-
জন্মদিন
আজ মিমের জন্মদিন…
প্রথম যখন ও আমার সাথে ওর জন্মদিন পালন শুরু করে তখন ওর ১৮তম জন্মদিন ছিল। তখন আমাদের বিয়ে হয়নি, তবে বিয়ের কথা চলছিল। আমরা প্রায়ই দেখা করতাম, ঘুরতে যেতাম, ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করতাম। ও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনার কি আমাকে পছন্দ হয়েছে? আমি তো সুন্দরি না তেমন”। জীবনে কখনো প্রেম ভালোবাসার বেড়াজালে পরি নাই, তাই মেয়েদের মন বুঝার অভিজ্ঞতা ছিল না একদমই। কিন্তু বন্ধুবান্ধবদের কাছে শুনেছি মেয়ে মানুষ সে যতই সুন্দরি হোক নিজেকে অসুন্দর বলেই প্রকাশ করে। মিমের এই ধরনের প্রশ্নে ভীষন বিব্রতবোধ করেছিলাম সেদিন। কি উত্তর দিব বুঝতে পারছিলাম না। তাও হাসিমুখে উত্তর দিয়েছিলাম, “তো আমি কি নায়ক নাকি? আর সুন্দর অসুন্দর নিয়ে ভাবো কেন? শিক্ষিত মানুষ এগুলা নিয়ে ভাবে না, শুধু ব্যক্তিত্ব নিয়ে ভাবে, যার ব্যক্তিত্ব সুন্দর সেই সুন্দর”। ওকে দেখে মনে হয়েছিল উত্তরটা অনেক পছন্দ হয়েছিল, খুব খুশি হয়েছিল। সে যাত্রা বেঁচে গিয়েছিলাম!
মিমকে আমার মা পছন্দ করেছিল, হুট করেই একদিন মা বললো, তোমার জন্য মেয়ে পছন্দ করেছি, বিকেলে দেখতে যাবে। ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকা, তারপর চাকরি, আমি কখনো আর ভাব ভালোবাসা নিয়ে ভাবার সময় পাইনি। মায়ের এমন কথা শুনে কিছুটা লজ্জাই পেয়েছিলাম সেদিন। মিমকে যখন প্রথম দেখি তখন পছন্দ হয়েছে কি হয়নি সেটা আমার জানা নেই। মিম খুবই সাধারন একটা মেয়ে, খুব সুন্দরি বলা যায় না, আবার একদম যে অসুন্দর তাও বলা যায় না। তবে হ্যাঁ, আমি খুশিই ছিলাম। এতটুকুই জানতাম যে বিয়ের পর এই মানুষটা আমার আপন কেউ হয়ে যাবে, আর নিজের মানুষটা দেখতে যেমনই হোক সে তো নিজেরই থাকে। আমি এতটুকুতেই খুশি ছিলাম যে সে আমার হবে, শুধুই আমার।
সামনে ওর জন্মদিন ছিল, অভিজ্ঞতার অভাবে ঠিক কি দিলে যে মিম খুশি হবে বুঝে উঠতে পারছিলাম না। উপহার দেয়ার অভ্যাস ছিল না কখনই আমার। মিম একবার আমায় বলছিল যে চকলেট তার খুব পছন্দ। তাই ভাবলাম ১৮তম জন্মদিনে তাকে ১৮টা চকলেট দেই, ব্যাপারটা ভালোই uncommon দেখাবে। সত্যিই অনেক খুশি হয়েছিল সেদিন মিম, আমার হাত ধরে বলেছিল সবসময় এমন থাকতে, কখনো যেন বদলে না যাই। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম, মাত্র কয়টা চকলেট পেয়ে কেউ এত খুশি কি করে হয়! তারপর থেকে ওর সব জন্মদিনে ওকে চকলেটই দিতাম। যত তম জন্মদিন ততগুলা চকলেট।
কিছুদিনের মাথায় আমাদের বিয়ে হয়ে যায়। মিম মেয়েটা ছিল খুবই লক্ষী। কোনোদিন আমার মুখের উপর কোনো কথা বলে নি, কোনো বায়না করেনি, আমার উপর খবরদারি করার চেষ্টাও করেনি কোনোদিন। সেসব মনে করলে মনে হয় আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো ওই আমাকে দিয়েছে। হয়ত আমি সবচেয়ে সুখি মানুষ ছিলাম। মানুষ বলে সাধনা ছাড়া সুখ পেয়ে গেলে নাকি তার কদর থাকে না।
সেদিনও ওর জন্মদিন ছিল। দীর্ঘদিনের চলমান ধারাবাহিকতা রক্ষায় ২৩টা চকলেট ভর্তি বাক্স নিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। আমি জানতাম না যে আমার সুন্দরি সহকর্মীর সাথে গড়ে ওঠা আমার সম্পর্ক এখন আর মিমের কাছে গোপন নেই। ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত মিমের স্থির দেহটা দেখার সাথে সাথেই আমি বুঝতে পারলাম কতটা গর্হিত কাজ করে ফেলেছিলাম আমি! কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। একটা চিঠি লিখে গিয়েছিল মিম…
“আমাকে তো আমি বানাইনি,
যদি আমি বানাতাম তাহলে হয়তো অন্যরকম বানাতাম, সবার মন মতো বানাতাম, তাহলে আর এই অবহেলা অনাদর গুলো দেখতে হতো না।
সবাই ভিতু, নিজের সত্যটা সবাই সযত্নে লুকিয়ে রাখে। এদের মাঝে আর থাকতে পারছি না। নিজের বলতে আমার কিছুই থাকলো না! এই সত্য মেনে নিয়ে বাঁচতে অনেক কষ্ট হচ্ছে, তাই চলে যাচ্ছি।”
একটা অসহ্যকর অপরাধবোধ নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে আমার বাকি জীবনভর এটাই হয়ত আমার শাস্তি। সংসার জীবনে মিম কখনই আমার উপর খবরদারি করেনি। আমার এমন কুৎসিত সত্যটা জানার পরও মেয়েটা আমাকে কোনো প্রশ্নও করলো না। মাফ চাওয়ার কোনো সুযোগই দিল না! আমাকে তার হত্যাকারী বানিয়ে রেখে চলে গেল। এতগুলো বছর ধরে তার জন্মবার্ষিকীতে তার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতে হচ্ছে। অপেক্ষায় আছি, মৃত্যুর মাধ্যমে হলেও যদি তার কাছে ফিরে যেতে পারি, ক্ষমা চেয়ে নিতে পারি!!!3 Comments
Friends
রক্তিম জয়
@racktimjoy
মাহমুদ হাসান সজীব
@mahmudhasan1821
Soumaya-Islam-Rimi
@soumaya-islam-rimi
Hijbullah hiju
@hijbullah
Amena Anwar
@amena507
আদিল আফসার
@adilafsar
Tahsan-Ekush
@tahsan-ekush
মোঃ রিদওয়ান আল হাসান
@mridwanalhasan
Wafy Abrar
@wafy2710


গদ্য হচ্ছে বাক্যের খেলা। নিপুন ভাবে লিখে যাও।