-
(বসন্তের রং)
লেখকঃ এনাম আহমেদ পূষন” ময়না ”
“বলো”
“তুমি কি জাদু জানো?”
“নাহ, আমি জাদু জানবো কেমন করে? হঠাৎ এই কথা বললে?”
“তাহলে তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারি না কেনো? যতক্ষন বাড়িতে থাকি ততক্ষণই বুকটা কেমন যেন করে। কবে যে বিয়ে করবো তোমাকে, তোমার সাথে সারাদিন সারাজীবন একসাথে কাটিয়ে দেবো এভাবে তোমার কোলে মাথা দিয়ে। ”
“হবে হবে। একদিন হবে।”
“ময়না”
“হুম বলো”
” বসন্তকাল এতো সুন্দর কিন্তু আসে সেই এক বছর পর পর। শুনেছি বসন্তের জন্য এক বছর অপেক্ষা করা লাগে এ জন্যই বসন্তকে এতটা সুন্দর লাগে। প্রতি বছর নতুন নতুন রং নিয়ে আসে। কিন্তু তুমি তো প্রতিদিনই আসো। তারপরও তোমার রং কখনো পুরোনো হয় না। তোমার সৌন্দর্যের যেন শেষ নেই”
“ধুর। তুমি একটা পাগল।”
“পাগল তো থাকবোই”
” এই শুনো না।”
“বলো”
“মৌসুমির জন্মদিন কালকে। ওর জন্মদিনে যাবো। কিন্তু আমার কাছে না একটা টাকাও নেই। সেদিক সেলিম চাচার দোকানে লাল কাচের নকশি করা চুরি দেখলাম আর মনির ভাইয়ের দোকানে লাল শাড়ি। ওর জন্মদিনে সবাই নাকি সেজেগুজে আসবে। আমিও যাবো কিন্তু বাবা একটা টাকাও দিতে চায় না। কি যে করি”
” সেদিন যে জামাটা কিনে দিয়েছিলাম। সবুজ থ্রি পিচ। খুব সুন্দর লাগছিলো তোমাকে। সেটা পড়ে যাও। ”
” না। ওরকম একটা থ্রি পিচ ছনিয়া পড়ে। ওটা আমি পড়বো না”
“আচ্ছা কাল কিনে দি?”
“কালই তো ওর জন্মদিন ”
“আচ্ছা দেখি। বন্ধু কাশেমের কাছে কিছু টাকা পাওনা আছে। ওইটা দিয়ে কিনে দিবোনে,খুশিতো এবার?”
” তুমি দুনিয়ার সবচেয়ে ভালো মানুষ”
” একটা চুমু দেও।”জীবনটা খুব ভালো চলতেছে। কোনো দিকে অভাব নেই। ময়নাকে পাশে পেয়েছি। এটাই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। ময়না আমাদের গ্রামের সবথেকে সুন্দরী মেয়ে। হালকা পাতলা গড়নের শরীর। লম্বা কাজলকালো চুল। খুব ঘন চুল ওর একেবারপ হাটু বরাবর ঝুলে থাকে। চুল খুলে যখন দিঘির পাড়ে হাটে তখন মনে হয় যেন পুরো দিঘির জলে ঢেউ লেগে যায়। হয়তো দিঘির জল ওর চুলের মায়ায় পড়ে যায়। ময়নাকে সবথেকে বেশি সুন্দর লাগে শাড়ি পড়লে। ওর কোমড় একবারে ধনুকের মতে বাকানো। চুলে খোপা বেধে শাড়ির