Profile Photo

Sakib SaifOffline

  • sakibdhaka
  • Profile picture of Sakib Saif

    Sakib Saif

    • 4 years ago

    সুটকেস
    সাকিব সাইফ

    মাখনের ছুরি দিয়ে মাখন কেটে রুটিতে লাগাতে লাগাতে মিকালভ হাক দিচ্ছে মাকে।
    মা! চায়ের জল ফুটে গেছে তুমি কি চা খাবে না কফি?
    সোফিয়া বিছানা থেকে আলসে ভাবে বলছে -বাপু হলেই হলো তুই কি করছিস?
    জানালা কি খোলা রেখেছিস?
    আগুন ঘরে কি লাকড়ি দিস নাই?
    যা!বাবা এক কাপ চা খাবে কিনা জিজ্ঞেস করাতে এত গুলো ফরমাইস দিয়ে দিলে?
    পারো তুমি মা!

    আজ রোববার,কারখানা বন্ধ।
    সকালের এই সময়টা একটু আলসে লাগে পলিনার।
    মিকা তোর বাবা কইরে?হাঁক দিয়ে বলল পলিনা।
    জানি না মা!সকালে দেখলাম বাগানে তারপর আমাকে বলল একটু বের হলাম।
    তুই নাস্তা করে নিস।
    ও আচ্ছা!
    মিকা এক মগ কফি সাথে মাখন মাখা রুটি সাজালো মায়ের জন্য।
    নিজের জন্য এক কাপ চা।সালাদের বাটিতে গত রাতের কাটা সালাদ আছে।
    একটু বোয়াম থেকে নুনের জলে ডোবানো শশা বের করে পিরিচে বাড়লো।
    মা কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
    লক্ষ্মী মা উঠে এসো!
    পুরো হপ্তায় মাকে এই রবিবারটাই পাওয়া যায়।
    মিকালভের মা সোফিয়া বড় রাস্তার পাশের রেশনের দোকানে কাজ করে।
    আর বাবা মেদভেব কারখানার ফোরম্যান।
    হেমন্তের এক সকালের গল্প।
    কাজান শহর থেকে দক্ষিন এর পাহাড়ের কোলে এই গ্রাম।
    গ্রাম বললে ভুল হবে,দুটো কারখানা, দুটো সূরিখানা, একটা ডাকঘর আছে।
    মাইল পাঁচেক দূরে রেল ষ্টেশন আছে।

