Profile Photo

Md Joynul AbedhinOffline

  • J.A.Sagor
  • Profile picture of Md Joynul Abedhin

    Md Joynul Abedhin

    3 years, 8 months ago

    গল্পঃ জাল

    শীতে নলুয়া নদী অনন্যা। কুয়াশার চাদর এমন মায়ার জাল বিছিয়ে দেয় যেন স্বর্গের পথ বেয়ে অন্যকোন নক্ষত্রলোকে যাওয়া যায়। ১২ বছরের ছেলে ফজলুকে নিয়ে ছগির মিয়া নৌকা বেয়ে চলেছেন উত্তর দিকে। টেংরা পুটি খলিশা কিছু মেলে। পানি কমে এলে নদীর গভীর তলদেশ থেকে বোয়াল, কার্প আর বড় শোলের দেখা মেলে। সে মাছ দেখার আলাদা সৌন্দর্য। নদীর অগভীর জায়গায় জাল ফেলছে বাবা। মাছের টুকরি ধরে আছে ফজলু। বাবা যখন জাল টেনে নৌকায় তোলে তখন মাছ ধরে টুকরিতে রাখে ফজলু। টেংরা পুটির লাফালাফি ভালই লাগে ওর।

    নৌকায় জাল তৈরি করে ছুড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বাবাকে দেখে ফজলু বললো

    আব্বা, ঐ কচুরিপানার জাগাত দেও।

    ছগির মিয়া দেখলেন একটি কচুরিপানা শীতের বাতাসে নদীর কিনার ঘেষে হালকা দুলছে। ছেলের কথা শুনে সেখানে জাল ছুড়ে দিলেন। ঝপ। জাল টানার একটু পরেই বুঝলেন বড়সড় কিছু একটা জালে বেঁধেছে ।

    ফজলু, দড়ি ধর , মনে হচ্চে বড় মাছ।

    ফজলু দড়ি ধরামাত্রই ছগির মিয়া পানিতে লাফ দিয়ে জালের কাঠি কাঁদার ভেতর সেঁধিয়ে দিলেন। পানি এখানে তার বুক বরাবর। পা দিয়ে খচে খচে অবশেষে বড় মাছের নাগাল পেলেন । পায়ের নীচ থেকেই বেশ জোড়ে ঝাঁকুনি দিল মাছটি। মাছটি ধরার জন্য ডুব দিলেন , জাল দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে উপরে উঠে ফজলুকে জাল টানতে বললেন।

    ফজলু নিজেও উত্তেজিত ছিল- বড় কিছু একটা যে জালে ফেঁসেছে তা সেও বুঝেছে । সেও জোরেশোরে জাল টানতে লাগলো। একটু পরেই ফজলু দেখলো বিশাল এক বোয়াল জালের ভিতর মাথা দিয়ে ঝাঁকুনি দিচ্ছে বেড়িয়ে আসার জন্য। কি বড় বোয়াল! বাবা এত শক্ত করে ধরেছে তবু যেন গায়ে কত শক্তি তার! বোয়ালসহ জাল নিয়ে ছগির মিয়া নৌকায় উঠলেন। বোয়াল জালের মধ্যে মাথা দিয়ে ঝাঁকুনি দিয়েই যাচ্ছে। জাল ছিড়ে বেড়িয়ে আসার সেকি চেষ্টা, কিন্তু জাল বেশ শক্ত। ফেরার পুরো পথ ফজলু জালের সাথে বোয়ালের যুদ্ধ দেখেই এল। মা কি খুশি হবে , সে আজই মাকে রান্না করতে বলবে। স্কুলে গিয়ে বোয়াল খাওয়ার গল্প করবে। ফজলুকে খুব খুশি দেখাচ্ছিল । সবে রোদ নলুয়াতে নেমেছে, শীতের রোদে জালের নীচে থাকা বোয়ালের গা কেমন চকচক করছে ।

