Profile Photo

Farhana YeasminOffline

  • Profile picture of Farhana Yeasmin

    Farhana Yeasmin

    3 years, 8 months ago

    বৃত্ত
    এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় যেতে বেশ সময় লাগে। আর জ্যাম থাকলে তো কোথায় নেই। পাক্কা ২ -৩ ঘন্টা রাস্তায় পার হয়ে যায়। এই সময়ে জীবন অসহ্য মনে হয়। প্লেন এ বসেই এসব বিষয় আহাদ এর মাথায় ঘুরতে থাকে। প্লেন থেকে নেমে এয়ারপোর্ট এর যাবতীয় পাঠ চুকিয়ে আহাদ তার গাড়িতে বসল। গাড়ি ড্রাইভ করছে আহাদের খালাতো ভাই তুহিন। আহাদ তুহিনকে বাসাটা ঠিক চেনে কিনা জিজ্ঞেস করল। তুহিন হ্যা বলে মাথা নাড়ল। আহাদের শিরদাঁড়া বেয়ে বয়ে গেলো অদ্ভুত শীতলতা। আহাদ খানিকটা কান্ত বোধ করছে। চোখের পাতাটা বুজে আসছে। কিন্তু সে ঘুমাতে চাইছে না। তার বার বার মনে হচ্ছে রিনিতা এখন কি করছে, রঙ্গন কি করছে, সে কি আহাদের কেনা রোবট পেয়ে খুশি হবে কিনা আরো কত কি।খানিক বাদেই জ্যাম। আহাদ চোখ বন্ধ করল।
    কলিং বেলের শব্দ পেতেই রিনিতা দরজা খুললো। আহাদের চোখ আটকে ধরলো রিনিতার স্মিত হাসি। তথাকথিত সুন্দরী বলতে যা বোঝায় তার কিছুই নেই রিনিতার , তারপর ও কি অদ্ভুত সুন্দর। রিনিতার রং দুধে আলতা নয় , মাথা ভরা চুল নেই , উচ্চতা স্বাভাবিক হলেও রিনিতার গায়ের গড়নের জন্য তাকে লম্বা মনে হয় না। কিন্তু তার পর ও কি মায়া। এই মায়ায় আহাদ গত ১৫ টি বছর কাটিয়ে দিল। রিনিতার প্রেমে পড়েছে কৈশোরে। একই এলাকায় থাকতো রিনিতা আর আহাদ। স্কুল ছুটি হলেই আহাদের সাইকেলটা সে হেলিকপ্টার এর মতো চালিয়ে আসত রিনিতার স্কুল এর সামনে। যাতে তাকে দেখা মিস না হয়। মাঝে মাঝে রিনিতা কে না দেখলে আহাদ চলে যেত ওদের বাসার গলিতে যেখানে রিনিতা বিকেলে বান্ধবীদের নিয়ে গল্প করতো। আর সেখানেও রিনিতার দেখা না পেলে আহাদের পাগল পাগল লাগতো । অপেক্ষা করে থাকতো কখন রিনিতা কে দেখবে।
    রিনিতাকে তার ভালোবাসার কথাটা বলেছিলো তার ও ৬ বছর পর। যখন রিনিতা আর আহাদ একই ইউনিভার্সিটি তে পরে। কথাটা জানানোর পর রিনিতার কি রিঅ্যাকশন ! তিন দিন ফোন অফ। আহাদ শুধু রাত দিন রিনিতার মেসের সামনে চক্কর কেটেছে। এরপরই একপশলা বৃষ্টির মতো রিনিতার ছোট একটা মেসেজ, “হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট নাউ? আর ইউ সিরিয়াস?” আহাদ ভয়ে কিছুই বুঝতে পারছে না। কারণ রিনিতাকে সে নিজে তার ভালোবাসার কথাটা বলে