    মা!!!বের হলাম।
    মাও প্রতি উত্তরে দিলো।-যা পথে পেশকভের বাড়ি হয়ে আসিস,গেলো হপ্তায় নাকি ইরান থেকে এসেছে।
    আমার জন্য নাকি কিছু পেস্তা আর জাফরান এনেছে।
    সময় হচ্ছে না ওদিকে যাবার।
    তুই নিয়ে আসিস।
    আচ্ছা!
    পেশকভ হচ্ছে তার মেসো,তার মায়ের বোনের বিয়ে হয়েছে এই একই গ্রামে।
    মেশো বেশ মজার মানুষ,বছরের অনেক মাস পারস্য,আর্মেনিয়া সহ অনেক দেশে যায়।
    মসলা,আলুভোকরা পশমের কাপড়,চীনে থালা-বাটি আরো কত কি নিয়ে আসে,পরে মস্কোতে তার পিসতুতু ভাই এর সাথে বিক্রি করে।
    মেসো নানা কিসিমের গল্প জানে,কত দেশ বিদেশের নানা রঙের গল্প-এর পসরা নিয়ে বসেন যখন সফরে করে ফেরেন।শীতের সময় গনগনে আগুনের পাশে বসে অনেক সন্ধ্যা কেটে গেছে মেসোর থলের ভেতর থেকে গপ্প শুনে।গপ্পের ভ্রম কাটতো যখন গির্জায় রাতের ঘণ্টার শব্দ পাওয়া যেতো।
    মিকালোভ মাথায় ক্যাপটা চাপিয়ে পেছনের বাগানের দরজা দিয়ে বের হয়ে গেলো।
    পেছনের বাগানে লাল আপেল আর আপ্রিকট এর গাছে এবার ভালোই ফল এসেছে।
    দুটো পাকা আপ্রিকট তুলে নিয়ে জ্যাকেটে মুছে কামড় দিতে দিতে হাটা দিলো।
    মাথার উপর ঝকজকে নীলচে সাদা আকাশ আর মেঘের এলো-মেলো তুলির আচড়।
    তাদের বাড়ি ছেড়ে সামনের মাটির রাস্তা এটাই গিয়ে মিশেছে গ্রামের বড় রাস্তার সাথে।
    যাবার পথে প্লেৎণেভ কে দেখা যাচ্ছে সারা গায়ে ভুসো কালি মেখে ট্রক্টরটা ঠিক করছে।
    কি রে?
    এইতো কাকা আপনি কেমন আছেন?
    চলে যাচ্ছে।
    ভালো কথা, তোর কাকী তোদের জন্য মাংসের পাই বানিয়েছে ফেরার পথে নিয়ে যাস ,
    সন্ধ্যায় তোদের বাড়ি আসবো।
    তোর বাবা কই?
    তা তো জানি না।
    আচ্ছা ঠিক আছে।
    হাত নাড়িয়ে বিদায় বলে এগুতে লাগলো মিকালভ।
    সুড়ীখানা পার হয়ে হলুদ সরিষার খেত তারপরই মাসীর বাড়ী,দূর থেকে দেখা যাচ্ছে মাসীকে।
    কাঠের দরজা ঠেলে বাগানে ঢুকতে ঢুকতে মিষ্টি হাসিতে ভরে গেলো ইরিনার।
    ওরে আমার দুষ্ট সোনা এত দিন পর এ পথ মাড়ালি?
    না গো মাসী বড় কাজের চাপ ছিলো।
    মাসীর হালকা হলদে রঙা হাত দিয়ে মিকার সোনালী চুল বুলিয়ে দিলো।
    অভিমান করে বলল তুমিও তো অনেক দিন আমাদের ওদিকে যাওনা?
    পাঁকা আপেলের টুকরো রোদে শুকানোর জন্য মেলতে মেলতে ইরিনার বলল- যাবো রে আগামী হপ্তায়ে যাবো।
    যা বারান্দায় বস আমিও কাজ সেরে আসছি।
    মাসী উঠে বসলো মিকার পাশে, সোনামনি চল রান্না ঘরের দিকে।
    তোর মেসো আবার কাজানে গেছে,তোর মায়ের জন্য এই গুলো নিয়ে যাস।
    মাসী চটের একটা থলে হাতে দিলো মিকার।
    মাংসের সূপ আর রুটি দিলো খেতে,মিকা ঐ তাকের উপর জ্যাম আছে খেয়ে দেখতো কেমন হয়েছে।
    তোমার জ্যাম আমি মড়ার পর কফিনেও নিয়ে যাবো।
    আমার এতো ভালো লাগে খেতে!
    আসলে মাসীর আপেলের জ্যামটা এত ভালো হয়!
    আরাম করে খেয়ে মুখ মুছতে মুছতে মিকা বলল মাসী উঠি আজ।
    আচ্ছা যা!মাকে বলিশ আসবো সময় করে।
    পাকা।
    বড় রাস্তায় উঠেই বাম পাশে ইস্পাত কারখানার শ্রমিকদের একটা বস্তি আছে,ওটা ছাপিয়ে গির্জা তারপর দিগন্ত জোড়া মাঠ।
    রাস্তায় দেখা যাচ্ছে পলিনাকে।
    মিকাদের এই গ্রামে পলিনারা এসেছে বছর চারেক আগে,তার বাবা দিমিত্রি এই গ্রামের পোস্ট অফিসের বড় কেরানী।
    মোটা সোটা,খয়ে যাওয়া বাদামী রঙের চুল গড়া মানুষ।
    আজ পলিনাকে দারুন লাগছে সাদা নেটের গাউনের উপর হাল্কা নীলচে-সাদা স্কারফ।মনে হচ্ছে মেঘের সাথে মিশে যাওয়া আরেকটা মেঘ।পাতলা ঠোঁটের উপর একটা মৃদু হাসি।
    হাতে কাপড়ে মোড়ানো গরম রুটি।
    মিকা যে। কই গিয়েছো?
    ইরিনার বাসায়।
    আচ্ছা!তুমি কই গিয়েছো?
    আর বলো না।
    রুটী আনতে গিয়েছিলাম।
    ও!আচ্ছা যাই তাহলে।
    পাকা।
    প্রতি উত্তরে পাকা বলে হাটা দিলো পলিনা।
    বাড়ীতে ফিরে এসে দেখে বাবা ও চলে এসেছে।
    মা দুপুরের খাবার বানাচ্ছে,
    মা রাতে প্লেৎণেভ কাকা আর কাকিরা আসবে,তোমার জন্য পাই দিয়েছে।
    বাবা বারান্দায় আপেলে কামড় দিতে দিতে বলল- ভালোই তো তাহলে দিমুকে(দিমিত্রি) বলা যায় অনেক দিন হয়ে গেলো আমাদের বাড়িতে ও কে বলা হয় না।
    যা তো মিকা দিমুদের বাসায় ওদের বলে আয়। আজ সন্ধ্যাটা দারুণ কাটবে।
    কি গো ঘরে ভটকা আছে?আচ্ছা যাই মাংস নিয়ে আসি।
    মা মিটিমিটি হাসি দিয়ে কিছু বলল না।
    মিকা দিমুদের বাড়ি গিয়ে বলে বলবি- যেনো সবাই মিলে আসে।
    আর ফেরার পথে পিটারের দোকান থেকে নতুন বানানো মদ আর লেমোনেড নিয়ে এসো।
    বাবা পাঁচ রুবোল হাতে দিয়ে বলে যদি আরোও লাগে বলিস বাবা দিয়ে দিবে।
    মাথার উপর নীলচে আকাশ আর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত এক উত্তেজনায় মিকালভ বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো।

