Profile Photo

Md Joynul AbedhinOffline

  • J.A.Sagor
  • Profile picture of Md Joynul Abedhin

    Md Joynul Abedhin

    3 years, 4 months ago

    গল্প(ডার্ক থিম)- বাশপাতার নৌকা
    ছুড়িটা সবজি কাটার। দুপুরের রোদে বেশ চক চক করছে। লতিফ তাকিয়ে আছে। ছোট একটা ছুড়ি খুব সহজেই তার সব যন্ত্রনার অবসান করতে পারে। বাহ, কি দারুন ক্ষমতা।
    নিজের গাড়ি হাঁকিয়ে ঢাকা থেকে বেশ দূরের এক নিভৃত পল্লীর এক পুকুর ঘেষা জংলার পাশে লতিফ নিজের জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত নিয়ে চিন্তাভাবনার শেষ প্রান্তে। কিছু দূরে গ্রাম আর জংলার এক ধারে হাইওয়ে। লতিফ কদিন আগে এই স্থান দেখে গেছে। সেবার মন এত অনিয়ন্ত্রিত ছিল যে লতিফ ফিরে গিয়েছিল। আত্মহত্যা অনেকে ঝোকের বশে করে কিন্তু লতিফের একটা কারণ আছে, তার কারণ যথার্থ।
    যদিও বাসা থেকে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বের হয়েছিল লতিফ কিন্তু মানুষের যতক্ষন শ্বাস ততক্ষন তার মনের অস্থিরতা অনিবার্য।
    যা করছি ঠিক তো?
    ঠিক নয় কেন?
    মানে বেঁচে থাকারই তো একটা আনন্দ আছে, সেই বা কম কি?
    কিন্তু অপমানবোধটাও সত্য। প্রতিটা রাত তার কাছে অমাবশ্যা,অপমানের। রাত ঘুমাতে দেয়না। এই অনুভুতি কি মিথ্যে? কাকে বোঝাবে লতিফ রাত এলেই কি কষ্ট শুরু হয়। মনে হয় কেন বেঁচে আছি? কি জন্য? কেন এত অপমান সইতে হবে? কেউ যে অপমান করে তা নয়, নিজের শরীর অসম্পুর্ন, কোন অদৃশ্য হরমোনের খেলায় অথবা শারীরিক কোন গোলযোগের জন্য সে নারীর কাছে পুরুষ নয়।

    নিজের জীবন নিজে না নিয়ে অপেক্ষা করলে মৃত্যু একদিন নিজের নিয়মেই আসবে। কিন্তু লতিফের নিত্য অপমান বোধের কি হবে? রাত নেমে এলেই মানসিক যন্ত্রণা শুরু হয়। নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে ভাবে-সবই তো ঠিক ছিল অথচ…। অফিসে আর মন বসেনা।কোন কাজ করে লতিফের একটুও শান্তি নেই। একটু পর পরেই নিজের অক্ষমতা যেন চাবুক হাতে ফিরে আসে, সে ক্ষত বিক্ষত হয় । কি হবে এসব করে? এত টাকা এই নিজের বাড়ি -সব কিছু থেকেও কিছুই নেই। শরীরের অল্প একটু কমতি জীবনের সব কিছু মিথ্যে করেছে। ভাল্লাগেনা, ভাল্লাগেনা-কিচ্ছু ভাল্লাগেনা।

    নিজের কোন ভুল হয়নি। লতিফ কি করে জানবে নিজের অক্ষমতা। যদি আগে থেকে জানত তবে সে বিয়েকে এড়িয়ে যেত সঙ্গত কারণেই।কিন্তু মানুষ বলে কথা- যার পা নেই সে ভিক্ষুকও তার জীবনকে তার ভিক্ষার থালার মত ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু তাকে কি বেচেঁ থাকা বলে?
    কিন্তু আমি বেঁচে থেকে কি করব? জারিনকে ডিভোর্স দেব? কি বলে দেব?
    খুব ভদ্র মেয়ে জারিন সন্দেহ নেই। অপেক্ষায় আছে হয়ত কিছু একটা হবে আর লতিফকে পুরুষ হিসাবে পাবে।

