-
“মুসাফির”
—————–পেটু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
তার দৃষ্টি তার পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের দিকে হলেও মনোযোগ বাবুমশাইয়ের প্লেটে। ভাবখানা এমন যে, বাবুমশাইকে হিরোশিমা নাগাসাকিতে এট্যাম বোম পড়ার সংবাদ জানাতে হবে, তবে কিভাবে সংবাদটা দেবে তা কিছুতেই বুঝে উঠছে না।
আসল ঘটনা তার চেয়েও টাইট। পেটুর ভেতর ভেতর যে চাপা উত্তেজনা বয়ে চলেছে তা কোন পরমানুর ফিউশন থেকে কম না।বাবুমশাইয়ের খাবার শেষ হবার অপেক্ষায় আছে পেটু। এই নিয়ে সাতবার ঘরে গিয়ে ফিরে এসেছে সে। প্রত্যেকবার ঘরে গিয়ে হাতে-পায়ে ধরে নীরাকে কত অনুনয় বিনয় করে এসেছে সে। “আপু প্লিস বলোনা বাবুমশাইকে একবার।” “আপু! এই তোমার পায়ে ধরি যাও না আপু বলোনা বাবুমশাইকে।” “একটি বার আমার হয়ে বলো তুমি…। প্লিস! প্লিস! প্লিস!” “এই আপুমনি বলবে তুমি একটি বার? আমি নিশ্চিত বাবুমশাই তোমার কথা শুনবে আপু।”
কিন্তু বারংবার নীরার একি উত্তর দেয়, তুই ভালো করে জানিস বাবা কিছুতেই মানবেনা তাই বিরক্ত না করে পড়তে বস। আর না হয় তোর সমস্যা তোর নিজের মুখে বল।এই একান্নবর্তী রাবনের সংসারে পেটু তার সব কথা বলতে পারে শুধু মাত্র এই একটি মানুষকে। তার এই বড় বোনটিও পেটুর পক্ষে কথা বলে সবসময়। তবে আজ আর কোন কিছু দিয়েই রাজি করানো গেলনা তাকে। তাই বাধ্য হয়েই ফিরে এসে পেটু এভাবে অনেকক্ষন হল বাবুমশাইয়ের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। মনে মনে নিজেকে সাহস জুগিয়ে চলেছে, আজ তাকেই বলতে হবে। সে বড় হয়েছে, এখন সে ইউনিভার্সিটির ছাত্র। তার সমস্যাগুলো নিয়ে তাকেই মাথা ঘামাতে হবে, তাকেই হ্যান্ডেল করতে হবে সব এবং এটাই উচিত। তাকে যে করেই হোক বাবুমশাইকে বুঝিয়ে বলতে হবে তার কথাগুলো।
খাবার সময় বাবুমশাই খাবার প্লেট ও টিভির পর্দা ছাড়া কোন দিকে তাকায় না। খায়ও খুব ধীরে যেন প্রতিটি ভাতকে আলাদা করে চিবিয়ে চিবিয়ে গলাধঃকরণ করে। এক মুঠো ভাত তরকারীর সাথে মেখে সেটা খেয়ে শেষ করে তারপর আরেক মুঠো ভাত মাখে। এভাবে তৃপ্তি সহকারে খাবারের পূর্ন স্বাদ আহরণ করে সে সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন ভাবে।