    দিমিত্রি বাইরের বারান্দায় বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা লিখছে।
    প্রিভেত!ঘাড় ঘুরিয়ে ঝুপো মোছের ফাঁক দিয়ে মাথা তুলে মিকার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলো দিমিত্রি ।
    আরে মিকা যে! কেমন আছো?
    আছি ভালো,বাবা পাঠিয়েছে আপনার আজ রাতে আমাদের বাসায় দাওয়াত।
    হঠাৎ?
    না ওরকম কিছু না।অনেক দিন আপনাদের সাথে দেখা হয় না।
    ও আচ্ছা!আসলে তো!
    তোমাদেরও অনেকদিন কোনো টেলিগ্রাফ ও আসে না।
    আচ্ছা যাবো!
    মিকা!কিছু বাদাম নিয়ে যা,ভালো বাদাম।
    বারান্দায়র টেবিলে বাটিতে রাখা বাদাম থেকে এক খাবলা বাদাম তুলে নিলো সে।
    আচ্ছা পাকা! বলে শিষ কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে সে।
    এই সব কিছুই আরেক জোড়া চোখ সাদা পর্দার ফাক গলে দেখছে,পাতলা ঠোঁটের উপর তখন খেলা করছে নরম রোদের খেলা।
    চমকে উঠলো এক বাজখাই গলার শব্দে।
    জোয়ান মরদ আর দেখতে হবে না,কাজ কর্মতো করতে আর ইচ্ছে করবে না।
    নিজের মাকে তো মেরেছিস এখন আমাকে মারা তোর বাকি।
    হে ভগবান! আমাকে বাঁচাও।
    দাঁড়িয়ে আছিস কেনো?যা বাগানে উনুনটা কে জ্বালাবে?
    আমি?
    যাচ্ছি মা! বলে নিরবে জানালা ছেড়ে এলো পলিনা।