    পুকুরের ধারে কিছু তাল গাছ। চড়া দুপুরে জায়গাটা বেশ নির্জন। রাস্তা দিয়ে অবশ্য গাড়ি গেলে অপার্থিব এই নীরবতার ছন্দপতন হয়। জংলার শব্দহীনতা যেন লতিফের শেষ ইচ্ছাকে আরো হাতছানি দিয়ে ডাকছে। পুকুরের জলে কিছু বাঁশ পাতার নৌকা ভেসে আছে। মৃদু বাতাসে সেগুলি দোল খাচ্ছে। নিশ্চিত পাশের গ্রামের ছেলেরা বানিয়ে খেলা করেছে। বেশ দেখতে নৌকাগুলি। লতিফের মনে হল তার সাথে বাঁশপাতার নৌকাগুলির তফাৎ নেই। সে নিজেও দেখতে শুধু পুরুষের মত কিন্তু সে আসলে কার্যকর অর্থে পুরুষ নয়। নৌকাগুলিকে বালকেরা যেমন আনন্দের জন্য বানিয়েছে লতিফও তেমন কারো খেলার বস্তু মাত্র। কেউ একজন হয়ত স্রেফ সৃষ্টির বিচিত্রতা আনতে গিয়ে তাকে ন-পুরুষ বানিয়েছে। কারো কাছে হয়ত সৃষ্টির খেলা, কিন্তু লতিফ যে প্রতি রাতে অপমানিত হয়, প্রতিক্ষণে জন্ম রহস্যের কূলকিনারা খুঁজে ফেরে,তার নিজের জীবন রাখতে না চাওয়ার পিছনের শব্দহীন কান্না-এতে কারো জন্যে আছে অপার আনন্দের খোরাক।
    একেক সময় লতিফের মনে হয়েছে- যে খেলা খেলতে চাও, যে মজা নিতে চাও কি হবে যদি তোমার সেই খেলা না খেলি, কি হবে যখন থাকব না? তখন এই মজা এই আনন্দ কি আর থাকবে? আমি আছি বলেই তো তোমার এত আনন্দ- আচ্ছা, বেশ।
    কাল রাতে সুইসাইড নোট লিখেছে লতিফ। পকেট থেকে বের করে নিজের চোখের সামনে নিল । বেশ গুছিয়ে লেখা-
    আমার লাশ দেখে উৎসুক হয়ে যারা ভাবছেন আমি কে- তাদের বলি,

    আমি লতিফ।
    অপর পাশে আমার ঠিকানা দেয়া আছে। আমার আত্মহত্যার কারণ খুব বড় কিছু নয়। আমি চাইলেই হাওয়া বাতাস খেয়ে পৃথিবীতে থাকতে পারতাম। খুব সম্ভব ছিল সেটা। যে কোন কারণেই হোক হতাশ ছিলাম।
    কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ বা অভিমান নেই। পৃথিবী অনেক সুন্দর জায়গা। তবে কারো কারো জন্যে এখানে না থাকাটাই বরং ভাল।
    চাকুটার দিকে তাকিয়ে আছে লতিফ। সব কেমন নিঝুম হয়ে আছে। জংলার ছায়ায় দাঁড়িয়ে লতিফের মনে হল মহাবিশ্বের সবকিছু যেন থমকে আছে। প্রকৃতির শব্দহীনতা সুইসাইডাল। জংলার বাইরে বিরান প্রান্তর । ধানকাটা হয়ে গেছে, বিস্তীর্ন খোলা ন্যাড়া সুর্যের প্রচন্ড দাপট নিজের মনের অশান্তিকে উসকে দিচ্ছে।
    একজন সুখী মানুষ হলে হয়ত লতিফ এমন নির্জনতা উপভোগ করত। কিন্তু জীবন যন্ত্রণা আর বাইরের খরতাপ- লতিফের কেমন বিরক্তবোধ হচ্ছিল। উন্মুক্ত বিশাল আকাশে চোখ রেখে লতিফের মনে হল- একজন অতি সামান্য মানুষের এই পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া বড় কোন ঘটনা নয়। সে ঝোকের বশে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে না। তার যাবার যুক্তি আছে। সে যে কোম্পানিতে কাজ করে সে্খানে পণ্যে ডিফেক্ট থাকলে সে পণ্য জাস্ট ছুড়ে ফেলা হয়। সে সেরকম কিছুই। সে জাস্ট বাতিল হবার কাজটা নিজেই করছে। অপমান সইবার চেয়ে সাহস করে নিজেকে অপমানের হাত থেকে মুক্তি দেয়াই ভাল।
    যথার্থ কারণ থাকলে মানুষ কি জীবন দান করেনা?
    নিজের দেশের জন্য, প্রিয় কারো জন্যে অনেকেই নিজের জীবন উতসর্গ করেন। এই প্রাণ উতসর্গ করা কি আত্মহত্যা নয়? তাদের মনে হয়েছে নিজের দেশ নিজের প্রাণের চেয়ে বড়, তাই দেশের জন্য মৃত্যু গর্বের। যদি তাই হয় তাহলে নিজের অপমানের চেয়ে যদি মৃত্যুকে শ্রেয় মনে হয় তবে নিজের সন্মানের জন্য আমি কেন নিজের জীবন নিজেকে উতসর্গ করতে পারবনা? এখানে কোথায় ভুল? এই মৃত্যু গর্বের নয় কেন? আত্মহত্যা না করে আত্ম উতসর্গ করা যায়না।
    লতিফ নিজেও অনেক চেষ্টা করেছে, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে এই আশায় সে নিজেও তো কম অপেক্ষা করেনি । কিন্তু কোন আশার আলো নেই। লতিফের মনে হল- আমার জীবন রাখা দরকার কি দরকার নেই তা আমার চেয়ে কেউ ভাল জানেনা। বাইরের কেউ বুঝবেনা আমার যন্ত্রণা কোথায়। বাইরের লোক বাইরে থেকে মন্তব্য করবে মাত্র। এদের কে বোঝাবে কেউ শখ করে এ রাস্তা মাড়ায় না। জীবনকে কে না ভালবাসে! আজ সব ঠিক থাকলে এই তপ্ত দুপুরে রোদে পোড়া গ্রামের ছবি তুলে নিত লতিফ, ধান কাঁটা প্রান্তর দেখে কত কবিতা লিখে গেছে জীবনানন্দ। তার প্রিয় কবি। তার মৃত্যু নিয়েও অনেক কথা শুনেছে লতিফ।

