কথা জানালো আবিদ, স্যালারি নিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলো এমন সময় রুবাইদা বললো,”স্যালারি শুনে কাজ নেই, চাকুরী পেয়েছেন এটাই খুশির খবর।”

    রশীদ ভাইও সায় দিল।

    ”ঠিক বলেছো, রুবাইদা। আমার মনে ছিলোনা।”

    কাবাব এলে অন্য কথার ফাকে মুসকানই কথা তুললো।

    ”ভাইয়া, এবার কিন্তু বিয়ে করে ফেলতে পারেন।”

    রশীদ ভাই, রুবাইদা হই দিয়ে উঠলো।

    রুবাইদা বললো,”আর কোন অজুহাত নয়, বিয়ে করতে হবে আর আমরা যেন দাওয়াত পাই, গাইবান্ধা গিয়ে দাওয়াত খেয়ে আসবো।”

    এই শ্যামলা মেয়েকে কেন এত ভাল লাগে ওর! মেয়েটি কি কিছু বুঝেনা!

    রশীদ ভাই বললো, ”কি কোন মেয়ে হাতে আছে, নাকি দেখতে হবে?”

    ”না ভাই, দেখতেই হবে।”

    মুসকান বেশ আগ্রহ নিয়ে বললো,

    ”কোন চিন্তা করবেন না, আমি আছি। কেমন মেয়ে লাগবে বলেন শুধু। উত্তরবঙ্গের লাগবে নাকি যে কোন জায়গার, তিতুমীরে সব আছে। ম্যানেজ করে ফেলবো।”

    এমন কথায় রুবাইদাকেও বেশ উতসাহী দেখালো। খাওয়া শেষ করে আড্ডা দিয়ে ওরা যখন উঠলো তখন প্রায় দশটার কাছাকাছি। রশীদ ভাই দোকানে গেলেন আর আবিদ রুবাইদাদের এগিয়ে দেয়ার জন্য ব্যাঙ্ক এশিয়ার সামনে এল। এখানেই গলির এক বাসায় রুবাইদা মুসকান একসাথে থাকে। এশিয়ার সামনে এসে মুসকানকে আলাদা করে সিঁড়ির কাছে নিয়ে গেল।

    ”মুসকান তোমার সাথে কথা আছে।”

    ”কি ব্যাপার ভাইয়া? কি কথা?”

    ”তুমি না ম্যাচমেকার, কেমন মেয়ে লাগবে সেটা নিয়েই কথা আছে।”

    রুবাইদা বেশ কড়া গলায় বললো,

    ”তাহলে আমি কেন শুনবোনা?”

    ”মুসকান একাই পারবে আর তুমি পারলে পরে ওকে হেল্প করে দিও।”

    ”রাগ করলাম কিন্তু ।”

    ”উপায় নেই শুধু মুসকানকেই বলতে হবে।”

    ব্যাঙ্ক এশিয়ার সিঁড়িতে একপাশে দাঁড়ালো আবিদ আর মুসকান। কিছু দূরে এক চায়ের দোকানের কাছে রুবাইদা পায়চারী করছে। একটু হলেও বিষন্ন সে।

    ”কি ব্যাপার বলুন তো ভাইয়া? ”

    নিজের ভাল লাগার কথা বলতে অনেক সাহসী পুরুষেরও বুকে কম্পন হয়। কেমন জানি জড়তা আসে কিন্তু তবুও না বলে আর উপায় কি!

    ”’আচ্ছা, রুবাইদার কি কোন পছন্দ আছে? তুমি কি কিছু জানো?”

    নিয়ন আলোয় মুসকানের মুখ বেশ হাসি হাসি হয়ে উঠলো,

    ”ভা-ই-ইয়া কি ব্যাপার , মানে কি তবে রুবাইদা আপু , ঠিক তো?”