    ডোমরার সুর আর হাজার তারার মেলা

    সন্ধ্যার আগ আগ করে সবাই এসে গেছে মিকালভদের বাড়ী।
    প্লেৎণেভ এর বউ ইরিনা রসুইঘরে মা কে সাহায্য করছে।
    মিকা যা তো সোনা রুটি নিয়ে আয় গরম দেখে।
    যাচ্ছি মা।
    বারান্দায় বাবা আর প্লেৎণেভ কথা বলছে আর টেবিল সাজাচ্ছে।
    মিকা রুটির দোকানের সামনে দেখা হয়ে গেলো পলিনা তার বাবার সাথে।
    পলিনার হাতে ঘরে বানানো জ্যামের বোয়াম আর দিমিত্রি পনিরের দরদাম করছে।
    মিষ্টি হাসি দিয়ে দিমিত্রি পনির বগলদাবা করে বলল-রুটি যেনো ভালো স্যাকা হয়।
    পলিনা কে বলল-চল মা আমরা এগুই।
    গরম রুটি থেকে ভেসে আসছে মিষ্টি গন্ধ আর হাতে গরম উষ্ণতা দারুন লাগছে মিকালভের।

    সামনের বারান্দায় আড্ডা জমে উঠেছে।
    বাবা টেবিলে তাল দিচ্ছে প্লেৎণেভ ডোমরা বাজাচ্ছে।
    কি সুন্দর গান ধরেছে প্লেৎণেভ।দরদ দিয়ে গাইতে পারে বুড়ো।
    টেবিলের চারপাশে সবাই বসেছে।
    মা আর উইলা সবার পেল্টে খাবার বেড়ে দিচ্ছে।
    তোমাকে কি সূপ দেবো আগে নাকি রুটি মাংসের তরকারী দেবো?-পলিনা মিকালভ কে বলল।
    আচ্ছা আমি নিচ্ছি।টেবিলে মদের ফোয়ারা উড়ছে।
    প্লেৎণেভ এর দরদ গান যেনো ইথারে ইথারে ভেসে যাচ্ছে কাজানকা নদীর ওপারে।
    বাবা আর দিমিত্রি হাতে হাতে তাল দিচ্ছে আর গলা ছেড়ে গান ধরেছে।
    মা আর ইরিনা বারান্দা সিঁড়িতে বসে কথা বলছে,মাঝের ঘরে পলিনা সালাদ সাজাচ্ছে।
    কেমন লাগছে আমাদের বাড়ী?
    এমন ভাবে বলছো যেনো আগে আসি নাই তোমাদের বাড়ি?
    না-তা ঠিক।
    কফি খাবা?
    হুম!এটা খাওয়া যায়-আচ্ছা আমি বানাচ্ছি পলিনা বলল।
    আরে না আমি বানাচ্ছি বলে রসুই ঘরের দিকে গেলো মিকালভ।

    কফির মগ নিয়ে পলিনাকে নিয়ে মিকালভ পেছনের বারান্দায়।
    হাল্কা বাতাস বইছে উত্তর দিক থেকে,দূর কাযান্সকা পাহাড় থেকে শীত এর চিঠি ডাকপিয়উন নিয়ে আসার সময় হয় যাচ্ছে।
    দেখেছো কি ঝকককে আকাশ,এতো তারা!!
    দারুন লাগছে,তোমার কেমন লাগছে মিকা?-আকাশের দিকে তাকিয়ে কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলল।
    খারাপ না।
    মানে? কি বল?
    আরে মজা করলাম তোমার সাথে।আমারো ভালো লাগছে।
    বাগানে হাটবা?
    না আজ থাক! এক কাজ করা যেতে পারে কাল ইস্কুলের পেছনের যব ক্ষেতে আমি যাবো।
    আমার দারুন লাগে,তুমি আসতে পারো।
    আচ্ছা আসবো।
    চল ঘরে যাই,ঝলসানো মাংসের গন্ধ আসছে।
    অনেক রাতে ভোজ পর্ব শেষ হয়েছে, বাবা অঘরে বারান্দার কার্পেট মোড়ানো চকিতে ঘুমাচ্ছে।
    মিকা আর পারছি নারে।
    কাল সকালে এগুলো পরিস্কার করা যাবে।
    শুয়ে পরো সোনা।আচ্ছা পলিনা মেয়েটা বেশ ভাল তাই নারে।
    আমাকে অনেক সাহায্য করেছে,রিহান পাতার সালাদটা সুন্দর মাখিয়েছে।
    হঠাৎ মা! একথা কেনো?
    না এমনি বললাম র কি।
    আচ্ছা যা!শুয়ে পর। শূভ রাত্রি।
    মা বারান্দায় গিয়ে বাবাকে আর জাগালো না।

    গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে পোড় খাওয়া বাদামী মোটা রেখার কপালে ছোট্ট চুমু দিয়ে মা ঘরে ঢুকে গেলো।
    বাইরে বাতাসে এক অদ্ভুদ শির শির করা একটা শব্দ হচ্ছে,বাগানের বড় গাছ শির শির করে কথা বলছে হেমন্তের বাতাসের সাথে।

    বাদামী সুটকেস আর যবের ছরা

    মিকালভ চারটা আপেল,কিছু বাদাম আর মাসীর দেওয়া এক কৌটো জ্যাম একটা কাপড়ের পুটলি বেধে নিলো সাবধানে।
    ভাগ্যিস মা সকালে বেরিয়ে গেছে,বাবা সামনের বারান্দায় একমনে ছুতরের কাজ করছে।
    কাজে না গেলে প্রায়ই মেদভেব কাঠের কাজ করে,আশপাশের সবারি নতুন বাড়ি কিংবা সারাই-এর জন্য মেদভেব এর ডাক পরে।বেশ বাড়তি রোজগার হয়।
    যেমন এখন কাজ করছে পলিনদের বাড়ীর জন্য।
    বাবা বের হলাম।
    দুপুরে খাবে না?
    না গো আজ ইশকুলের ওদিকে যাবো সবাই আসবে।
    আচ্ছা!এই শোন এই বিশ কোপেক নিয়ে যা রুটি-সসেজ কিনে খাস।
    বাবাতো এরকম করার কথা না, হঠাৎ!- মনে মনে বলল মিকা।
    বাবারা কি সব কিছু টের পায় ?

