-
স্বপ্নপূরণ
তখন মধ্য দুপুর, আকাশে কিঞ্চিৎ মেঘ করেছে তবে বৃষ্টি আসবে বলে মনে হয় না। বৃষ্টি এলেই কি আর না এলেই বা কি, আমিনুলকে প্রতিদিনই বের হতে হবে তার জীবিকার একমাত্র সম্বল রিকশা নিয়ে।
অন্য দিনের মতো আজও আমিনুল রিকশা নিয়ে বের হয়েছে। তবে আজকের দিনটি একটু অন্যরকম। আজ ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। সকাল থেকে সারা শহরের অলিতে গলিতে বঙ্গবন্ধুর সেই কালজয়ী ভাষণটি মাইকে বাজানো হচ্ছে। এ ভাষণ আমিনুলের খুবই পরিচিত। অলস দুপুরে যখন খালি রিকশায় একটুখানি ঝিমাচ্ছিল, তখনই বারবার তার কানে ভেসে আসতে লাগলো সে কালজয়ী ভাষণ। “এমন ভাষণে কার না রক্ত গরম হয়, কার না সাধ জাগে দেশমাতৃকাকে ভালবেসে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে,” ফাঁকা রিকশায় একাকী বসে এসব ভাবতে থাকে আমিনুল।
-“এই মামা যাবেন,” হঠাৎ পেছন থেকে আমিনুলকে ডেকে ওঠে দুজন যুবক-যুবতী।
-“কই যাবেন মামা?” আমিনুল জানতে চায়।
-“এই তো টিএসসির দিকে”, যুবক ছেলেটির উত্তর।
-“চলেন”, আমিনুল জবাব দেয়।
-“ভাড়া কত?”
আমিনুল উত্তর দেয়, “মামা, আজ বিজয় দিবস, ভাড়া আফনেরা ইনসাফ মতই দিয়েন”।
দুজনে রিকশায় উঠে বসে। ওদেরকে নিয়ে আমিনুলের পথচলা শুরু হয়। ওদের একজনের নাম ঐশী আর অপরজন সাফাত। দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। রিকশা চলছে টিএসসির দিকে আর ওদের কানে বারবার ভেসে আসছে সেই রক্ত গরম করা ভাষণ। ভাষণ শুনতে শুনতে হঠাৎ আমিনুল “জয় বাংলা” বলে জোরে চিৎকার করে ওঠে। ঐশী আর সাফাত অবাক হয়ে যায়, সামান্য ভয়ও পায়।-“মামা, এভাবে চিৎকার করলেন কেন?” ঐশী জানতে চায়।
-“কিছু না, মা। একটা পুরান কথা মনে পইড়া গেল তো, তাই আর কি”। আমিনুল উত্তর দেয়।
-“সেই কথাটি কি আমরা জানতে পারি?” প্রশ্ন করে বসে সাফাত।
-“হুনবেন আফনেরা, তয় হুনেন। বাপজান আফনেগো মতো আমারও সংসার আছিল, আমিও বহুত সুখে আছিলাম। গোলাভর্তি ধান, উঠানে গরু, বেবাক আছিল আমার। বউ আর মাইয়া লইয়া খুব ভাল আছিলাম,” দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলেন আমিনুল।
-“তাহলে তারা কোথায় এখন?” জানতে চায় ওরা।
-“অনেক কথা, মামা। আমার মাইয়াডার বিয়ার বয়স হইয়া গেছিল, কথাও হইতাছিল। কিন্তু একদিন দ্যাশে যুদ্ধ শুরু হইল, আমাগো গেরামের সবাই যুদ্ধে গেল, দুই একজন ছাড়া। হেগো দেইখ্যা আমারও মনে কইল যাইতে। একদিন বউরে কইলাম যুদ্ধে যামু, আমার দ্যাশ মারে বাঁচামু। আমার বউডা খুবই ভালা, আমারে যাইতে দিল। যুদ্ধ করলাম, আফনেগো লাইগা দ্যাশ স্বাধীন করলাম, আমার একটা চোখও হারাইলাম, এক চোখ লইয়া অহন রিশকা চালাই। কিন্তু যুদ্ধ শেষে যখন বাড়িতে গেলাম, যাইয়া দেহি আমার ঘরবাড়ি কিছুই নাই, মাইনষে কইলো সব মিলিটারি জ্বালাইয়া দিছে, আমার বউ আর ফুটফুটে মাইয়াডারে ওরা পশুর মত শেষ করছে মামা”, বুকফাটা আর্তনাদ করে ওঠে আমিনুল।
-“তার মানে আপনি মুক্তিযোদ্ধা। রিকশা থামান মামা”, বলে রিকশা থেকে নেমে যায় দুজন।
-“আপনার আজ এ অবস্থা কেন?” ওরা জানতে চায়।
-“ভাইগ্য মামা ভাইগ্য। আজ আমার কিছু নাই, দুঃখও নাই আমার, দ্যাশ তো পাইছি। তয় মামা আমি খোয়াব দেহি আফনেগো লইয়া, আফনেরা এই দ্যাশটারে অনেক দূরে লইয়া যাইয়েন। আমাগো আশাডা পুরাইয়েন”।ঐশী আর সাফাত আমিনুলকে ১০০০ টাকার একটি নোট দিয়ে বলে, “মামা এটা আপনার বিজয় দিবসের উপহার”। কিন্তু আমিনুল নিতে চায় না। বলে, “ট্যাহা লাগবো না, আমাগো স্বপ্নডা পুরাইয়েন, দ্যাশটারে দুর্নীতিমুক্ত কইরেন। তাইলেই আমার উপহার হইয়া যাইব”।
নিস্তব্ধ হয়ে যায় ওরা, কিছুই বলতে পারে না। শুধু এটুকু বলে, “মামা আমাদের ক্ষমা করবেন, আপনাদের সম্মান আমরা দিতে পারিনি। আপনাদের স্বপ্ন পূরণ হবেই, আমরা তরুণরা করবোই, ইনশাআল্লাহ”।3 Comments
Friends
Sehran-Sowaiba
@sehran-sowaiba
Tridib Azad
@tridibex
Rakib Hassan
@rakib-hassan-jakariya
কুব্বা
@kubot-11
Rayhan1234
@rayhan1234
Md. Yeasin Ahammed
@yeasin
Tarik-Bin-Tarikul
@tarik-bin-tarikul
Mostafa Zaman
@mostafa
Azizur Rahman
@soummodiptoarko


বিনম্র শ্রদ্ধা, গল্পকার আপনার চরণে!