Profile Photo

Md Joynul AbedhinOffline

  • J.A.Sagor
  • Profile picture of Md Joynul Abedhin

    Md Joynul Abedhin

    3 years, 7 months ago

    গল্পঃ বিধিলিপি
    ভাঙ্গা পা নিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে টিভির রিমোট ঘুরিয়ে যাচ্ছে পারকি। আর ভাল্লাগেনা! মা-বাবা অফিসের জন্য বেড়িয়ে গেছে। এক্সিডেন্টের পর থেকে প্রাণে বাঁচলেও ডান পা এক্ষুণি সারবার নয়। যত বেশি রেস্ট তত তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক হাটা চলা করা সম্ভব হবে-এই আশায় শুধুই সোফা-বিছানা করে দুই মাস গেল। প্রথমে প্রাণে বেঁচে থাকবার একটা ভাল লাগা ছিল। এখন তা উবে গেছে। রেস্ট নেয়া অতিরিক্ত হলে বিরক্তির শেষ থাকেনা। সেখানে দু মাস গত হল। ইউটিউব ফেসবুক কিংবা টিভি মাঝে মাঝে জানালা গলে আকাশ দেখা- হাঁপিয়ে ওঠা ছাড়া আর কোন গতি নেই। মাঝ দুপুর নাগাদ কখন যে সোফায় ঘুমিয়ে গেল পারকি কিছুই জানেনা। যখন তখন ঘুম আসে আর সেও ঘুম আসতে চায়। অন্তত ঘুমের সময়টা ভাল থাকে সে। চোখ যখন মেলল- তখন শরীর কেঁপে উঠল। বুক এমন কষে মোচড় দিল যে ঢোক গিলে নিতেই কষ্ট হল। একটা লোক সামনে বসে আছে-হাতে ছুঁড়ি। পারকি চিৎকার করতে যাবে কিন্তু শরীর যেন অবশ।ভয়ে হাত পা কাঁপছে। চিতকার করবে কি, নির্বাক হয়ে নিজের কাঁপুনির চোটে কথা এলোনা মুখে। লোকটি বলে উঠল
    – চিৎকার করবেন না। আমি আপনার কোন ক্ষতি করবোনা। আমি চোর সত্যি কিন্তু আপনার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছে আমার নেই। আমার জাস্ট কিছু টাকা দরকার। টাকাটা পেলে আমি চলে যাব। নিজেই নিজেই খুঁজেছি ,পেলে হয়ত নিয়ে চলেও যেতাম কিন্তু কোথাও টাকা খুঁজে পেলাম না। তাই ভাবলাম আপনি উঠে সাহায্য করলেই কেবল টাকা পাওয়া সম্ভব। কিন্তু আপনার ঘুম ভাঙ্গাতে ইচ্ছে হয়নি তাই টিভির ভলিউম কমিয়ে টিভি দেখছিলাম।
    এ পর্যন্ত শুনে হা হয়ে গেল পারকি। একজন কি করে এত জেন্টলম্যান হতে পারে! পারকি অবাক হয়ে দেখল ওর শরীর আর কাপছেনা। একটূও না। একজন মানুষ হৃদয় থেকে কথা বললে তা অন্য জনের হৃদয়কে স্পর্শ করে। পারকির তাই হয়েছে। লোকটির চোখে-মুখে কেন জানি সত্য বচনের রেশ স্পষ্ট। বেশ আশ্বস্ত হওয়া যায়। ফ্রিজ থেকে বের করে চাউমিন খাওয়া প্লেট পাশেই, মানে লোকটা একটুও মিথ্যা বলেনি।
    তবুও পারকির জিজ্ঞাসা- ক্ষতি করবেন না তার নিশ্চয়তা কি? ভয় গেলেও আশ্বস্ত হওয়া ভাল।
    – যদি তাই হত তবে আপনার ঘুম ভাঙ্গিয়ে , মুখে টেপ লাগিয়ে জানতে চাইতাম টাকা কোথায়?
    আরে তাই তো, ভাবল পারকি।