    ছোট কাজানকা নদীর পাশে ইস্কুল।
    এই কাজানকা গিয়ে মিশে গেছে ভলগার সাথে।
    হেমন্তের এই সময় ভাড়ারঘর সারা বছরের জন্য ফসল তুলে রাখার ধুম পড়ে যায়।
    ঝকঝকে আকাশ থাকে এই সময়টা।
    নীল এর উপর সাদা মেঘ গুলো ভেসে ভেসে আসে ঐ দূর সাইবেরিয়া থেকে।
    পাইনের বনগুলোতে দোলা দেয় আগাম হাড়ে সুই ফোটানো শীতের বার্তার।
    পাকা গম আর ভুট্টার ছরা গুলো আকাশের দিকে মুখ করে দোলা খায়।
    দারুন লাগে তখন মিকালভের।
    কেমন জানি শান্তি শান্তি চারদিক।
    ডেউ খেলানো যবের ক্ষেতের পাশে কয়েকটা উইলো গাছের সারী আছে,
    সেখানে দাড়ীয়ে আছে পলিনা আর অক্সানা।
    কাছাকাছি আসতেই গোলাপী ঠোটের উপর উইলোর পাতার ফাঁকে আসা নরম রোদের আলোখেলা।
    কি ব্যাপার!বাড়ি ছেড়ে এলে নাকি?
    কি আছে তোমার জাদুর বস্তায়?
    হোহো করে হেসে দিলো মিকালভ।
    আরে না!এই সামান্য দুপুরের কিছু খাবার এনেছিলাম আর কি।
    আচ্ছা দাও তোমার বস্তা।
    এমা! তুমি এত খাবার এনেছো?
    বাহ!তাহলে তো আজ দারুন পিকনিক হয়ে যাবে দেখছি- বলল অক্সানা।
    দূর মাঠে কৃষকরা যব কাটছে,মাঝে মাঝে বাতাস দুলিয়ে যায় যবের শিষ এর উপর।
    থেকে থেকে আনমোনা হয়ে যায় পলিনা।
    কোথায় যেনো চলে যায় তার নীল চোখ।
    দারুন জমে উঠেছে গপ্প।
    জানো মিকা একবার কি হয়েছে এক ছেলে আমাকে খুব সুন্দর একটা চিঠি দিয়েছিলো,একই চিঠি পলিনার কাছে এসেছিলো।বেচারা আসলে টোপ ফেলেছিলো দুজনের কাছে যেকোনো একজন গিললেই হলো।
    তুমি সেই ছেলে না তো আবার?
    হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লো অক্সানা আর পলিনা।
    মিকাও হেসে বলল-দূরভাগ্য যদি আমি সেই ছেলে হতাম?
    সবাই হাসতে লাগলো।
    চল এবার খাওয়া যাক!
    পলিনা লেমোনেড এর বোতল বের করলো।
    মিকা এই পনিরটা খাও এটা কারাল প্নির,রুটির সাথে ভালো লাগবে।
    কোথায় পেলে?মিকার প্রশ্ন।
    আমার এক খুড়তুতো ভাই মস্কো থাকে ঐ অনেকখানি এনেছে।
    তোমার ভালো লাগছে?মাছের গন্ধটা কিন্তু কম ভালোই লাগছে।
    বেশ মজা করে ভোজ পর্ব শেষ লেমোনেড এর কাচের বোতলে চুমুক দিতে দিতে মিকা বলল-অনেক খেয়ে ফেলেছি।
    ঘুম ঘুম লাগছে এখন।
    আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে উঠে দাড়ালো।
    দুই বান্ধবী আস্তে আস্তে জিনিস পত্র গোছাতে শুরু করছে।
    সূর্য হেলতে শুরু করে করছে পশ্চীমা সোনালি মিঠে রোদ যেনো পিছলে যাচ্ছে ওদের গাল বেয়ে,
    চল যাওয়া যাক।
    গ্রামের পথ ধরে হাটছে তারা।
    প্রথমেই পলিনদের বাড়ি পরে।
    ধন্যবাদ মিকা,জ্যামটা দারুণ মজার ছিলো।
    ওমা!অনেকখানী তো আছে তুমি নিয়ে নাও।
    আরে না!লাগবে না।
    আরে রাখো।
    অর্ধেক জ্যাম ভরা বোয়ামটা ঝুলি থেকে বের করে দিলো মিকা।
    আচ্ছা যাই।দেখা হবে।
    ঠিক আছে এই অক্সানা তুই কি এগুবি ?না ঘরে আসবি?
    না রে! কাজ আছে।যাই
    পাকা।
    সবাই বিদায় নিলো।
    মিকালভ যখন বাড়ির পথ ধরলো ততক্ষনে সূর্য পাটে গিয়েছে।
    কারখানার ছুটির সাইরেন বাজছে।
    পিলপিল করে বের হচ্ছে তেলেঝুলে মাখা মোটা বাহুর শ্রমিকরা।
    সুঁড়িখানার বারান্দায় কারখানা ফেরতা শ্রমিকরা চোখ ঘোলা করা শুরু করেছে।

    পলিনার ঘরে ছোট্ট একটা বাদামী চামড়ার সুটকেস আছে,যেটা তার আরেক জগত।
    কত না জিনিস থাকে এই বাক্সে।
    পুরনো লেস থেকে শুরু করে সোনালী শূকনো যবের ছরা।
    কিংবা অলেগ ভিডোগ এর সোনালী চুলের ভিউ কার্ড।
    আরোও কত কি।
    কিন্তু কেউ যেটা জানে না সেটা হচ্ছে এক খানা কবিতার খাতা।
    যেখানে মাঝে মাঝে তার অনেক কথা লিখে রাখে সে।
    হয়তো এলোমেলো,হয়তো খাপ ছাড়া।
    পরম যত্নে সিল্কের কাপড়ে মোড়ানো থাকে খাতা খানা।
    আজ অনেক দিন বাদে দূটো লাইন লেখা হয়েছে,

    পশমের মত নরম আকাশে হাজার তারার মেলা,
    জীবনের এই খেলাঘরে এ কেমন খেলা?