নি। আহাদের ছোট বেলার বন্ধু সেজান। বেশ চটপটে আর স্মার্ট। ওকে দিয়েই আহাদ রিনিতাকে জানিয়েছিল সে রিনিতাকে কতটা ভালোবাসে। আহাদ নিজে কথাটা না বলে সেজান বলেছে সেইজন্য রিনিতা কি ভাবছে আহাদকে নিয়ে আহাদ বুঝতে পারছে না। সে কিছু না লিখে ফাঁকা মেসেজ পাঠালো। এরপরই আবার মেসেজ, “দশ মিনিটের মধ্যে আমার মেসের সামনে আসো”। এভাবেই শুরু। রঙ্গন ও হয়েছে রিনিতার মতো। রিনিতার জুনিয়র ভার্সন। ওদের জন্যই আহাদের মনে হয় তার জীবনটা অনেক দামি।
    তুহিন আহাদ কে ডাক দিলো, “ভাইয়া ওঠো, চলে এসেছি।”
    “এটাই ওর বাসা?”
    “হুম , এটাই। ৩ (এ) ”
    “আচ্ছা”
    আহাদের শরীর টা ভারী মনে হচ্ছে।
    কলিং বেল বাজাতেই একটা ছোট মেয়ে দরজা খুলে সালাম দিল। পেছনে রিনিতা আর তার সেই স্মিত হাসি। “এত দিনে আমাদের কথা মনে পড়লো? ভেতরে আসেন। ”
    আহাদ কি বলবে, তার কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। সে কিছু না বলেই রিনিতাকে অনুসরণ করল। তুহিন কে কিছু মিষ্টি আনার জন্য টাকা দিলো। সে রিনিতার সাথে একা কথা বলতে চাইছে। তুহিন বুঝতে পেরে দ্রুত বাইরে চলে গেল। রিনিতাকে আজ একটা কফি কালার সারি পড়েছে। এই শাড়িটা আহাদ রিনিতাকে বিয়ের উপহার দিয়েছিলো। রিনিতাকে মোহনীয় লাগছে। আহাদের কাছে রিনিতা সব সময়ে মোহনীয়। আহাদ রঙ্গনকে রোবট খেলনাটা দিলো। রঙ্গন সেটা নিয়েই ভেতরের রুম দৌড়ে পালালো।
    “মামনি, থ্যাংক ইউ বল। আর বলবেন না আহাদ ভাই , মেয়েটা অনেক শাই। আপনার মতো। ”
    “হুম”।
    “হুম মানে ? আপনি তো দেখছি শুধু হুম চালিয়ে যাচ্ছেন। তা বাসার ঠিকানা কই পেলেন ? আন্টি কে যে ঠিকানা দিয়েছিলাম সে বাসা তো শিফট করেছি আট মাস হলো। সেখানের কেউ তো এই ঠিকানা জানে না।”
    “চেষ্টা করলে ” আহাদ কথাটা শেষ করলো না।
    “এই অর্ধেক কথা বলেই জীবনটা পার করে দিলেন আহাদ ভাই। চেষ্টা করলে কি সব কিছু পাওয়া যায়? আপনি চেষ্টা করেছিলেন?” রিনিতার দীর্ঘশ্বাস পড়লো।
    “সেজানের সাথে সংসার কেমন চলে ? সুখে যে আছো দেখেই বোঝা যায়।”
    “হুম, আহাদ ভাই আপনাকে থ্যাংক ইউ। সেদিন আপনি সেজান এর সাথে কথা না বলিয়ে দিলে জানতেই পারতাম না ও আমাকে এতটা ভালোবাসে। আমি তো ওকে বখাটে ছেলে বলেই জানতাম। তবে ওর এপ্রোচ টা আমার ভালো লেগেছিলো। বলা নাই কওয়া নাই, ‘আই লাভ ইউ’। সেজান তো আমাকে প্রায়ই বলে আপনার কথা। একজন কে পছন্দ করতেন সেটা তাকে বলতেই পারেননি। ”