পাড়টা কোমরের সাথে বেধে পানির কলসি নিয়ে যাবার সময় ওকে যে কতো সুন্দর লাগে তা কেউ না দেখলে বিশ্বাস করবে না। উঠোনে যখন ওড়নাটা কোমরে বেধে দড়িলাফ দেয় তখন এলাকায় বুড়োরা যেন যৌবনে ফিরে যায় ওর বুকের দোল দেখে। তখন মনে হয় যেন বুড়ো গুলোকে একেবারে গ্রামের বাইরে ফেলে দিয়ে আসতে পারতাম। মাঝে মাঝে বলি ওমন করে বারান্দায় দড়িলাফ দিও না। তা সে শুনতেই চায় না। তবু সমস্যা নেই। গ্রামে প্রতিপত্তি আমার অনেক। বাবা গ্রামে ব্যবসা করে। আমি কিছু ছেলেপান রাখি সাথে। ওরা সারাদিনই আমার থাকে থাকে। গ্রামের কেউ ময়নার দিকে তাকালেও গ্রামছারা করি। ভয়ে কেউ ময়নার দিকে তাকাতে সাহস পায় না৷
ময়না যা চায় তাই ওরে দেই আমি৷ আব্বার ক্যাশবাকসো থেকে টাকা দিয়ে। আব্বা একটু হিসেবি। টাকা নিলে খুব রাগারাগি করে। আজ যদি আম্মা বেচে থাকতেন তাহলে আব্বা টাকা নিয়ে মাতব্বরি দেখাতে পারতো না। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। ময়নার যা লাগে তা আমি যেমনই হোক দি। মাঝে মাঝে ধার নেই। কিন্তু তা আবার ফেরতও দিয়ে দি। আব্বারে বলছিলাম যে আমারে একটা ব্যবসা দিয়ে দিতে। ব্যবসাটা নিয়েই ময়নারে বিয়া করতাম। কিন্তু তা আব্বা আমারে ব্যবসার টাকা দেয় না৷ বলে তোর মতোন অপদার্থ ব্যবসা করতে পারবে না। আমি কোন দিক দিয়া অপদার্থ? আমি কি ব্যবসা করতে পারি না। থাক সেসব কথা। এগুলো নিয়ে মাথাব্যথা নেই বেশি। যা আছে তা নিয়েই সুখে আছি।” একটা কথা বলবো?”
“একটা কেন হাজারটা বলো”
” আগে বলো রাখবা তো?”
” কোন কথাটা রাখিনি?”
“অমন করে বলছো কেন? আমি কি সবসময়ই এটা ওটা চাই নাকি তোমার কাছে? ”
“আরে না না৷ আমি তো নিজে নিজেই দেই তোমাকে। তুমি শুধু মুখে একবার বলবে আর আমি তোমার সামনে হাজির করবো সবকিছু ”
” তাহলে শুনো না, চলো না আমরা একটু কক্সবাজার যাই। আমি কোনো দিন সাগর দেখি নি। খুব ইচ্ছে করে। ”
” কিহ? কক্সবাজার? এতো অনেক দূর। এখানে যেতে তো অনেক খরচ। আর তোমাকে তোমার আব্বা যেতে দিবে?”
” দিবে না কেনো? আমি কি ছোট খুকি নাকি?”
“যাক আমার আজ ময়না বড় হয়ে গেছে। ”
“একটুও মজা করবা না”
” আচ্ছা বাবা আচ্ছা, আমি ব্যবস্থা করতেছি। কবে যাবা?”