পেটু মনে মনে ঠিক করে বাবুমশাইয়ের খাবার পর্ব শেষ হলেই তাকে জানাবে, যে তার বন্ধুরা সবাই মিলে কাল বিরুলিয়ায় কবীরের বাসায় যাবে রাতে সেখানেই থাকবে। কবীরদের নাকি নিজেদের প্রকান্ড বাড়ি তাই কোন রকম অসুবিধে হবে না। আর সে বাড়িতে কবীরের পরিবারের সবাই থাকে বিধায় কোন ধরনের উল্টাপাল্টা হবার বিন্দু পরিমাণ চান্স নাই। সেখানে তারা সারারাত সবাই মিলে বার-বি-কিউ করবে, গান বাজনা করবে, হৈ-হুল্লোড় করে সারারাত এক আনন্দের সভা করবে। বিরুলিয়ায় বংশী নদীর পাড়ে গল্প-উপন্যাসের মত হরেক রকম দেশি-বিদেশি গাছ দিয়ে ঘেরা সেই বাড়িটি নাকি দেখার মত, যেন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য।
নাহ! নদীর কথা কিছুতেই বাবুমশাইকে বলা যাবে না। বাসার কাউকেই বলা যাবে না, ভুল করেও না। তাহলে আর এ জনমে বাবুমশাই কবীরের বাসায় যেতে দেবেনা।
এই নিয়ে হাজারবার রির্হাসেল করল পেটু তবুও ঠিক গুছিয়ে উঠতে পারছে না। ঠোট-মুখ-গলা বারবার শুকিয়ে যাচ্ছে, বড় অসহনীয় লাগে এ চাপ পেটুর কাছে।বাবুমশাইয়ের খাবার প্রায় শেষের দিকে এমন সময় মমতাময়ী ছেলেকে বলল, কুট্টি! ফ্রিজ থেকে দই’য়ের টোহা বের করে তোর বাবুমশাই’য়ের পাতে দে।
পেটু মায়ের আদেশমত ফ্রিজ থেকে দই বের করে বাবুমশাইয়ে সামনে নিয়ে রাখল, ভীত আড়চোখে বাবুমশাইয়ের মেরুন রঙের মাঝারি ফ্রেমে বাধানো স্বচ্ছ কাচের চশমার ওপাশে থাকা নিরেট পাথরের মত চোখ দুখানার গতিবিধি দেখে নিল। টিভির দিকে নির্লিপ্তভাবে চেয়ে আছে বাবুমশাই।মমতাময়ী তার প্রাননাথকে উদ্দেশ্য করে বলল, আজকের দই খেয়ে দেখ! খুব ভাল! একদম আমাদের বাড়ির দই’য়ের মত স্বাদ।
কুট্টি! যা তো, একটা চামচ এনে তোর বাবার পাতে দৈ উঠিয়ে দে।পেটু উঠে গিয়ে সেলফের ছোট চামচের দিকে হাত বাড়াতেই মমতাময়ী চেচিয়ে উঠল। কেন! বড় চামচ নেই এ সংসারে।
পেটু থতমত খেয়ে এদিক-সেদিক তাকিয়ে মাথা চুলকোতে চুলকোতে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল, বড় চামচ কোথায়?মমতাময়ী আবার ঝাঝিয়ে উঠল, কেন! ঐযে ঐ গামলার নিচেই তো। আমি তো এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি। বলে ক্ষান্ত হলনা, সংসারের নানা জটিল কাজে তার একচেটিয়া অবাধ বিচরন ও পেটুর নির্বুদ্ধিতার গোটা তিনেক উদাহরন দিয়ে আবার হাক দিলেন, কিরে কানাউল্লা পেলি?
মায়ের ওপর বিরক্তির শেষ নেই পেটুর, এমনিতেই প্রচুর প্রেসার এরমাঝে তার এতসব বলতে হল। আর প্রতিদিন মায়ের এই একি লাঞ্ছনা শুনে শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে পেটুর, রাগে-দুঃখে চোখ মুখ কুকড়ে যাচ্ছে। নাহ.. শান্ত হও বাবা পেটু। কুল! কুউউউউউউল! চিলাক্স ম্যান! ঐতো সালা বড় চামচ। নিজেকে শান্ত করে চামচ হাতে আবার বাবুমশাইয়ের কাছে গিয়ে বসল পেটু। দইয়ের হাড়ি খুলতে খুলতে আবার বাবুমশাইয়ের দিকে তাকাতেই ধ্বক করে উঠল পেটুর ভেতরটা।