    প্রথম তুষার আর বাদামী চিঠি

    আজকাল প্রায়ই দেখা হয় মিকা আর পলিনার।
    মাঝে মাঝে তারা দিগন্তজোড়া মাঠে হারিয়ে যায়,কখনো কান পেতে শোনে টেলিগ্রামের তারের উপর চুপ চাপ বসে থাকা উত্তর থেকে আসা ডাহুকের গুম গুম শব্দ।
    হুস হুস করে উড়িয়ে দিয়ে তার পেছনে ছুটে চলা।
    বেস বিরক্ত হয় তখন ডাহুক কিংবা ঝিমানো সাইবেরিইয়ান চড়ই-এর ঝাঁক।
    কেনো বাপু আমাদের ভাত ঘুমটায় বাগড়া দিলে?-বলে উড়ে যায় দিগন্তের পানে।
    পাতা ঝরা শুরু হয়ে গেছে,ফসল উঠার পর ন্যাড়া বাদামী শুন্য মাঠ গুলো পড়ে আছে এখন।
    উইলোর পাতা আরোও পরে ঝড়া শুরু হয় এখন হলদে বাদামী হচ্ছে।
    খুব ধীরে ধীরে সাদা সফেদ কুয়াশা মাখা শীতের চাদর মুড়ে যাবে এই গ্রামটার উপর।
    শুধু কুয়াশা ভেদ করে দেখা যাবে পাথরের বাড়ী গুলো উপর ভেসে যাওয়া চুল্লীর ধোয়া।

    পলিনাদের বাড়িতে আজ মহা লঙ্কা কান্ড চলছে।
    পলিনার সথ মা নাতালিয়া খুব মেরেছে পলিনাকে আজ।আজকাল কোনো ভাবেই তাকে সহ্য হয় না।
    কুকুরের মত ব্যাবহার করে সে।কিন্তু চুপচাপ থেকে সহ্য করে এই নির্যাতন।
    তুমি ওকে ওর মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দাও,শুনেছিতো বেশ ভালো অবস্থা ওদের ভাগ্নীকে এক কোনায় রেখে দিলে কিছু কম হবে না।বাজখাইয়ী গলায় বলছে নাতা তার স্বামীকে।
    থাকুক না এই মা মরা মেয়েটা তোমার কি খুব খারাপ লাগে তাকে? কাতর করে বলল দিমিত্রি।
    না কোনো ভাবেই না।
    রাক্ষসী মেয়ে নিজের মাকে খেয়েছে এখন আমাকে খাচ্ছে।
    যখন কিছুই আর করা যাচ্ছে না তখন দিমিত্রি পলিনার মামাকে একটা চিঠি লিখে দিয়ে দিলেন।

    হপ্তাহ খানেক পরে আজ দুপুরে তার উত্তর আসলো উনি লিখেছেন-কিছুদিন এর মধ্যে এসে পলিনাকে নিয়ে যাবেন তার শহর ইউরস্লাভে।
    অদ্ভুদ! আজই শীতের প্রথম তুষার পড়লো আবার আজই আসলো বাদামী একখানা চিঠি।
    এই একখানা চিঠিই মুহূর্তের মাঝে সব কিছু পালটে দিল পলিনার জীবন।