    -আপনাকে দারোয়ান দেখেনি?
    -না। সে ঘুম। আমি কদিন ধরে আপনাদের বাসা পর্যবেক্ষণ করেছি। মোটে বাসায় তিনজন। আপনি বাসায় থাকেন কিন্তু নড়তে পারেন না। আপনাদের দারোয়ান দুপুরে ঘুমিয়ে যায়। যদিও তার হাতে ইয়া বড় লাঠি থাকে কিন্তু খুব ঘুম কাতুরে যা আমার জন্য বেশ ভাল । অনেক টাকা লাগবে তা নয় অল্প টাকা হলেই চলবে। গরীব মানুষের কাছে বেশী টাকা থাকতে নেই, বেশি টাকা গরীব ছোট চোর হজম করতে পারেনা। ধরা যাক আপনাদের বাসা থেকে যদি আমি দশ লক্ষ টাকা চুরি করি তাহলে আপনার বাবা পুলিশ লাগিয়ে টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করবেন। কিন্তু আশি হাজার -এক লাখ চুরি গেলে তিনি গুরুত্ব কম দেবেন। পুলিশকে জানাতে পারেন আবার নাও পারেন। পরিমাণ কম বিধায় পুলিশেরও আগ্রহ থাকবে কম। এটা আমার জন্য ভাল। আশি হাজার-এক লাখে আমার আরামসে কয়েক মাস যাবে। বেশি টাকার লোভে সারাক্ষণ পুলিশের ভয়ে থাকার চেয়ে এটাই আমার কাছে ভাল মনে হয়।
    – আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে পড়াশুনা জানেন তাহলে চুরি করেন কেন?
    – এই প্রশ্নে পৃথিবীর সকল চোর বিব্রত হয়। তারা যে কেন চোর তার ব্যখ্যা তাদের কাছে নেই। তবে চুরি করা দক্ষতার কাজ। সবাই এই কাজ পারেনা। যারা পারে তারা এই কাজ পারে বলেই হয়ত চোর। অথবা পৃথিবীর অনেক কিছুরই ব্যাখ্যা মানুষের জানা নেই। কেউ কেউ ঘোরের মধ্যে থেকে জীবন পার করে দেয়। ভাল কথা আমি পড়াশুনা করিনি কিন্তু ভাল করে কথা বললে মানুষকে বোকা বানানো সহজ,তাই এটা শিখেছি।
    -আপনি কি এখন আমাকে বোকা বানাচ্ছেন?
    -না, আপনাকে বোকা বানিয়ে লাভ নেই,ক্ষতি।
    পারকির মনে হল এই লোকটি যে চোর তা বিশ্বাস করা কষ্টকর। এমন একজন মানুষ চোর! কিন্তু পৃথিবীতে বিস্ময়ের শেষ নেই। এমন চোর হতেই পারে এবং সে এখন একজন ভদ্র চোরের সাথে একই ঘরে আছে- এটা সত্য, সপ্ন নয়।
    – আপনি এই যে চুরি করেন , ধরা পড়েন না, মার খাননা?
    – দু বার ধরা পড়েছি। মাইর খেয়েছি। গরীব চোরকে মানুষ বেশ উল্লাস করে মারে। তবে আমি যে চোর বলে মাইর খাই তা কিন্তু নয়। মানুষ চুরির জন্য মাইর খায়না, সমাজে অবস্থানের জন্য মাইর খায়। একজন রিকশাওয়ালাকে সহজেই চড় দেয়া যায়।কারণ মানুষের জানা আছে সে রিকশাওয়ালা, সমাজে সে নীচুতলার মানুষ। অথচ একজন প্রাইভেট কারের মালিকের গায়ে কেউ হাত তুলতে চায়না। কারণ তার অবস্থান উপড়ে। মানুষ তখন ভয় পায়। চুরি অনেক রকমের। ঘুষ যারা খায় তারা মূলত কি করে ? তারা মূলত ডাকাতি করে, যারা টাকা পাচার করে তারা মূলত চুরি করে। যারা বাজারে সিন্ডিকেট করে তারা মূলত কি করে-ডাকাতি করে। কিন্তু মাইর খেতে হয় শুধু আমাদের মত ছিঁচকে চোরকে। কেন জানেন? কারণ চুরি করার জন্য আমার কোন এসি লাগানো রুম নেই। এসি রুমে বসে চোর চুরি করলে মানুষ তাকে স্যালুট দিয়ে স্যার বলে। তাই চোর হবার জন্য আমার আসলে আফসোস নেই, আমার আফসোস আমার একটা এসি লাগানো রুম নেই বলে তাহলেই আমার চুরি সিস্টেম হয়ে যেত। হা হা হা।

