Profile Photo

ShrabonOffline

  • Shrabon
  • Profile picture of Shrabon

    Shrabon

    3 years, 10 months ago

    রাত ১টা ৪৭,
    নীলিমার ব্লাঊজের সবগুলো বোতাম খোলা । গভীর রাতের আমন্ত্রনের আভাস চোখে মুখে । কিন্তু সৌরভের অনিচ্ছায় আজ আর আদিম খেলায় মেতে উঠলো না কেউ। সৌরভের পাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়লো নীলিমা। আজ সারাদিনের উটকো ঝামেলায় অফিস যাওয়া হলো না সৌরভের, তবে কপালে চিন্তার ভাজ গাঢ় হয় নি।
    -‘মেয়েটা এভাবে আত্মহত্যা না করলেও পারতো। কোনো স্ত্রী এরকম বৈবাহিক কোন্দল সহ্য না করতে পেরে মরে যাবে, আর স্বামীগুলো আবার নতুন মেয়ে ধরে আনবে ভাবতেই ঘৃণা হয়।‘
    নীলিমার কথায় খানিকটা ভুরু কুচকালো সৌরভ। কিন্তু একটু ক্লান্তির ছাপ চোখের তলায়। আজ ভোর ছটায় সৌরভদের পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা মিসেস নিশাত তাহসিন আত্মহত্যা করেছেন। সারাদিন পুলিশি জেরায় অনেক ধকল গিয়েছে তার উপর। এতক্ষণ উপড় হয়ে শুয়েছিলো সৌরভ। কাত হয়ে নীলিমার মুখোমুখী হয়ে শুলো। সৌরভের নিঃশ্বাস নীলিমার নাকে এসে আচড়ে পড়ছে। ভুরু কুচকালেও মুখে একটু কৌতুকের হাসি এনে বললো,
    – ‘তিনি এডাল্ট মানুষ। আত্মহত্যা করাটা ওনার পারসোনাল ম্যাটার। তবে আত্মহত্যা করাটাও একটা আর্ট , ক্রাইম অব প্যাশান। সবাই সেটা পারফেক্টলি করতে পারেনা। ডাক্তার হয়েও ঘুমের ঔষধের স্টক থাকতে ইলেকট্রিক শকের এমন চমৎকার ব্যবহার, তাও নিজের শরীরের ওপর! মারভেলাস। আমি থ্রিলার লেখক হলে বোধ হয় গল্পটা লুফে নিতাম। নাম দিতাম “আত্মঘাতী আর্ট”। হা, হা, হা………’
    -‘তোমার একটুও দয়া মায়া নেই ? একটা মেয়ে মরে গেলো, আর তুমি সেটা নিয়ে ঠাট্টা করছো। ছী!’
    -‘ঠাট্টা করাই দরকার। ওনার ইহককালও গেলো, পরকালও গেলো। থাক সারাদিন এই বিষয়টা নিয়ে অনেক জবানবন্দী দিয়েছি। আর দেবার ইচ্ছে নেই। ‘
    দুজনের কেউই কিছুক্ষন কোনো কথা বললো না। হয়তো থম্থমে পরিবেশ এড়ানোর জন্যই নীলিমা সৌরভের চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে একটা উদ্ভট কিন্তু প্রখর প্রশ্ন ছুড়ে দিলো,
    -‘আচ্ছা শুনো,আমাদের বিয়ের আগে তোমার জীবনে কেও এসেছিলো ? আই মিন কারো সাথে তোমার সম্পর্ক ছিলো?’
    – থাকবেনা কেনো? আমার বাবা , মা , বোন সবার সাথেই সম্পর্ক ছিলো। এখনো তো বেশ আছে।
    -তুমি আবার ঠাট্টা করছো। আমি বলতে চাইছি কোনো প্রেমিকা ছিলো?
    সৌরভ খানিক উদ্ভ্রান্তের মত হাসলো।
    -ইদানিং আমার ওপর তোমার বোধ হয় সন্দেহ জন্মেছে। সন্দেহ জাগাটা ভালো ব্যাপার। আমি জীবনে একজনকেই মন সপে দিয়েছি । তবে আমার মনটা ফরমালিনে ডোবানো। এতে পচঁন ধরে না। আর ফরমালিন মেশানো খাবারের স্বাদ যেমন বিচ্ছিরি আমার রোমান্টিসিজমও ঠিক ততোটাই নিম্নমাত্রার। তোমার প্রতি ভালোবাসাটাও প্রাণ খুলে প্রকাশ করতে পারিনা। তাই আমাকে তুমি বরাবরই সন্দেহ করো।