    ডাঙ্গায় নেমে, বোয়াল বের করা মাত্রই ফজলু নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বাড়ির দিকে ভো দৌড় দিল। সে কি ঝাঁকুনি মাছের, তেজ এখনো কমেনি। রাস্তায় তার কাছের বয়সী ছেলেমেয়ে কয়েকজন বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে ছিল। তারা ‘’ওমা কত বড় বোল’’ বলে ফজলুর পিছু নিল । নিজেকে রাজা রাজা মনে হচ্ছিল ফজলুর।

    নিজের বাড়ির আঙিনায় গিয়ে মাছটা চুলার কাছে রেখে ফজলু তার মাকে ডাকলো,

    মা , ও মা, দেখে যা কি ধরা পচ্চে আজ।

    পানি আনতে গিয়েছিল ফজলুর মা , এসে দেখলেন বাড়ির আঙিনায় একগাদা ছেলেমেয়ে। আর মাঝখানে মস্ত বোয়াল। মাকে দেখে ফজলু বেশ উত্তেজিত ভাবে বললো,

    মা দ্যাখ, কত্ত বড় বোল মাছ।

    বড় বোয়াল দেখে ফজলুর মাও খুশি হলেন।

    মা এখনি পাক কর, আজগেই খামো।

    ছেলের আবদারে তিনি হেসে শুধু আচ্ছা বলে বোয়ালের দিকে তাকালেন। সত্যি বেশ বড় বোয়াল।

    ছেলেমেয়েদের জটলা থেকে কে জানতে চাইলো,

    ক্যাংকা করে মাছটা ধরা পল্লো রে ফজলু?

    ফজলু যেন এমন একটা প্রশ্নের অপেক্ষাই করছিলো। ওর দাদীও ঘর থেকে বেড়িয়ে এসেছে। ফজলু এবার গল্প বলা শুরু করলো কিভাবে ওর কথামত ওর বাবা ওর দেখানো জায়গায় জাল ফেললো আর তারপর কিভাবে বাবা মাছটাকে নৌকায় তুললো, বোয়ালের সে কি আক্রোশ- কিছুই ফজলুর গল্পে বাদ গেলোনা। সবাই মুগ্ধ হয়ে ফজলুর রোমাঞ্চকর গল্প শুনলো। কিছু ছেলেমেয়ে বেশ সময় নিয়ে বোয়াল দেখে বিদায় নিল, আরো কয়েকজন এত্ত বড় বোয়াল কাটার দৃশ্য দেখার জন্য অপেক্ষা করছে। মাছ কাটার দৃশ্য দেখাটাও আনন্দের। মা এখনো কেন মাছ কাটছেনা দেখে ফজলু মাকে তাগাদা দেয়ার জন্য বললো,

    “কাট না মা মাছটা।”

    ফজলু দেখলো ওর মায়ের কোন উত্তর নেই। বেশ গম্ভীর মুখ। এত্ত বড় বোয়াল দেখে খুশি হয়েছিলেন , সেই হাসি মুখ আর নেই। মা কি যেন ভাবছে।

    “মা কাট না ।”

    “এ যা তো এট থ্যাকে। ভ্যান ভ্যান করবু না ।”

    মায়ের এমন গলায় ফজলু কেমন গুটিয়ে গেল। রাগ হচ্ছিল খুব। মাছই তো কাটতে বলেছে শুধু, কিন্তু মা হঠাত ক্ষেপে গেল কেন তা তার বুঝে আসছেনা। নিজের ছেলের বউকে বেশ ভয় পান ফজলুর দাদী , তবু নাতির ওমন মুখ দেখে আর থাকতে পারলেন না।

    “ফজলু এনা খাবার চাতিছে, কাট বাহে ।”