    তিন চারদিন পরে একদিন বিকেলে পলিনা মিকালভের বাড়ীর পেছনে এসে দাড়ালো।
    বাড়ির পেছন দিকে গত রাতের হাল্কা তুষারে ভেজা হয়ে আছে ঘাস গুলো।
    বাগানের দরজা খোলাই ছিলো,খুব ধীরে ধীরে শিড়ি ভেঙ্গে বারান্দায় দাঁড়িয়ে টোকা দিলো সে।
    মিকালভ দরজা খুলেই চমকে উঠলো “তুমি?”
    ভেতরে আসো।
    কি করছিলা?
    আরে ওরকম কিছু না।
    কফি খাও ভালো লাগবে।
    ঘরটা বেশ গরম লাগছে।চুপচাপ কাঠের চেয়ার টেনে নিয়ে বসলো।
    মিকা এটা তোমার জন্য।
    কি এটা?ওমা এটা তো একটা সুটকেস।
    কি আছে এতে?
    যাই থাকুক! তুমি এটা এখন খুলবে না, আমি ইউরস্লাভে চলে যাবার পর খুলবে।
    আচ্ছা তা না হয় খুলবো।কাদছো কেনো?
    না এমনি চোখে জল চলে আসছে,হয়তো তোমার সাথে আর দেখা হবে না।
    মিকালভ বলল-আরে হবে হবে।তুমি মাঝে মাঝে আসবে,আমি বড় হয়ে তোমার শহরে যাবো।
    আমাকে চিঠি লিখবে আমিও বড়দিনে তোমাকে কার্ড পাঠাবো।

    ঝিম ধরে বসে থাকা থেকে উঠে পড়লো পলিনা।
    আসি।ভালো থেকো।
    দরজার কাছাকাছি আসতেই মিকালভ তাকে জড়িয়ে ধরলো।
    দুটো ঠোঁট কাছাকাছি এখন।
    উষ্ণ গরম নিঃশাস লাগছে।চারটি চোখ থেকে শুধু গড়িয়ে পড়ছে নোনা জল।
    মিকালভের মনে হলো এক বিশাল নীল সমুদ্রের মাঝে ডুবে যাচ্ছে।
    মাঝে মাঝে কেপে উঠছে পলিনা।
    তখন তাকে আরো শক্ত করে ধরে রাখছে মিকালভ।
    ঈশ্বরের দোহাই কেদোনা।
    তখনোও হয়তো ঝিম ধরা সাইবেরিয়ান ডাহুক আলসে করে ডেকে উঠে ছিলো।

    আবারো বরফে ঢেকে গেছে,ঐ বাদামী চামড়ার সুটকেসে মাঝে মাঝে ধুলো পড়ে।
    সুটকেসের চামড়ার যেমন মাঝে মাঝে কুঁকড়ে তার বয়স জানাচ্ছে ঠিক তার মত করে সেও বড় হয়ে যাচ্ছে।
    পরম আদরে ধুলো ঝেড়ে রাখে মিকালভ সারগেই।
    মাঝে মাঝে ঐ ছোট কবিতার খাতা ওল্টায় সে।
    সুটকেসে কাচের বোয়ামে কয়েকটা যবের ছরা আর দুটো মাতুরস্কা থাকে মাঝে মাঝে কথা বলে সে।
    আবারোও সাইবেরিয়ান ডাহুক ডাকে হেমন্তের মাঠে।
    উইলোর পাতার ফাঁকে হলদে গিরগিটী পালিয়ে যায়।
    হেমন্ত আসে আবার চলে যায়,উইলো গাছের বাকলের মত করে সবাই বুড়ো হয়ে যায়।
    কেউ অপেক্ষা করে এমন একটা হেমন্তের যেবার সব কিছু অন্য রকম হবে।
    সেই হেমন্ত কি আর আসবে?

    2
    4 Comments
    • আমার সুটকেসটায় লুকিয়ে আছে দুনিয়াদারি।

    • অনুবাদ গল্প মনে হল! বেশ ভালো লাগলো পড়ে! আরো গল্প হোক!

      • ধন্যবাদ।আমি অনেক দিন ধরে রাশিয়া ছিলাম।আমার লেখার মাঝে রুশ ব্যাপার চলে আসে।

      • ধন্যবাদ। গল্পে বিদেশী ভাবটা কিন্তু গল্পটাকে আরো বেশী ইন্টারেস্টিং করে তুলেছে। লিখে যান, শুভ কামনা রইল!

Friends

Skip to toolbar