    পারকির কেন জানি মনে হচ্ছে এই লোক বেখেয়ালে চোর। পৃথিবীর প্রতি তার কোন মোহ নেই।
    -কিন্তু আপনি কাজ করেন না কেন? কাজ করলেই তো আপনাকে এত রিস্ক নিতে হয়না।
    -তা ঠিক। কিন্তু শহরে যখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছিলাম কি করে খাব কি করে খাব তখন পরিচয় একদল চোরের সাথে। তারপর থেকে এই পেশাটা আসলে আর পেশা নয়-নেশা। তাই বলে যে ভাল হবার চেষ্টা করিনি তা নয়। কিন্তু সমাজে নীচু তলার কাজ করতে গেলে মানুষ কথা শোনায়। বাসের হেল্পার গালি খায়, গার্মেন্ট কর্মী গালি খায়, বিক্রয়কর্মী গালি খায়। তার থেকে চোরের পেশা ঢের ভাল। শুধু ধরা পরার দিনে মাইর খেতে এই যা। তবে জানেন প্রত্যেক বার নতুন বাসায় ঢুকে পড়া একটা দারুন উত্তেজনা। এটা আমার ভালই লাগে।
    -আপনি কি ভাল হতে চাননা?
    -চাই না তা নয়, কিন্তু কেউ একটু অপমান করলেই মনে হয়- আরে, এর থেকে তো আমার চোর হওয়াই ভাল। হা হা হা।
    -আচ্ছা আমি কি আপনার জন্য চেষ্টা করে দেখব। কথা দিচ্ছি আপনাকে কথা কেউ শোনাবেনা। আর কথা শোনালেই কি? মানুষ যে যার জায়গা থেকে কথা শোনে। কথা শোনা থেকে দেশের মন্ত্রীরও নিস্তার নেই। তাহলে আপনার এত খারাপ লাগবে কেন? আমি আপনার জন্য একটা চেষ্টা করব, এবং আপনি ভাল হবেন এই কথা আমাকে দিতে হবে।
    লোকটি অবাক করা চোখ নিয়ে পারকির দিকে তাকাল। এই প্রথম বার মনে হল ভাল হবার একটা বাসনা সবারই থাকে। নীরবে থাকে। অনেক মানুষ আছে যারা ভাল হতে চায়, কিন্তু পথ জানা নেই, পথ দেখানোর কেউ নেই। অনেকেই ভাল হতে পারেনা কারণ কেউ তাদের ভাল হতে বলেনি।
    -আপনি যেহেতু বলছেন তাহলে একবার চেষ্টা করে দেখব। একটু হাসি লোকটির ঠোটে।
    খুব খুশি হল পারকি।
    -আমি তবে আমার বাবার সাথে কথা বলব। বাবা চট্টগ্রামে গেছে। তিন দিন পরে আসবে। বাবা আসলেই আমি কিছু একটা করতে পারব। আপনি আপনার মোবাইল নাম্বার থাকলে আমাকে দিন।
    – নাহ, ভেবেছিলাম আপনাদের বাসায় চুরি করে কয়েক মাস আরামে থাকব, তা আর হলনা।
    শুনে পারকিও একটু হাসল। একজন মানুষকে সাহায্য করার মধ্যে স্বর্গীয় অনুভূতি কাজ করে। নাম্বার সেইভ করল পারকি।