বাবুমশাই যে তার দিকেই চেয়ে আছে। বড় শান্ত, কোমল সে চাহনী, চোখাচোখি হতেই বাবুমশাই তার সমস্ত স্নেহ দুই ঠোটে জমা করে অল্প হাসল। তবে তার সুন্দর পুরু গোঁফের নিচে সে হাসি পেটু ধরতে পারেনি।
পেটুর হৃদপিন্ডটা স্কুলের ঘন্টার মত বাজতে শুরু করেছে। আর সইতে পারল না পেটু, প্রবল চাপে ফেটে পড়া আগ্নোয়গিরির মত এক নিঃশ্বাসে সবকথা বেরিয়ে পড়ল পেটুর মুখ থেকে।
প্রবল উত্তেজনার মাঝেও বুদ্ধি করে নদীর কথা এড়িয়ে গেল পেটু। তার বদলে বিরুলিয়ায় জমিদার বাড়ির উপখ্যান ও তার সৌন্দর্য্য ব্যাখ্যা করল। এক মুহূর্ত ভেবে নিল কোন কিছু কি বাদ পড়ল নাকি, নাহ আর কিছুই বলার নেই। তার আকুতি ভরা অনুরোধ জানিয়ে ছলছল চোখে বাবুমশাইয়ের দিকে আশায় বুক বেধে তাকিয়ে আছে।
এক মূহূর্ত নীরবতায় ঘর জুড়ে এক নাটকীয় পরিবশ তৈরী হয়েছে। মমতাময়ী ভয়ে ভয়ে এক বার পেটুকে, একবার তার প্রাননাথকে দেখল, কিছু বলবে ভেবে মুখে খুলতে যাবে তার আগেই বাবুমশাইয়ের এক হাত বরাবরের মত তুলে ধরে থামার নির্দেশ দিল। মুখেও গর্জে উঠল, থাম!… না..! রাতে বাইরে থাকা চলবে না।বাবুমশাইয়ের এমনিতেই দৃড় কঠিন মুখের আদলে পেটুর এই অসম্ভব আবদার সেই কাঠিন্যকে রীতিমত হিংস্র-বর্বর করে তুলেছে। চোখের দৃষ্টিতে ভয়াবহ উত্তাপ।
গর্জন শুনে নীরা ছুটে এল। এসে দরদী সুরে ডেকে উঠল, বাবা!
দাঁড়াও! আমাকে বলতে দাও আগে। বাবুমশাইয়ের এই চিরচেনা হুঙ্কার পৃথিবীকে নিস্তব্ধ করে দিতে পারে আর নীরা তো এক তুচ্ছ মানবী।
না!… রাতে এ বাসার কারোই বাইরে থাকা চলবে না! অন্তত আমি যতদিন বেচে আছি। আর এ ব্যাপরে আমি কোন কথা শুনতে চাই না।ততক্ষণে পেটুর দু চোখের বাধ ভেঙ্গে গেছে। গাল বেয়ে চোখের জল, নাকের জল গড়িয়ে টপটপ করে দই’য়ের হাড়িতে পড়ছে।
মমতাময়ী ছেলের কান্ড দেখে সইতে না পেরে উঠে গিয়ে কষিয়ে এক চর মারে ছেলের গালে।
যাহ! এখান থেকে। পুরুষ মানুষ নাকি এইভাবে কাদে। তোরে কি কেউ মেরেছে যে এই ভাবে নাকের জল চোখের জল এক করছিস।বিহ্বল হয়ে পড়ে পেটু, কাদতে কাদতে উঠে দাঁড়ায়। ঘরে যাবার আগে শেষবার বাবুমশাইয়ের দিকে তাকায়, বাবুমশাইয়ের নিরেট-নিথর পাথুড়ে চোখ চেয়ে আছে টিভির পর্দায়।
বাবুমশাই নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই নীরা আর মমতাময়ী ঝগড়া বাধিয়ে দিল। গলার স্বর সপ্তকে চড়িয়ে নীরা বলল, তুমি অযথা ওকে মারলে কেন মা?