    আহাদ মৃদু হাসলো। ভাবছে সেজান কি তার আসলেই বন্ধু ?
    “চা দেই আহাদ ভাই ? আপনি হুট্ করে নিউজিল্যান্ড চলে গেলেন। গ্রাডুয়েশনটাও শেষ করলেন না। আমি আপনার ফ্রেন্ড দের কাছে আপনার নম্বর চাইলাম, বলে আপনি নাকি কারো সাথে যোগাযোগ করেন না। গত ঈদ এ আন্টির সাথে দেখা। আন্টি ও আপনার সম্পকে কিছু বলতে চাইলো না। আমাকে এভোইড করলো । ”
    “না মানে আম্মির বয়স হয়েছে তো তাই কথা বার্তার ঠিক নেই। সেজান কোথায় ?”
    “ব্যাংকার দের সময় কম আপনি জানেন। এসে পড়বে অফিস থেকে। আপনি বসেন। আমি নাস্তা নিয়ে আসি। ” কথাটা বলেও রিনিতা আহাদের সামনেই বসে রইলো।
    আহাদের মনে হলো তার এখন চলে যাওয়া দরকার। এই রিনিতার মায়ায় সে তার রিনিতা কে হারিয়ে ফেলছে। এই আট বছর সে রিনিতা কে নিয়েই ছিল। যে রিনিতা একান্তই তার। যে রিনিতায় সেজান নেই।
    আহাদ উঠে দাঁড়ালো। “আট বছর পরে দেশে আসলাম। আম্মি খালার বাসায়। দেরি হয়ে যাচ্ছে। আসি রিনিতা। ”
    “আহাদ ভাই , যোগাযোগ রেখেন”, বলেই রিনিতা আহাদের হাতটা চেপে ধরলো। আহাদ দ্রুত হাতটা ছাড়িয়ে নিল। পেছনে না তাকিয়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে একদম মাইন্ গেট এ। একবার ও পেছনে তাকালো না। গেট এর কাছে আসতেই ছায়ার মতো একজনকে আড়ালে সরে যেতে দেখলো। আহাদের বুঝতে কষ্ট হলো না যে, এটা সেজান। তার ছোট বেলার বন্ধু . . . । গেট এর বাইরে তুহিন গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে। আহাদ শেষ বার রিনিতার বেলকনিতে তাকালো। রিনিতা দাঁড়িয়ে আছে, সাথে রঙ্গন। রঙ্গন হাত নাড়ছে আর টা টা বলছে। রিনিতা চুপ। মনে হচ্ছে ওর মুখে রাজ্যের অভিমান।
    আচ্ছা , রিনিতা কি তাকে ভালোবাসতো ? রিনিতা কি চাইছিলো আহাদ তাকে ভালোবাসার কথাটা বলুক। সেজান কি রিনিতাকে বলেছে আহাদ অন্য কাউকে ভালোবাসে?
    আহাদ আর কিছুই ভাবতে পারছে না। তার জীবন রিনিতা কে ঘিরেই আবর্তিত। রিনিতা তার বৃত্তের মধ্য বিন্দু। সে রিনিতাকে চারপাশ জুড়ে ঘুরছে কিন্তু কিছুতেই ছুঁতে পারছে না।
    বৃত্ত আর বিন্দু কি কখনো এক হয়?

    8
    2 Comments
    • চমৎকার গল্প! দৃশ্যগুলো খুব দ্রুত বদলে যাওয়ায় গল্পে বেশ টানটান ভাব ছিল! তবে গল্পের টুইস্টটা মন খারাপ করে দেয়ার মত! সব মিলিয়ে খুব ভালো লাগলো পড়ে! শুভেচ্ছা নেবেন!

    • বৃত্ত আর বিন্দু মিলিত হয় না কিন্তু একে অপরের পরিপূরক…

Skip to toolbar