    শুধু এতটুকু বলেছেন। গলা চড়িয়ে দিলেন ফজলুর মা,

    “এত সোহাগের দরকার নাই। গরীবের ছলের এত বোল খাওয়ার শখ ক্যা? গরীব মানুষের শখ খারাপ জিনিস। বড় মাছ খাব্যে বড়লোক। ফজলু, তোর বাপক যায়া ক, মাঠের হাট যায়া বোল মাছটা ব্যেচে আসুক।”

    ফজলু হা করে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে পানিও এসেছে, কটা টাকার জন্য মা কিনা মাছটা বিক্রি করে দেবে! দাদী ফজলুর মনের কথা জানেন যেন, তাই আবার একটু চেষ্টা করলেন,

    “মাছটা পাক করো বাহে, ছোট ছোল এনা খাবার চাছে।”

    নিজের শ্বাশুরীর দিকে অগ্নিদৃষ্টি দিলেন ফজলুর মা ।

    “কাল কিস্তির টেকা নিয়া এত্ত গুলা কথা শুননু আপনার সামনত,, এরপরও ক্যাংকা করে এই কথা কন! কিস্তির টাকা কোটে পামো ? একটু পরেই তো আস্যে হাজির হব্যে, আছে কিস্তির টাকা?এই বোল মাছটা বেচলে তাও এ সপ্তার কিস্তির টেকা হয়া যাব্যে । আইজগ্যা কিস্তি দিব্যার না পালে কথা কেটা শুনবে?”

    ছেলের বউ তার খারাপ নয়। কাল অনেক কটু কথা তার সামনেই বকে গেছে কিস্তির লোক। ফজলুর দাদী আর কোন উপায় পেলেন না,শুধু ফজলুর পানে চাইলেন।

    ফজলু এত কিছু বোঝেনা, বোয়াল মাছ খাওয়া হচ্ছেনা দেখে মায়ের দিকে নাখোশের চোখে তাকিয়ে ছিল সে। তার মা যেন চোখের ভাষা বুঝলেন। চুলার চোঙ্গা ফজলুর দিকে ছুড়ে মারলেন।

    “ভাগ এট থাক্যে। গরীবের ছল হয়া তোর ক্যা এত আল্লাদ রে!”

    মায়ের তাড়া খেয়ে আর বোয়াল মাছ যে খাওয়া হচ্ছেনা তার দুঃখে ফজলু ক্ষেতের আইল ধরে ধান ক্ষেতের ভিতর দিয়ে নদীর ধারের রাস্তায় গিয়ে উঠল। মার উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে তার।

    কিছু সময় পর বাবাকে ধান ক্ষেতের ভিতর দিয়ে আসতে দেখলো ফজলু। হাতে বোয়াল মাছ ঝুলছে। বাবা মাঠের হাট যাচ্ছে বোয়াল বিক্রি করতে। রাস্তায় উঠে ছগির মিয়া দেখলেন তার ছেলে কাঁদছে। আহা, ছেলেটার খুব শখ হয়েছিল বোয়াল খাবার। ছেলের জন্য খুব কষ্ট হল তার।

    “ফজলু , তোর জন্যে বাতাসা নিয়ে আসিম এলাই, কান্দিস ন্যা।”

    “তুমিই খাও বাতাসা।”

    ফজলু ফুঁপিয়ে কাঁদছে এবার। ছগির মিয়া ঘাড় ঘুড়িয়ে নিলেন- ছেলের এমন কান্না তিনি যেন সহ্য করতে পারলেন না। তার চোখও ঝাপসা হয়ে আসছে । ও ছোট বলেই হয়তো জানেনা কিন্তু বড় হলে জানবে গরীব কেন নিজের হাতে ধরা বোয়াল খেতে পারেনা।

    বেশ খানিকটা পথ হেটে যখন পিছনে তাকালেন ছগির মিয়া , দেখলেন ফজলু তখনো তাকিয়ে আছে। কে জানে হয়তো এখনো বোয়ালটাকে দেখতে পাচ্ছে ফজলু।

    5
    3 Comments
Skip to toolbar