    -আমি তবে আর এখানে না থাকি। চলে যাই। দেখি আপনার কথা রাখতে পারি কি না।
    -পারবেন, আমার বিশ্বাস আছে- আপনি পারবেন।
    -জি, ভাল থাকবেন ।
    লোকটি উঠে গেল। পারকি ওঠার চেষ্টা করল। পারকির বুক কাঁপছে । অনেক সময় বড় পর্বত ওঠার চেয়ে নেমে আসা কঠিন। লোকটি ভালয় ভালয় বের হতে পারলে হয়। রুমে বসে আর কোনদিন এত ঘামেনি পারকি। কিন্তু ভয়ের জায়গাতেই সর্বনাশ হয়। একটু পরেই নীচ থেকে শোরগোল আসতে লাগল। চোর চোর শব্দে দারওয়ান আবুল চাচা কোন দিকে যেন ছুটে যাচ্ছে । অনেক কষ্টে পারকি বারান্দায় এল গলিতে চোখ রেখে বুঝল গলির একদম মাথায় বেশ হট্টগোল। কয়েকটি কিশোর ছেলে গলির মাথার দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। বুক কাপঁছে,দম দম করে কাপঁছে। ইস কেন কেন !
    মার শালারে মার এমন শব্দ কানে আসছে। এমন দিশেহারা কোনদিন বোধ হয়নি। কেমন পাগল পাগল লাগছে- কি করা যায় কি করা যায়- মাথায় কিছুই আসছেনা। বসে বসে সিঁড়ি বেয়ে দুই তলা থেকে নেমে এল পারকি। সময় লাগল। গেট গলিয়ে চোখ দিয়ে তাকাতেই দেখল-
    দারওয়ান আবুল চাচা লোকটির শার্টের পিছন কলার ধরে টেনে হিঁচড়ে আনছে। রক্তে মুখ ভেসে গেছে ,শার্ট লাল হয়েছে।
    আবুল চাচা বেশ উল্লাস করেই জানাল- ঘরে ঢুকেছিল। ধইরা ফালাইছি। দিছি মাইর। জন্মের শিক্ষ্যা দিছি, হাড্ডি সব পাউডার করে দিছি। আর কোনদিন চুরি করবোনা। কি রে তুই কিছু চুরি করিস নাই তাহলে কোন মতলবে ঢুকছিলি? দারওয়ানের এমন কথায় আশেপাশের দুই একজন বিস্ময় প্রকাশ করল। চোর ধরা পড়লে এই দেশে একটা উতসবের আমেজ তৈরি হয়। জনবহুল এই দেশে উতসুক জনতার কমতি নেই। পারকি দেখল জনতার ভীড় কম নয়। আর দাড়োয়ান আবুল চাচা নিজের অজান্তে যে প্রশ্ন ছুড়েছে তার উপর পারকির,তার পরিবারের মান-সন্মান দাঁড়িয়ে আছে।
    উতসুক জনতার চোখে মুখে প্রশ্নের উত্তরের প্রতীক্ষা। সমাজের এই জিজ্ঞাসু চোখ অত্যন্ত ভয়ানক তা জানে পারকি। তার উত্তরের উপরেই সমাজের ভিত যেন দাড়িয়ে আছে। চুরির মতলব যদি না থাকে -তাহলে?
    পারকির জন্য দেরী করা ঠিক নয়,একদমই নয়।
    -আরে আমাদের বাসায় কিছু নেই তো, বাসায় আমরা টাকা রাখিনা , তাই কিছু নিতে পারেনি হয়ত। সমাজের বিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সন্দেহ মুক্ত করতে পারকি আরো বলল- কি রকম বোকা লোক , দিনের বেলা কেউ চুরি করতে আসে! মানুষের চোখের দিকে পারকির মনে হল তারা আশ্বস্ত হয়েছে।

    কিন্তু লোকটি মাথা তুলে পারকিকে দেখতে চাচ্ছে কিন্তু মাথা তুলতে পারছেনা। গাঢ় লাল রক্ত মুখ বেয়ে নীচে মাটিতে পড়ছে ফোটা ফোটা। কিশোর একটা ছেলের হাতে গাছের ডাল। সপাং চালিয়ে দিল পিঠের উপর।
    -এই শালাই মনে হয় সেদিন দোকান থেকে আমার মোবাইল গায়েব করে দিয়েছে। এখন কেমন লাগে? সপাং সপাং সপাং।মাটিতে মাথা দিয়ে একপাশে পড়ে গেল লোকটি।

    আর দাড়াল না পারকি। নিজের রুমে এসে কাঁদল সে। এ কেমন অসহায় সে।
    জীবনের কি মুহুর্ত যেখানে না সওয়া যায় না কিছু বলা যায়?
    রাত বারোটা নাগাদ পারকি মায়ের বকাবকির আওয়াজ শুনলো। । মা পাশের রুমে দারোয়ান আবুল চাচাকে বকছে।
    পারকির রুমে এসে জানাল,
    -সেই চোর না কি হাসপাতালে মারা গেছে। কি জ্বালা! এত কেউ মারে।
    এবার আর কাদেঁনি পারকি। হাসি এসেছে, হাসি এসেছে এই ভেবে যে লোকটি ভাল হতে চেয়েছিল।

    6
    6 Comments
    • “পৃথিবীর অনেক কিছুরই ব্যাখ্যা মানুষের জানা নেই… অনেক মানুষ আছে যারা ভাল হতে চায়, কিন্তু পথ জানা নেই, পথ দেখানোর কেউ ন… অনেকেই ভাল হতে পারেনা কারণ কেউ তাদের ভাল হতে বলেনি… ” কথাগুলো বুকে কাঁটার মত বিঁধলো… অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও মুগ্ধতা এত মোহনীয় একটা লেখা উপহার দেয়ার জন্যে…

    • আপনার গল্পের গাঁথুনি ভালো। মনটা খারাপ হয়ে গেলো। যে পথ সে বেছে নিয়েছিল সেটা থেকে কী সত্যি বের হয়ে আসা যায়!

      • অনেক ধন্যবাদ। বেচারাকে তো বাচিয়েই রাখলাম না,জানার আর উপায় নেই।

    • শহরের রোজকার গল্প! ভালো লাগলো পড়ে!

Skip to toolbar