-
নয়নপথগামী
হাসনাত সৌরভ
=======================কচুরিপানা আর কলমিশাকে মোড়া একটা নীচুমতো জমিন দেখিয়ে জুহিকে বলি, ওই দ্যাখো ওইটা ধানসিদ্ধ নদী, জীবনানন্দের ধানসিঁড়ি। এখন মজে গেছে কিন্তু আগে জাহাজ চলত নাকি। ধান-চালের বস্তাভর্তি জাহাজ।
জুহির চোখে সানগ্লাস। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। নাকে রুমাল চাপা দেয়। আমিও পাচ্ছি মনুষ্যবিষ্ঠার গন্ধ।
হা হা করে হাসি— আরে রুমাল চাপা দাও কেন? এটা ন্যাচারাল পারফিউম।
ধানসিঁড়ির বুকে ধানের বীজতলা। বর্ষার জল জমেছে কোথাও কোথাও। একটা মাছরাঙা বসে আছে সেই জলের দিকে চেয়ে। জুহির গাল লাল হচ্ছে রোদে। রোদে পুড়লে জুহিকে ভীষণ আকর্ষিক লাগে। চুমু খেতে ইচ্ছা করে ভীষণ।
–চলো আমবাগানটা দেখিয়ে আনি। বাপ-দাদার আমলের আমবাগান। কত পুরানো গাছ আছে জানো!
‘ডিসগাস্টিং!’ জুহি মনে মনে বললেও আমি শুনতে পাই। শুনেও ইগনোর করি। বিয়ের পর প্রথম এসেছি গ্রামের বাড়িতে। একবার অন্তত ঘুরে দেখুক শ্বশুরের ভিটা। আর হয়তো কখনওই আসা হবে না। গ্রামের সব বাগান ভিটা বেচার পরিকল্পনা চলছে। মোটামুটি সব ঠিক হয়ে গেছে। পরের মাসে রেজিষ্ট্রি। সেই টাকাই ভরসাতেই শহরে নতুন ফ্ল্যাটের বুকিং। কী করার আছে! কত কষ্টে ছুটি জোগাড় হয় আমাদের। আমার হয় তো, জুহির হয় না। জুহির হয় তো, আমার হয় না। গ্রামের বাড়ি জমি থাকা না থাকা এক ব্যাপার। তার থেকে নতুবা ফ্ল্যাটে কাজে লাগুক।
মা শেষমেশ রাজী হয়েছেন শহরে গিয়ে থাকতে, এটাই ভাগ্যি।
–কিগো লতিফুলের ব্যাটা লয়? ল্যাংড়া আমগাছের পেছন থেকে ভূতের মতো বেরিয়ে এল কিরন শেখ।
কোমরটা টানটান করে দাঁড়িয়ে বলল— চোখে আর জ্যোতি নাই রে দাদো। কিন্তু ঠিক চিনছি লতিফুলের ব্যাটা। ঠিক য্যানো লতিফুল দাঁড়ায় আছে। আহারে! বুড়া চাচা পড়ি রইল, ব্যাটা চলি গেল আগুতে। সবই নসিব!
কিরন শেখ সেই দাদোর আমল থেকে আমাদের আমবাগানের জোগালদার। আমে বোল এলেই খড়ের ছাউনির মাচায় কাটায় দিনরাত। কোন গাছে কত আম হবে, আগে থেকে বুঝতে পারে সব। যেন গাছেদের ভাষা জানে।
–কদিন থাকবা বাপ? পুকুরপাড়ে আর কটি আম আছে। পরশু পাক ধরবে অল্প। ল্যাংড়াতে মিষ্টি বসতে আরও কদিন। তুমি তো গাছপাকা ল্যাংড়া ভালোবাসো।
বুকের মধ্যে একটা ছোট ধানসিঁড়ি।
শুকিয়ে যায়। মজে আসে অল্প অল্প করে।বুকের ভেতর একটা ছোট ধানসিঁড়ি।
যে নদীতে আর নৌকা চলে না। সুর ওঠে না ভাটিয়ালি।বুকের ভেতর একটা ছোট ধানসিঁড়ি।
মরে যায় একটু একটু করে।দিন বিকালের ট্রেন। বাতানুকূল কামরা। বাইরের বাতাস আসে না। জুহির গাল রোদে পোড়ে না, লালও হয় না। জানলার দিকে মুখ করে জুহি আমাকে বলে— কিরনচাচা যতদিন আছে ততদিন না হয় জমিবাড়ি বিক্রিবাটা বন্ধ থাক। গাছপাকা ল্যাংড়া খাওয়া যাবে।
আমি জুহির দিকে তাকিয়ে থাকি। বুকের ভেতর ছোট ধানসিঁড়িতে হঠাৎ কোথা থেকে জল থইথই করে। পালতোলা নৌকা বয়। সেই নৌকার পাল যেন জুহির আঁচল। বিকালের পড়ন্ত আলোয় জুহির গাল সূর্যের মতো লাল। আমি তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠি।
————————————-2 Comments
Friends
ফরহাদ আহমেদ
@forhad2004
সাব্বির হোসেন।
@shadowhunter3d
তাজুল ইসলাম তন্ময়
@tazulumgmail-com
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
জিকরুল ইসলাম
@zikrul
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
অসীম রহমান
@ashim_rahman
Prithula Zaman
@prithula


সুন্দর লিখেছেন।