মা মেয়ের প্রশ্নের উত্তরে আরো এক সুর উপরে গলা চড়িয়ে বলে উঠল, মারবে না তো কি করবে? তোরা জানিস তোদের বাবা কেমন তারপরেও কেন এসব আজেবাজে আবদার করিস, আর দেখেছিস তুই ওর কান্ড! এখনো কথায় কথায় চোখের জল-নাকের জল গড়িয়ে পড়ে।
দইটার পাইন মারছে, তোর বাবা একটু মুখে দিতে পারল না।
নীরা মেজাজ খারাপ করে উঠে পড়ল। সে ভালো করেই জানে এই মহিলা তার জননী সুতরাং কথায় তার সাথে পেরে ওঠা তার কম্ম নহে।সন্ধ্যে হয়ে এসেছে তবুও ক্যাম্পাস ভরা ছাত্র-ছাত্রীর ভিড়। মাঝমাঠে সব থেকে বড় দলটি গোল হয়ে বসে আছে। বেশ জমজামট আড্ডা চলে এই দলটার অনেক রাত পর্যন্ত।
শীতের শেষ হতে চলল প্রায় কোথাও ট্যুর দেয়া হইলনারে। কন্ঠে এক ধরনের আর্তনাদ নিয়েই টিপু কথাটা বলল।
এইখানে বইসা আপসোস না কইরা চল তাইলে ঘুইরা আহি। রবি ঘিয়ে আরো একটু আগুন দিয়ে উত্তর দিল।
কিশোর বলল, চল তাইলে কক্সবাজার যাই। সমুদ্র দেইখা আসি।
পাগলাটে শিয়াম সিরিয়াস সুরে বলল, সিওর কইরা বল।
ইমন চূড়ান্ত সিরিয়াস, আরে সিওরের কি আছে এখন কইলে এখনি রওনা দিমু।
তাইলে চল এই মাসের শেষ শুক্রবার রাতে রওনা দেই। মনের সুখে তিন দিন থাকুম ভালো লাগলে আর একদিন পরে বাড়াইলাম।
সেই চিল হইব তাইলে। রুশিল যোগ করল।
রাতুল, তাইলে এইখানে যেই কয়জন আছি আমরা সবাই তো ফাইনাল। আমি কাকারে কইয়া ডিসকাউন্টে টিকিট বুক কইরা রাখতাছি।
রাতুল টিকিট একটা বেশি বুক করিস নাইলে একটা কম বুক করিস। রবি লাফ দিয়ে দাড়িয়ে এই প্রস্তাব দিল।
রাতুল, কেন?
পেটুরে নিয়া যাইতে হইলে যে ওর হিটলার বাপটারেও সাথে কইরা নিয়া যাইতে হইব। নাইলে বেচারা এই বারো যাইতে পারব না আমদের সাথে।সেই সন্ধ্যায় ভার্সিটির মাঠের সব থেকে বড় ও ভ্রমন পিপাসু মুসাফির দলটির এক সদস্য বাদে বাকি সবাই হেসে লুটুপুটু হায়। উত্তরের ভেসে আসা ঠান্ডা বাতাস বুকের মাঝে হু হু করে বয়ে চলে, বিদ্রোহী করে তোলে পেটুকে। সেই দিনের পর থেকে বিদ্রোহ করে পেটু। তার পরিবার,বন্ধু,সমাজ সবার বিপক্ষে শুরু করে এক নীরব বিদ্রোহ।
(ছোটগল্প)
{বড়গল্পের সূচনা।}19 Comments-
@MD Daniel Promice ধন্যবাদ। আপনার উৎসাহ পেয়ে সত্যিই আরো লেখার অনুপ্রেরণা পেলাম। হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা পারিবারিক গল্প, উপন্যাস পড়ে ও তার নির্মিত বেশ কিছু নাটক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাবুমশাই নামের একটি লেখা শুরু করার আগ্রহবোধ করি অনেক আগে থেকেই। এই গল্পের চরিত্রগুলোকে আমি তার মত করে তেমনভাবেই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি। এবং চেষ্টা করছি তার স্মরনে লেখা আমার এই লেখাগুলো দিয়ে তাকে আবার ফিরে পেতে। শুভচ্ছা ও ভালবাসা নেবেন।
-
@mashum007 আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ বন্ধু। আপনার নতুন লেখা পাইনা কেন??
-
@himi1912 ধন্যবাদ বন্ধু। লেখাটি পড়ার জন্য ও আপনার গুরত্বপূর্ণ মতামত দেয়ার জন্য। আপনি ঠিকি বলেছেন তাই হবে। আমি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র নই তাই শব্দগুলো লেখার সময়ে দ্বিধা বোধ করছিলাম। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গুগলের সাহায্য নিয়েছিলাম। আবারো ধন্যবাদ বন্ধু। শুভেচ্ছা নেবেন।
Friends
TARIN
@tarin
মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম (সবুজ) সিকদার
@attokendrik
মো. আবু মোহাদ্দেস
@mohaddesh1967
Kishor Kanok
@kishorkanok-2
Shahajahan Tapu
@shahajahantapu
জুলহাজ আলী জীবন
@julhaj
গোলাম রাব্বানী
@rabbi-2
Reazul Kabir
@reazul-kabir
পিপীলিকা
@abujubair



অভিনন্দন।