    -না না, আমি তেমন কিছু বলতে চাই নি। খানিক কৌতুহলের বসে প্রশ্নটা করে ফেললাম।
    -তবে নীলিমা, সত্যি কথা বলতে বিয়ের আগে কোনো সম্পর্কে না জড়ালেও বিয়ের পর আমাকে একজন সম্পর্কে জড়াতে চেয়েছিলো।
    নীলিমা সৌরভের চুলে বিলিকাটা থামিয়ে দিলো । তার চোখ বিস্ফোরিত। বহ্নিশিখার মতো দপ করে জ্বলে উঠলেও গলার স্বর ঠান্ডা রেখেই বলল,
    -তুমি আবার ঠাট্টা করছো, তাই না?
    -মোটেও না। কিছু কিছু সময় আমি খুব সিরিয়াস হয়ে যাই, এখন আমি পুরোপুরী সিরিয়াস। আমি তোমার সামনে বাদে বাহিরে বরাবরই সিরিয়াস। আমার এই মুডি স্বভাবটা দেখেই তুমি আমায় পছন্দ করেছিলে। কিন্তু বিয়ের পর তোমার কাছে আমি অনেক খোলামেলা হয়ে গেছি। আমার এই সিরিয়াস এবং অনাড়ম্বর স্বভাবের জন্যই অনেক মেয়ের চোখ পড়েছে আমার উপর। ঐ যে বললাম আমার হৃদয় ফরমালিনে ডোবানো পচঁন ধরেনি। তাই তুমি বাদে কোনো মেয়ের দিকে তাকানোই হলো না।
    কিন্তু এক কার্ডিওলজিস্ট তরুনী আমার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলো। সূক্ষ প্রেম। তুমি কখনো খেয়াল কর নি, সে আমার জন্য প্রায় প্রতদিন পার্কিং লটে অপেক্ষা করতো। শুধু আমার সাথে কিছু সময় কাটাবে বলে। আমার কাছে এসে আমাকেই ভিক্ষে চাইতো। তোমাকে ব্যাপারটা বলবো ভেবেছিলাম কিন্তু তার আগে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, এই উচ্ছন্নে যাবার প্রেমের একটা দফারফা করে নেই তারপর তোমাকে জানাবো। কিন্তু মাঝখানে অনেক দিন তার দেখা পেলাম না। আমিও যেনো হাফ ছেড়ে বাচঁলাম, যাক এতোদিনে বোধহয় ডাক্তারনীর ঘাড় থেকে এই অবান্তর প্রেমের ভূত নেমেছে।
    না ভূত নামেনি। ভূতটা আরোও ভালোভাবে জেকে বসেছিলো। তার সাথে শেষ দেখা হবার কিছু দিন পরেই আমার মেইল একাউন্টে একটা মেইল আসে। প্রথমে ভেবেছিলাম জাঙ্ক মেইল। কিন্তু মেইল বক্স খুলতেই দেখলাম দীর্ঘ ঝকঝকে বাংলা টাইপ করা লেখা। বুঝতে অসবিধা রইলো না কে মেইল পাঠিয়েছে। কিন্তু আমার মেইল আইডি কোত্থেকে যোগাড় করলো সেটাও একটা রহস্য। ইচ্ছে হলে তুমিও মেইলটা পড়ে দেখতে পারো।
    কথাটা বলেই মেইলটা খুলে নিজের ফোন নীলিমার হাতে তুলে দিলো সৌরভ। এতোক্ষণ যেনো নীলিমা স্বপ্নের রাজ্যে হাবুডুবো খচ্ছিলো, এতকিছু হয়ে গেলো সে কিচ্ছুটি টের পায়নি? তাদের সম্পর্ক এতোটাই ঠুনকো! কিন্তু তার আবেগ তাড়িত মন সচকিত হতেই সে এক ঝটকায় ফোনটা কেড়ে মেইলটি পড়া শুরু করলো।
    “সৌরভ,
    একসময় মনে হতো রাস্তায় হাটঁতে হাটঁতে হঠাৎ যেনো রাস্তাটা ফুড়িয়ে গেছে। এই রাস্তার শেষ প্রান্তে দাড়িয়ে আমি। একজন বন্ধুর খুব দরকার ছিলো, তাই বিয়ে করেছিলাম। তবে বিয়েটা করেছিলাম সমাজের চোখে শারীরিক মিলনের একটা লিগ্যাল সার্টিফিকেট ইস্যু করবার জন্য। আমি ভাবতাম শরীর পুরোনো হয়ে গেলেও ভালোবাসা একই থাকে। আমার স্বামীর কাছে আমার শরীর যত পুরোনো হচ্ছিলো, ওর চোখের ভালোবাসা তত কমছিলো। খুব সূক্ষ ধাক্কা খাচ্ছিলাম জীবনে, প্রতিক্ষণে।