” সামনের সপ্তাহে? ”
” আচ্ছা ঠিক আছে”আব্বার কাছে টাকা চেয়ে লাভ নেই। এতো টাকা সে দিবেনা। কদিন পর ক্যাশ বাক্স খুলে দেখলাম ৫০ হাজার টাকার বেশি আছে। আমি পুরো টাকাটা নিয়ে ময়নাকে নিয়ে কক্সবাজার চলে গেলাম। পুরো সাতদিন থেকেছি। এক রুমে এক খাটে। স্বপ্নের মতো ছিলো একটা সপ্তাহ। কিন্তু এই স্বপ্ন বেশিদিন রইলো না। এক সপ্তাহ পর বাড়ি এসে দেখলাম বাবা মারা গেছে। খোজ নিয়ে জানতে পারলাম ওই ৫০ হাজার টাকা যা নিয়ে আমি ফুর্তি করে এসেছি ওই টাকা ব্যাংকের ঋণ ছিলো। টাকা ফেরত না দেওয়ায় ব্যাংক তার দোকান ও শাস্তিস্বরূপ আমাদের বাড়িটাও নিয়ে গেছে। তারপরই আব্বা স্ট্রোক করে মারা যায়৷ পুরো আকাশটা যেন মাথায় ভেঙে পড়লো। কি করবো এখন? কোথায় থাকবো? কি করবো? কিছুই মাথায় আসছিলো না। একেবারে শেষ হয়ে গেলাম। কোনো আত্মিয় সাহায্য করলো না। কারো কাছে ঠাই পেলাম না। আব্বা মারা যাওয়ার পাচ দিনের মাথায় শুনলাম ময়না সুরেশের সাথে বিয়ে বসছে। নিজের ইচ্ছেতেই বিয়ে করলো সুরেশরে। পায়ের নিচে মাটি সরে গেলো। চোখের দৃস্টি যেন সেদিন শুধু দিঘির জলের দিকেই থাকলো। একটা চিঠি লিখলাম ময়নাকে। চিঠির জবাবে আমার প্রাপ্য কথাটুকু সুন্দরভাবে লেখা ছিলো-
“রহিম,
আমি এখন বিবাহিত। এখন থেকে তুমি আমাকে চিঠি পাঠাবে না। আমি নিক ইচ্ছেতেই বিয়ে করেছি। তোমার সাথে থেকে আমি আমার জীবন নস্ট করতে রাজি না। আমি জানি তুমি এখন সবদিক থেকে নিঃস্ব। কিছুই নেই তোমার আর। তুমি কীভাবে আমাকে বিয়ে করবে? কোথায় রাখবে? কি খাওয়াতে পারবে? আমি তাই সুরেশের সাথে বিয়ে করেছি। ওর মামা বিদেশে থাকে আমাদের নাকি সামনের বছর বিদেশ নিয়ে যাবে। আজ আমাদের এই শেষ কথা হলো। ভালো থেকো। আর আমাকে ভুলে যাও।”চিঠিটা আজও আমি রেখে দিয়েছি। আমি যা করেছি তার শাস্তি আমি আজ রোজ ভোগ করি। ঢাকায় রিকশা চালাই। আরো ৫ বছর আগে যে চৈত্রে গাছের ছায়া ময়নার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকতাম আর সেই চৈত্রেই ঢাকার রাস্তায় কড়া রোদে রিকশা চালাই। এই পাচ বছর বসন্তের নতুন রং দেখতে পাইনি। শুধু দেখেছি রিকশার হুডের রং পাল্টাতে। কখনো লাল কখনো নীল। যেসময় যেটা ভাড়ায় পাই। মানুষ চিরকাল সুখ পায় না। একটা সময় ঠিকই সুখ থাকে বুক ভরা। সেই সুখ হাওয়াই মিঠাইয়ের মতোন উড়ে যেতে একটুও সময় নেয় না৷
রিকশা চালাই এয়ারপোর্টের এলাকায়। আমার পিছনে ময়না বসা। তার কোলে একটা মেয়ে। নাম মনে হয় শিশির। একেবারে ময়নার মতো দেখতে। পাশে সুরেশ। কত গল্প শুনলাম এয়ারপোর্ট থেকে মিরপুর যেতে যেতে। সব কথা মনে নেই কিন্তু একটা কথা ভুলিনি– শিশির জানো। এদেশে বসন্ত প্রতিবছর রং পাল্টায়। নতুন নতুন রং।
©এনাম আহমেদ পূষন
2 Comments
Friends
RahamatAli
@rahamatali
Arif-Ahmed
@arif-ahmed
শফিকুল মুহাম্মদ ইসলাম
@shafiqul22
Kibria jahan anaana
@ananna
Mumtahina Chowdhury
@mumtahinachowdhurytahigmail-com
Sahat-M.-Samrat
@sahat-m-samrat
অপরিচিতা আমি
@opo-ri-001
অপরিচিতা আমি
@opo-ri-1001
আওসাফ সাদিক
@awsaaf-sadik


সব শীতের শেষে বসন্ত আসেনা! শুভেচ্ছা নেবেন গল্পকার সুন্দর গল্পটির জন্য!