Profile Photo

সুমাইয়া বিনতে করিমOffline

  • Sumaiya03
  • সে
    ছাব্বিশ তলা উঁচু দালানের ওপর ঠিক আকাশের কাছাকাছি একটি কফিশপ। মাঝারি টেবিলের তিনটি চেয়ারে, দুইজন ছেলে, একজন মেয়ে! টুংটাং চামচ এর শব্দ, কফি কাপে ছোট চুমুক। বাইরে তুমুল বৃষ্টি! সন্ধ্যার এরকম একটা সময়ে কফি কাপে চুমুক দিতে দিতে হয়তো কিছুটা চোখাচোখি! তুমুল আড্ডা! হঠাৎ একটু থমকে যাওয়া!
    কফি শপের ঠিক বাইরে বারান্দায়, অন্ধকারে, সাদা চেয়ারে গা ডুবিয়ে বসে আছে কেউ! এই বৃষ্টিতে কেউ এভাবে বসে থাকে? ভিজে যাচ্ছে না? শপের ভেতরে থাকা মেয়েটা কফিতে চুমুক দিতে গিয়ে হঠাৎ চমকায়, কফি ছলকে পড়ে এক-দু ফোটা!বাইরে বিজলি চমকানোর আলোয় আরোও ভালো করে দেখে নিতে চায় বসে থাকা কাউকে! আসলেই কি কেউ আছে?
    মেয়েটার ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখ কিংবা বার বার বাইরে তাকানো খেয়াল করে বিপরীত পাশে বসে থাকা মানুষটি! “কি ব্যাপার, বাইরে কি?”
    “হুম! না কেউ না!”
    ” তাহলে বাইরে তাকাও কেন বার বার, খাও!”
    “হ্যা, খাচ্ছি!” বলেই আবার বাইরে তাকায় মেয়েটি! বিকট শব্দে বাজ পড়ে, আলোয় ভরে যায় চারপাশ! আসলেই চেয়ারে কেউ আছে! আস্তে আস্তে উঠেও দাঁড়িয়েছে। পরনের সালোয়ার-কামিজের রঙ কি আবছা নীল? বিজলি চমকানোর সাদা আলো আর ঝুম বৃষ্টির নিকষ আঁধার যেন আরও অস্বস্তি বাড়ায় মেয়েটার মনে। ও আসলেই দেখছে ওখানে কেউ আছে! বাতাসে চুল উড়ছে তার, ঠিক রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি যেন পাখির পালকে ভর করে উড়ে যেতে চায়!
    “ এই, আবার কি দেখো? কি ওখানে?”
    “আচ্ছা দেখো তো ওখানে, বাইরে কি কেউ আছে? রেলিং এর ধার দিয়ে দাঁড়ানো!”
    “কই, কোথায়? এই বৃষ্টিতে কে থাকবে ওখানে?” নিজেও ঘাড় ঘুরিয়ে ইতিউতি তাকায় ছেলেটি, কিন্তু কাউকে দেখেনা। তখন অন্য চেয়ারে বসে থাকা বন্ধুটি নড়েচড়ে ওঠে, চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়।
    “ তুই কই যাস?”
    ‘দাড়া, আমি একটা সিগারেট ফুঁকে আসি, চট করে দেখেও আসি, ও কাকে দেখছে। ঝুম বৃষ্টিতে কি কারোও থাকার কথা? ভুলভাল দেখছে, আলবাত!”
    ততক্ষণে মেয়েটি সচকিত, কই না তো! ও এখনো দেখছে মেয়েটাকে! চোখের ভুল? আসলেই? তাই বলে এতক্ষণ ধরে! অসম্ভব, হতেই পারে না। সিগারেট খেতে চাওয়া বন্ধুটি ছাতা হাতে বাইরের দিকে পা বাড়ায়। মেয়েটি একবার ভাবে আটকাবে, কিন্তু কি ভেবে আটকায় না। হতে পারে ওর মন নিশ্চিত হতে চায় যে ও ভুল দেখে নি। চার জোড়া চোখ ছাতে হাতে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে থাকে অস্বস্তি আর কিছুটা ভয় নিয়ে। ছেলেটি আরাম করে সিগারেট ধরায়, আয়েশ করে তাতে টান দেয়, আস্তে আস্তে সেটাও শেষ করে। কিন্তু সে জায়গার দিকে যায় না যেখানে হয়তো কেউ দাঁড়িয়ে আছে! সিগারেট শেষ হয়ে এলে পাড়ার রোমিওদের মতো একটা হাসি দিয়ে বন্ধুদের দিকে তাকায় ছেলেটি। ভাবটা এমন, “আরে ভাই দাঁড়া না, যাচ্ছি তো, কিছু যে নাই সেটা এখুনি দেখিয়ে দেই!”
    এরপর আস্তে আস্তে ছেলেটি তো এগিয়ে যায়, এদিকে কফিশপের ভেতরে বসে থাকা দুজনের অস্থিরতা দেখা যায় না চোখে। একজন তো দেখছে না কিছুই কিন্তু অস্বস্তিতে ভুগছে বিপরীত পাশের জনকে নিয়ে! আর অন্যজন দেখছে, স্পষ্ট চোখে দেখছে, সেই নীকষ আঁধারে ছোট চুলের মেয়েটি ঘুরে তাকিয়েছে ঠিক যেন তার দিকেই। চোখে খুনে দৃষ্টি, মুখের মুচকি হাসিতে আশ্চর্য শীতলতা! ছেলেটি ততক্ষণে পৌছে গিয়েছে ওখানে। একদম কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে মেয়েটির! ধীরে ধীরে ব্যবধান কমছে ওদের দুজনের। ঠিক তখনই আলতো করে ছেলেটির ঘাড়ে হাত দেয় মেয়েটি। অথচ ছেলেটি সে সময় ভেতরে বসে থাকা দুই বন্ধুর দিকে তাকিয়ে আত্মবিশ্বাসের হাসি হাসছিলো, কারণ সে তো কাউকে দেখেই নি!
    কিছুক্ষণ পর আচমকাই, একটি তরতাজা সুঠাম দেহের অধিকারী অল্প বয়েসী ছেলেকে ছাব্বিশ তলা থেকে পাখির পালকের মতো ভেসে ভেসে নিচে নামতে দেখা গেলো! একবারে নিচে যখন সে নামলো, তার আশেপাশে তখন লাল রঙের বন্যা, যেন শিল্পীর শেষ আঁচড়! তার বন্ধুরা যখন সেই উঁচু দালানের রেলিং থেকে আতংক আর ভয় নিয়ে এই নিথর হয়ে যাওয়া দেহের দিকে তাকিয়ে ছিল, পাশে একদম পাশেই সে ছিলো!
    ঝুম বৃষ্টিতেও যার ছোট চুল উড়ছিলো বাতাসে, যার খুনে দৃষ্টি কফিতে চুমুক দিয়ে হাসতে থাকা মেয়েটি ছাড়া আর কেউ দেখেনি!
    © সুমাইয়া
    ০১.০৭.২০২১!

    9
    8 Comments
Skip to toolbar