    কিন্তু ভাগ্যক্রমে দেখা হলো আপনার সাথে, মনে একটা চাঞ্চল্য বয়ে গেলো। এমন সপ্রতিভ ,ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন পুরুষ জীবনে দেখেছি কিনা মনে করতে পারিনা। কিন্তু কি করবো আপনিও বিবাহিত , আর আমিও ভুল করে বিবাহিত। শুধু শরীরকেই চেনার তাগিদে বিয়ে করেছিলাম , মন চিনে উঠতে পারিনি।
    আমি মন চিনে উঠতে পেরেছিলাম আপনাদের দেখে। হ্যাঁ, আপনাকে আর নীলিমাকে দেখে। কতবার আকৃষ্ট করতে চাইলাম আপনাকে , কিন্তু প্রতিবারই আমি ব্যর্থ আর আহত হয়ে ফিরে এসেছি। আপনাদের সম্পর্কটা আসলেই সুন্দর।
    সৌন্দর্য্য ব্যাপারটা অনেক্টা ভবঘুরের মত।
    উদ্ভ্রাতের মত খুজঁলে,
    খঁজে তাকে পাওয়া দায়।
    তবে সুন্দরকে বারবার দেখতে হয় না,
    তাহলে সেটা পুরোনো হয়ে যায়।
    চারটে লাইনের ছন্দ জুড়ে দিলাম। তবে,আমি আর আপনাকে দেখবো না। বারবার দেখলে আপনি পুরনো হয়ে যাবেন আমার মনে। ডাক্তারী জীবনে ডাকসাইটে সুন্দরী হিসেবে আমার অনেক জনপ্রিয়তা ছিলো, এমনকি এখনও আছে। আসলে পুরূষ জাতি চোখ দিয়ে আমায় গিলে খায়। কিন্তু আপনি ব্যাতিক্রম। আপনি নীলিমার কাছেই আটকে আছেন। এভাবেই থাকুন। আর যাই হোক নীলিমাকে আপনি কখনো ঠকাতে পারবেন না, এটাই আপ্নার চূড়ান্ত ব্যাক্তিত্ব। জীবনে এখনো অনেক নাটকীয়তা বাকি তবে আর নাটকীয়তা দেখবার ইচ্ছে নেই। পারলে আমায় ক্ষমা করে দেবেন। ‘শেষের কবিতা’র শেষ কটা লাইন বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে। লিখে দিলাম,
    যে আমারে দেখিবারে পায় অসীম ক্ষমায়
    ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি
    এবার পু্জোঁয় তারে আপনারে দিতে চাই বলি
    ইতি,
    নিশাত তাহসিন।“
    মেইলটি পড়ে নীলিমা সৌরভের দিকে বিদ্ধস্ত চোখে তাকালো যেনো তার উপর দিয়ে একটা টর্নেডো বয়ে গেছে। ভাঙা ভাঙা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
    “এ কোন নিশাত তাহসিন? আর আমাকে চেনেইবা কি করে?”
    সৌরভ উদ্ভ্রান্তের মত হাসল । সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বলল,
    “ তিনি ,যিনি আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে আজ আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যাটা বোধ হয় আমার জন্যই করেছেন। কিন্তু চিন্তা করিস না আমি কখনো তোকে ছেড়ে যাবো না।
    নীলিমার মনে পড়ে গেলো সৌরভ কলেজ লাইফে নীলিমাকে তুই তুই করে সম্বোধোন করতো। এখনো মাঝে মাঝেই করে ।
    ওরা একে অপরের মন চিনতে পেরেছিলো, শরীর নয়। এ ভালোবাসা ফরমালিনে ডোবানো , পঁচে যাবে না।

    গল্পঃ ফরমালিন ভালোবাসা

    5
    4 Comments
Skip to toolbar