    রোদ যেন আরো বেড়ে যাচ্ছে। সবকিছুর শেষ তাই যেন এক প্রকার শান্তি লাগছে। দিঘীর জলের উপর একটা ফড়িঙের দিকে চোখ আটকে গেল। বাহ, সেই ছোট থাকতে গ্রামে ফড়িঙ দেখত অনেক। আজ যাবার আগে আগে ফড়িঙ দেখে বেশ লাগল লতিফের। পৃথিবীর নিজের যেন একটা টান আছে। জীবনে যতই অশান্তি থাক, মানুষ তবু এই পৃথিবীর মায়ায় বাচে। প্রত্যেক প্রাণ তো পৃথিবীরই সন্তান। এই হাওয়া,এই রোদ, এই মেঘ এই জল -পৃথিবী এইসব কিছু দিয়ে নিজের সব সন্তানকে নিজের বুকের ওমে আগলে রাখে। এই মায়ের বাধন ছেঁড়া কি এত সহজ!
    ছুড়ি নিয়ে লতিফ জংলার এক পিতরাজের গাছের নীচে ঠেস দিয়ে বসল। পুকুরটা বেশ টলটল করছে। কেমন নীরব বোবা চারপাশ। গ্রামের ধার থেকে গরুর হাম্বা রব বেশ লাগছে। যাবার জন্য এর চেয়ে ভাল সময় আর হয়না।
    মিসাও ফুজিমুরাকে মনে পড়ছে এখন। আত্মহত্যার আগে গাছের ছাল তুলে কবিতা লিখেছিল মাত্র ১৬ বছরের জাপানি ছেলে। খুব ছোট একটা কারণ। স্কুলের সহপাঠী তামিকো তার ভালবাসা প্রত্যাখ্যান করেছিল। এইটুকু বয়সেই ফুজিমুরা মহাবিশ্বের রহস্য অনুসন্ধান করে কোন লাভ নেই মনে করে প্রস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তার আত্মহত্যার কবিতাই তাকে অমর করেছে।
    গাছের ছাল তুলে নিজের শেষ কথা লিখে ফেলল লতিফ-

    ছায়াপথ ধরে হেটে এক অন্তহীন নক্ষত্রলোকের পথে যাচ্ছি, তোমাদের মুখরিত জীবনকে অভিনন্দন।

    4
    7 Comments
Skip to toolbar