    বুক ঢিপ ঢিপ করছিলো আবিদের।

    ”যদি কোন পছন্দ না থাকে আর কি।”

    ওয়াহ ওয়াহ করে নাচতে নাচতে রুবাইদার দিকে হাটা দিলো মুসকান।

    ”এই এখনি কিছু বলোনা কিন্তু।”

    ”ইশ ভাইয়া এসব কথা না বলে আমি থাকতে পারিনা, এক্ষণই বলবো।”

    আবিদ দেখলো এখানে দাঁড়ানো আর সুবিধার নয়, বেশ লজ্জা লাগছে।

    রাস্তা পেরিয়ে তিতূমীরের গেটের সামনে থেকে ওপাশে তাকাতেও রুবাইদা আর মুসকানকে রাস্তার দিকে আসতে দেখলো।

    ”দাড়াতে হবে, যাওয়া যাবেনা। বেশ জোড়ে বললো রুবাইদা।”

    লজ্জায় পালানো ভাল কিন্তু আর গেল কই। দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে আবিদের সামনে দাঁড়ালো রুবাইদা। কোন ছেলে তাকে ভালবাসে এটা জানতে পারলে মেয়েরা এক ধরনের অধিকার পেয়ে যায়।

    ”পালাচ্ছিলেন কেন?”

    ”লজ্জা লাগছে তাই ।”

    ”বিয়ের দিন কি মুখে রুমাল লাগবে?”

    লজ্জায় অন্যদিকেই তাকালো আবিদ, মুসকান হেসেই যাচ্ছে।

    ”আচ্ছা আর লজ্জা পেতে হবেনা, কাল আসলেই হবে।”

    লজ্জায় কিংবা স্বর্গীয় আনন্দে অথবা দুটোর কারনেই আবিদ বিদায় নিলো। মাঝে মাঝে পিছু তাকিয়েছে – রুবাইদা দাঁড়িয়ে আছে।

    জীবনে মাঝে মাঝে বড় সমস্যার সমাধান অনেক সহজে মেলে। এই রুবাইদাকে পাওয়া কিছুদিন আগেও কল্পনাতেও সেভাবে ছিলোনা- এখন খুব সত্যি।

    হৃদয়ে বেশ বুদ্বুদ উঠেছে আজ রাতে , ঘুম এল দেরীতে আর শেষ রাতে আসমান থেকে অবতরণ করলেন নানু। আজ তাকে বেশ সুখী দেখাচ্ছে। হাতে মিষ্টির প্যাকেট, একাই খাচ্ছেন তিনি।

    ”খুব ভাল একটা কাজ করেছিস বুঝলি। আমি জানতুম তুই এমন কিছুই করবি।”

    ”দেখ নানু , জীবনে যদি কখনো সুন্দরী মেয়ে বিয়ে না করার জন্য আফসোস হয়, তাহলে কিন্তু তোমায় শাপ-শাপন্ত করবো।”

    ”বাদ দে দেখি, সুন্দরী মেয়ে রাজমুকুটের মত বুঝলি , অনেকেই মাথায় নিতে চায় কিন্তু মাথায় পরে শান্তিতে কেউ থাকেনা, রাজ্যের চিন্তা ভীড় করে। রুবাইদাই ভাল, দোয়া করে দিলাম- সুখে থাকবি। জানসই তো – চেহরে নে লাখো কো লুটা।”

    ”বলছো ?”

    ”তো আর বলছি কি ?”

    ”তুমি দেখি মিষ্টি একাই খাচ্ছো, আমাকে দেবেনা?”

    ”ধুর, এ পরকালের মিষ্টি, তোদের জন্য হারাম। তোকে আর জ্বালাতে আসবনা। এখন রুবাইদাই তোকে লাইনে রাখবে।”

    নানু আসমানে উড়ে গেলেন।

    ভোর রাতে উঠে আবিদ দেখলো আজ আবার পানি নেই। সেদিনের পর শিক্ষা হয়েছে, আজ টেপ আগে চালু করে দেখেছে- পানি আছে কি নেই। গেইট খুলে গুলশানের দিকে দৃষ্টি দিলো আবিদ। আজ আর আল্লাহর উপর রাগ আসছেনা। এই ঢাকা শহরে ভোরের আলো আসবে একটু পরেই, এই সময়ে পৃথিবীর অল্প কয়েকজন সুখী মানুষের মধ্যে আবিদ একজন। তার চিন্তায় শুধুই রুবাইদা আর ছোট একটা সংসার-বদনায় পানি নেই তো কি হইছে। না থাকুক।

    7
    6 Comments
Skip to toolbar